অনুমোদনের পরও পে-স্কেলে বৈষম্য

S M Ashraful Azom
সেবা ডেস্ক:  পে-স্কেলের প্রজ্ঞাপনের ভেটিংকালে আইন মন্ত্রণালয় ক্যাডার ও নন-ক্যাডার বৈষম্য, বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি (ইনক্রিমেন্ট) স্থগিত না করাসহ বেশ কিছু বিষয়ে পর্যবেক্ষণ দিয়েছিল। পাশাপাশি গত ২২ নভেম্বর অর্থমন্ত্রীর স্বাক্ষরিত সারসংক্ষেপেও বেশকিছু ভালো প্রস্তাব ছিল। কিন্তু পে-স্কেলের জারি করা প্রজ্ঞাপনে উল্লিখিত বিষয়গুলো আমলে নেয়া হয়নি। ওইসব বিষয় আমলে নেয়া হলে অধিকাংশ সমস্যারই সমাধান হতো। এসব বিষয় নিয়ে আমাদের আন্দোলন করতে হতো না, রাস্তায়ও নামতে হতো না।'' এসব কথা বলেছেন পে-স্কেল নিয়ে বর্তমানে আন্দোলনকারী সবচেয়ে বড় মোর্চা প্রকৃচি-বিসিএস সমন্বয় কমিটির সদস্য সচিব মো. ফিরোজ খান।
আর বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনের মহাসচিব অধ্যাপক ড. এএসএম মাকসুদ কামাল বলেছেন, ''অর্থমন্ত্রীর পাঠানো সারসংক্ষেপ অনুমোদন করা হলে আজ বাংলাদেশ ব্যাংক কর্মকর্তা, সরকারি নন-ক্যাডার কর্মকর্তাসহ প্রায় ১০ লাখ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে আন্দোলন করতে হতো না। আমাদের বিষয়েও মন্ত্রিসভা কমিটির সুপারিশ রাখা হয়নি।''
তিনি বলেন, ''মাননীয় প্রধানমন্ত্রী অনুমোদনের পরও কোনো বিষয় কী করে বাদ যায়, তা তদন্তের দাবি রাখে। আজ আমাদের রাজপথে ঠেলে দেয়া হয়েছে। এটা এ সরকারের বিরুদ্ধে সুগভীর ষড়যন্ত্রের অংশ।''
পে-স্কেলের প্রজ্ঞাপনের খসড়ার ওপর ভেটিংয়ের সময় আইন মন্ত্রণালয় যে ৮টি বিষয়ে পর্যবেক্ষণ দিয়েছিল। সেগুলো হচ্ছে- চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে আহরিত মহার্ঘ্য ভাতা, অবসর-উত্তর ছুটি ভোগরতদের বিষয়, পে-স্কেলের সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছানো কর্মকর্তার টাইম স্কেল এবং প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদিত একটি সারসংক্ষেপে উচ্চতর গ্রেড প্রদান বিষয়ক।
এছাড়া আছে টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড দেয়ার সময় নির্ধারণ, কর্মচারীদের শ্রেণী (১ম, ২য়, ৩য়, ৪র্থ) বাতিল, ক্যাডার ও নন-ক্যাডারের চাকরির প্রারম্ভিক গ্রেড পুনর্র্নিধারণ এবং ইনক্রিমেন্ট বন্ধ রাখা সংক্রান্ত। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, এর মধ্যে প্রথম চারটি অর্থ মন্ত্রণালয় রেখেছে। কিন্তু পরের চারটির মধ্যে শুধু শেষেরটি আংশিক রাখা হয়েছে।
নাম প্রকাশ না করে আইন মন্ত্রণালয়ের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, ''পে-স্কেলের খসড়ায় ৮টি বিষয় কোনো না কোনভাবে সংবিধান, রুলস অব বিজনেস ও প্রচলিত আইনের পরিপন্থী ছিল। যে কোনো আইন, বিধি, সংবিধান ও প্রচলিত আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কিনা, তা দেখার দায়িত্ব আইন মন্ত্রণালয়ের। এসব বিষয়কে সামনে রেখেই আমরা মতামত দিয়েছিলাম। কিন্তু তার অনেক কিছুই রাখা হয়নি।''
ওই কর্মকর্তা বলেন, ''মতামতগুলো রাখা হলে আজ সিলেকশন গ্রেড ও টাইম স্কেল, বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি, চাকরিতে যোগদান স্কেল নিয়ে ক্যাডার ও নন-ক্যাডার কর্মকর্তাদের বৈষম্য তৈরি হতো না। ফলে অনেক ক্ষোভই প্রশমিত হতো।''
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, অর্থমন্ত্রীর পক্ষ থেকে সিলেকশন গ্রেড ও টাইম স্কেলের বিষয়ে বিকল্প প্রস্তাব তৈরি করে প্রধানমন্ত্রীর কাছে সারসংক্ষেপ পাঠানো হয়েছিল। গত ২২ নভেম্বর অর্থমন্ত্রী স্বাক্ষরিত এ সারসংক্ষেপে বলা হয়, চাকরির মেয়াদ তিন বছর পূর্ণ হওয়ার পর নবম গ্রেডের কর্মকর্তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে অষ্টম গ্রেডের একজন কর্মকর্তা হবেন। চার বছর পূর্ণ হলে সেখান থেকে সপ্তম গ্রেডে চলে যাবেন একজন কর্মকর্তা। এ কর্মকর্তা এই স্তরে পাঁচ বছর পূর্ণ করলে তিনি ষষ্ঠ গ্রেডে যাবেন।
ষষ্ঠ গ্রেডে ১০ বছর চাকরির পর ওই কর্মকর্তা থেকে উন্নীত হয়ে ৫ম গ্রেডে যাবেন। পঞ্চম থেকে ৪র্থ গ্রেডে যেতে ওই স্তরে তাকে চাকরি জীবনের ১২ বছর পূর্ণ করতে হবে। একইভাবে চতুর্থ গ্রেডে চাকরির মেয়াদ ১৪ বছর পূর্ণ হওয়ার পর তার গ্রেড পরিবর্তন হয়ে ৩য় গ্রেডে উঠবে। আবার তৃতীয় থেকে দ্বিতীয় গ্রেডে যেতে পূর্ণ করতে হবে ১৭ বছর। চাকরি জীবনের ২০ বছর পূর্ণ হলে একইভাবে একজন কর্মকর্তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রথম গ্রেডে উন্নীত হবেন। তবে চতুর্থ গ্রেডের পর থেকে পদোন্নতি হবে পদ শূন্যতার বিবেচনায়। পদ শূন্য না থাকলে গ্রেড পরিবর্তন হবে না। সংশ্লিষ্টদের দাবি, ওই প্রস্তাবে ২৭ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সম্মতি দেয়। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে এসব বিষয় পে-স্কেলের প্রজ্ঞাপনে উপেক্ষা করা হয়।
৭ সেপ্টেম্বর মন্ত্রিসভার বৈঠকে অষ্টম জাতীয় পে-স্কেল অনুমোদন করা হয়। ঘোষিত নতুন পে-স্কেলের ব্যাপারে বিভিন্ন অভিযোগ উঠতে থাকে। বিশেষ করে প্রকৃচি, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি, বিসিএস শিক্ষক সমিতি, ২৬টি ক্যাডার সমিতি বেতন-ভাতার বিষয়ে বেশকিছু আপত্তি তুলে ধরে। এ প্রেক্ষাপটে বেতনবৈষম্য দূরীকরণ সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিকে পর্যালোচনার দায়িত্ব দেয়া হয়। ওই কমিটি বৈঠক করে নতুন পে-স্কেল নিয়ে ইতিবাচক একটি সমাধানের পক্ষে অভিমত দিয়েছে।
বিশেষ করে আগের পে-স্কেলে যেসব সুবিধা ছিল, তার চেয়ে বেশি সুবিধা রাখার পরামর্শ দেয় কমিটি। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের দাবি, মন্ত্রিসভা কমিটি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকসহ অন্যদের বিষয়ে যেসব সুপারিশ করেছে, তা যথাযথভাবে উঠে আসেনি অর্থ মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে। তারা আইন মন্ত্রণালয়ে ভেটিং এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে দেয়া অর্থমন্ত্রণালয়ের চিঠি থেকে এ তথ্য পেয়েছেন বলে জানান বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনের মহাসচিব।
তিনি বলেন, ''আমাদের কাছে মন্ত্রিসভা কমিটির রেজ্যুলেশন এবং অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে বাস্তবায়নের জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের চিঠি হাতে আছে। উভয়ের সঙ্গে মিল নেই। আমরা সবকিছু জনগণের কাছে প্রকাশ করব।

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Know about Cookies
Ok, Go it!
To Top