ঘুরে এলাম মাধবকুন্ড ও চা বাগান

Unknown

ভ্রমন নেশায় যখন পেয়ে বসে তখন আমাকে কোথাও না কোথাও ভ্রমনে যেতে হবে। এই বদ নেশা থেকে মুক্তি পাওযার আর কোন উপায় আজ অবধি খুঁজে পেলাম না। দূরে কোথাও যেতে না পারলে কাছের কোন দর্শনিয় স্থানে ছুটে যাই কয়েক জন নতুন পুরাতন বন্ধু নিয়ে। দিনভর আনন্দ-ফূর্তি আর হই হুল্লোর মধ্যে দিয়ে। জানি না এই ভ্রমন নেশা আমাকে কোন দূর্গতির দেশে নিয়ে ছাড়ে। তবুও মন পাগলাকে থামাতে হলে এই জায়গা ঐ জায়গা ঘুরে বেড়াতে হবে। পকেটে টাকা পয়সা থাক আর না থাক - ছুটে চলা আর থামে না। কোন কিছুতে ভরসা না হলে পা’দুটাই যথেষ্ট। ধারে কাছে কোন নির্জন অরন্য খুঁজে তার মধ্যে ভ্রমন পিপাসু মনটাকে একটু শান্ত করে আসি। এই ছন্নছাড়া জীবনে তার চেয়ে বেশি কিছু আশা করা অনাবশ্যক। কোন না কোন উপায়ে নতুন নতুন জায়গা দেখা ও সেই অঞ্চলের মানুষের জীবন যাত্রার মান, কৃষ্টি-কালচার সর্ম্পকে জানার কৌতুহল সব সময় মনের মধ্যে লুকায়িত থাকে। তাই সুযোগ পেলে আর হাতছাড়া করার চেষ্টা বাদ দিয়ে গ্রহন করার চিন্তা চেতনায় মুশগুল হয়ে যাই। যেভাবে হোক নতুন নতুন পরিবেশে যেতে হবে; নতুন কিছু জানতে হবে। সোজা কথা জানার শেষ নেই।

গত মার্চে বুড়িচং প্রেস ক্লাবের সকল সদস্যরা মিলে আনন্দ ভ্রমনের আয়োজন করি। এই ভ্রমনে যাওয়ার প্রেরণাটা আমারই বেশি ছিল। প্রেস ক্লাবের সভাপতি মোঃ মোসলেহ উদ্দিন এবং সাধারন সম্পাদক মোহাম্মদ সাখাওয়াত হাফিজকে বছরের শুরুতে তাগাদা দিতে থাকি, যেন এই বছর কোন একটি দর্শনিয় স্থানে ভ্রমনের আয়োজন করা হয়। অন্য সদস্যদের সাথে আলাপ আলোচনা করলে তারাও আনন্দ ভ্রমনে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করে। সকলের ইচ্ছা শক্তি কাজেই পরিনত হলো। আমরা ভ্রমনে যাচ্ছি। ভ্রমনের স্থান নির্ধারন করা হলো- মৌলভীবাজার জেলার বিভিন্ন আকর্ষনীয় ও দর্শনীয় স'ানসমূহ। আকর্ষনীয় ও দর্শনীয় স্থান গুলোর মধ্যে রয়েছে চা বাগান, খাসিয়া পল্লী, মাধবকুন্ড, হাওর-বিল। এই স্থানটি নির্ধারন করার একটি কারণ রয়েছে। আমাদের প্রেস ক্লাবের সাংগঠনিক সম্পাদক মোঃ গিয়াস উদ্দিন চাকুরী সুবাধে অনেক দিন যাবত মৌলবীবাজার জেলায় অবস'ান করছেন। তিনি সেই জেলার সকল দর্শনীয় স্থানের সন্ধান জানেন এবং তার ইচ্ছা যে আমরা এবারের ভ্রমনটি তার কর্মস্থল জেলাই করি। দিন তারিখ ঠিক হলো। সম্ভাব্য বাজেট হয়ে গেল। যাতায়াতের যাবতীয় ভাড়া ও খরচ বহন করার দায়িত্ব দেওয়া হল সভাপতি মোঃ মোসলেহ উদ্দিনের উপর, ভ্রমন প্রস'তিমূলক যাবতীয় খরচের দায়িত্ব দেওয়া হলো সাধারন সম্পাদক মোহাম্মদ সাখাওয়াত হাফিজের উপর এবং সাংগঠনিক সম্পাদক মোঃ গিয়াস উদ্দিন দায়িত্ব নিলেন থাকা- খাওয়ার যাবতীয় খরচের। কারো কাছ থেকে ডোনেশন বা কমিশন অথবা অন্য কোন উপায়ে সাহায্য-সহযোগীতা ছাড়াই ভ্রমন করা হবে বলে পূর্বেই সিদ্ধান্ত ছিল। তাই গুরুত্বপূর্ণ পদে যারা দায়িত্ব পালন করছেন তারা ভ্রমনের খরচের যোগান নিজেরাই দিবে বলে যার যার সাধ্যমত বন্টন করে নেয়। আমার এবং নির্বাহী সদস্য সাংবাদিক জহিরুল হক বাবুর উপর দায়িত্ব ন্যস্ত হয় চাউলবিহীন পানি ফুটানো। তার মানে ভ্রমন কমিটির আহবায়ক হলাম আমি আর জহিরুল হক বাবু হল যুগ্ম আহবায়ক। ভ্রমনের টাকা পয়সার যোগান দিতে হবে না। শুধু মাত্র ভ্রমনের প্রোফাইল তৈরী করাই আমাদের দায়িত্ব। উপজেলা সদরের প্রধান সড়কে ডিজিটাল ব্যানার টাঙ্গানো হলো। এই নিয়ে আরেক মহাকান্ড ঘটে গেল। আমাদের জয়নাল ভাই আন্দোলন শুরু করে দিয়েছেন । ব্যানারে তার নাম নেই কেন? তিনি এই ভ্রমনে আর যাবে না। আমরা সবাই তাকে বড় ভাই হিসেবে সম্মান করি। কিন' তিনি ছোট একটি বিষয় নিয়ে এমন ভাবে আপত্তি করবেন তা আমরা কেউ কল্পনা করতে পারি নি। কি আর করার কেউ কোথাও যেতে না চাইলে তাকে তো আর জোর প্রয়োগ করে নেওয়া যাবে না। ভ্রমন মানেই তো আনন্দ- বিনোদন। এই আনন্দ-বিনোদনকে মাটি করতে চাই না। তাই জয়নাল ভাইয়ের সাথে এই নিয়ে আর কোন তর্কবিতর্কে জড়াতে চাই নাই। তার সাথে তর্কবিতর্কের কোন প্রয়োজন নেই; তার মনটাই এই রকম। কখন কোন কাজে কার সাথে রাগ করে তা বুঝার কোন উপায় নেই। আবার কখন রাগ ভুলে যায়, তারও কোন উয়ত্তা নেই।
যাক, আমাদের ভ্রমনের দিন ক্রমান্নয়ে ঘনিয়ে আসছে। সবাই নিজ নিজ দায়িত্ব নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ি। প্রেস ক্লাবের সভাপতি মোসলেহ উদ্দিন ভ্রমনের যাওয়ার গাড়ির ব্যবস'া করলেন আর সাধারন সম্পাদক মোঃ সাখাওয়াত হাফিজ ব্যানারসহ অন্যান্য কাজ করা নিয়ে ব্যস্ত আর আমি ও মোঃ জহিরুল হক বাবু দুই জনের সাথে সমন্বয় করে ভ্রমনের সকল ব্যবস্থা পাকাপোক্ত করলাম। অন্যদিকে থাকা-খাওয়া নিয়ে কোন চিন্তা করতে হচ্ছে না; থাকা-খাওয়ার যাবতীয় ব্যবস্থার দায়িত্ব নিয়েছেন প্রেস ক্লাবের সাংগঠনিক সম্পাদক মো. গিয়াস উদ্দিন। সব কিছু ঠিক ঠাক। এবার যাওয়ার পালা। আমরা সবাই নিজেদের প্রয়োজনীয় জিনিস পত্র নিয়ে গাড়ীর জন্য অপেক্ষা করছি। ঠিক এমন সময় জহিরুল হক বাবু ফোন করে বলল, সে যেতে পারবে না। বুড়িচং বাজারে তাদের সম্পত্তি নিয়ে দরবার চলছে। তাকে দরবারের থাকতে হবে। এমনই এক মর্হুত কি করা যায়; আমরা সবাই তৈরী আর সে ব্যস্ত তার পারিবারিক কাজ নিয়ে। পারিবারিক কাজটা যেহেতু জরুরী, তাই; তাকে বাদ দিয়ে আমরা যাত্রা শুরু করি।
বিভিন্ন ঝামেলা থাকার কারণে যথা সময়ে আমরা যাত্রা শুরু করতে পারি নি। তাই গন্তব্যস'লে যেতে আমাদের অনেক দেরি হয়েছে। ঐ দিকে বেচারা গিয়াস উদ্দিন প্রতিক্ষার প্রহর গুনতে গুনতে একেবারে বিরক্ত হয়ে গেছে। বার বার ফোন করে খোঁজ খবর নিচ্ছে কোথায় অবস'ান, আর কতক্ষণ লাগতে পারে এবং এত সময় বেশি লাগার কারণ কি?
গাড়ী চলছে; কত বাড়ী, কত গ্রাম, সবুজের পরিবেষ্টিত  মাঠ-ঘাঠ অতিক্রম করে। কখনো খোলা আকাশের নিচে ঘর-বাড়ীহীন খালি মাঠ: কখনো ফসলে মাঠ। আবার কখনো উচুঁ-নিচু পাহাড়; রাস্তার দু’ধারে চা বাগান। সারি সারি গাছ দাঁড়িয়ে আছে যুগ-জনম ধরে। নিজেদের চাওয়া পাওয়া বলতে কিছুই নেই-যে মানবের সেবাদানে তারে তৃপ্তি। প্রকৃতির সাথে তাল মিলিয়ে নাচে-গায়। তাদের ভাষা তারাই বুঝে; পত্র-পল্লবের মাধ্যমে-ইশারা ইঙ্গিতে কত কিছু বলে কিন্ত আমরা বুঝিনা বলে কিছুই অনুভব করতে পারি না। তবু তারা কিছু বলে না। দাঁড়িয়ে আছে তো দাঁড়িয়ে আছে। দাঁড়িয়ে থাকাটাই তাদের ধর্ম। বিভিন্ন প্রজাতির এই গাছ-পালা, পত্র-পল্লব আছে বলে পৃথিবীটা দেখতে এতো সুন্দর। এদের কেউ সাজিয়ে গোছিয়ে রাখতে হয় না; তারা নিজেরাই নিজেদের মতো করে সেজে-গোজে থাকে। প্রকৃতি শুধু আমাদের কে দিয়ে যায় আর আমরা তার কাছ থেকে শুধু পেতেই থাকি; প্রতিদানে কিছুই দেই না বরং পারলে একটু ক্ষতি করার চেষ্টা করি। এই ধরুন একটা গাছের ডাল ভেঙ্গে ফেলি, পাতা ছিড়ে ফেলি; প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে নষ্ট করে ফেলি। তবু প্রকৃতি আমাদেরকে দিয়ে যাচ্ছে। প্রকৃতি আমাদেরকে আলো, বাতাস, খাদ্য ও পানীয় দিয়ে আমাদেরকে বাঁচিয়ে রেখেছে।
আমাদের গাড়ী চলছে; আপন গন্তব্যর উদ্দেশ্য। আমাদের গন্তব্যস'ল মৌলভিবাজার জেলার কুলাউড়ার সিআরপি গেষ্ট হাউজে। গিয়াস ভাই সিআরপি গেষ্ট হাউজসহ মৌলভিবাজার জেলার সিআরপির প্রতিনিধির দায়িত্ব পালন করছেন। তার পূর্বে তিনি কুমিল্লা ও নারায়ণগঞ্জ জেলায় দায়িত্ব পালন করেছেন। কিছুদিন আবার সিআরপির হেড অফিসেও দায়িত্ব পালন করেছেন। সিআরপি মূলত: একটি সমাজসেবী সংগঠন। এই সংগঠনটি বিভিন্ন প্রতিবন্ধিদের কে নিয়ে কাজ করে। তাদেরকে সাহায্য সহযোগীতা করে এবং সমাজ সেবা অধিদপ্তর থেকে ভাতা প্রদানের কাজ করে। প্রকৃতপক্ষে প্রতিবন্ধিতের কে সাহায্য সহযোগীতা করাই এই সংগঠনের মুল কাজ-এটাই আমার জানা; তার বাহিরে অন্য কোন কাজ করে কি-না, সে বিষয়ে আমার পরিপূর্ণ ধারনা নেই। গিয়াস ভাইয়ের সাথে চলতে ফিরতে গিয়ে এতটুকু জানা হল।
আমরা কুলাউড়া থানা সদর পৌঁছে গিয়াস ভাইকে বার বার ফোন করছি; কিন্ত যোগাযোগ আর করতে পারছি না। ইতিমধ্যে অনেক রাত হয়ে গেছে। এখন কি করি? রাস্তা- ঘাট কারোই জানা শোনা নেই। এখানের জন্য আমরা সবাই নতুন। আমাদের লক্ষ্য ছিল সন্ধ্যার পূর্বেই আমরা সিআরপি গেষ্ট হাউজে উপসি'ত হতে পারব। রাস্তা দুরত্ব সর্ম্পকে আমাদের ভুল ধারনা ছিল; তাই একটু দেরি করে রওনা হয়েছিলাম। তা ছাড়া জয়নাল ভাই আর বাবুর জন্য বাকি সময়টা নষ্ট হয়েছে। তারা যদি পূর্বের রাতে তাদের সিদ্ধান্তটা জানিয়ে দিত ; তাহলে আমাদেরকে এই দুর্ভোগ পোহাতে হত না। আমরাও একটু খাম-খেয়ালীপনা করেছি। মৌলভিবাজার আর কত দূর হবে। বাহ্মণবাড়িয়া ও হবিগঞ্জ পার হলেও তো মৌলভিবাজার। যেতে বেশি সময় লাগবে না। এজন্য আন্দাজের উপর ভিত্তি করে কোন কাজ করতে নেই আর করলে  দুর্ভোগ পোহাতে হবে।
শীতের রাত। চারদিকে কোয়াশায় আচ্ছন্ন কিছুই দেখা যায় না। মাঝে মধ্যে কোয়াশার জোয়ার আসে; তখন সাথের মানুষটিকে দেখা যায় না চেনা যায় না। চারদিকে শুধু সাদা আর সাদা। আমরা এখন কি করি; কোন দিকে যাই, ঠাহর করতে পারছিনা। এই রকম পরিসি'তি থেকে মুক্তি পেলাম এক পুলিশ সদস্যর সহযোগীতার ফলে। পুলিশ সদস্যটির নাম হানিফ। পুরো নামটি কি তা বলতে পারব না। গ্রামের বাড়ি কুমিল্লা জেলার বুড়িচং উপজেলার জগতপুর গ্রামে। দীর্ঘদিন ধরে তিনি কুলাউড়া থানায় কর্মরত আছেন। তাই তিনি সহজে সিআরপি গেষ্ট হাউজে যাওয়ার রাস্তা দেখিয়ে দিলেন। আমরা প্রথমে পুলিশ দেখে মনে করেছিলাম কিছু হাদিয়া দিতে হবে; পুলিশের যা বদনাম রয়েছে। রাস্তা নেই, ঘাট নেই, জায়গা-অজায়গা কিছুই নেই; সুযোগ পেলে হাদিয়া চাই। অন্যথায় মামলা টামলার বোঝা ঘাড়ে চাপবে অথবা থানায় যেতে হবে, ফিফটি ফোরে চালান হবে- এই হাবিজাবি ভয়-ভীতি। আবার কোন কোন সময় ভয়-ভীতির মধ্যে থাকে না; ঠিকই কোন না কোন মামলায় চালান দিয়ে দেয়। মাল-পানি অথবা হাদিয়া-পাতি ভাল হলে মুক্তি মিলে। এটা অবশ্য আমাদের দেশের চলমান একটি প্রক্রিয়ার। যা এদেশের মানুষ প্রতিনিয়তই দেখতে পাচ্ছে; আবার কেউ কেউ নিজেরাই ভোগান্তির শিকার হচ্ছে। শুধু শুধু পুলিশকে দোষ দিয়ে আর লাভ কি; আমাদের দেশের প্রত্যেকটি দপ্তরের দৃশ্য একই। কোনটা মানুষের চোখে পড়ে বেশি আর কোনটা থাকে লোকচক্ষের অন্তরালে; পার্থক্য শুধু এতটুকুই।
পুলিশ সদস্য হানিফ আমাদের ভুল ভেঙ্গে দিলেন: যে নর্দমার মধ্যেও ভাল কিছু থাকে। তিনি অত্যান্ত আন্তরিকতার সাথে আমাদের কে সাহায্য করলেন এবং সঙ্গে সাথীদের কে বললেন আমাদের কে যেন হয়রানী না করেন। আমরা যত দিন এই জায়গায় থাকব কোন অসুবিধা হলে যেন তাকে স্বরণ করি। তাই নিজের মোবাইল নম্বরটি দিলেন এবং আমার নম্বরটি নিলেন। সিআরপি গেষ্ট হাউজে পৌঁছা অবধি তিনি আমাদের খোঁজ খবর নিয়েছেন। মনে মনে ভাবলাম আহ! দেশের প্রত্যেকটি পুলিশ যদি এমন হয়ে যেত। জানি না, আর কোন দিন হানিফ পুলিশের সাথে আর দেখা হয় কিনা।
সিআরপি গেষ্ট হাউজটি  উপজেলা সদর থেকে কয়েক মাইল দূরে একটি গ্রামে। গ্রাম্য রাস্তা; বুঝতেই পারছেন, কি অবস্থা। সরু রাস্তাটির দু’ধারে উঁচু উঁচু লাল মাটির টিলা। মনে হয় এই লাল মাটির টিলা কেটে রাস্তা তৈরী করা হয়েছে। আবার কোথাও কোথাও দু’ধারে রয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির গাছ-পালা। এই রাস্তা দেখলে মনে হবে না ভেতরে যে একটি উন্নত গেষ্ট হাউজ রয়েছে। যাক, আমাদের চিন্তা-ভাবনার অবসান হল: আমরা সিআরপি গেষ্ট হাউজের গেইটে এসে উপসি'ত হলাম; রাত প্রায় শেষ হয়ে এল। পূর্ব আকাশ একটু একটু করে ফর্সা হচ্ছে। পাখিরা কিচির মিচির শব্দ করে সকালের বার্তা সঙ্গীদের নিকট পৌঁছে দিচ্ছে। গাছেরাও জেগে উঠছে পাখির কলরবে আর আমাদের চোখে ঘুম এসে বারবার হানা দিচ্ছে। প্রত্যেকেই ঘুমে টলমল করছে। নির্ঘম একটি রাত কেটে গেল। বড় ভালই লাগছিল কিন্ত এখন একটু খারাপ লাগছে। গোসল করে শরীরটাকে বিছানার সন্ধান দিতে পারলে খুব ভাল হবে। ক্লান্ত শরীরটা একটু প্রশান্তি পাবে।
আবারও সেই গিয়াস ভাই! বেচারা আমাদের জন্য অপেক্ষা করে ঘুমিয়ে পড়েছে। তাই বার বার ফোন করে তাকে পাওয়া যাচ্ছে না। তারপরেও চেষ্টা চলছে; এছাড়া এখন আর কোন উপায় নেই। ভেতরে প্রবেশ করতে পারছি না। মূল গেইট ভেতর থেকে বন্ধ। অনেক্ষন পর গিয়াস ভাইকে ফোনে পাওয়া গেল। তিনি একজন দারোয়ানকে পাঠালেন। দারোয়ান গেইট খুলে আমাদের নিয়ে চলল গিয়াস ভাইয়ের বাসার দিকে। বাসার মধ্যে গিয়াস ভাই একাই রয়েছেন। তার পরিবার নিজ বাড়ি পূর্ণমতি গ্রামে রয়েছে। তিনি এখানে একাই থাকেন। আমরা সবাই তার বাসায় উঠলাম। বাসাটি তিন তলা বিশিষ্ট। তাই আমাদের থাকা-খাওয়ার কোন অসুবিধা হয়নি। বাসাতে গিয়ে সবাই গোসল করে ফ্রেস হয়ে খাওয়া দাওয়া করলাম। গিয়াস ভাই অবশ্য আগে থেকে রান্না-বান্না করে রেখেন। খাওয়া-দাওয়া শেষে ক্লান্ত শরীরটাকে প্রশান্তি দেওয়ার জন্য বিছানায় শুয়ে পরলাম। ঘন্টা দু’তিন ঘুমানোর পর একে একে সবাই এক সাথে হয়ে কোথায় কোথায় যাব তার ছক আঁকতে শুরু করলাম। এই নিয়ে মোটামোটি ছোট-খাট একটি মিটিং করা হয়ে গেল। গিয়াস ভাই তার অফিসিয়ালি কাজ নিয়ে ব্যস্ত। তাই তিনি প্রথম দিন আমাদেরকে তেমন একটু সময় দিতে পারে নি। আমরা প্রথমে চা বাগান ঘুরতে যাই। বিশাল চা বাগান; যেন সবুজের সমারোহ। কত সুন্দর ভাবে ছাটানো! কোন গড়মিল নেই, প্রত্যেকটি গাছের ডগা এক সমান। গাছ গুলো ছোট ছোট, তবে ঝোপরি ঝোপরি। চা গাছের মাঝে মাঝে রয়েছে বড় বড় কিছু গাছ। গাছগুলো চা গাছকে তীব্র রোদ থেকে ছায়া দিয়ে আগলিয়ে রাখে। সারি সারি চা গাছের পানি নিঃষ্কাশনের জন্য ছোট ছোট নালা রয়েছে। এই নালা গুলো গিয়ে বড় নালাতে পড়েছে। বিশাল এই সবুজের সমারোহে সবার মন কেড়ে নিয়েছে। তাই কারো কোন দিকে খেয়াল নেই। সবাই ছবি তোল নিয়ে ব্যস্ত। কে কার সাথে ছবি তুলবে, কি ভাবে তুলবে। প্রায় সবার নিকট রয়েছে ডিজিটাল ক্যামেরা। ছবি তুলতে সমস্যা কোথায়? যে যত পার কেবল ছবি তোল। ফিল্ম মাগার শেষ হবে না। আগে তো এনালগ ক্যামেরা দিয়ে ছবি তুলতে হিসাব-নিকাস করা হতো। একটি নির্দিষ্ট পরিমানের ফিল্ম থাকতো। ফিল্মের হিসাব করে ছবি উঠাতো। এখন সেই যুগের ইতি ঘটেছে। যতপার ছবি তোল; পরে বাছাই করে খারাপ গুলো বাতিল করা যাবে। সাখাওয়াত হাফিজ সবচেয়ে বেশি ছবি তোলেছে। কত রকম করে তিনি ছবি তুলেছে তার উয়ত্তা নেই। বুঝা গেল ছবি তোলাতে তার কোন অলসতা নেই। বেশি বেশি ছবি তোলা তার একটি নেশাই বলা যায়। এক পাশে একটি রাবার বাগান দেখা গেল। আমরা সেই বাগানে গেলাম। সারিবদ্ধ রাবার গাছগুলো যেন সেনাবাহিনীর মতো আমাদের কে স্যালুট করে অভিবাদন জানালো। গাছগুলো কান্ডের একটু উপরে বিভিন্ন দাগ দেখা গেল। স'ানীয় একজনকে জিজ্ঞাসা করায়: সে বলল, গাছগুলো থেকে রস সংগ্রহ করার কারনে এই রকম দাগ পড়ে আছে। প্রতি বছর গাছগুলো থেকে রস সংগ্রহ করা হয়। এই রসকে প্রক্রিয়াজাত  করে রাবার তৈরী করা হয়। বিকালে গাছের কান্ডের উপরি অংশ কেটে তাতে ছোট ছোট (টোয়া বা ঘটি বা বাটি) দেওয়া হয়। সারা রাতে ঘটি গুলো রসে পরিপূর্ণ হয়; সকালে সেই ঘটি গুলো থেকে রস সংগ্রহ করে তা প্রক্রিয়াজাত করার জন্য পাঠানো হয়।
আমাদের ছবি তোলার রুচি কমে এসেছে। পশ্চিম  আকাশের সূর্যটা কোয়াশার আড়ালে চলে যাওয়ার প্রস'তি নিচ্ছে। একটু পরে সে কোয়াশার চাদরে ঢেকে যাবে। তার রক্তিম আভা দেখার কোন সম্ভাবনা নেই। সাদা সাদা কোয়াশার কণা গুলো ইতি মধ্যে চা গাছের পাতাকে সিক্ত করেছে। পাখিরা ঘরে ফিরতে শুরু করেছে। কেউ কেউ ঘরে ফিরে কিচির মিচির শব্দ করে প্রতিবেশির খোজঁ খবর নিচ্ছে। আমরাও গেষ্ট হাউজের উদ্দেশ্য রওন হলাম। বাগানের মূল প্রবেদ্বার দিয়ে বের না হয়ে আমরা অন্যদিক দিয়ে বের হতে গিয়ে দেখি বের হওয়ার কোন রাস্তা নেই। একটি খাল বের হওয়ার রাস্তায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে রেখেছে। খালের মধ্যে মৃদু স্রোতধারা প্রবাহিত হচ্ছে। অপর পাড়ে খাড়া টিলা। এখন কি করি; মূল প্রবেশদ্ধারে যেতে হলে অনেকটা রাস্তা ঘুরতে হবে আর ততক্ষনে অন্ধকারে ঢেকে যাবে পুরো পৃথিবী। রাত হয়ে গেলে  রাস্তা-ঘাট চিনে গেষ্ট হাউজে পৌঁছা দুষ্কর হয়ে যাবে। তাই আমরা ঐ খাল লাফ দিয়ে পার হওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। বাক্য কালের ইমেজটাকে মনের মধ্যে স'ান দিয়ে সাহসটা বাড়িয়ে নিলাম। ইতিমধ্যে কয়েকজন পার হয়েগেছে। কিন্তু সেক্রেটারী সাখাওয়াত হাফিজ একটু মোটা-সোটা মানুষ সে তো আর লাফ দিয়ে পার হতে পারবে না। সে পরেছে মহাবিপদে। এখন কি করবে? সবাই তো চলে এসেছে। সভাপতি মোসলেহ উদ্দিন একটু ভদ্র ও মুরুব্বি টাইপের মানুষ তাই তিনি লাফ দেওয়াটাকে পছন্দ না করে অপর পাড়ে দাঁড়িয়ে আছেন। আমরা সবাই বললাম, সভাপতি ও সেক্রেটারী দু’জনে থাক: আমরা চললাম। তখন তারা বলল, এটা কোন কথা হল; এটা নিয়ম নয়, তোমরা আমাদেরকে ফেলে চলে যাবে। এটা কেমন কথা? এক সাথে এসেছি এক সাথে যাব। তারা আর কোন উপায় না পেয়ে পায়ের জুতো খুলে খালের মধ্যে নেমে পরল। শীতের সময় বিধায় খালে তেমন একটা পানি ছিল না; তাই শেষ রক্ষা হয়েছে। তারা কোন রকমে এই পাড়ে উঠে আমাদের সঙ্গী হয়েছে।
রাতের খাওয়া দাওয়া করে সবাই শুয়ে পরলাম। আগামীকাল মাধব কুন্ডের ঝড়ণা দেখতে যাব। সারা দিনের ক্লাশ শরীর নিয়ে যেই মাত্র দেহটা বিছানার স্পর্স পেল সেই মাত্র চোখের মধ্যে ঘুমেরা এসে বাঁধা বাধলো। অন্যন্যা দিন রাত দুপুর অবধি এই ঘুমকে ডেকে আনা যায় না কিন্ত আজ নিজেরাই এসে স'ান দখল করেছে। তাদের কে আর ডেকে আনতে হল না। আহ! কি প্রশান্তির ঘুম।
সকাল হওয়ার সাথে সাথে গিয়াস ভাইয়ের বাবুর্চি এসে ডাকা-ডাকি শুরু করে দিল। আপনারা সবাই উঠুন; রান্না হয়েগেছে। শীতের মধ্যে গরম গরম খাওয়া ভালো অন্যথায় ঠান্ডা হয়ে গেলে কোন স্বাধ পাবেন না। বাবুর্চির হাক-ডাকে আমরা জেগে উঠে প্রত্যেকে তৈরী হয়ে যাই। কাপড়-চোপর, ব্যাগ ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গোছ-গাছ করে নিই। বিকালে আমাদেরকে কুমিল্লায় ফিরতে হবে। তাই সিআরপি গেষ্ট হাউজ থেকে বাড়ি ফেরা প্রস'তি নিয়ে বের হয়ে যাই। সিআরপি গেষ্ট হাউজটিও দেখার মতো। চারপাশে ওয়াল দিয়ে বেষ্টনী করা। ওয়ালের বাহিরে সারিবদ্ধ গাছের বাগান, ছোট-বড়, উচুঁ নিচু টিলা। ভেতরে ওয়ালের পার্শ্বঘেষে পাকা রাস্তা। পাকা রাস্তাটি এক পাশ দিয়ে ক্রমান্নয়ে উপরে উঠে গিয়ে অপর পাশ দিয়ে আবার ক্রমান্নয়ে নেমে গেছে। পুরো গেষ্ট হাউজটি একটি বড় টিলার উপর অবসি'ত। কয়েকটি কটেজ রয়েছে। যা বিভিন্ন অতিথি ও ভ্রমনকারীদের নিকট ভাড়া দেওয়া হয়। পাকা রাস্তাটি টিলাকে চারদিক থেকে বেষ্টনী করে রেখেছে। মধ্য খানে একটি বট গাছ রয়েছে; পাশে বসার জায়গা। একটি কটেজ থেকে অন্য কটেজে যাওয়ার রাস্তাগুলো ছোট ছোট সিঁড়ি করা। গাছ গুলোকে বিভিন্ন রং মেখে আর্কষনীয় করে তুলেছে। নির্জন এই জায়গাটিতে বেড়াতে খুবই ভাল লেগেছে।
আমরা সবাই গাড়িতে উঠে আবারও কুলাউড়ার দিকে রওনা হলাম। ছোট ছোট টিলার উপর দিয়ে লাল মাটির রাস্তা। লাল মাটির রাস্তা পার হয়ে পাকা রাস্তা উঠলাম। দুই ধারে গাছ-পালাগুলো অতন্ত্রপ্রহরীর মতো দাঁড়িয়ে আছে। আমাদের গাড়ি এক এক করে প্রহরীদের অতিক্রম করে সামনের দিকে এগিয়ে চলছে। কুলাউড়া পৌঁছা মাত্র হানিফ পুলিশের সাথে আবার দেখা। তিনি সঙ্গীয় ফোর্সের সাথে কোথায় যেন যাচ্ছেন। আমাদেরকে দেখে সাথীদের ছেড়ে কাছে এসে হাত মিলিয়ে বললেন- ভাই, এখনতো আপনাদেরকে সময় দিতে পারলাম না। রাজনৈতিক কর্মসুচী আছে। সেখানে যেতে হবে। অবস'াতো বেশি ভাল নেই; কখন গুলি করা লাগে আবার কখন বা নিজেরা মার খাওয়া লাগে তার কোন ইয়ত্তা নেই। তাই এভাবে প্রস'ত হয়ে যেতে হয়। আপনাদের সাথে বসে গল্প করা এবং চা খাওয়ার খুব ইচ্ছা থাকা সত্তেও কর্মের খাতিলে করতে পারছি না। দেশ স্বাভাবিক অবস'ায় আসুক দেখা হবে; আবার যদি কখনো এখানে বেড়াতে আসেন, তখন খুব বেশি করে সময় দেয়ার চেষ্টা করব। সে গাড়ীতে উঠে বিদায় হয়ে গেল। আমরাও আমাদের গাড়ী নিয়ে বড়লেখা ও জুড়ী উপজেলা পার হয়ে মাধবকুন্ডের দিকে ছুটছি। কিন্ত মূল রাস্তা থেকে যখন মাধবকুন্ডের রাস্তা গাড়ী ঢুকলো তখন ভ্রমনের ইচ্ছা মন থেকে মুছে যেতে লাগল। এটা একটি দর্শনীয় স'ান; এখানে হাজার হাজার লোক আসে। অথচ রাস্তাটির যে বেহাল দশা হয়ে আছে। তার দিকে কারো খেয়াল নেই। তবু ভ্রমন পিপাসু মানুষ গুলো এক নজর ঝড়ণা দেখার প্রত্যাশায় শত কষ্ট সহ্য করে ঝড়না দিকে ছুটে যায়। রাস্তা-ঘাটের যে দশা; এটা দেখে কারো মনে হবে না যে সামনে বাংরাদেশের একটি বিখ্যাত দর্শনীয় স'ান রয়েছে। রাস্তার দু’ধারে সমতল ভূমি; খালি মাঠ। টিলা-টক্কর, পাহাড়-পর্বতের লেশ মাত্র নেই। আমরা মনে হচ্ছিল আমরা কোন ভুল রাস্তায় এগুচ্ছি কি-না। গাড়ী অনেক্ষন চলার পর কিছু টিলার দেখা পাওয়া গেল। পূর্ব দিকে বড় বড় পাহাড় দেখা যাচ্ছে, যেন আকাশের সাথে মিশে আছে। পাহাড়ের সবুজ গাছগুলো আকাশের সাদা মেঘের সাথে কথা বলছে। তাদের মধ্যে মনে হয় অনেক দিনের অন্তরঙ্গ বন্ধুত্ব ।
আমাদের গাড়ী মাধবকুন্ডের মূল প্রবেদ্বারের নিকট একটি জমিতে থামল। এখানে আসা সব গাড়ীগুলোকে এই জমির উপর থামতে হয়; ভেতরে যাওয়ার কোন সুযোগ নেই। খালি জমিতে গাড়ী পারকিং করলে যানজট সৃষ্টি হয় না। তাই কৃতপক্ষ এই জমিটাকে গাড়ী পারকিংয়ের জন্য নির্ধারন করে রেখেছে। গাড়ী পারকিংস'লের পর থেকে বিভিন্ন দোকান-পাট, হোটেল-রেস্টুরেন্টের মার্কেট। মূল প্রবেশদ্বার থেকে ঝড়না পর্যন্ত রাস্তাটি পাহাড়ের পাশ দিয়ে পাকা করা। মাঝে মাঝে বিভিন্ন ফুলের টপ দেওয়া এবং রাস্তাটির যে পাশে পাহাড় নেই সেই পাশের নিন্ম দেশ দিয়ে ঝড়নার পানি প্রবাহিত হচ্ছে। ঝড়না পর্যন্ত রাস্তাটি পাকা হওযায় দর্শনাথীদের জন্য ঝড়না অবধি পৌঁছতে কষ্ট কম হয়। মানুষ স্বাভাবিক ভাবে ঝড়না দেখার জন্য যেতে পারে। ছোট-বড় সবাই নিজের মতো করে ঝড়নার নিকট পৌঁছে আনন্দ উপভোগ করতে পারে।
আমাদের সফর সঙ্গী মোহাম্মদ সাখাওয়াত হাফিজ একটু স্বাস'্যবান মোটা-সোটা মানুষ। তাকে নিয়ে হয়েছে মহা মুশকিল। তিনি অল্প একটু হাটার পরে বিশ্রাম নেওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে যায়। শরীরের ওজন বহন করে পা দু’টা পাহাড় বেয়ে বেয়ে চলতে নারাজ হয়ে যায়। তাই বিশ্রামের প্রয়োজন হয়। বেচারার দোষ দিয়ে বা কি লাভ। তার পায়ে তো চলতে চায় না। কত যে বলি, ভাই; দেহটার ওজন কমান। কিন্ত কে শোনে কার কথা। তার শরীরের ওজন আর কমে না। এই বিষয়ে বেশি চাপ প্রয়োগ করলে; তনি বলেন, শরীর না কমলে কি করব? খাওয়া-দাওয়া একেবারে কমিয়ে দিয়েছি কিন্ত ওজন তো আর কমে না। প্রায় সময় রাতের খাবার বন্ধ থাকে। ক্ষুধা থাকলেও খাওয়া-দাওয়া করি না। তবু যদি ওজন না কমে আর কি করতে পারি। তার কথাও তো সত্যি হতে পারে। শরীর আল্লার দান। কারো শরীর এমনি এমনি বাড়ে আবার কারো শরীর হাজার চেষ্টাতেও বাড়ে না। তাকে নিয়ে সবাই মজা করি। সময় থাকতে শরীরের প্রতি খেয়াল দাও; অন্যথায় বড় বিপদে পড়বে। অপর দিকে আমাদের মোসলেহ উদ্দিন ভাই। বেচারা লাজুক লাজুক ভাব নিয়ে চলে। ইদানীং হুজুর হয়েছে। লম্বা দাড়ি, মাথায় টুপি, পড়নের পোষাক পায়জামা-পাঞ্জাবী। তাকে পূর্বে যে দেখে নাই; সে অবশ্য তাকে কোন মসজিদের ইমাম সাহেব ভাবতে দ্বিধাবোধ করবে না। বর্তমানে তার চলন-বলনে তাই পরিলক্ষিত হয়। পূর্বের মোসলেহ উদ্দিন আর বর্তমানের মোসলেহ উদ্দিনের পোষাক, চলন-বলনের মধ্যে হাজার তফাৎ। আগে তিনি দাড়ি রাখতেন না, শার্ট-প্যান্ট পড়ে হ্যানসাম হ্যানসাম থাকতেন। তার এই পরিবর্তনেই প্রমান করে তারুন্যতা একসময় বিদায় হয়ে বার্ধক্য আসে। যদিও তিনি এখনো বার্ধক্যর দুয়ার এসে দাড়ায় নি। তাই গিয়াস ভাই সব সময় মোসলেহ ভাই হুজুর হুজুর বলে সম্বোধন করেন। তিনি ঠিকই ইমামতি করেন, তবে তা কোন মসজিদে না- একটা কিন্ডার গার্টেনে। ভরাসার সূর্যোদয় কিন্ডার গার্টেনের অধ্যক্ষ হিসেবে দীর্ঘ দিন দায়িত্ব পালন করছেন। এখানে শেষ নয় তিনি আমাদের বুড়িচংয়ের প্রেস ক্লাবের সভাপতিও বটে; বুড়িচংয়ে বিভিন্ন পত্রিকায় কর্মরত সাংবাদিকদের ইমাম। তবে ইমাম সাহেব একটু অলস প্রকৃতির মানুষ। যা প্রেস ক্লাবের সকল সদস্যদের অভিযোগ তবু নেতৃত্ব তার হাতেই। অলস প্রকৃতির বলে অভিযোগ থাকলেও তাকে সবাই ভালবাসে। তিনি সকলের বিপদে এগিয়ে আসার চেষ্টা করেন। আমাদের প্রেস ক্লাবটি কার্যত ততটা সক্রিয় না। এর জন্য নদী গোমতীই বেশি দায়ি। ভুগোলিক কারণে আমরা তাৎক্ষনিক কোন কাজের সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। সভাপতির বাড়ি গোমতী নদীর পূর্ব পাশে আর সেক্রেটারী ও সহ সেক্রেটারীর বাড়ি গোমতীর পশ্চিম পাড়ে। এই নদী পার হয়ে কে যাবে আর কে আসবে সেই সিদ্বান্ত নিতে নিতে কর্মসূচীর মেয়াদ উত্তির্ন হয়ে যায়। যাক তবু আমরা একটি সংগঠনের আওতায় আছি; তবে কত দিন এক সাথে থাকতে পারব, তা বলা যাচ্ছে না। ইতি মধ্যে আমাদের অনেকের নতুন ডানা গজিয়েছে। আমরা বিভিন্ন দিকে উড়াউড়ির চেষ্টা করছি। এই বাধঁন থেকে মুক্তি হয়ে নতুন ভাবে সংঘবদ্ধ হওয়ার প্রয়াসে অনেক জায়গায় যোগাযোগ রক্ষা করছি। এটাই পৃথিবীর নিয়ম; মানুষ সংঘবদ্ধ হবে আবার ভাঙ্গবে এবং নতুন করে সংঘবদ্ধ হবে। এতে যেমন সুফল বনে আনে আবার কূ-ফলও বনে আনে। যদি নীতি-নৈতিকতা ঠিক না থাকে; তাতে কূ-ফলই বেশি হয়। যুগের যেই অধঃপত হয়েছে তাতে সুফলের চেয়ে কূ-ফলই বেশি হবে।
আমরা ঝড়নার একেবারে নিকটবর্তী। শীতের সময় তাই ঝড়নাতে পানি বেশি নেই। ঝিরঝির করে পানি পড়ছে। গর্জন নেই; তর্জন নেই- লোকজনেরও অভাব নেই। ক্ষৃণ ধারায় জলরাশি উপর থেকে নিচে পড়ছে। ঝড়না স'লে পানি তেমন এতটা নেই। তবে এতেই অনেকে গোসল করছে; ছবি তোলছে। ছোট-বড় অনেক গুলো পাথর পড়ে আছে। তার উপর মানুষ দাঁড়িয়ে ছবি তুলছে। আমরাও ছবি তোলতে শুরু করে দিয়েছি। শীতের মৌসুম থাকায় জলস্‌্েরাত কম। পাহাড়ের উপর থেকে অল্প অল্প জলাধারা নিচে পড়ছে। তাই ঝড়নাস'লে জলের পরিমাণ অনেক কম। দক্ষিণ দিক থেমে সিঁড়ি বেঁয়ে ঝরনাস'লে নামতে হয়। পশ্চিম দিকের কিছু অংশ খাড়া এবং কিছু অংশ গুহার মতো। উত্তরের সম্পূর্ণ অংশটি গুহার মতো। উপরের মাটির পাহাড় নিচে মাটি মধ্যখানে গুহার মতো রয়েছে। গুহার উপরের অংশটিকে আকাশের ছাদের মতো মনে হয়। আমার প্রথমে ভয়েই লেগেছিল এর মধ্যে ছবি তোলতে। এখানে প্রতিবছর পর্যটক মারা যাওয়ার খবর পত্রিকার পাতায় দেখতে পাই। তাই মনে হচ্ছিল কখন যে আকাশের মতো ছাদটি অথাৎ পাহাড়টি নিচের দিকে চাপ দেয়। আমার ভাবনার আর শেষ নেই; এখানে কেন পর্যটক মারা যায়? কি এমন জিনিস রয়েছে, যে প্রতিবছর মানুষ মারা যায়; যার কোন প্রতিকার নেই। অনেক ভাবনা চিন্তার পর বুঝতে পারলাম-কেন পর্যটক মারা যায়। তবে এটা আমার ধারনা মাত্র। অনেকের সাথে এই ধারনার মিল হতে পারে আবার অমিলও হতে পারে। কেউ আমার সাথে একমত হতে পারেন আবার নাও হতে পারেন। আমার মতে মৃত্যুর কারন হল: ঝরনা উত্তর ও পশ্চিম পাশের গুহার মতো যে খোপগুলো তৈরী হয়েছে; সেগুলো। ঝরনাটি যখন যৌবন ফিরে আসে, কানায় কানায় জলরাশি পরিপূর্ণ থাকে; তখন গুহার মতো খোপ গুলো আর দেখা যায় না। তখন যারা নতুন পর্যটক আসে তারা আনন্দ উৎসাহের সাথে ঝরনায় গোসল করতে নেমে ডুব দিয়ে গুহার মতো খোপে ঢোকে যায়; তখন আর কোন দিগবিদিগ খুঁজে পায় না। যে দিকে যায় সে দিকেই তো খোপ আর উপরে ছাদের মতো পাহাড়েরর তলদেশ। উপরে উঠতে পারে না এবং ডান-বাম কিছুই খেয়াল থাকে না- তখনই মানুষ মারা যায়। আর এ জন্যই ঝরনা নেমে গোসল করতে কৃতপক্ষ নিষেধ করেন। কিন' অনেকেই নিষেধ অমান্য করে গোসল করতে গিয়ে মারা যায়। আবার অনেকের ধারনা ঝরনাই প্রতিবছর মানুষ খেয়ে ফেলে। যদিও তা আমরা কুসংস্কার বলে থাকি। এই কথাগুলো কুসংস্কার হলেও গ্রামের মানুষ আজও সত্যি বলে বিশ্বাস করে। যুগ যুগ ধরে গ্রামাঞ্চলের মানুষ এই সব বিশ্বাস করে, মনে প্রাণে মান্য করে আসছে। জ্বিন-ভূতের আছর বর্তমান যুগের শিক্ষিত মানুষেরা বিশ্বাস করে না; তবু জ্বিন-ভূত পৃথিবীর মাঝে বিরাজমান রয়েছে তা অস্বীকার করা যায় না। বিভিন্ন গল্প-উপন্যান, নাটকে জ্বিন-ভূতের বহু কাহিনীর সন্ধ্যান পাওয়া যায়। কুরআন-হাদীসেও তার অস্তিত্ব পাওয়া যায়। অনেক সময় গ্রামাঞ্চলে জ্বিনের আছর পাওয়া বিভিন্ন মানুষকে দেখতে পাওয়া যায়। ফকির-কবিরাজের মাধ্যমে চিকিৎসা করে জ্বিন তাড়ানোর চিত্র চলতে ফিরতে দেখা যায়। জ্বিন জাতি পৃথিবীতে ছিল এবং কেয়ামত পর্যন্ত থাকবে এটাই চিরন্তসত্য- তা কেউ বিশ্বাস করুক আর নাই করুক তাতে কিছু যায়-আসে না।
ঝরনা থেকে ক্লান্ত হতে ফিরতে শুরু করলাম। এখানে থাকতে আর ভাল লাগছে না। এক জায়গয় আর কতক্ষন থাকতে ভাল লাগে। আবার পাহাড় ঘেষে সেই সিঁড়ির উপর পদচারণ করতে করতে মূল ফটক দিয়ে বের হয়ে গেলাম। সকাল বিদায় হয়েছে সেই কখন; দুপুরের খাড়া সুর্য্যটা পশ্চিম দিকে হেলে পড়েছে। উদরে আগুণ লেগে গেছে। আগুন নেভানোর ব্যবস'া আগে করতে হবে। অন্যথায় আর পদচারণ করার শক্তি পাওয়া যাবে না। দেখে-শুনে একটি রেষ্টুরেন্টে দুপুরের খাবারের পর্ব শেষ করলাম। পাশেই রয়েছে খাসিয়াদের তাঁতের তৈরী বিভিন্ন পোষাক। ভ্রমনে যেহেতু এসেছি কিছু একটা তো কিনতে হবে। বউ-বাচ্চারা ভ্রমনের অংশিদার হতে চাইবে। তাদেরকে কাপড়-চোপর উপহার দিলে তারাও ঘরে বসে ভ্রমনের আনন্দ উপভোগ করতে পারবে। মার্কেটের এ প্রান্ত ঐ প্রান্ত ঘরে যে যার মতো করে আত্মীয়-স্বজনের জন্য বিভিন্নপত্র ক্রয় করে নিল। আমি আমার দুই মেয়ে কাজী সাইমা, কাজী সাদিয়া, ভাইপো সায়িন, ভাগনি তন্বি এবং স্ত্রী ফাতেমা বেগমের জন্য কাপড় ও অন্যান্য জিনিষপত্র ক্রয় করার পর নিজের জন্য আর কিছু ক্রয় করার মতো টাকা রইল না। ধার করে কারো কাছ থেকে আরো কিছু ক্রয় করব; সেই সুযোগ নেই। সবার একই দশা। পকেটে যা ছিল তা দিয়ে ইচ্ছে মতো স্বজনদের জন্য জিনিষপত্র ক্রয় করে ব্যাগ পরিপূর্ণ করে ফেলেছে। মুলত: ভ্রমনে আসলে মানুষ একটু শৌখিন হয়ে যায়। টাকা-পয়সা হিসেব করে খরচ করে না। মনের আশ মিটিয়ে খরব করে। মনকে প্রফুল্ল করতে এবং আত্মতৃপ্তি মেটানোর জন্য দু’হাতে টাকা খরচ করে।
এবার ফেরার পালা। আবার সেই ভাঙ্গা-চুড়া রাস্তা দিয়ে গাড়ী চলতে শুরু করল। কুলাউড়া এসে গিয়াস ভাইকে বিদায় জানাতে গাড়ী থেকে সবাই নেমে পড়লাম। গাড়ী থেকে নেমে দেখতে পেলাম কুলাউড়া প্রেস ক্লাবটি। সবাই তখন প্রেস ক্লাবের সদস্যদের সাথে সাক্ষাত করে যাওয়ার ইচ্ছে প্রকাশ করে। তখন গিয়াস ভাই বিদায় না হয়ে আমাদেরকে সাপ্তহিক সংলাপ অফিসে নিয়ে যায়। সেখানে গিয়ে সংলাপ পত্রিকার স্টাফ এবং কুলাউড়া প্রেস ক্লাবের সদস্যদের সাথে গ্রুফ ছবি তুলে নাস্তা খেলাম ও মনের মাধরি মিশিয়ে ঘন্টা খানেক আড্ডা দিয়ে আবার গাড়ীতে গিয়ে উঠলাম।
তখন সন্ধ্যা ঘনাঘন। সুর্য্যটা অন্ধকারের সাথে যুদ্ধ করছে। অন্ধকার তাকে গিলে খাওয়ার চেষ্টা করছে। সূর্য্য আর অন্ধকারের মধ্যে প্রতিদিন দু’বার যুদ্ধ হয়। এতে পালাক্রমে একবার অন্ধকার জয়ী হয় আবার একবার সূর্য্য জয়ী হয়। এখন অন্ধকারের পালা; সুতরাং সূর্য্য যত শক্তি প্রদর্শন করোক না কেন- অন্ধকারই জয়ী হবে। এই যুদ্ধের মধ্যে অনেক রহস্য লুকিয়ে আছে। জোয়ার-ভাটার যে রহস্য; জন্ম-মৃত্যুর যে রহস্য: এখানে তা প্রতিয়মান। কোনটাই তো আর এক জায়গায় থেমে থাকে না, প্রকৃতির নিয়ম অনুসারে ঘটে যাচ্ছে। কারো ক্ষমতা নেই- এই নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটানো। আমরা অনেক সময় ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে কতকিছু করে ফেলতে চাই; আবার করেও ফেলি। কিন' কখনো হিসেব করে দেখি না তার স'ায়ীত্ব কতটুকু হবে। পৃথিবীর ইতিহাসের দিকে তাকালেই দেখা যায়: কত উত্থান-পতনের কাহিনীতে বিস্তৃত রয়েছে। তবু আমরা বিচার বিশ্লেষণ করে কখনো দেখি না- কি করছি, কেন করছি: যা করছি তার সময়কাল বা কতটুকু রয়েছে। অতীত ইতিহাস থেকে কেউ কোন দিন শিক্ষা নেই না; নেওয়ার প্রয়োজনবোধও করি না। অতীত অতীতেই থেকে যায় আর বদলায় না আমাদের জীবন চলার প্রদ্ধতি।
সূর্য্য চলে গেছে অন্ধকারের গহ্বরে। আধাঁরে ঢেকে গেছে পুরো পৃথিবী। আমাদের গাড়ী ছুটছে বাড়ির দিকে। ক্লান্ত দেহ নিয়ে সিটে বসে ঝিমাতে ঝিমাতে চার পাশে দৃশ্য অবলোকন করছি।



লেখক: কাজী খোরশেদ আলম
ট্যাগস

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Know about Cookies
Ok, Go it!
To Top