অবৈধভাবে বাংলাদেশে বসবাস করা বিদেশি
নাগরিকদের নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে আইনশৃৃঙ্খলা বাহিনী। কারণ, অবৈধ বিদেশি
নাগরিকদের কোন পরিসংখ্যানই নেই গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাছে। ধারণা করে
গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলছেন, অবৈধ নাগরিকের সংখ্যা বৈধের চেয়ে কয়েকগুণ
বেশি। বৈধভাবে বর্তমানে দেশে অবস্থান করছেন সোয়া দুই লাখের মতো বিদেশি
নাগরিক।
ঢাকা
ও রংপুরে দুই বিদেশি নাগরিক হত্যাকান্ডের পর বিদেশিদের নিরাপত্তায় বিশেষ
উদ্যোগ নেয় সরকার। বিদেশিদের নিরাপত্তা দিতে গিয়েই বেঁধেছে বিপত্তি।
বৈধভাবে অবস্থানকারীদের নাম, পরিচয়, ঠিকানা ও কর্মস্থল সরকারের কাছে থাকলেও
অবৈধভাবে যারা আছেন তাদের কোন তথ্যই নেই। ফলে তাদের যথাযথ নিরাপত্তা দেয়া
নিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে।
পুলিশের
একটি গোয়েন্দা সংস্থার এক হিসাবে দেখা গেছে, বর্তমানে দেশে বৈধভাবে
বসবাসকারী সংখ্যা ২ লাখ ২১ হাজার ৫৫৯ জন। আর অবৈধ বিদেশির সংখ্যা এর
কয়েকগুণ বেশি। আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ যেমন- নাইজেরিয়া, উগান্ডা, ঘানা,
আলজেরিয়া, আইভরি কোস্ট, সেনেগাল, ক্যামেরুন ও লাইবেরিয়া থেকে আসা অবৈধ
নাগরিকদের অনেকে প্রায়ই বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়ছেন। গত তিন
বছরে মাদক ব্যবসায় জড়িত থাকার অভিযোগে ৪৪ জন আফ্রিকান নাগরিককে গ্রেফতার
করেছে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী। এছাড়া গত ৫ বছরে অভিযান চালিয়ে বিভিন্ন অভিযোগে
৯১ আফ্রিকান নাগরিককে গ্রেফতার করেছে র্যাব। সব মিলিয়ে এই ৫ বছরে গ্রেফতার
হওয়া বিদেশি নাগরিকের সংখ্যা দেড় শতাধিকের মতো। এদের অধিকাংশই খেলোয়াড় ও
স্টুডেন্ট ভিসায় বাংলাদেশে এসেছিলেন। ভিসার মেয়াদ শেষ হলেও তারা দেশে ফিরে
যাননি।
র্যাবের
মহাপরিচালক বেনজির আহমেদ ইত্তেফাককে বলেন, অবৈধভাবে বাংলাদেশে বসবাস করা
বিদেশি নাগরিকদের নিরাপত্তা দেয়া সম্ভব নয়। কারণ তাদের ব্যাপারে পুরো তথ্য
সরকারের কাছে নেই। এখানে জনগণকে সম্পৃক্ত করতে হবে।
র্যাবের
ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের পরিচালক লে. কর্নেল আবুল কালাম আজাদ বলেন, অনেক
বিদেশি নাগরিক বাংলাদেশে এসে অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। তাদের অনেকেই
র্যাবের হাতে গ্রেফতার হয়েছেন। গত বছর অবৈধ ভিওআইপি ব্যবসার সঙ্গে জড়িত
থাকার অভিযোগে ৩৪ জন বিদেশি নাগরিককে গ্রেফতার করা হয়। এদের মধ্যে চীন ও
তাইওয়ানের নাগরিকও রয়েছেন। এর বাইরে প্রতারণাসহ নানা অপরাধের কারণে বেশ
কিছু বিদেশি নাগরিককে গ্রেফতার করে র্যাব। র্যাবের এই অভিযান চলমান।
সরকারের
কছে থাকা তালিকায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি বৈধ নাগরিক রয়েছে
ভারতের। ৭১ হাজার ৩২ জন নাগরিক বর্তমানে বাংলাদেশে আছেন। এরপরই
যুক্তরাজ্যের অবস্থান। তাদের ২৭ হাজার ৮৫৯ জন নাগরিক বাংলাদেশে আছেন। এছাড়া
চীনের ৯ হাজার ৪৬৬, পাকিস্তানের ৮ হাজার ৯৪২, যুক্তরাষ্ট্রের ৮ হাজার ৮৪,
জাপানের ২ হাজার ৯১৫, ইতালির ২ হাজার ৫৯৫ জনসহ ২২৫টি দেশের ২ লাখ ২১ হাজার
৫৫৯ জন নাগরিক বাংলাদেশে অবস্থান করছেন।
এদিকে,
গত নভেম্বরে অবৈধ বিদেশিদের বিরুদ্ধে অভিযানে নামে পুলিশ। প্রথম রাত ১৩
নভেম্বরে অবৈধভাবে বসবাসসহ বিভিন্ন অভিযোগে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে অভিযান
চালিয়ে ৩১ জন বিদেশি নাগরিককে গ্রেফতার করে গোয়েন্দা পুলিশ। বনশ্রী,
গুলশান ও উত্তরায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেফতার করা হয়। এরপরই আবার পুলিশের
অভিযান থেমে যায়। গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলছেন, অবৈধ বিদেশিরা প্রথমে
বৈধপথে পার্শ্ববর্তী একটি দেশে আসে। সেখান থেকে সন্ত্রাসীগ্রুপের সঙ্গে হাত
মিলিয়ে অবৈধভাবে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। এদেশে তারা নিজস্ব সিন্ডিকেট তৈরি
করে মুদ্রা ও ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতি পর্যন্ত করে থাকে। এছাড়া অবৈধ অস্ত্র
কেনাবেচা, মানবপাচার, মাদক ব্যবসা, বিভিন্ন ধরনের প্রতারণায়ও জড়িয়ে পড়েন
অনেকে বিদেশি।
গোয়েন্দা
পুলিশের একজন কর্মকর্তা বলেন, কিছু অসাধু ব্যক্তির যোগসাজশে এরা রাজধানীর
বিভিন্ন অভিজাত এলাকা যেমন- উত্তরা, বনানী, বারিধারা, ধানমন্ডি ও নিকুঞ্জে
বাসাভাড়া করে থাকছে। এসব এলাকায় ধনী ও ভিআইপি মানুষের বসবাস হওয়ায় তাদের
পরিচয় ও বৈধতা নিয়ে কেউ কোন কথা বলে না। তিনি বলেন, আইন অনুযায়ী কোনো
বিদেশি নাগরিক হোটেল বা বাসাভাড়া নিতে চাইলে তাকে অবশ্যই তার পাসপোর্ট ও
ভিসার মেয়াদ অনুযায়ী কতোদিন থাকবেন তা জানাতে হবে। কিন্তু বাড়ির মালিকরা
মোটা অংকের ভাড়া পাওয়ায় অনেকেই এই আইন মানছেন না। গত বছরের ১৯ নভেম্বর
মগবাজার এলাকা থেকে ৩ বিদেশী নাগরিকসহ ৪ জনকে গ্রেফতার করেছে র্যাব।
বাংলাদেশে বসবাসের বৈধ কাগজপত্র না থাকায় তাদের গ্রেফতার করা হয়। আর অবৈধ
বিদেশিদের বাসাভাড়া দেয়ার কারণে পার্থ কুমার নামে একজনকে গ্রেফতার করা হয়।
গত
বছরের অক্টোবর মাসে উত্তরায় একজন আলজেরীয় নাগরিকের হাতে জুবায়ের আহমেদ
নামে ‘ও’ লেভেল পড়ুয়া ছাত্রের মৃত্যু হয়। ওই আলজেরীয় নাগরিক প্রায় কোনো
ধরনের বৈধ কাগজপত্র ছাড়াই এ দেশে বসবাস করছিলেন। তিনি ২০০০ সালে স্টুডেন্ট
ভিসা নিয়ে এদেশে প্রবেশ করেন। ২০০১ সালেই তার ওই ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যায়।
কিন্তু তিনি তার সব কাগজপত্র নষ্ট করে ফেলেন। তারপরও থাকতে তার কোন অসুবিধা
হয়নি।
পুলিশের
একটি গোয়েন্দা সংস্থার একজন কর্মকর্তা বলেন, বাংলাদেশে অবস্থানরত ভারত,
পাকিস্তান, থাইল্যান্ডসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ, নাইজেরিয়া, লিবিয়াসহ
১৬টি দেশের সহস্রাধিক নাগরিকের বিরুদ্ধে অপরাধমূলক নানা তথ্য রয়েছে। এছাড়া
রোহিঙ্গাসহ মিয়ানমারের বিপুলসংখ্যক নাগরিক অনবরত এদেশে প্রবেশ করছে। তাদের
একটি বড় অংশই মাদক, অস্ত্র চোরাচালানসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকান্ডে জড়িত।
বেসরকারি
খাতের কোন শিল্প প্রতিষ্ঠান যদি কোন বিদেশি নাগরিককে নিয়োগ দিতে চায়,
তাহলে বিনিয়োগ বোর্ডের নির্ধারিত ফরমে আগেই আবেদন করতে হয়। বাংলাদেশে
বিদেশি নাগরিকদের কর্মসংস্থানের জন্য ওয়ার্ক পারমিট বাধ্যতামূলক। সর্বোচ্চ
ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তাসহ প্রতিষ্ঠানে বিদেশি কর্মচারীর সংখ্যা শতকরা ৫
ভাগের বেশি হতে পারবে না। এমন সব নিয়ম থাকলেও ‘ওয়ার্ক পারমিট’ নেয়ার
ক্ষেত্রে এসব জটিলতায় যেতে পছন্দ করেন না বিদেশি নাগরিকরা। সে কারণে ভ্রমণ
ভিসা নিয়েই বাংলাদেশে আসেন। তারপর এখানে চাকরি বা ব্যবসা-বাণিজ্যে জড়িয়ে
পড়েন। ভিসার মেয়াদ শেষ হলেও নবায়ন করেন না।
ঢাকা
মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার ছানোয়ার হোসেন ইত্তেফাককে
বলেন, অবৈধভাবে বাংলাদেশে বাস করা বিদেশি নাগরিকদের বড় একটি অংশ আফ্রিকার
নাগরিক। তারা এখানে নানা ধরনের অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। মাঝে মধ্যেই
পুলিশের অভিযানে তারা গ্রেফতার হচ্ছে। জাল টাকা, অবৈধ ভিওআইপি ব্যবসা থেকে
শুরু করে ছিনতাইয়ের মতো অপরাধেও তারা জড়াচ্ছে। তাদের ব্যাপারে সচেতন
গোয়েন্দা পুলিশ।

