পাঠ্যবই নিয়ে অনিশ্চয়তা

S M Ashraful Azom
প্রাথমিকের পাঠ্যবই নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে জটিলতা। বিশ্বব্যাংক ও প্রেস মালিকদের বিপরীতমুখী অবস্থানের কারণে আগামী শিক্ষাবর্ষে যথাসময়ে বিনামূল্যের পাঠ্যবই পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। পাঠ্যবই তদারকির দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি প্রতিষ্ঠান জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) একাধিক কর্মকর্তা বলছেন, যেভাবে দুই পক্ষ অনঢ় অবস্থান রয়েছে, এভাবে চলতে থাকলে কোনভাবেই যথাসময়ে বই ছাপা সম্ভব হবে না। পহেলা জানুয়ারি উত্সব করে সব শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেয়া যাবে না বই ।
 
এনসিটিবি জানিয়েছে, নিয়ম অনুযায়ী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে বই ছাপার কাজ শেষ করতে হয়। তবে বিশেষ ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১০ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় দেয়া হয়। সে হিসাবে আগস্টে পুরোদমে বই ছাপার কাজ চলে। গত বছরও তাই হয়েছিল। এ সময় দেশি-বিদেশি সব প্রেসেই বই ছাপার কাজ চলছিল। এবার মাধ্যমিকের বই ছাপার কাজ শুরু হলেও প্রাথমিকের কার্যাদেশ এখনও দেয়া হয়নি। কবে ছাপা শুরু হবে সে ব্যাপারে এখনও সিদ্ধান্ত নেয়নি প্রেস মালিকরা।
 
এনসিটিবি জানিয়েছে, কার্যাদেশ দেয়ার পর ছাপার কাজ শেষ করতে ১২৬ দিন সময় দেয়ার নিয়ম। ৩১ আগস্ট কার্যাদেশ দেয়া হলে এর পর ১২৬ দিন গিয়ে দাঁড়ায় ২৪ জানুয়ারি। কিন্তু ৩০ নভেম্বরের মধ্যে ছাপা শেষ করতে হলে সময় পাওয়া যাবে ৯১ দিন। এতো অল্প দিনে যা সম্ভব নয়।
 
এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক নারায়ণ চন্দ্র পাল বলেন, মাধ্যমিকের বই ছাপা অনেক আগেই শুরু হয়েছে। পৌঁছানোর কাজও শুরু হয়েছে। কিন্তু প্রাথমিকের বই ছাপা নিয়ে সমস্যা হচ্ছে। আমরা পহেলা জানুয়ারি শিক্ষার্থীদের হাতে বই দেয়ার বিষয়টি মাথায় রেখে এগুচ্ছি। সরকারের অর্জন কোনভাবে ব্যাহত হোক আমরা তা চাই না। আগামী দুই একদিনের মধ্যে বিষয়টি সমাধান হয়ে যাবে এমনটি আশা করছি। সময় কমিয়ে দিয়ে কাজ করিয়ে নিতে হবে।
 
তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বব্যাংক প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিকের সাড়ে ১১ কোটি বই ছাপার মান ঠিক রাখতে একাধিক শর্ত জুড়ে দিয়েছে। কিন্তু দরপত্রে উল্লেখিত শর্তের বাইরে নতুন কোন শর্ত মানতে রাজি নয় সর্বনিম্ন দরে প্রাথমিকের বই ছাপার দায়িত্ব পাওয়া প্রেস মালিকরা। জুড়ে দেয়া শর্তে কার্যাদেশ গ্রহণে রাজিও নন তারা। আর বিশ্বব্যাংক তাদের শর্তের বাইরে কার্যাদেশ না দিতে এনসিটিবিকে চিঠি দিয়েছে। এ নিয়ে দুই পক্ষই বিপরীতমুখী অবস্থানে।
 
গত বুধবার প্রেস মালিকরা মন্ত্রণালয়ের গিয়ে তাদের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন। তারা বলেছেন, দরপত্রে উল্লেখিত শর্ত অনুযায়ী তাদের কার্যাদেশ দিতে হবে। এর বাইরে শর্ত আরোপ করে কার্যাদেশ দিলে তা তারা গ্রহণ করবে না। গতকাল বৃহস্পতিবারও প্রেস মালিকরা এনসিটিবিতে গিয়ে তাদের অবস্থান ব্যাখ্যা করে বলেছে, যদি নতুন করে শর্ত আরোপ করে কার্যাদেশ দেয়া হয় তা তারা মেনে নেবে না। তারা এনসিটিবিকে জানিয়েছে, শুধু প্রাথমিক নয়, মাধ্যমিকসহ ৩৫ কোটি বই ছাপার কাজ তারা বন্ধ করে দিবে। অযাচিত শর্ত দেয়া হলে তারা উচ্চ আদালতেও যাবে এমন হুমকিও দিয়েছে। এমন অবস্থায় বিপাকে পড়েছে এনসিটিবি।
 
এনসিটিবি বলেছে, তাদের বিশ্বব্যাংকের গাইড লাইনের বাইরে যাওয়ার কোন সুযোগ নেই। শর্ত আরোপ করেই কার্যাদেশ দিতে হবে।
 
চলতি শিক্ষাবর্ষে ২০১৫ সালে দেশের প্রাথমিক, নিম্ন মাধ্যমিক এবং মাধ্যমিক স্তরের চার কোটি ৪৪ লাখ ৫২ হাজার ৩৭৪ শিক্ষার্থীর হাতে ৩২ কোটি ৬৩ লাখ ৪৭ হাজার ৯২৩টি চার রংয়ের নতুন বই তুলে দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। আগামী শিক্ষাবর্ষে গড়ে মোট ৫ শতাংশ ছাত্রছাত্রী বেশি ধরে নিয়ে বই ছাপা হচ্ছে। এতে ২০১৬ শিক্ষাবর্ষের জন্য মোট ৩৫ কোটি কপি পাঠ্যবই মুদ্রণ ও সরবরাহ করার লক্ষ্য স্থির করা হয়েছে। ৩৫ কোটি বইয়ের মধ্যে মাধ্যমিকের প্রায় ২১ কোটি ৯২ লাখ, প্রাথমিকের ১১ কোটি এবং প্রাক-প্রাথমিকের ৬৭ লাখ কপি বই।
 
প্রাথমিকের বই ছাপার জন্য প্রাক্কলন বাজেট ছিল ২৯২ কোটি টাকা। কিন্তু আন্তর্জাতিক দরপত্রে সর্বনিম্ন দরদাতা হিসাবে ১৯৮ কোটি টাকায় কাজ পায় দেশীয় সব প্রতিষ্ঠান। প্রাক্কলিত বাজেটের চেয়ে ৯৪ কোটি টাকা কম মূল্যে কাজ নেয়ায় বইয়ের মান নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছে বই ছাপার কাজে সাড়ে ৯ শতাংশ ঋণ দেয়া বিশ্বব্যাংক। প্রথমে দরপত্র বাতিল করে নতুন করে দরপত্র দেয়ার প্রস্তাব করে বিশ্বব্যাংক। কিন্তু প্রক্রিয়া শেষ করতে অনেক সময় প্রয়োজন হবে এনসিটিবির পক্ষ থেকে এমনটি জানালে তারা নতুন করে শর্ত আরোপ করে।
 
শর্তে উল্লেখ রয়েছে, বই ছাপার বিষয়ে তারা সন্তুষ্ট না হলে এবং সম্মতি না দিলে বিল পরিশোধ করা যাবে না, এ জন্য বিশ্বব্যাংকের নিজস্ব টিম কর্তৃক বই ছাপাপূর্ব, ছাপাকালীন এবং ছাপা-পরবর্তী পরিদর্শন, তদারকি, দেখভাল এবং তদন্ত করবে। এর অংশ হিসেবে বই ছাপার আগে কাগজের নমুনা, ছাপার নমুনা এবং বই বাঁধাইয়ের পর বইয়ের নমুনা তাদের কাছে পাঠাতে হবে। ছাপার সময় তাদের টিম আকস্মিক যেকোনো প্রেস পরিদর্শন করতে পারবে। এ ছাড়া প্রেস মালিকদের জামানত বিদ্যমান ১০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করার শর্ত দেয়া হয়েছে।
 
প্রেস মালিকরা বলছেন, এসব শর্ত জুড়ে প্রেস মালিকদের বিপাকে ফেলা হবে। জমানত বাজেয়াপ্ত করা হবে। প্রেস মালিকদের কালো তালিকাভুক্ত করা হবে।
 
এনসিটিবি জানায়, বিশ্বব্যাংকের দেয়া শর্ত উল্লেখ করেই প্রেস মালিকদের চিঠি দিবেন তারা। নিয়মের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই তাদের। অচিরেই এ বিষয়ে সমাধান হবে বলে তিনি জানান।
 
মুদ্রণ শিল্প সমিতির সভাপতি শহীদ সেরনিয়াবাত বলেন, আমরা সর্বনিম্ন দরে পাঠ্যবই ছাপিয়ে দেশের ১০৯ কোটি টাকা বাঁচিয়ে দিচ্ছি। আমরা বিশ্বব্যাংকের অধীনে দরপত্রে অংশ নেইনি। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় ও এনসিটিবির অধীনে আমরা দরপত্রে অংশ নিয়েছি। অন্যায় কোন শর্ত মেনে নেয়া হবে না। ভারত থেকে মাত্র তিন শতাংশ কমে দর দিয়ে কাজ পেয়েছি।
ট্যাগস

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Know about Cookies
Ok, Go it!
To Top