কাজী খোরশেদ আলম: যুগে যুগে মানব সম্প্রদায়কে হেদায়েতের জন্য এবং সঠিক ও সত্য পথে পরিচালনার মাধ্যমে আত্মমুক্তির লক্ষ্যে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কিতাব নাযিল হয়েছে। যা মানব জাতীর দিকনির্দেশনা হিসেবে কাজ করেছে; আজও করছে এবং কিয়ামত পর্যন্ত করবে। তবে যুগের পরিবর্তন ও প্রেক্ষাপট অনুযায়ী এবং আল্লাহ তা’য়ালার মনোনীত প্রেরিত বান্দাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য অনুযায়ী কিতাব গুলো নাযিল হয়েছিল।
মানব সৃষ্টির শুরু থেকে অর্থ্যাৎ আদি পিতা হযরত আদম (আঃ) থেকে আরম্ভব হয়ে সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী ও রাসূল হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) পর্যন্ত যত কিতাব নাযিল হয়েছে তার মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ কিতাব হল পবিত্র কোরআনুল কারীম। অন্যান্য নবীদের উপর অবর্তীণ কিতাব ও সহীফা গুলোর কার্যকাল ও দিকনিদের্শনা প্রয়োগ হয়েছিল একটি নিদির্ষ্ট সময় কাল পর্যন্ত। কোন কোন কিতাব একটি নির্দিষ্ট জাতী বা কওমের জন্য নির্ধারিত হয়ে নাযিল হয়েছিল। কিন্ত একমাত্র আল কোরআন-ই সমগ্র জাতী এবং আঠার হাজার মাখলুকাত তথা আল্লাহ তা’আলার সকল সৃষ্টিকুলের জন্য নাযিল হয়েছে এবং বর্তমানকাল পর্যন্ত তার কার্যক্রম মানবের মাঝে চলমান আছে; আগামীতে চলমান থাকবে। তাওরাত, ইঞ্জিল ও যাবূর কিতাবের মতো যার মধ্যে কোন সংশোধন-সংস্করণ ও সংযোজন-বিয়োজন নেই। কারণ এই কিতাবটি হল সর্বশ্রেষ্ঠ্য কিতাব; যা নবী হযরত মুহাম্মদ(সাঃ) এর উপর অবর্তীণ হয়েছে এবং যার হেফাজতের দায়িত্ব সয়ং আল্লাহ রাব্বুল আলামীন নিয়েছেন। ফলে কোন কালে তার পরিবর্তন, পরিমার্জন, সংশোধন, সংযোজন-বিয়োজন করা সম্ভব নয়। এই বিষয়ে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সয়ং চ্যালেন্স করে সূরা বাকারাহ এর ২৩ নং আয়াতের মাধ্যমে বলেছেন“এতদ সর্ম্পকে যদি তোমাদের কোন সন্দেহ থাকে যা আমি আমার বান্দার প্রতি অবর্তীণ করেছি। তাহলে এর মতো একটি সূরা রচনা করে নিয়ে আস। তোমাদের সে সব সাহায়্যকারীদেরকে ও সঙ্গে নাও- আল্লাহ কে ছাড়া, যদি তোমরা সত্যবাদী হয়ে থাক।”
পবিত্র আল কোরআন হল-সমগ্র সৃষ্টি কূলের সংবিধান। যার মধ্যে নিহিত রয়েছে জীবন পরিচালনা ও জীবিকা আহরণের সকল কর্ম-পদ্ধতি এবং নিয়ম-কানুন। বিশেষ করে মানব জাতির আলোকবর্তিকা হিসেবে যুগ-যুগান্তর সত্যর আলো বিচ্ছরিত করে মানব সত্তাকে সর্বময় জাগ্রত রাখবে; যাতে কোন ইবলিস সত্তা কাউকে বশ করে অন্ধকার পথে পরিচালিত করতে না পারে। সত্যানুসন্ধানীদের জ্ঞান অর্জনের ঠিকানা এবং পৃথিবীসহ সকল গ্রহ, উপ-গ্রহ এবং নক্ষত্রের গতি-বিধির সকল সূত্র যার মধ্যে নিহিত রয়েছে। জ্ঞান-বিজ্ঞানের সূতিকাঘর হিসেবে যার সূ-খ্যাতি আছে। জ্ঞানী,গুণি,সাধক,বুদ্ধিজীবিদের জন্য গবেষণার কেন্দ্রবৃন্দ হল: এই মহাগ্রন' আল-কোরআন। পৃথিবীতে যত গ্রন'-ই রচিত হয়েছে; তার মধ্যে আল-কোরআন ব্যতিত কোন গ্রন'-ই পরিপূর্ণ গ্রন' হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে নি। প্রত্যেকটি গ্রনে'র মধ্যে ভুল-ক্রর্টি সন্ধান পাওয়া গেলেও আল-কোরআনের মধ্যে কোন কালে কেউ কোন ভুল ক্রুটির সন্ধার করতে পারে নি এবং তার মধ্যে ভুল খুঁজতে গিয়ে জ্ঞানীর জ্ঞান শেষ হয়ে যাবে কিন্ত ভুল পাওয়া সম্ভব হবে না; তার কারণ এই মহা-গ্রন'টি রচনা করেছেন মহাজ্ঞানী আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন সয়ং।
আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন প্রত্যেক নবী ও রাসূলকে কিছু অলৌকিক ক্ষমতা প্রদান করেছেন। হযরত সোলায়মান (আঃ) সকল জীবের ভাষা বুঝতেন এবং তাদের সাথে কথা বলতে পারতেন- এটা ছিল সোলায়মান (আঃ) এর মু‘জেযা। হযরত মূসা (আঃ) এর হাতে লাঠি ছিল; যার দ্বারা তিনি বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কাজ করতে পারতেন। ফেরাউন যখন হযরত মূসা (আঃ)সহ তার কাওমের লোকদেরকে সৈন্য বাহিনী নিয়ে তিন দিক থেকে ঘেরাও করে ফেলে তখন তিনি তার হাতের লাঠি দ্বারা নীল নদের আঘাত করেন এবং আঘাত করার সাথে সাথে নদীর মাঝখান দিয়ে রাস্তা হয়ে যায় এবং তিনি তার অনুসারীদের নিয়ে নিরাপদে নদী পার হতে সক্ষম হয়। ফেরাউন সকল দল-বল ও সৈন্য সামন্ত নিয়ে ডুবে মরে। এখানে হযরত মূসা (আঃ) এর হাতের লাঠিটি ছিল মু‘জেযার নিদর্শন স্বরূপ। এভাবে প্রত্যেকটি নবী ও রাসূলগণ আল্লাহ রাব্বুল আলামীন থেকে অসাধারণ ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন; যার মাধ্যমে মানুষকে আল্লাহর পথে ডেকে আনার জন্য কিছু নির্দশন প্রকাশ করতেন। এভাবে নবী ও রাসূলের যুগের পরে সাধারণ মানুষকে সত্যর পথে পরিচালিত করে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের যিকর কে পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠা করে রাখার জন্য অলী এবং আওলীয়াদেরকে কিছু অলৌকিক ক্ষমতা প্রদান করেন যাকে কেরামত বলে। বাংলার বুকে অনেক অলী ও আওলীদের আগমন ঘটেছে। হযরত শাহ্ জালাল, হযরত শাহ্ পরান, হযরত খান জাহান আলী, নুর-নগরী, বন্দীশাহী, সোবহান শাহ আলকাদরী, মনোহর আলী শাহ্, আপ্তাব উদ্দিন শাহ্, শাহ্ ঈসরাইল, জিয়া উদ্দিন শাহ্, আমানত শাহ্, বায়েদিত বোস্তামিন,নিযাম উদ্দিন, সাহেব খাসহ বিভিন্ন অলী ও আওলীয়ারা বিভিন্ন স'ানে আস্তানা করে মানুষকে আল্লাহ্ আল্লাহর পথে ডেকেছেন এবং বিভিন্ন সময় অলৌকিক ঘটনা প্রদর্শন করে আস'া অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন। আজও মানুষ তাদের অলৌকিক ঘটনাকে গল্পের মতো বলে বেড়ান এবং শ্রদ্ধার সঙ্গে তাদের নাম উচ্চারণ করেন।
আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীনের পেয়ারে হাবীব, দু’জাহানের বাদশা,সৃষ্টিকুলের শিরমণি, আঠার হাজার মাখলুকাতের জন্য রহমতস্বরূপ প্রেরিত মহা-মানব, সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী ও রাসূল হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)কে অনেক অলৌকিক ক্ষমতা প্রদান করেছেন; যা মু‘জেযা হিসেবে স্বীকৃত। তার মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ মু’জেযা হল: আল-কোরআন।
পৃথিবীর সৃষ্টির রহস্য ও মানব সৃষ্টির রহস্য এবং মানব সম্প্রদায়ের ইহকালের করণীয়, পরকালের মুক্তির নির্দেশিকার ব্যাখ্যা- বিশ্লেষণ রয়েছে।
তাছাড়া আল্লাহ তা’আলা অনুগ্রহ করে ও দয়া বশত: পরীক্ষার প্রশ্নপত্র পূর্বে-ই রাসূল্লাহ (সাঃ) এর মাধ্যমে উম্মতের কাছে প্রকাশ করে দিয়েছেন। এখন এসব প্রশ্নের সমাধান শিক্ষা করাই উম্মতের কাজ। পরীক্ষার পূর্বে প্রশ্নপত্র প্রকাশ করে দেওয়ার পরও যদি কেউ ফেল করে, তবে এর চাইতে দুর্ভাগ্য আর কি হতে পারে?
প্রশ্নপত্র সর্ম্পকে রাসূল (সাঃ) বলেন-“ হাশরের ময়দানে কোন ব্যক্তির পদযুগল ততক্ষণ পর্যন্ত সামনে অগ্রসর হতে পারবে না, যতক্ষণ না তার কাছ থেকে পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর নেয়া হয়। প্রথম এই যে, সে জীবনের সুদীর্ঘ ও প্রচুর সংখ্যক দিবারাত্র কে কি কাজে ব্যয় করেছে? দ্বিতীয় এই যে বিশেষ ভাবে কর্মক্ষম যৌবনকালকে সে কিভাবে অতিবাহিত করেছে? তৃতীয় এই যে, অর্থকড়ি কোন (হালাল এবং হারাম) পথে উপার্জন করেছে? চতুর্থ এই যে, অর্থকড়িতে সে কোন (জায়েয কিংবা নাজায়েয) কাজে ব্যয় করেছে? পঞ্চম এই যে, নিজ এলম অনুযায়ী সে কি আমল করেছে?
জাদু ও মু’জেযার পার্থক্য ঃ-
পয়গম্বরদের মু’জেযা ও ওলীদের কারামত দ্বারা যেমন অস্বাভাবিক ও অলৌকিক ঘটনাবলী প্রকাশ পায়, জাদুর মাধ্যমেও তেমনি প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যায়। ফলে মুর্খ লোকেরা বিভ্রান্তিতে পতিত হয়ে জাদুকরদেরকেও সম্মানীত ও শ্রদ্বার পাত্র মনে করে থাকে। তাই জাদু ও মু’জেযার মধ্যে পার্থক্য জানা প্রয়োজন। প্রকৃত সত্তার দিক দিয়ে এবং বাহ্যিক প্রতিক্রিয়ার দিক দিয়ে এতদুভয়ের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
সত্তার পার্থক্য এই যে, জাদুর প্রভাবে সৃষ্ট ঘটনাবলী ও কারণের আওতাবহির্ভূত নয়। পার্থক্য শুধু কারণটি দৃশ্য কিংবা অদৃশ্য হওয়ার মধ্যে। যেখানে কারণ দৃশ্যমান, সেখানে ঘটনাকে কারণের সাথে সম্পৃক্ত করে দেয়া হয় এবং ঘটনাকে মোটেই বিষ্ময়কর মনে করা হয় না।কিন্ত যেখানে কারণ অদৃশ্য, সেখানেই ঘটনাকে অদ্ভুত ও আর্শ্চযজন মনে করা হয়। সাধারণ লোক ‘কারণ’ না জানার ফলে এ ধরনের ঘটনাকে অলৌকিক মনে করতে থাকে। অথচ বাস্তবে তা অন্যান্য অলৌকিক ঘটনারই মতো। কোন দূরপ্রাচ্য থেকে কোন জিনিস হঠাৎ সামনে পড়লে দর্শকমাত্রই সেটাকে অলৌকিক বলে আখ্যায়িত করবে। মূলত জ্বিন ও শয়তানরা এ জাতীয় কাজের ক্ষমতা প্রাপ্ত হয়েছে।
মোট কথা এই যে, জাদুর প্রভাবে দৃষ্ট ঘটনাবলী ও প্রাকৃতিক কারণের অধীন। তবে, কারণ অদৃশ্য হওয়ার ফলে মানুষ অলৌকিকতার বিভ্রান্তিতে পতিত হয়।
মু‘জেযাঃ-
মু‘জেযার অবস'া এর বিপরীত। মু‘জেযা প্রত্যক্ষভাবে আল্লাহ তা’আলার কাজ। এতে প্রাকৃতিক কারণের কোন হাত নেই। ইবরাহীম (আঃ) এর জন্য নমরূদের জ্বালানো আগুণকে আল্লাহ্ তা’আলাই আদেশ করেছিলেন,“ ইবরাহীমের জন্য সুশীতল হয়ে যাও। কিন্ত এতটুকু শীতল নয় যে, ইবরাহীম কষ্ট অনুভব করে। আল্লাহর এই আদেশের ফলে আগুণ শীতল হয়ে যায়।”
ইদানিং কোন কোন লোক শরীরে ভেষজ প্রয়োগ করে আগুণের ভেতরে চলে যায়। এটা মু‘জেযা নয়; বরং ভেষজের প্রতিক্রিয়া। তবে এখানে ভেষজটি অদৃশ্য, তাই মানুষ এই ঘটনাকে অলৌকিক বলে ধোকা খায়।
আবার এমন কিছু ভেষজ রয়েছে যা শীত কালে যদি কোন মানুষ তার শরীরে মাখে, তখন তার শরীর থেকে ঘাম বের হতে থাকবে। য অনেক সময় ভন্ডরা শরীরে প্রয়োগ করে কেরামত দেখানোর বৃথা চেষ্টা করে নিজেকে কামেল বা ওলী হিসেবে আত্মপরিচয় ফুটিয়ে তুলতে চেষ্টা করে। কন কনে শীতের মধ্যে শরীর থেকে ঘাম ঝড়তে দেখলে তাজ্জব হয়ে যায় আর মনে প্রাণে মেনে নেয় যে- এই মানুষ কোন সাধারণ মানুষ নয়, অথচ এখানে অদৃশ্য ভেষজ ঔষধের গুণে শীতের মাঝে শরীর থেকে ঘাম বের হচ্ছে।
স্বয়ং কোরআনের বর্ণনা দ্বারা বুঝা যায় যে, মু‘জেযা সরাসরি আল্লাহর কাজ। বলা হয়েছে- আপনি যে এক মুষ্টি কঙ্কর নিক্ষেপ করেছিলেন, প্রকৃতপক্ষে তা আপনি নিক্ষেপ করেননি, আল্লাহ্ নিক্ষেপ করেছিলেন। অর্থ্যাৎ এক মুষ্টি কঙ্কর- যে সমবেত সবার চোখে পৌঁছে গেল, এতে আপনার কোন হাত ছিল না। এটা ছিল একান্তভাবেই আল্লাহর কাজ। এই মু‘জেযাটি বদর যুদ্ধে সংঘটিত হয়েছিল।
রাসূল্লাহ (সাঃ) একমুষ্টি কঙ্কর কাফের বাহিনীর প্রতি নিক্ষেপ করেছিলেন যা সবার চোখেই পড়েছিল। (তফসীর মাআরেফুল কোরান পৃষ্টা-৫২)
মু‘জেযা প্রাকৃতিক কারণ ছাড়াই সরাসরি আল্লাহ্র কাজ আর জাদু অদৃশ্য প্রাকৃতিক কারণের প্রভাব। এই প্রার্থক্যটি-ই মু‘জেযা ও জাদুর স্বরূপ বোঝার পক্ষে যথেষ্ট। কিন্ত তা সত্ত্বেও এখানে একটি প্রশ্ন থেকে যায় যে, সাধারণ মানুষএই পার্থক্যটি কিভাবে বুঝবে? কারণ, বাহ্যিক রূপ উভয়েরই এক। এই প্রশ্নের উত্তর এই যে, সাধারণ লোকদের বোঝার জন্যেও আল্লাহ্ তা’আলা কয়েকটি পার্থক্য প্রকাশ করেছেন।
প্রথমতঃ মু‘জেযা ও কারামত এমন ব্যক্তিবর্গের দ্বারা প্রকাশ পায় যাদের খোদাভীতি,পবিত্রতা, চরিত্র ও কাজ কর্ম সবার দৃষ্টির সামনে থাকে। পক্ষান্তরে জাদু তারাই প্রদর্শন করে, যারা নোংরা,অপবিত্র এবং আল্লাহর যিক্র থেকে দূরে থাকে। এসব বিষয় চোখে দেখে প্রত্যেকেই মু‘জেযা ও জাদুর প্রার্থক্য বুঝতে পারে।
দ্বিতীয়ত ঃ- আল্লাহ্র চিরাচরিত্র রীতি এই যে, যে ব্যক্তি মু‘জেযা ও নবুওত দাবী করে জাদু করতে চায়; তার জাদু প্রতিষ্ঠা লাভ করতে পারে না। অবশ্য নবুওয়াতের দাবী ছাড়া জাদু করতে তা প্রতিষ্ঠা লাভ করে।
কোরআনুল করীম রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর সর্বশ্রেষ্ঠ মু‘জেযা
রাসূল (সাঃ) এর মু‘জেযার তো কোন শেষ নেই এবং প্রত্যেকটিই মু‘জেযাই অত্যন্ত বিষ্ময়কর। কিন্ত তা সত্ত্বেও এ স'লে তার জ্ঞান ও বিদ্যার মু‘জেযা অর্থ্যাৎ কোরআনের বর্ণনায় সীমাবদ্ধ রেখে ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে যে,তার সর্বশ্রেষ্ঠ মু‘জেযা হচ্ছে কোরআন এবং এ মু‘জেযা অন্যান্য নবী রাসূলগণের সাধারণ মু‘জেযা অপেক্ষা স্বতন্ত্র। কেননা, আল্লাহ তা’আলা তার অপার কুদরতে রসূল প্রেরণের সাথে সাথে কিছু মু‘জেযা প্রকাশ করেন। আর এসব মু‘জেযা সে সমস্ত রসূলের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে, যে গুলো তাদের জীবন কাল পর্যন্তই শেষ হয়ে গেছে। কিন্ত কোরআনই এমন এক বিচিত্র মু‘জেযা যা কেয়ামত পর্যন্ত থাকবে।
কোরআন একটি গতিশীল ও কেয়ামত পর্যন্ত স'ায়ী মু‘জেযা ঃ-
অন্যান্য সমস্ত নবী ও রসূলগণের মু‘জেযাসমুহ তাদের জীবন পর্যন্তই মু‘জেযা ছিল অথবা কোন প্রেক্ষাপট অনুযায়ী তার সীমাবদ্ধতা থেকেছে; যতক্ষণ তার প্রয়োজন ছিল কিন্ত কোরআনের মু‘জেযা হুযুর (সাঃ) এর তিরোধানের পরও পূর্বের মতোই মু‘জেযা সূলভ বেশিষ্ট্যসহ-ই বিদ্যমান রয়েছে। আজ পর্যন্ত একজন সাধারণ মুসলমান দুনিয়ার যে কোন জ্ঞানী-গুণি ও বুদ্ধিজীবিকে চ্যালেঞ্জ করে বলতে পারে যে, কোরআনের সমতূল্য কোন আয়াত ইতিপূর্বে কেউ তৈরী করতে পারে নি; এখনো কেউ পারবে না আর ভবিষ্যৎতে পারবে না। সুতরাং কোরআনের রচনাশৈলী যার নমুনা আর কোন কালেই কোন জাতি পেশ করতে পারে নি, সেটাও একটি গতিশিল দীর্ঘস'ায়ী মু‘জেযা। হুযুরের যুগে যেমন এর নযীর পেশ করা যায় নি, অনুরূপভাবে আজও তা কেউ পেশ করতে পারেনি, ভবিষ্যতেও কারো দ্বারা সম্ভব হবে না। উপরোক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে এ বিষয়টি পরিষ্কার হওযার প্রয়োজন যে, কিসের ভিত্তিতে কোরআনকে হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের সর্বপেক্ষা বড় মু‘জেযা বলা হয়? আর কি কারণে কোরআন শরীফ সর্বযুগে অনন্য ও অপরাজেয় এবং সারা বিশ্ববাসী কেন এর নযীর পেশ করতে অক্ষম।
মুসলমানদের দাবী যে, চৌদ্দশত বৎসরের এ দীর্ঘ সময়ের মধ্যে কোরআনের এ চ্যালেঞ্জ সত্বেও কেউ কোরআনের বা এর একটি সূরার অনুরূপ কোন রচনাও পেশ করতে পারেনি ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে এ দাবীর যথার্থতা কতটুকু এ দুটি বিষয়ই দীর্ঘ আলোচনা সাপেক্ষ।
কোরআনের মু‘েজেযা হওয়ার অন্যান্য কারণসমূহ ঃ-
প্রথম কথা হচ্ছে যে, কোরআন কে মু‘জেযা বলে অভিহিত করা হলো কেন, আর কি কি কারণে সারা বিশ্ব এর নযীর পেশ করতে অপারগী হয়েছে। এ বিষয়ে প্রাচীন কাল থেকে আলেমগণ বহু গ্রন' রচনা করেছেন এবং প্রত্যেক মুফাসসিরই স্ব স্ব বর্ণনা ভঙ্গিতে এর বিবরণ দিয়েছে। এখানে অতি সংক্ষেপে কয়েকটি প্রয়োজনীয় বিষয় বর্ণনা করা হল। সর্ব প্রথম লক্ষণীয় বিষয় এই যে, এ আশ্বর্য এবং সর্ববিধ জ্ঞানের আধার মহান গ্রন'টি কোন পরিবেশে এবং কার উপর অবর্তীণ হয়েছিল। আরো লক্ষ্য করার বিষয় হচ্ছে যে, সে যুগের সমাজ পরিবেশে কি এমন কিছু জ্ঞানের উপকরণ বিদ্যমান ছিল, যার দ্বারা এমন পূণাঙ্গ একটি গ্রন' রচিত হতে পারে, যাতে সৃষ্টির আদি থেকে অন্ত পর্যন্ত সর্ববিধ জ্ঞান-বিজ্ঞানের যাবতীয় উপকরণ সন্নিবেশিত করা স্বাভাবিক হতে পারে? সমগ্র মানব সমাজের ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত জীবনের সকল দিক সম্বতি নির্ভূল পথ-নির্দেশ এ গ্রনে' সন্নিবেশিত করার মতো কোন সূত্রের সন্ধান কি সে যুগের জ্ঞান ভান্ডারে বিদ্যামান ছিল, যা দ্বারা মানুষের দৈহিক ও আত্মিক উভয় দিকেরই সুষ্ঠ বিকাশের বিধানাবলী থেকে শুরু করে পারিবারিক নিয়ম শৃংখলা সমাজ সংগঠন ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস'াপনা তথা দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রেও সর্বোত্তম ও সর্বযুগে সমভাবে প্রজোয্য আইন-কানুন বিদ্যমান থাকতে পারে?
যে ভূ-খন্ডে এবং যে মহান ব্যক্তির প্রতি এ গ্রন' অবতীর্ণ হয়েছে, এর ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিক অবস'া জানতে গেলে সাক্ষাৎ ঘটবে এমন একটা ঊষর শুষ্ক মরুময় এলাকার সাথে যা ছিল বাত্হা বা মক্কা নামে পরিচিত। যে এলাকার ভূমি না ছিল শিল্প। আবহাওয়া এমন স্বাস'্যকর ছিল না, যা কোন বিদেশী পর্যটককে আকৃষ্ট করতে পারে। রাস্তা-ঘাটও এমন ছিল না যেখানে সহজে যাতায়াত করা যায়। সেটি ছিল অবশিষ্ট দুনিয়া থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন এমন একটি মরুময় উপদ্বীপ, যেখানে শুষ্ক পাহাড়-পর্বত এবং ধূ-ধূ বালুকাময় প্রান্তর ছাড়া আর কিছুই নজরে পড়তো না। কোন জনবসতি বা বৃক্ষলতার অস্তিত্বও বড় একটা দেখা যেত না।
এ বিরাট ভূ-ভাগটির মধ্যে কোন উল্লেখযোগ্য শহরের ও অস্তিত্ব ছিল না। মাঝে মাঝে ছোট ছোট গ্রাম এবং তার মধ্যে উট-ছাগল প্রতিপালন করে জীবন ধারণকারী কিছু মানুষ বসবাস করতো। ছোট ছোট গ্রাম গুলো তো দূরের কথা। নামে মাত্র যে কয়টি শহর ছিল, সে গুলোতে লেখা পড়ার কোন চর্চা ছিল না। না ছিল কোন স্কুল কলেজ, না ছিল কোন বিশ্ববিদ্যালয়। শুধুমাত্র ঐতিহ্যগত ভাবে আল্লাহ তা’আলা তাদেরকে এমন একটা সু সমৃদ্ধ ভাষা সম্পদ দান করেছিলেন, েভাষা গদ্য ও পদ্য বাক-রীতিতে ছিল অনন্য। আকাশের মেঘ-গর্জনের মতো সে ভাষার মাধূরী অপূর্ব সাহিত্যরসে সিক্ত হয়ে তাদের মুখ থেকে বেরিয়ে আসতো। অপূর্ব রসময় কাব্যসম্ভার বৃষ্টিধারার মতো আবৃত হতো পথে-প্রান্তরে। এ সম্পদ ছিল এমনি এক বিষ্ময় আজ পর্যন্তও যার রসাস্বাদন করতে গিয়ে যে কোন সাহিত্য প্রতিভা হতবাক হয়ে যায়। কিন্ত এটি ছিল তাদের স্বভাবজাত এক সাধারণ উত্তরাধিকার। কোন মক্তব মাদরাসার মাধ্যমে এ ভাষা জ্ঞান অর্জন করা রীতি ছিল না। অধিবাসিদের মধ্যে এ ধরনের কোন আগ্রহও পরিলক্ষিত হতো না। যারা শহরে বাস করতো , তাদের জীবিকার প্রধান অবলম্বন ছিল ব্যবসা-বাণিজ্য। পন্যসামগ্রী একস'ান থেকে অন্যস'ানে আমদানী -রপ্তানীই ছিল তাদের একমাত্র পেশা।
সে দেশেই সর্বপ্রাচীন শহর মক্কার এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে সে মহান ব্যক্তিত্বের আবির্ভাব, যার প্রতি আল্লাহর পবিত্রতম কিতাব কোরআন নাযিল করা হয়। প্রসঙ্গত: সে মহামানবের অবস'া সর্ম্পকে ও কিছুটা আলোচনা করা যাক।
ভূমিষ্ট হওয়ার আগেই তিনি পিতৃহারা হন, জন্মগ্রহনের পর মা’কে হারিয়ে এতিম হয়ে যান। মাত্র সাত বছর বয়সেই মাতৃবিয়োগ ঘটে। পিতৃ-মাতৃহীন অবস'ায় নিতান্ত কঠোর দারিদ্র্যের মাঝে লালিত-পালিত হন। যদি তখনকার মক্কায় লেখা পড়ার চর্চা থাকতো তুবও কঠোর দারিদ্র্যপূর্ণ জীবনে লেখাপড়া করার কোন সুযোগ গ্রহন করা তার পক্ষে কোন অবস'াতেই সম্ভব হতো না, আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, তদানিন্তন আরবে লেখাপড়ার কোন চর্চা ছিল না, যে জন্য আরব জাতিকে উম্মী তথা নিরক্ষর জাতি বলা হতো। কোরআন পাকেও এ জাতিকে উম্মী জাতি নামে উল্লেখ করা হয়েছে। এ অবস'ার পরিপ্রেক্ষিতেই সে মহান ব্যক্তি বাল্যকাল থেকেই সব ধরনের লেখাপড়া থেকে সর্র্ম্পূণ সর্ম্পকহীন ছিল। সে দেশে তখন এমন কোন জ্ঞানী ব্যক্তির অস্তিত্ব ছিল না যার সাহচর্যে থেকে এমন কোন জ্ঞান-সূত্রের সন্ধান পাওয়া সম্ভব হতো, যে জ্ঞান কোরআন পাকের মাধ্যমে পরিবেশন করা হয়েছে। সেহেতু একটা অনন্য সাধারণ মু‘জেযা প্রদর্শনিই ছিল আল্লাহ তা’আলার উদ্দেশ্য। মামুলী একটু অক্ষর জ্ঞান যা দুনিয়ার যে কোন এলাকার লোকই কোন না কোন উপায়ে আয়ত্ব করতে পারে, তাও আয়ত্ব করার কোন সুযোগ তার জীবনে হয়ে উঠেনি। অদৃশ্য শক্তির বিশেষ ব্যবস'াতেই তিনি এমন নিরক্ষর উম্মী রয়ে গেলেন যে, নিজের নাম টুকু পর্যন্ত দস্তখত করতে শেখেননি। তৎকালীন আরবের সর্বপেক্ষা জনপ্রিয় বিষয় ছিল কাব্য-চর্চা। স'ানে স'ানে কবিদের জলসা-মজলিস বসতো। এসব মজলিসে অংশগ্রহণকারী চারণ ও স্বভাব কবিগণের মধ্যে পারস্পরিক প্রতিযোগিতা হতো। প্রত্যেকেই উত্তম কাব্য রচনা করে প্রাধান্য অর্জন করার চেষ্টা করতো। কিন্ত তাকে আল্লাহ তা’আলা এমন রুচি দান করেছিলেন যে, কোনদিন তিনি এ ধরনের কবি জলসায় শরীক হননি। জীবনেও কখনো একছত্র কবিতা রচনা করার চেষ্টা করেননি।
উম্মী হওয়া সত্তেবও ভদ্রতা-নম্রতা, চরিত্রমাধূর্য অত্যন্ত প্রখর ধীশক্তি এবং সত্যবাদিতা ও আমানতদারীর অসাধারণ গুন বাক্যকাল থেকেই তার মধ্যে পরিলক্ষিত হতো, ফলে আরবের ক্ষমতাদর্পী বড়লোকগুলো তাকেই শ্রদ্ধা ও সম্মানের চোখে দেখতো এবং সমগ্র মক্কা নগরীতে তাকে আল-আমিন বলে অভিহিত করা হতো।
এ নিরক্ষর ব্যক্তি চল্লিশ বছর বয়স পর্যন্ত মক্কা নগরীতে অবস'ান করেছেন। ভিন্ন কোন দেশে ভ্রমণেও যাননি। যদিও এমন কোন ভ্রমনে যেতেন, তবুও ধরে নেয়া যেত যে, তিনি সেসব সফরে অভিজ্ঞতা ও বিদ্যার্জন করেছেন। মাত্র সিরিয়ার দুটি বাণিজ্যিক সফর করেছেন। যাতে তার কোন কর্তৃত্ব ছিল না। তিনি দীর্ঘ চল্লিশ বছর পর্যন্ত মক্কায় এমন ভাবে জীবযাপন করেছেন যে, কোন পুস্তক বা লেখনী কবিতা বা ছড়াও রচনা করেননি। ঠিক চল্লিশ বছর বয়সে তার মুখ থেকে যে বাণী নি:সৃত হতে লাগল, যাকে কোরআন বলা হয়। যা শাব্দিক ও অর্থের গুণগত দিক দিয়ে মানুষকে স্তম্ভিত করতো। সুস' বিবেকবান লোকদের জন্য কোরআনের এ গুণগত মান মু‘জেযা হওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল। কিন্ত তাতে তো শেষ নয়। বরং এ কোরআন বিশ্ববাসীকে বারংবার চ্যালেঞ্জ সহকারে আহবান করেছে যে, যদি একে আল্লাহর কালাম বলে বিশ্বাস করতে তোমাদের কোন সন্দেহ থাকে, তবে এর নযীর পেশ করে দেখাও।
একদিকে কোরআনের আহবান অপর দিকে সমগ্র বিশ্বের বিরোধী শক্তি যা ইসলাম ও ইসলামের নবীকে ধ্বংস করার জন্য স্বীয় জান-মাল, শক্তি-সামর্থ ও মান-ইয্যত তথা সবকিছু নিয়োজিত করে দিন-রাত চেষ্টা করছিল। কিন্ত এ সামান্য চ্যালেঞ্জর সম্মুখীন হতে কেউ সাহস করেনি। ধরে নেয়া যাক, এ গ্রন' যদি অদ্বিতীয় ও অনন্য সাধারণ নাও হতো, তবু একজন ঊম্মী লোকের মুখে এর প্রকাশই কোরআন কে অপরাজেয় বলে বিবেচনা করতে যে কোন সুস'বিবেক সম্পন্ন লোকই বাধ্য হতো। কেননা, একজন উম্মী লোকের পক্ষে এমন একটা গ্রন' রচনা করতে পারা কোন সাধারণ ঘটনা বলে চিন্তা করা যায় না।
দ্বিতীয় কারণঃ-
পবিত্র কোরআন ও কোরআনের নির্দেশাবলী সমগ্র বিশ্ববাসীর জন্য অবর্তীণ হয়েছে। কিন্ত এর প্রথম সম্বোধন ছিল প্রত্যক্ষভাবে আরব জনগণের প্রতি। যাদের জন্য কোন জ্ঞান না থাকলেও ভাষা শৈলীর উপর ছিল অসাধারণ বুৎপত্তি। এদিক দিয়ে আরবরা সারা বিশ্বে এক শ্রেষ্ঠ স'ান অধিকার করেছিল। কোরআন তাদেরকে লক্ষ্যে করেই চ্যালেঞ্জ করেছে যে, কোরআন যে আল্লাহর কালাম তাতে যদি তোমরা সন্দিহান হয়ে থাক, তবে তোমরা এর অনুরূপ একটি সাধারণ সূরা রচনা করে দেখাও।
যদি আল কোরআনের এ চ্যালেঞ্জ শুধু এর অর্ন্তগত গুন,নীতি, শিক্ষাগত তথ্য এবং নিগুঢ় তত্ত্ব পর্যন্ত সীমাবদ্ধ রাখা হতো, তবে হয়তো এ উম্মী জাতির পক্ষে কোন অজুহাত পেশ করা যুক্তি সঙ্গত হতে পারতো,কিন্ত ব্যাপার তা নয়, বরং রচনা-শৈলীর আঙ্গিক ও সর্ম্পকে এতে বিশ্ববাসীকে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে। এ চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করার জন্য অন্যান্য জাতির চাইতে আরববাসীরাই ছিল বেশি উপযুক্ত। যদি এ কালাম মানব ক্ষমতার উর্ধ্বে কোন অলৌকি শক্তির রচনা না হতো, তবে অসাধারণ ভাষাজ্ঞান সম্পন্ন আরবদের পক্ষে এর মোকাবেলা কোন মতেই অসম্ভব হতো না, বরং এর চাইতেও উন্নত মানের কালাম তৈরি করা তাদের পক্ষে সহজ ছিল। দু’একজনের পক্ষে তা সম্ভব না হলে, কোরআন তাদেরকে সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এমনটি রচনা করারও সুযোগ দিয়েছিল। তা সত্ত্বেও সমগ্র আরববাসী একেবারে নিশ্চুপ রয়ে গেল কয়েকটি বাক্যও তৈরী করতে পারলো না।
আরবের নেতৃস'ানীয় লোকগুলো কোরআন ও ইসলাম সর্ম্পূণ উৎখাত এবং রাসূল (সাঃ) কে পরাজিত করার জন্য যেভাবে সর্বশক্তি নিয়োগ করেছিল, তা শিক্ষিত লোকমাত্র-ই অবগত।
প্রাথমিক অবস'ায় হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) এর স্বল্প সংখ্যক অনুসারীর প্রতি নানা উৎপীড়নের মাধ্যমে ইসলাম থেকে সরিয়ে আনার চেষ্টা করেছিল। কিন্ত এতে ব্যর্থ হয়ে তারা তোষামোদের পথ ধরলো। আরবের বড় সরদার ওতবা ইবনে রাবীয়া সকলের প্রতিনিধিরূপে হুযুর (সাঃ) এর দরবারে উপসি'ত হয়ে নিবেদন করলো, আপনি ইসলাম প্রচার থেকে বিরত থাকুন। আপনাকে সমগ্র আরবের ধন-সম্পদ, রাজত্ব এবং সুন্দরী মেয়ে দান করা হবে এবং তুমি যা চাইবে; আমরা তার ব্যবস'া করে দিব। তিনি এর উত্তরে কোরআনের কয়েকটি আয়াত পাঠ করে শোনালেন। ফলে তারা এ প্রচেষ্টা সফল না হওয়ায় তারা যুদ্ধের জন্য প্রস'ত হল। হিজরতের পূর্বেও পরে সর্বশক্তি নিয়োগ করে যুদ্ধে অবর্তীণ হলো। কিন্ত কেউই কোরআনের চ্যালেঞ্জ গ্রহন করতে অগ্রসর হল না-তারা কোরআনের অনুরূপ একটি সুরা এমনকি কয়েকটি ছত্রও তৈরী করতে পারল না। ভাষাশৈলী ও পান্ডিত্বের মাধ্যমে কোরআনের মোকাবেলা করার ব্যাপারে আরবদের এহেন নীরবতাই প্রমাণ করে যে, কোরআন মানবরচিত গ্রন' নয় বরং তা আল্লাহরই কালাম। মানুষ তো দূরের কথা,সমগ্র সৃষ্টিজগত মিলেও এ কালামের মোকাবেলা করতে পারে নাই, কোন দিনই পারবে না।
আবরবাসীরা যে এ ব্যাপারে শুধু নির্বাকই রয়েছে তাই নয়, তাদের একান্ত আলোচনায় এরূপ মন্তব্য করেছে যে, এ কিতাব কোন মানুষের রচনা হতে পারে না। আরবদের মধ্যে যাদের কিছুটা সুস'্য বিবেক ছিল তারা শুধু মুখেই একথা প্রকাশ করেনি, এরূপ স্বীকৃতির সাথে সাথে স্বত:স্ফূর্তভাবে অনেকেই ইসলাম গ্রহণও করেছে। আবার কেউ কেউ পৈত্রিক ধর্মের প্রতি অন্ধ আবেগের কারণে অথবা বনী-আব্দে মনাফের প্রতি বিদ্বেষবশত: কোরআনকে আল্লাহর কালাম বলে স্বীকার করেও ইসলাম গ্রহণ থেকে বিরত হয়েছে।
কুরাইশদের ইতিহাসই সে সমস্ত ঘটনার সাক্ষী। তারই মধ্য থেকে এখানে কয়েকটি ঘটনার উল্লেখ করা হচ্ছে, যাতে অতি সহজে বুঝা যাবে যে, সমগ্র আরববাসী কোরআনকে অদ্বিতীয় ও নযীরবিহীন কালাম বলে স্বীকার করেছে এবং এর নযীর পেশ করার ব্যর্থ প্রচেষ্টায় অবতীর্ণ হওয়ার ঝুঁকি নিয়ে সচেতনভাবে বিরত হয়েছে।
রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এবং কোরআন নাযিলের কথা মক্কার গন্ডী ছাড়িয়ে হেজাযের অন্যান্য এলাকায় ছড়িয়ে পড়ার পর বিরুদ্ববাদীদের অন্তরে এরূপ সংশয়ের সৃষ্টি হলো যে, আসন্ন হজ্জের মওসুমে আরবের বিভিন্ন এলাকা থেকে হাজীগণ যখন মক্কায় আগমন করবে, তখন তারা রসূল (সা:) এর কথাবার্তা শুনে প্রভাবান্বিত না হয়ে পারবে না। এমতাবস'ায় এরূপ সম্ভাবনার পথ রুদ্ধ করার পন'া নিরূপণ সভার আয়োজন করলো। এ বৈঠকে আবের বিশিষ্ট সরদারগণও উপসি'ত ছিলেন। তাদের মধ্যে ওলীদ ইবনে মুগীরা বয়সে ও বিচক্ষণতায় ছিলেন শীর্ষস'ানীয়। সবাই তার নিকট সমস্যার কথা উত্থাপন করলো। তারা বললো, এখন চারদিক থেকে মানুষ আসবে এবং মুহাম্মদ (সা:) সর্ম্পকে আমাদেরকে জিজ্ঞেস করবে। তাদের এসব প্রশ্নের জবাবে আমরা কি বলবো? আপনি আমাদেরকে এমন একটি উত্তর বলে দিন, যেন আমরা সবাই একই কথা বলতে পারি।
অনেক ভাবনা-চিন্তার পর তিনি উত্তর দিলেন, যদি তোমাদের কিছু বলতেই হয়, তবে তাঁকে জাদুকর বলতে পার। লোকদেরকে বলো যে, এ লোক জাদুর-বলে পিতা-পুত্র ও স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করেন। সমবেত লোকেরা তখনকার মতো এ প্রস্তাবে একমত ও নিশ্চিত হয়ে গেল। তখন থেকেই তারা আগন্তকদের নিকট একথা বলতে আরম্ভ করলো, কিন্ত আল্লাহর জ্বালানো প্রদীপ কারো ফুৎকারে নির্বাপিত হবার নয়। আরবের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সাধারণ লোকদের অনেকেই কোরআনের অমীয় বাণী শুনে মুসলমান হয়ে গেল। ফলে মক্কার বাইরেও ইসলামের বিস্তার সুচিত হলো। (সূত্র:খাসায়েসে-কুবরা)
এমনিভাবে বিশিষ্ট কুরাইশ সরদার নযর ইবনে হারেস তার স্বজাতিকে লক্ষ্য করে বলেছিলেন, আজ তোমরা এমন এক বিপদের সম্মুখীন হয়েছ, যা ইতিপূর্বে কখনো দেখা যায়নি। মুহাম্মদ (সা:) তোমাদেরই মধ্যে যৌবন অতিবাহিত করেছে, তোমরা তার চরিত্র মাধূর্যে বিমুগ্ধ ছিলে, তাকে তোমরা সবার চাইতে সত্যবাদী বলে বিশ্বাস করতে, আমানতদার বলে অভিহিত করতে। কিন্ত যখন তার মাথার চুল সাদা হতে আরম্ভ করেছে, আর তিনি আল্লাহর কালাম তোমাদেরকে শোনাতে শুরু করেছেন, তখন তোমরা তাকে জাদুকর বলে অভিহিত করছ। আল্লাহর কসম, তিনি জাদুকর নন। আমি বহু জাদুকর দেখেছি, তাদের পরীক্ষা-নিরিক্ষা করেছি, তাদের সঙ্গে মেলাশো করেছি, কিন্ত মুহাম্মদ (সা:) কোন অবস'াতেই তাদের মত নন। তিনি সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্ব। আরও জেনে রাখো। আমি অনেক জাদুকরের কথাবার্তা শুনেছি, কিন্ত তার কথাবার্তা জাদুকরের কথাবার্তার সাথে কোন বিচারেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তোমরা তাকে কবি বল, অথচ আমি অনেক কবি দেখেছি, এ বিদ্যা আয়ত্ত করেছি, অনেক বড় বড় কবির কবিতা শুনেছি, অনেক কবিতা আমার মুখস্তও আছে, কিন্ত তার কালামের সাথে কবিদের কবিতার কোন সাদৃশ্য আমি খুঁজে পাইনি। কখনো কখনো তোমরা তাকে পাগল বল, তিনি পাগলও নন। আমি অনেক পাগল দেখেছি, তাদের পাগলামীপূর্ণ কথাবার্তাও শুনেছি, কিন্ত তার মধ্যে তাদের মত কোন লক্ষণই পাওয়া যায় না। হে আমার জাতি! তোমরা ন্যায়নীতির ভিত্তিতে এ ব্যাপারে চিন্তা কর, সহজে এড়িয়ে যাওয়ার মতো ব্যক্তিত্ব তিনি নন।
হযরত আবু যর (রা:) বলেছেন, আমার ভাই আনীস একবার মক্কায় গিয়েছিলেন। তিনি ফিরে এসে আমাকে বলেছিলেন যে, মক্কার এক ব্যক্তি নিজেকে আল্লাহর রসুল বলে দাবী করছেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, সেখানকার মানুষ এ সর্ম্পকে কি ধারণা পোষন করে? তিনি উত্তর দিলেন, তাকে কেউ কবি, কেউ পাগল, কেউ-বা জাদুকর বলে। আমার ভাই আনীস একজন বিশিষ্ট কবি এবং বিভিন্ন বিষয়ে বিজ্ঞ লোক ছিলেন। তিনি আমাকে বললেন, আমি যতটুকু লক্ষ্য করেছি, মানুষের এসব কথা ভুল ও মিথ্যা। তার কালাম কবিতাও নয়, জাদুও নয়, আমার ধারণায় সে কালাম সত্য।
আবু যর (রা:) বলেন যে, ভাইয়ের কথা শুনে আমি মক্কায় চলে এলাম। মসজিদে হারামে অবস'ান করলাম এবং ত্রিশ দিন শুধু অপেক্ষা করেই অতিবাহিত করলাম। এ সময় যমযম কূপের পানি ব্যতীত আমি অন্য কিছুই পানাহার করিনি। কিন্ত এতে আমার ক্ষুধার কষ্ট অনুভব হয়নি। দূর্বলতাও উপলব্ধি করিনি। শেষ পর্যন্ত কাবা প্রাঙ্গন থেকে বের হয়ে লোকের নিকট বললাম, আমি রোম ও পারস্যের বড় বড় জ্ঞানী-গুণী লোকদের অনেক কথা শুনেছি, অনেক জাদুকর দেখেছি, কিন্ত মুহাম্মদ (সা:) এর বাণীর মত কোন বাণী আজও পর্যন্ত কোথাও শুনিনি। কাজেই সবাই আমার কথা শোন এবং তার অনুসরণ কর। আবু যরের এ প্রচারে উদ্ববুদ্ধ হয়েই মক্কা বিজয়ের বছর তার কওমের প্রায় এক হাজার লোক মক্কায় গিয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন।
ইসলাম ও হযরতের সবচাইতে বড় শত্রু আবু জাহল এবং আখনাস ইবনে শোরাইকও লোকচক্ষুর অগোচলে কোরআন শুনত, কোরআনের অসাধারণ বর্ণনাভঙ্গি এবং অনন্য রচনারীতির প্রভাবে প্রভান্বিত হতো। কিন্ত গোত্রের লোকেরা যখন তাদেরকে বলতো যে, তোমরা যখন এ কালামের গুণ সর্ম্পকে এতই অবগত এবং একে অদ্বিতীয় কালামরূপে বিশ্বাস কর, তখন কেন তা গ্রহণ করছ না? প্রত্যুত্তরে আবু জাহল বলতো, তোমরা জান যে, বনি আবদে মনাফ এবং আমাদের মধ্যে পূর্ব থেকেই বিরামহীন শত্রুতা চলে আসছে; তারা যখন কোন কাজে অগ্রসর হতে চায়, তখন আমরা তার প্রতিদ্বন্দ্বীরূপে বাঁধা দেই। উভয় গোত্রই সমপর্যায়ের। এমবতাবস'ায় তারা যখন বলছে যে, আমাদের মধ্যে এমন এক নবীর আাভির্ভাব হয়েছে, যার নিকট আল্লাহর বাণী আসে, তখন আমরা কিভাবে তাদের মোকাবেলা করব, তাই আমার চিন্তা। আমি কখনো তাদের একথা মেনে নিতে পারি না।
মোট কথা কোরআনের এ দাবী ও চ্যালেঞ্জে সারা আরববাসী যে পরাজয় বরণ করেই ক্ষান্ত হয়েছে তাই নয়, বরং একে অদ্বিতীয় ও অনন্য বলে প্রকাশ্য ভাবে স্বীকারও করেছে। যতি কোরআন মানব রচিত কালাম হতো, তবে সমগ্র আবরবাসী তথা সমগ্র বিশ্ববাসী অনুরূপ কোন না কোন একটি ছোট সুরা রচনা করতে অপারগ হতো না এবং এ কিতাবের অনন্য বৈশিষ্ট্যের কথা স্বীকারও করতো না। কোরআনের বাহক পয়গাম্বরের বিরুদ্ধে জান-মাল, ধন-সম্পদ,মান-উজ্জত সবকিছু ব্যয় করার জন্য তারা প্রস'ত ছিল, কিন্ত কোরআনের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে দুটি শব্দও রচনা করতে কেউ সাহসী হয়নি।
এর কারণ এই যে, যে সমস্ত মানুষ তাদের মুর্খতাজনিত কার্যকলাপ ও আমল সত্ত্বেও কিছুটা বিবেকসম্পন্ন ছিল;তাদের মিথ্যার প্রতি একটা সহজাত ঘৃণাবোধ ছিল। কোরআন শুনে তারা যখন বুঝতে পারলো যে, এমন কালাম রচনা আমাদের পক্ষে আদৌ সম্ভব নয়, তখন তারা কেবল একগুয়েমীর মাধ্যমে কোন বাক্য রচনা করে তা জনসমেক্ষ তুলে ধরতে নিজেদের জন্য লজ্জার ব্যাপার বলে মনে করতো। তারা জানতো যে, আমরা যদি কোন বাক্য পেশ করিও, তবে সমগ্র আরবের শুদ্ধভাষী লোকেরা তুলনামূলক পরীক্ষায় আমাদেরকে অকৃতকার্যই ঘোষণা করবে এবং এজন্য অনর্থক লজ্জিত হতে হবে। এজন্য সমগ্র জাতিই চুপ করে ছিল। আর যারা কিছুটা ন্যায়পথে চিন্তা করেছে, তারা খোলাখুলিভাবে স্বীকার করে নিতেও কুন্ঠিত হয়নি যে, এটা আল্লাহর কালাম।
এসব ঘটনার মধ্যে একটি হচ্ছে এই যে, আরবের একজন সরদার আস’আদ ইবনে যেরার হযরতের চাচা আব্বাস (রা:) এর নিকট স্বীকার করেছেন যে, তোমরা অনর্থক মুহাম্মদ (সা:) এর বিরুদ্ধোচারণ করে নিজেদের ক্ষতি করছ এবং পারস্পারিক সর্ম্পকচ্ছেদ করছ। আমি দৃঢ় বিশ্বাসের সাথে বলতে পারি যে, নিশ্চয়ই তিনি আল্লাহর রসূল এবং তিনি যে কালাম পেশ করেছেন তা আল্লাহর কালাম এতে বিন্দুমাত্রও সন্দেহ নেই।
তৃতীয় কারণ:
তৃতীয় কারণ হচ্ছে এই যে, কোরআন কিছু গায়েবী সংবাদ এবং ভবিষ্যতে ঘটবে এমন অনেক ঘটনার সংবাদ দিয়েছে, যা হুবহু সংঘঠিত হয়েছে। যথা- কোরআন ঘোষণা করেছে, রোম ও পারস্যের যুদ্ধে প্রথমত: পারস্যবাসী জয়লাভ করবে এবং দশ বছর যেতে না যেতেই পনুরায় রোম পারস্যকে পরাজিত করবে। এ আয়াত নাযিল হওয়ার পর মক্কার সরদারগণ হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা:) এর সাথে এ ভবিষ্যদ্বাণীর যথার্থতা সর্ম্পকে বাজী ধরল। শেষ পর্যন্ত কোরআনের ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী রোম জয়লাভ করলো এবং বাজীর শর্তানুযায়ী যে মাল দেয়ার কথা ছিল, তা তাদের দিতে হলো। রসূলুল্লাহ (সা:) অবশ্য এ মাল গ্রহন করেননি। কেননা, এরূপ বাজী ধরা শরীয়ত অনুমোদন করে না। এমন আরো অনেক ঘটনা কোরআনে উল্লেখিত রয়েছে, যা গায়েবের সাথে সর্ম্পকযুক্ত এবং নিকট অতীতে হুবহু ঘটেছেও।
চুতুর্থ কারণ:
চতুর্থ কারণ এই যে, কোরআন শরীফে পূবর্বর্তী উম্মত, শরীয়ত ও তাদের ইতিহাস এমন পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, সে যুগের ইহুদী-খৃষ্টানদের পন্ডিতগণ, যাদেরকে পুর্ববর্তী আসমানী কিতাবসমুহের বিজ্ঞ লোক মনে করা হতো, তারাও এতটা অবগত ছিল না। রসূল (সা:) এর কোন প্রতিষ্ঠানগত শিক্ষা ছিল না। কোন শিক্ষিত লোকের সাহায্যও তিনি গ্রহণ করেননি। কোন কিতাব কোনদিন সর্ম্পশও করেন নি। এতদসত্ত্বেও দুনিয়ার প্রথম থেকে তার যুগ পর্যন্ত সমগ্র বিশ্ববাসীর ঐতিহাসিক অবস'া এবং তাদের শরীয়ত সর্ম্পকে অতি নিখুঁতভাবে বিস্তারিত আলোচনা করা আল্লাহর কালাম ব্যতীত কিছুতেই তার পক্ষে সম্ভব হতে পারে না। প্রকৃত পক্ষে আল্লাহ তা’আলাই যে তাকে এ সংবাদ দিয়েছেন এতে সন্দেহের অবকাশ নেই।
পঞ্চম কারণ:
পঞ্চম করণ হচ্ছে এই যে, কোরআনের বিভিন্ন আয়াতে মানুষের অন্তর্নিহিত বিষয়াদি সম্পর্কিত যে সব সংবাদ দেয়া হয়েছে পরে সংশ্লিষ্ট লোকদের স্কীকারোক্তিতে প্রমাণিত হয়েছে যে, এ সব কথাই সত্য। একাজও আল্লাহ তা’আলারই কাজ, তা কোন মানুষের পক্ষে সম্ভব ছিল না।
ষষ্ঠ কারণ:
ষষ্ঠ কারণ হচ্ছে যে, কোরআনে এমন সব আয়াত রয়েছে যাতে কোন সম্প্রদায় বা কোন ব্যক্তি সর্ম্পকে ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে যে, তাদের দ্বারা অমুক কাজ হবে না; তারা তা করতে পারবে না। ইহুদীদের সর্ম্পকে বলা হয়েছে, যদি তারা নিজেদেরকে আল্লাহর প্রিয় বান্দা বলেই মনে করে, তবে তারা নিশ্চয় তার নিকট যেতে পছন্দ করবে। সুতরাং এমতাবস'ায় তাদের পক্ষে মৃত্যু কামনা করা অপছন্দীয় হতে পারে না। মৃত্যু কামনা করা তাদের পক্ষে কঠিন ছিল না। বিশেষ করে ঐ সমস্ত লোকদের জন্য যারা কোরআনকে মিথ্যা বলে অভিহিত করতো। কোরআনের এরশাদ মোতাবেক তাদের মৃত্যু কামনা করার ব্যাপারে ভয় পাওয়ার কোন কারণ ছিল না। ইহুদীদের পক্ষে মৃত্যু কামনার (মোবাহালা) এ চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে মুসলমানদেরকে পরাজিত করার অত্যন্ত সুবর্ণ সুযোগ ছিল। কেরাআনের দাবীর পরিপ্রেক্ষিতে সঙ্গে সঙ্গেই তাতে সম্মত হওয়া তাদের পক্ষে উচিত ছিল। কিন্ত উহুদী ও মুশরিকরা মুখে কোরআনকে যতই মিথ্যা বলুক না কেন, তাদের মন জানতো যে, কোরআন সত্য, তাতে কনো সন্দেহের অবকাশ নেই। সুতরাং মৃত্যু কামনার চ্যালেঞ্জ সাড়া দিলে সত্য-সত্যই তা ঘটবে। এজন্যই তারা কোরআনের এ প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে সাহস পায়নি এবং একটি বারের জন্যও মুখ দিয়ে মৃত্যুর কথা বলেনি।
সপ্তম কারণ:
কোরআন শরীফ শ্রবণ করলে মুমিন, কাফির,সাধারণ-অসাধারণ নির্বিশেষে সবার উপর দু’ধনের প্রভাব সৃষ্টি হতে দেখা যায়। যেমন, হযরত জুবাইর ইবনে মোতআম (রাঃ) ইসলাম গ্রহণের পুর্বে একদিন হুযুর (সাঃ) কে মাগরিবের নামাযে সূরা তুর পড়তে শুনেন। হুযুর (সাঃ) যখন শেষ আয়াতে পৌঁছলেন,তখন জুবাইর (রাঃ) বলেন যে, মনে হলো, যেন আমার অন্তর উড়ে যাচ্ছে। তার কোরআন পাঠ শ্রবণের এটাই ছিল প্রথম ঘটনা। তিনি বলেন, সেদিনই কোরআন আমার উপর প্রভাব বিস্তার করে ফেলেছিল।
আয়াতটির বাংলা অনুবাদ হচ্ছে- তারা কি নিজেরাই সৃষ্ট হয়েছে, না তারাই আকাশ ও যমীন সৃষ্টি করেছে? কোন কিছুতেই ওরা ইয়াকীন করছে না। তাদের নিকট কি তোমার পালনর্কতার ভান্ডারসমুহ গচ্ছিত রয়েছে, না তারাই রক্ষক?
অষ্টম কারণ:
অষ্টম কারণ হচ্ছে, কোরআনকে বারংবার পাঠ করলেও মনে বিরক্তি আসে না। বরং যতই বেশি পাঠ করা যায় , ততই তাতে আগ্রহ বাড়তে থাকে। দুনিয়ার যত ভাল ও আকর্ষনীয় পুস্তকই হোক না কেন, বড়জোড় দু-চারবার পাঠ করার পর তা আর পড়তে মন চায় না, অন্যে পাঠ করলেও তা শুনতে ইচ্ছে হয় না। কিন্ত কোরআনের এ বৈশিষ্ট্য রয়েছে যে, যত বেশি পাঠ করা হয়, ততই মনের আগ্রহ আরো বাড়তে থাকে। অন্যের পাঠ শুনতেও আগ্রহ জন্মে।
নবম কারণ:
নবম কারণ হচ্ছে, কোরআন ঘোষণা করেছে যে, কোরআনের সংরক্ষণের দায়িত্ব স্বয়ং আল্লাহ গ্রহণ করেছেন। কিয়ামত পর্যন্ত এর মধ্যে বিন্দুবিসর্গ পরিমাণ পরিবর্তন-পরিবর্ধন না হয়ে তা সংরক্ষিত থাকবে। আল্লাহ তা’আলা এ ওয়াদা এভাবে পুরণ করেছেন যে, প্রত্যেক যুগে লক্ষ লক্ষ মানুষ ছিলেন এবং রয়েছেন, যারা কোরআনকে এমনভাবে স্বীয় স্মৃতিপটে ধারণ করেছেন যে, এর প্রতিটি যের, যবর তথা স্বরচিহ্ন পর্যন্ত অবিকৃত রয়েছে। নাযিলের সময় থেকে চৌদ্দ শতাধিক বছর অতিবাহিত হয়েছে; এ দীর্ঘ সময়ের মধ্যেও এ কিতাব কোন পরিবর্তন-পরিবর্ধন পরিলক্ষিত হয়নি। প্রতি যুগেই স্ত্রী-পুরুষ, শিশু-বৃদ্ধ নির্বিশেষে কোরআনের হাফেয ছিলেন ও রয়েছেন। বড় বড় আলেম যদি একটি যের-যবর, পেশ-কম করেন, তবে ছোট বাচ্চারাও তার ভুল ধরে ফেলে। পৃথিবীর কোন ধর্মীয় কিতাবের এমন সংরক্ষণ ব্যবস'া সে ধর্মের লোকেরা এক দশমাংশও পেশ করতে পারবে না। আর কোরআনের মত নির্ভুল দৃষ্টান্ত বা নযীর স'াপন করা তো অণ্য কোন গ্রন' সম্বন্ধে এটা সি'র করাও মুশকিল যে, এ কিতাব কোন ভাষায় অবর্তীণ হয়েছিল এবং তাতে কয়টি অধ্যায় ছিল।
গ্রন'াকারে প্রতি যুগে কোরআনের যত প্রচার ও প্রকাশ হয়েছে, অন্য কোন ধর্ম-গ্রনে'র ক্ষেত্রে তা হয়নি অথচ ইতিহাস সাক্ষী যে, প্রতি যুগেই মুসলমানদের সংখ্যা কাফের-মুশরিকদের তুলনায় কম ছিল এবং প্রচার-মাধ্যমও অন্যান্য ধর্মাবলম্বী লোকেদের তুলনায় কম ছিল। এতদসত্ত্বেও কোরআনের প্রচার ও প্রকাশের তুলনায় অন্য কোন ধর্মগ্রনে'র প্রচার ও প্রকাশনা সম্ভব হয়নি। তারপরেও কোরআনের সংরক্ষণ আল্লাহ তা’আলা শুধু গ্রন' ও পুস্তকেই সীমাবদ্ধ রাখেননি যা জ্বলে গেলে বা অন্য কোন কারণে নষ্ট হয়ে গেলে আর সংগ্রহ করার সম্ভাবনা থাকে না। তাই স্বীয় বান্দগণের স্মৃতিপটেও সংরক্ষিত করে দিয়েছেন। সমগ্র বিশ্বের কোরআনও যদি কোন কারণে ধ্বংস হয়ে যায, তবু এ গ্রন' পূর্বের ন্যায়ই সংরক্ষিত থাকবে। কয়েকজন হাফেয একত্রে বসে কয়েক ঘন্টার মধ্যেই তা লিখে দিতে পারবেন। এ অদ্ভুত সংরক্ষণও আল কোরআনেরই বিশেষত্ব এবং এ যে আল্লাহরই কালাম তার অন্যতম উজ্জ্বল প্রমাণ। যেভাবে আল্লাহর সত্তা সর্বযুগে বিদ্যমান থাকবে, তাতে কোন সৃষ্টির হস্তক্ষেপের কোন ক্ষমতা নেই, অনুরূপভাবে তার কালাম সকল সৃষ্টির রদ-বদলের ঊর্ধ্বে এবং সর্বযুগে বিদ্যমান থাকবে। কোরআনের এই ভবিষ্যদ্বানীর সত্যতা বিগত চৌদ্দশত বছরের অভিজ্ঞতা থেকে প্রমাণিত হয়েছে এবং কিয়ামত পর্যন্ত বিদ্যমান থাকবে। এ প্রকাশ্য মু‘জেযার পর কোরআন আল্লাহর কালাম হওয়াতে কোন প্রকার সন্দেহ- সংশয় থাকতে পারে না।
দশম কারণ:
কোরআনে এলম ও জ্ঞানের যে সাগর পুঞ্জীভূত করা হয়েছে, অন্য কোন কিতাবে আজ পর্যন্ত তা করা হয়নি। ভবিষ্যতেও তা হওযার সম্ভাবনা নেই। এই সংক্ষিপ্ত ও সীমিত শব্দসম্ভাবরের মধ্যে এত জ্ঞান ও বিষয়বস'র সমাবেশ ঘটেছে যে, তাতে সমগ্র সৃষ্টির সর্বকালের প্রয়োজন এবং মানবজীবনের প্রত্যেক দিক পরিপূর্ণভাবে আলোচিত হয়েছে। আর বিশ্বপরিচালনার সুন্দরতম নিয়ম এবং ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত জীবন থেকে সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনের নির্ভুল বিধান বর্ণিত হয়েছে। এ ছাড়া মাথার উপরে ও নীচে যত সম্পদ রয়েছে সে সবের প্রসঙ্গ ছাড়াও জীব-বিজ্ঞান, উদ্ভিদ বিজ্ঞান এমনকি রাজনীতি, অর্থনীতি ও সমাজ নীতির সকল দিকের পথনির্দেশ সম্বলিত এমন সমাহার বিশ্বের অণ্য কোন আসামানী কিতাবে দেখা যায় না।
শুধু আপাত: দৃষ্টিতে পথনির্দেশই নয়, এর নমুনা পাওয়া এবং সে সব নির্দেশ একটা জাতির বাস্তব জীবনে অক্ষরে অক্ষরে প্রতিফলিত হয়ে তাদের জীবনধারা এমনকি ধ্যান-ধ্যারণা, অভ্যাস এবং রুচিরও এমন বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধন দুনিয়ার অন্য কোন গ্রনে'র মাধ্যমে সম্ভব হয়েছে এমন নযীর আর একটা খুঁজে পাওয়া যায় না। একটা নিরক্ষর উম্মী জাতিকে জ্ঞানে, রুচিতে, সভ্যতায় ও সংস্কৃতিতে এত অল্পকালের মধ্যে এমন পরিবর্তিত করে দেয়ার নযীরও আর দ্বিতীয়টি নেই।
সংক্ষেপে এই হচ্ছে কোরআনের সেই বিস্ময় সৃষ্টিকারী প্রভাব, যাতে কোরআনকে আল্লাহর কালাম বলে প্রতিটি মানুষ স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে। যাদের বুদ্ধি-বিবেচনা বিদ্বেষের কালিমায় সম্পূর্ণ কলুষিত হয়ে যায়নি, এমন কোন লোকই কোরআনের এ অনন্যসাধারণ মু‘জেযা সর্ম্পকে অকুণ্ঠ স্বীকৃতি প্রদান করতে কার্পণ্য করেনি। যারা কোরআনকে জীবনবিধান হিসাবে গ্রহণ করেনি, এমন অনেক অ-মুসলিম লোকও কোরআনের এ নযীরবিহীন মু‘জেযা কথা স্বীকার করেছেন। ফ্রান্সের বিখ্যাত মণীষী ডঃ মারড্রেসকে ফরাসী সরকারের পক্ষ থেকে কোরআনের বাষট্টিটি সূরা ফরাসী ভাষায় অনুবাদ করার জন্য নিয়োগ করা হয়েছিল। তার স্বীকারোক্তিও এ ব্যাপারে প্রাণিধানযোগ্য। তিনি লিখেছেন- ‘নিশ্চয়ই কোরআনের বর্ণনাভঙ্গি সৃষ্টিকর্তার বর্ণনাভঙ্গিরই স্বাক্ষর। একথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, কোরআনে যেসব তথ্যাদি বর্ণিত হয়েছে, আল্লাহর বাণী ব্যতীত অন্য কোন বাণীতে তা থাকতে পারে না।
এতে সন্দেহ পোষনকারীরাও যখন এর অনন্যাসাধারণ প্রভাব লক্ষ্য করে, তখন তারাও এ কিতাবের সত্যতা স্বীকার বাধ্য হয়। বিশ্বের সর্বত্র শতাধিক কোটি মুলসমান ছড়িয়ে রয়েছে, তাদের মধ্যে কোরআনের বিশেষ প্রভাব দেখে খৃষ্টান মিশনগুলোতে কর্মরত সকলেই একবাক্যে স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে, যেসব মুসলমান কোরআন বুঝে পড়ার সুযোগ লাভ করেছে, তাদের মধ্যে একটি লোকও ধর্মত্যাগী-মুরতাদ হয়নি।
ড. গ্যারি মিলার ছিলেন কানাডার একজন খ্রিষ্ট ধর্ম প্রচারক। তিনি পবিত্র কুরআনের ভুল খোঁজার চেষ্টা করেছিলেন, যাতে ইসলাম ও কুরআন বিরোধী প্রচারণা চালানো সহজ হয়। কিন' ফল হয়েছিল বিপরীত। তিনি বলেন, আমি কোন একদিন কুরআন সংগ্রহ করে তা পড়া শুরু করলাম। প্রথমে ভেবেছিলাম কুরআন নাযিল হয়েছিল আরবের মরুচারীদের মধ্যে। তাই এতে নিশ্চয় মরুভূমি সম্পর্কে কথা থাকবে। কুরআন নাযিল হয়েছিল ১৪০০ বছর আগে। তাই খুব সহজেই এতে অনেক ভুল খুঁজে পাব ও সেসব ভুল মুসলিমদের সামনে তুলে ধরব বলে সংকল্প করেছিলাম। কিন' কয়েক ঘণ্টা ধরে কুরআন পড়ার পরে বুঝলাম আমার এসব ধারণা ঠিক নয়, বরং এমন একটা গ্রনে' অনেক আকর্ষণীয় তথ্য পেলাম। বিশেষ করে সূরা নিসার ৮২ নম্বর আয়াতটি আমাকে গভীর ভাবনায় নিমজ্জিত করে। সেখানে আল্লাহ বলেন, ‘এরা কী লক্ষ্য করে না কুরআনের প্রতি? এটা যদি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও পক্ষ থেকে নাযিল হত, তবে এতে অবশ্যই বহু বৈপরিত্য দেখতে পেত’। খ্রিষ্ট ধর্ম প্রচারক গ্যারি মিলার এভাবে ইসলামের দোষ খুঁজতে গিয়ে মুসলিম হয়ে যান।
তিনি বলেছেন, ‘আমি খুব বিস্মিত হয়েছি যে, কুরআনে ঈসা (আঃ)-এর মাতা মারিয়ামের নামে একটি বড় পরিপূর্ণ সূরা রয়েছে। আর এ সূরায় তাঁর এত ব্যাপক প্রশংসা ও সম্মান করা হয়েছে যে, এত প্রশংসা বাইবেলেও দেখা যায় না। পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন স'ানে বিশ্বনবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর নাম মাত্র ৫ বার এসেছে। কিন' ঈসা (আঃ)-এর নাম এসেছে ২৫ বার। আর এ বিষয়টি ইসলাম ধর্ম গ্রহণের ক্ষেত্রে আমার ওপর ব্যাপক প্রভাব রেখেছে’।
মোট কথা, কোরআনের অনন্য বৈশিষ্ট্য সর্ম্পকে যথাযোগ্য বিস্তারিত আলোচনা সম্ভব না হলেও সংক্ষিপ্তভাবে যতটুকু বলা হলো, এতেই সুস' বিবেকসম্পন্ন ব্যক্তিমাত্রই একথা স্বীকার করতে বাধ্য হবে যে, কোরআন আল্লাহরই কালাম এবং রসূলে মকবুল সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের একটি সর্বশ্রেষ্ঠ মু‘জেযা।
মানব সৃষ্টির শুরু থেকে অর্থ্যাৎ আদি পিতা হযরত আদম (আঃ) থেকে আরম্ভব হয়ে সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী ও রাসূল হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) পর্যন্ত যত কিতাব নাযিল হয়েছে তার মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ কিতাব হল পবিত্র কোরআনুল কারীম। অন্যান্য নবীদের উপর অবর্তীণ কিতাব ও সহীফা গুলোর কার্যকাল ও দিকনিদের্শনা প্রয়োগ হয়েছিল একটি নিদির্ষ্ট সময় কাল পর্যন্ত। কোন কোন কিতাব একটি নির্দিষ্ট জাতী বা কওমের জন্য নির্ধারিত হয়ে নাযিল হয়েছিল। কিন্ত একমাত্র আল কোরআন-ই সমগ্র জাতী এবং আঠার হাজার মাখলুকাত তথা আল্লাহ তা’আলার সকল সৃষ্টিকুলের জন্য নাযিল হয়েছে এবং বর্তমানকাল পর্যন্ত তার কার্যক্রম মানবের মাঝে চলমান আছে; আগামীতে চলমান থাকবে। তাওরাত, ইঞ্জিল ও যাবূর কিতাবের মতো যার মধ্যে কোন সংশোধন-সংস্করণ ও সংযোজন-বিয়োজন নেই। কারণ এই কিতাবটি হল সর্বশ্রেষ্ঠ্য কিতাব; যা নবী হযরত মুহাম্মদ(সাঃ) এর উপর অবর্তীণ হয়েছে এবং যার হেফাজতের দায়িত্ব সয়ং আল্লাহ রাব্বুল আলামীন নিয়েছেন। ফলে কোন কালে তার পরিবর্তন, পরিমার্জন, সংশোধন, সংযোজন-বিয়োজন করা সম্ভব নয়। এই বিষয়ে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সয়ং চ্যালেন্স করে সূরা বাকারাহ এর ২৩ নং আয়াতের মাধ্যমে বলেছেন“এতদ সর্ম্পকে যদি তোমাদের কোন সন্দেহ থাকে যা আমি আমার বান্দার প্রতি অবর্তীণ করেছি। তাহলে এর মতো একটি সূরা রচনা করে নিয়ে আস। তোমাদের সে সব সাহায়্যকারীদেরকে ও সঙ্গে নাও- আল্লাহ কে ছাড়া, যদি তোমরা সত্যবাদী হয়ে থাক।”
পবিত্র আল কোরআন হল-সমগ্র সৃষ্টি কূলের সংবিধান। যার মধ্যে নিহিত রয়েছে জীবন পরিচালনা ও জীবিকা আহরণের সকল কর্ম-পদ্ধতি এবং নিয়ম-কানুন। বিশেষ করে মানব জাতির আলোকবর্তিকা হিসেবে যুগ-যুগান্তর সত্যর আলো বিচ্ছরিত করে মানব সত্তাকে সর্বময় জাগ্রত রাখবে; যাতে কোন ইবলিস সত্তা কাউকে বশ করে অন্ধকার পথে পরিচালিত করতে না পারে। সত্যানুসন্ধানীদের জ্ঞান অর্জনের ঠিকানা এবং পৃথিবীসহ সকল গ্রহ, উপ-গ্রহ এবং নক্ষত্রের গতি-বিধির সকল সূত্র যার মধ্যে নিহিত রয়েছে। জ্ঞান-বিজ্ঞানের সূতিকাঘর হিসেবে যার সূ-খ্যাতি আছে। জ্ঞানী,গুণি,সাধক,বুদ্ধিজীবিদের জন্য গবেষণার কেন্দ্রবৃন্দ হল: এই মহাগ্রন' আল-কোরআন। পৃথিবীতে যত গ্রন'-ই রচিত হয়েছে; তার মধ্যে আল-কোরআন ব্যতিত কোন গ্রন'-ই পরিপূর্ণ গ্রন' হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে নি। প্রত্যেকটি গ্রনে'র মধ্যে ভুল-ক্রর্টি সন্ধান পাওয়া গেলেও আল-কোরআনের মধ্যে কোন কালে কেউ কোন ভুল ক্রুটির সন্ধার করতে পারে নি এবং তার মধ্যে ভুল খুঁজতে গিয়ে জ্ঞানীর জ্ঞান শেষ হয়ে যাবে কিন্ত ভুল পাওয়া সম্ভব হবে না; তার কারণ এই মহা-গ্রন'টি রচনা করেছেন মহাজ্ঞানী আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন সয়ং।
আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন প্রত্যেক নবী ও রাসূলকে কিছু অলৌকিক ক্ষমতা প্রদান করেছেন। হযরত সোলায়মান (আঃ) সকল জীবের ভাষা বুঝতেন এবং তাদের সাথে কথা বলতে পারতেন- এটা ছিল সোলায়মান (আঃ) এর মু‘জেযা। হযরত মূসা (আঃ) এর হাতে লাঠি ছিল; যার দ্বারা তিনি বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কাজ করতে পারতেন। ফেরাউন যখন হযরত মূসা (আঃ)সহ তার কাওমের লোকদেরকে সৈন্য বাহিনী নিয়ে তিন দিক থেকে ঘেরাও করে ফেলে তখন তিনি তার হাতের লাঠি দ্বারা নীল নদের আঘাত করেন এবং আঘাত করার সাথে সাথে নদীর মাঝখান দিয়ে রাস্তা হয়ে যায় এবং তিনি তার অনুসারীদের নিয়ে নিরাপদে নদী পার হতে সক্ষম হয়। ফেরাউন সকল দল-বল ও সৈন্য সামন্ত নিয়ে ডুবে মরে। এখানে হযরত মূসা (আঃ) এর হাতের লাঠিটি ছিল মু‘জেযার নিদর্শন স্বরূপ। এভাবে প্রত্যেকটি নবী ও রাসূলগণ আল্লাহ রাব্বুল আলামীন থেকে অসাধারণ ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন; যার মাধ্যমে মানুষকে আল্লাহর পথে ডেকে আনার জন্য কিছু নির্দশন প্রকাশ করতেন। এভাবে নবী ও রাসূলের যুগের পরে সাধারণ মানুষকে সত্যর পথে পরিচালিত করে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের যিকর কে পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠা করে রাখার জন্য অলী এবং আওলীয়াদেরকে কিছু অলৌকিক ক্ষমতা প্রদান করেন যাকে কেরামত বলে। বাংলার বুকে অনেক অলী ও আওলীদের আগমন ঘটেছে। হযরত শাহ্ জালাল, হযরত শাহ্ পরান, হযরত খান জাহান আলী, নুর-নগরী, বন্দীশাহী, সোবহান শাহ আলকাদরী, মনোহর আলী শাহ্, আপ্তাব উদ্দিন শাহ্, শাহ্ ঈসরাইল, জিয়া উদ্দিন শাহ্, আমানত শাহ্, বায়েদিত বোস্তামিন,নিযাম উদ্দিন, সাহেব খাসহ বিভিন্ন অলী ও আওলীয়ারা বিভিন্ন স'ানে আস্তানা করে মানুষকে আল্লাহ্ আল্লাহর পথে ডেকেছেন এবং বিভিন্ন সময় অলৌকিক ঘটনা প্রদর্শন করে আস'া অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন। আজও মানুষ তাদের অলৌকিক ঘটনাকে গল্পের মতো বলে বেড়ান এবং শ্রদ্ধার সঙ্গে তাদের নাম উচ্চারণ করেন।
আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীনের পেয়ারে হাবীব, দু’জাহানের বাদশা,সৃষ্টিকুলের শিরমণি, আঠার হাজার মাখলুকাতের জন্য রহমতস্বরূপ প্রেরিত মহা-মানব, সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী ও রাসূল হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)কে অনেক অলৌকিক ক্ষমতা প্রদান করেছেন; যা মু‘জেযা হিসেবে স্বীকৃত। তার মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ মু’জেযা হল: আল-কোরআন।
পৃথিবীর সৃষ্টির রহস্য ও মানব সৃষ্টির রহস্য এবং মানব সম্প্রদায়ের ইহকালের করণীয়, পরকালের মুক্তির নির্দেশিকার ব্যাখ্যা- বিশ্লেষণ রয়েছে।
তাছাড়া আল্লাহ তা’আলা অনুগ্রহ করে ও দয়া বশত: পরীক্ষার প্রশ্নপত্র পূর্বে-ই রাসূল্লাহ (সাঃ) এর মাধ্যমে উম্মতের কাছে প্রকাশ করে দিয়েছেন। এখন এসব প্রশ্নের সমাধান শিক্ষা করাই উম্মতের কাজ। পরীক্ষার পূর্বে প্রশ্নপত্র প্রকাশ করে দেওয়ার পরও যদি কেউ ফেল করে, তবে এর চাইতে দুর্ভাগ্য আর কি হতে পারে?
প্রশ্নপত্র সর্ম্পকে রাসূল (সাঃ) বলেন-“ হাশরের ময়দানে কোন ব্যক্তির পদযুগল ততক্ষণ পর্যন্ত সামনে অগ্রসর হতে পারবে না, যতক্ষণ না তার কাছ থেকে পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর নেয়া হয়। প্রথম এই যে, সে জীবনের সুদীর্ঘ ও প্রচুর সংখ্যক দিবারাত্র কে কি কাজে ব্যয় করেছে? দ্বিতীয় এই যে বিশেষ ভাবে কর্মক্ষম যৌবনকালকে সে কিভাবে অতিবাহিত করেছে? তৃতীয় এই যে, অর্থকড়ি কোন (হালাল এবং হারাম) পথে উপার্জন করেছে? চতুর্থ এই যে, অর্থকড়িতে সে কোন (জায়েয কিংবা নাজায়েয) কাজে ব্যয় করেছে? পঞ্চম এই যে, নিজ এলম অনুযায়ী সে কি আমল করেছে?
জাদু ও মু’জেযার পার্থক্য ঃ-
পয়গম্বরদের মু’জেযা ও ওলীদের কারামত দ্বারা যেমন অস্বাভাবিক ও অলৌকিক ঘটনাবলী প্রকাশ পায়, জাদুর মাধ্যমেও তেমনি প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যায়। ফলে মুর্খ লোকেরা বিভ্রান্তিতে পতিত হয়ে জাদুকরদেরকেও সম্মানীত ও শ্রদ্বার পাত্র মনে করে থাকে। তাই জাদু ও মু’জেযার মধ্যে পার্থক্য জানা প্রয়োজন। প্রকৃত সত্তার দিক দিয়ে এবং বাহ্যিক প্রতিক্রিয়ার দিক দিয়ে এতদুভয়ের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
সত্তার পার্থক্য এই যে, জাদুর প্রভাবে সৃষ্ট ঘটনাবলী ও কারণের আওতাবহির্ভূত নয়। পার্থক্য শুধু কারণটি দৃশ্য কিংবা অদৃশ্য হওয়ার মধ্যে। যেখানে কারণ দৃশ্যমান, সেখানে ঘটনাকে কারণের সাথে সম্পৃক্ত করে দেয়া হয় এবং ঘটনাকে মোটেই বিষ্ময়কর মনে করা হয় না।কিন্ত যেখানে কারণ অদৃশ্য, সেখানেই ঘটনাকে অদ্ভুত ও আর্শ্চযজন মনে করা হয়। সাধারণ লোক ‘কারণ’ না জানার ফলে এ ধরনের ঘটনাকে অলৌকিক মনে করতে থাকে। অথচ বাস্তবে তা অন্যান্য অলৌকিক ঘটনারই মতো। কোন দূরপ্রাচ্য থেকে কোন জিনিস হঠাৎ সামনে পড়লে দর্শকমাত্রই সেটাকে অলৌকিক বলে আখ্যায়িত করবে। মূলত জ্বিন ও শয়তানরা এ জাতীয় কাজের ক্ষমতা প্রাপ্ত হয়েছে।
মোট কথা এই যে, জাদুর প্রভাবে দৃষ্ট ঘটনাবলী ও প্রাকৃতিক কারণের অধীন। তবে, কারণ অদৃশ্য হওয়ার ফলে মানুষ অলৌকিকতার বিভ্রান্তিতে পতিত হয়।
মু‘জেযাঃ-
মু‘জেযার অবস'া এর বিপরীত। মু‘জেযা প্রত্যক্ষভাবে আল্লাহ তা’আলার কাজ। এতে প্রাকৃতিক কারণের কোন হাত নেই। ইবরাহীম (আঃ) এর জন্য নমরূদের জ্বালানো আগুণকে আল্লাহ্ তা’আলাই আদেশ করেছিলেন,“ ইবরাহীমের জন্য সুশীতল হয়ে যাও। কিন্ত এতটুকু শীতল নয় যে, ইবরাহীম কষ্ট অনুভব করে। আল্লাহর এই আদেশের ফলে আগুণ শীতল হয়ে যায়।”
ইদানিং কোন কোন লোক শরীরে ভেষজ প্রয়োগ করে আগুণের ভেতরে চলে যায়। এটা মু‘জেযা নয়; বরং ভেষজের প্রতিক্রিয়া। তবে এখানে ভেষজটি অদৃশ্য, তাই মানুষ এই ঘটনাকে অলৌকিক বলে ধোকা খায়।
আবার এমন কিছু ভেষজ রয়েছে যা শীত কালে যদি কোন মানুষ তার শরীরে মাখে, তখন তার শরীর থেকে ঘাম বের হতে থাকবে। য অনেক সময় ভন্ডরা শরীরে প্রয়োগ করে কেরামত দেখানোর বৃথা চেষ্টা করে নিজেকে কামেল বা ওলী হিসেবে আত্মপরিচয় ফুটিয়ে তুলতে চেষ্টা করে। কন কনে শীতের মধ্যে শরীর থেকে ঘাম ঝড়তে দেখলে তাজ্জব হয়ে যায় আর মনে প্রাণে মেনে নেয় যে- এই মানুষ কোন সাধারণ মানুষ নয়, অথচ এখানে অদৃশ্য ভেষজ ঔষধের গুণে শীতের মাঝে শরীর থেকে ঘাম বের হচ্ছে।
স্বয়ং কোরআনের বর্ণনা দ্বারা বুঝা যায় যে, মু‘জেযা সরাসরি আল্লাহর কাজ। বলা হয়েছে- আপনি যে এক মুষ্টি কঙ্কর নিক্ষেপ করেছিলেন, প্রকৃতপক্ষে তা আপনি নিক্ষেপ করেননি, আল্লাহ্ নিক্ষেপ করেছিলেন। অর্থ্যাৎ এক মুষ্টি কঙ্কর- যে সমবেত সবার চোখে পৌঁছে গেল, এতে আপনার কোন হাত ছিল না। এটা ছিল একান্তভাবেই আল্লাহর কাজ। এই মু‘জেযাটি বদর যুদ্ধে সংঘটিত হয়েছিল।
রাসূল্লাহ (সাঃ) একমুষ্টি কঙ্কর কাফের বাহিনীর প্রতি নিক্ষেপ করেছিলেন যা সবার চোখেই পড়েছিল। (তফসীর মাআরেফুল কোরান পৃষ্টা-৫২)
মু‘জেযা প্রাকৃতিক কারণ ছাড়াই সরাসরি আল্লাহ্র কাজ আর জাদু অদৃশ্য প্রাকৃতিক কারণের প্রভাব। এই প্রার্থক্যটি-ই মু‘জেযা ও জাদুর স্বরূপ বোঝার পক্ষে যথেষ্ট। কিন্ত তা সত্ত্বেও এখানে একটি প্রশ্ন থেকে যায় যে, সাধারণ মানুষএই পার্থক্যটি কিভাবে বুঝবে? কারণ, বাহ্যিক রূপ উভয়েরই এক। এই প্রশ্নের উত্তর এই যে, সাধারণ লোকদের বোঝার জন্যেও আল্লাহ্ তা’আলা কয়েকটি পার্থক্য প্রকাশ করেছেন।
প্রথমতঃ মু‘জেযা ও কারামত এমন ব্যক্তিবর্গের দ্বারা প্রকাশ পায় যাদের খোদাভীতি,পবিত্রতা, চরিত্র ও কাজ কর্ম সবার দৃষ্টির সামনে থাকে। পক্ষান্তরে জাদু তারাই প্রদর্শন করে, যারা নোংরা,অপবিত্র এবং আল্লাহর যিক্র থেকে দূরে থাকে। এসব বিষয় চোখে দেখে প্রত্যেকেই মু‘জেযা ও জাদুর প্রার্থক্য বুঝতে পারে।
দ্বিতীয়ত ঃ- আল্লাহ্র চিরাচরিত্র রীতি এই যে, যে ব্যক্তি মু‘জেযা ও নবুওত দাবী করে জাদু করতে চায়; তার জাদু প্রতিষ্ঠা লাভ করতে পারে না। অবশ্য নবুওয়াতের দাবী ছাড়া জাদু করতে তা প্রতিষ্ঠা লাভ করে।
কোরআনুল করীম রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর সর্বশ্রেষ্ঠ মু‘জেযা
রাসূল (সাঃ) এর মু‘জেযার তো কোন শেষ নেই এবং প্রত্যেকটিই মু‘জেযাই অত্যন্ত বিষ্ময়কর। কিন্ত তা সত্ত্বেও এ স'লে তার জ্ঞান ও বিদ্যার মু‘জেযা অর্থ্যাৎ কোরআনের বর্ণনায় সীমাবদ্ধ রেখে ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে যে,তার সর্বশ্রেষ্ঠ মু‘জেযা হচ্ছে কোরআন এবং এ মু‘জেযা অন্যান্য নবী রাসূলগণের সাধারণ মু‘জেযা অপেক্ষা স্বতন্ত্র। কেননা, আল্লাহ তা’আলা তার অপার কুদরতে রসূল প্রেরণের সাথে সাথে কিছু মু‘জেযা প্রকাশ করেন। আর এসব মু‘জেযা সে সমস্ত রসূলের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে, যে গুলো তাদের জীবন কাল পর্যন্তই শেষ হয়ে গেছে। কিন্ত কোরআনই এমন এক বিচিত্র মু‘জেযা যা কেয়ামত পর্যন্ত থাকবে।
কোরআন একটি গতিশীল ও কেয়ামত পর্যন্ত স'ায়ী মু‘জেযা ঃ-
অন্যান্য সমস্ত নবী ও রসূলগণের মু‘জেযাসমুহ তাদের জীবন পর্যন্তই মু‘জেযা ছিল অথবা কোন প্রেক্ষাপট অনুযায়ী তার সীমাবদ্ধতা থেকেছে; যতক্ষণ তার প্রয়োজন ছিল কিন্ত কোরআনের মু‘জেযা হুযুর (সাঃ) এর তিরোধানের পরও পূর্বের মতোই মু‘জেযা সূলভ বেশিষ্ট্যসহ-ই বিদ্যমান রয়েছে। আজ পর্যন্ত একজন সাধারণ মুসলমান দুনিয়ার যে কোন জ্ঞানী-গুণি ও বুদ্ধিজীবিকে চ্যালেঞ্জ করে বলতে পারে যে, কোরআনের সমতূল্য কোন আয়াত ইতিপূর্বে কেউ তৈরী করতে পারে নি; এখনো কেউ পারবে না আর ভবিষ্যৎতে পারবে না। সুতরাং কোরআনের রচনাশৈলী যার নমুনা আর কোন কালেই কোন জাতি পেশ করতে পারে নি, সেটাও একটি গতিশিল দীর্ঘস'ায়ী মু‘জেযা। হুযুরের যুগে যেমন এর নযীর পেশ করা যায় নি, অনুরূপভাবে আজও তা কেউ পেশ করতে পারেনি, ভবিষ্যতেও কারো দ্বারা সম্ভব হবে না। উপরোক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে এ বিষয়টি পরিষ্কার হওযার প্রয়োজন যে, কিসের ভিত্তিতে কোরআনকে হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের সর্বপেক্ষা বড় মু‘জেযা বলা হয়? আর কি কারণে কোরআন শরীফ সর্বযুগে অনন্য ও অপরাজেয় এবং সারা বিশ্ববাসী কেন এর নযীর পেশ করতে অক্ষম।
মুসলমানদের দাবী যে, চৌদ্দশত বৎসরের এ দীর্ঘ সময়ের মধ্যে কোরআনের এ চ্যালেঞ্জ সত্বেও কেউ কোরআনের বা এর একটি সূরার অনুরূপ কোন রচনাও পেশ করতে পারেনি ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে এ দাবীর যথার্থতা কতটুকু এ দুটি বিষয়ই দীর্ঘ আলোচনা সাপেক্ষ।
কোরআনের মু‘েজেযা হওয়ার অন্যান্য কারণসমূহ ঃ-
প্রথম কথা হচ্ছে যে, কোরআন কে মু‘জেযা বলে অভিহিত করা হলো কেন, আর কি কি কারণে সারা বিশ্ব এর নযীর পেশ করতে অপারগী হয়েছে। এ বিষয়ে প্রাচীন কাল থেকে আলেমগণ বহু গ্রন' রচনা করেছেন এবং প্রত্যেক মুফাসসিরই স্ব স্ব বর্ণনা ভঙ্গিতে এর বিবরণ দিয়েছে। এখানে অতি সংক্ষেপে কয়েকটি প্রয়োজনীয় বিষয় বর্ণনা করা হল। সর্ব প্রথম লক্ষণীয় বিষয় এই যে, এ আশ্বর্য এবং সর্ববিধ জ্ঞানের আধার মহান গ্রন'টি কোন পরিবেশে এবং কার উপর অবর্তীণ হয়েছিল। আরো লক্ষ্য করার বিষয় হচ্ছে যে, সে যুগের সমাজ পরিবেশে কি এমন কিছু জ্ঞানের উপকরণ বিদ্যমান ছিল, যার দ্বারা এমন পূণাঙ্গ একটি গ্রন' রচিত হতে পারে, যাতে সৃষ্টির আদি থেকে অন্ত পর্যন্ত সর্ববিধ জ্ঞান-বিজ্ঞানের যাবতীয় উপকরণ সন্নিবেশিত করা স্বাভাবিক হতে পারে? সমগ্র মানব সমাজের ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত জীবনের সকল দিক সম্বতি নির্ভূল পথ-নির্দেশ এ গ্রনে' সন্নিবেশিত করার মতো কোন সূত্রের সন্ধান কি সে যুগের জ্ঞান ভান্ডারে বিদ্যামান ছিল, যা দ্বারা মানুষের দৈহিক ও আত্মিক উভয় দিকেরই সুষ্ঠ বিকাশের বিধানাবলী থেকে শুরু করে পারিবারিক নিয়ম শৃংখলা সমাজ সংগঠন ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস'াপনা তথা দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রেও সর্বোত্তম ও সর্বযুগে সমভাবে প্রজোয্য আইন-কানুন বিদ্যমান থাকতে পারে?
যে ভূ-খন্ডে এবং যে মহান ব্যক্তির প্রতি এ গ্রন' অবতীর্ণ হয়েছে, এর ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিক অবস'া জানতে গেলে সাক্ষাৎ ঘটবে এমন একটা ঊষর শুষ্ক মরুময় এলাকার সাথে যা ছিল বাত্হা বা মক্কা নামে পরিচিত। যে এলাকার ভূমি না ছিল শিল্প। আবহাওয়া এমন স্বাস'্যকর ছিল না, যা কোন বিদেশী পর্যটককে আকৃষ্ট করতে পারে। রাস্তা-ঘাটও এমন ছিল না যেখানে সহজে যাতায়াত করা যায়। সেটি ছিল অবশিষ্ট দুনিয়া থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন এমন একটি মরুময় উপদ্বীপ, যেখানে শুষ্ক পাহাড়-পর্বত এবং ধূ-ধূ বালুকাময় প্রান্তর ছাড়া আর কিছুই নজরে পড়তো না। কোন জনবসতি বা বৃক্ষলতার অস্তিত্বও বড় একটা দেখা যেত না।
এ বিরাট ভূ-ভাগটির মধ্যে কোন উল্লেখযোগ্য শহরের ও অস্তিত্ব ছিল না। মাঝে মাঝে ছোট ছোট গ্রাম এবং তার মধ্যে উট-ছাগল প্রতিপালন করে জীবন ধারণকারী কিছু মানুষ বসবাস করতো। ছোট ছোট গ্রাম গুলো তো দূরের কথা। নামে মাত্র যে কয়টি শহর ছিল, সে গুলোতে লেখা পড়ার কোন চর্চা ছিল না। না ছিল কোন স্কুল কলেজ, না ছিল কোন বিশ্ববিদ্যালয়। শুধুমাত্র ঐতিহ্যগত ভাবে আল্লাহ তা’আলা তাদেরকে এমন একটা সু সমৃদ্ধ ভাষা সম্পদ দান করেছিলেন, েভাষা গদ্য ও পদ্য বাক-রীতিতে ছিল অনন্য। আকাশের মেঘ-গর্জনের মতো সে ভাষার মাধূরী অপূর্ব সাহিত্যরসে সিক্ত হয়ে তাদের মুখ থেকে বেরিয়ে আসতো। অপূর্ব রসময় কাব্যসম্ভার বৃষ্টিধারার মতো আবৃত হতো পথে-প্রান্তরে। এ সম্পদ ছিল এমনি এক বিষ্ময় আজ পর্যন্তও যার রসাস্বাদন করতে গিয়ে যে কোন সাহিত্য প্রতিভা হতবাক হয়ে যায়। কিন্ত এটি ছিল তাদের স্বভাবজাত এক সাধারণ উত্তরাধিকার। কোন মক্তব মাদরাসার মাধ্যমে এ ভাষা জ্ঞান অর্জন করা রীতি ছিল না। অধিবাসিদের মধ্যে এ ধরনের কোন আগ্রহও পরিলক্ষিত হতো না। যারা শহরে বাস করতো , তাদের জীবিকার প্রধান অবলম্বন ছিল ব্যবসা-বাণিজ্য। পন্যসামগ্রী একস'ান থেকে অন্যস'ানে আমদানী -রপ্তানীই ছিল তাদের একমাত্র পেশা।
সে দেশেই সর্বপ্রাচীন শহর মক্কার এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে সে মহান ব্যক্তিত্বের আবির্ভাব, যার প্রতি আল্লাহর পবিত্রতম কিতাব কোরআন নাযিল করা হয়। প্রসঙ্গত: সে মহামানবের অবস'া সর্ম্পকে ও কিছুটা আলোচনা করা যাক।
ভূমিষ্ট হওয়ার আগেই তিনি পিতৃহারা হন, জন্মগ্রহনের পর মা’কে হারিয়ে এতিম হয়ে যান। মাত্র সাত বছর বয়সেই মাতৃবিয়োগ ঘটে। পিতৃ-মাতৃহীন অবস'ায় নিতান্ত কঠোর দারিদ্র্যের মাঝে লালিত-পালিত হন। যদি তখনকার মক্কায় লেখা পড়ার চর্চা থাকতো তুবও কঠোর দারিদ্র্যপূর্ণ জীবনে লেখাপড়া করার কোন সুযোগ গ্রহন করা তার পক্ষে কোন অবস'াতেই সম্ভব হতো না, আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, তদানিন্তন আরবে লেখাপড়ার কোন চর্চা ছিল না, যে জন্য আরব জাতিকে উম্মী তথা নিরক্ষর জাতি বলা হতো। কোরআন পাকেও এ জাতিকে উম্মী জাতি নামে উল্লেখ করা হয়েছে। এ অবস'ার পরিপ্রেক্ষিতেই সে মহান ব্যক্তি বাল্যকাল থেকেই সব ধরনের লেখাপড়া থেকে সর্র্ম্পূণ সর্ম্পকহীন ছিল। সে দেশে তখন এমন কোন জ্ঞানী ব্যক্তির অস্তিত্ব ছিল না যার সাহচর্যে থেকে এমন কোন জ্ঞান-সূত্রের সন্ধান পাওয়া সম্ভব হতো, যে জ্ঞান কোরআন পাকের মাধ্যমে পরিবেশন করা হয়েছে। সেহেতু একটা অনন্য সাধারণ মু‘জেযা প্রদর্শনিই ছিল আল্লাহ তা’আলার উদ্দেশ্য। মামুলী একটু অক্ষর জ্ঞান যা দুনিয়ার যে কোন এলাকার লোকই কোন না কোন উপায়ে আয়ত্ব করতে পারে, তাও আয়ত্ব করার কোন সুযোগ তার জীবনে হয়ে উঠেনি। অদৃশ্য শক্তির বিশেষ ব্যবস'াতেই তিনি এমন নিরক্ষর উম্মী রয়ে গেলেন যে, নিজের নাম টুকু পর্যন্ত দস্তখত করতে শেখেননি। তৎকালীন আরবের সর্বপেক্ষা জনপ্রিয় বিষয় ছিল কাব্য-চর্চা। স'ানে স'ানে কবিদের জলসা-মজলিস বসতো। এসব মজলিসে অংশগ্রহণকারী চারণ ও স্বভাব কবিগণের মধ্যে পারস্পরিক প্রতিযোগিতা হতো। প্রত্যেকেই উত্তম কাব্য রচনা করে প্রাধান্য অর্জন করার চেষ্টা করতো। কিন্ত তাকে আল্লাহ তা’আলা এমন রুচি দান করেছিলেন যে, কোনদিন তিনি এ ধরনের কবি জলসায় শরীক হননি। জীবনেও কখনো একছত্র কবিতা রচনা করার চেষ্টা করেননি।
উম্মী হওয়া সত্তেবও ভদ্রতা-নম্রতা, চরিত্রমাধূর্য অত্যন্ত প্রখর ধীশক্তি এবং সত্যবাদিতা ও আমানতদারীর অসাধারণ গুন বাক্যকাল থেকেই তার মধ্যে পরিলক্ষিত হতো, ফলে আরবের ক্ষমতাদর্পী বড়লোকগুলো তাকেই শ্রদ্ধা ও সম্মানের চোখে দেখতো এবং সমগ্র মক্কা নগরীতে তাকে আল-আমিন বলে অভিহিত করা হতো।
এ নিরক্ষর ব্যক্তি চল্লিশ বছর বয়স পর্যন্ত মক্কা নগরীতে অবস'ান করেছেন। ভিন্ন কোন দেশে ভ্রমণেও যাননি। যদিও এমন কোন ভ্রমনে যেতেন, তবুও ধরে নেয়া যেত যে, তিনি সেসব সফরে অভিজ্ঞতা ও বিদ্যার্জন করেছেন। মাত্র সিরিয়ার দুটি বাণিজ্যিক সফর করেছেন। যাতে তার কোন কর্তৃত্ব ছিল না। তিনি দীর্ঘ চল্লিশ বছর পর্যন্ত মক্কায় এমন ভাবে জীবযাপন করেছেন যে, কোন পুস্তক বা লেখনী কবিতা বা ছড়াও রচনা করেননি। ঠিক চল্লিশ বছর বয়সে তার মুখ থেকে যে বাণী নি:সৃত হতে লাগল, যাকে কোরআন বলা হয়। যা শাব্দিক ও অর্থের গুণগত দিক দিয়ে মানুষকে স্তম্ভিত করতো। সুস' বিবেকবান লোকদের জন্য কোরআনের এ গুণগত মান মু‘জেযা হওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল। কিন্ত তাতে তো শেষ নয়। বরং এ কোরআন বিশ্ববাসীকে বারংবার চ্যালেঞ্জ সহকারে আহবান করেছে যে, যদি একে আল্লাহর কালাম বলে বিশ্বাস করতে তোমাদের কোন সন্দেহ থাকে, তবে এর নযীর পেশ করে দেখাও।
একদিকে কোরআনের আহবান অপর দিকে সমগ্র বিশ্বের বিরোধী শক্তি যা ইসলাম ও ইসলামের নবীকে ধ্বংস করার জন্য স্বীয় জান-মাল, শক্তি-সামর্থ ও মান-ইয্যত তথা সবকিছু নিয়োজিত করে দিন-রাত চেষ্টা করছিল। কিন্ত এ সামান্য চ্যালেঞ্জর সম্মুখীন হতে কেউ সাহস করেনি। ধরে নেয়া যাক, এ গ্রন' যদি অদ্বিতীয় ও অনন্য সাধারণ নাও হতো, তবু একজন ঊম্মী লোকের মুখে এর প্রকাশই কোরআন কে অপরাজেয় বলে বিবেচনা করতে যে কোন সুস'বিবেক সম্পন্ন লোকই বাধ্য হতো। কেননা, একজন উম্মী লোকের পক্ষে এমন একটা গ্রন' রচনা করতে পারা কোন সাধারণ ঘটনা বলে চিন্তা করা যায় না।
দ্বিতীয় কারণঃ-
পবিত্র কোরআন ও কোরআনের নির্দেশাবলী সমগ্র বিশ্ববাসীর জন্য অবর্তীণ হয়েছে। কিন্ত এর প্রথম সম্বোধন ছিল প্রত্যক্ষভাবে আরব জনগণের প্রতি। যাদের জন্য কোন জ্ঞান না থাকলেও ভাষা শৈলীর উপর ছিল অসাধারণ বুৎপত্তি। এদিক দিয়ে আরবরা সারা বিশ্বে এক শ্রেষ্ঠ স'ান অধিকার করেছিল। কোরআন তাদেরকে লক্ষ্যে করেই চ্যালেঞ্জ করেছে যে, কোরআন যে আল্লাহর কালাম তাতে যদি তোমরা সন্দিহান হয়ে থাক, তবে তোমরা এর অনুরূপ একটি সাধারণ সূরা রচনা করে দেখাও।
যদি আল কোরআনের এ চ্যালেঞ্জ শুধু এর অর্ন্তগত গুন,নীতি, শিক্ষাগত তথ্য এবং নিগুঢ় তত্ত্ব পর্যন্ত সীমাবদ্ধ রাখা হতো, তবে হয়তো এ উম্মী জাতির পক্ষে কোন অজুহাত পেশ করা যুক্তি সঙ্গত হতে পারতো,কিন্ত ব্যাপার তা নয়, বরং রচনা-শৈলীর আঙ্গিক ও সর্ম্পকে এতে বিশ্ববাসীকে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে। এ চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করার জন্য অন্যান্য জাতির চাইতে আরববাসীরাই ছিল বেশি উপযুক্ত। যদি এ কালাম মানব ক্ষমতার উর্ধ্বে কোন অলৌকি শক্তির রচনা না হতো, তবে অসাধারণ ভাষাজ্ঞান সম্পন্ন আরবদের পক্ষে এর মোকাবেলা কোন মতেই অসম্ভব হতো না, বরং এর চাইতেও উন্নত মানের কালাম তৈরি করা তাদের পক্ষে সহজ ছিল। দু’একজনের পক্ষে তা সম্ভব না হলে, কোরআন তাদেরকে সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এমনটি রচনা করারও সুযোগ দিয়েছিল। তা সত্ত্বেও সমগ্র আরববাসী একেবারে নিশ্চুপ রয়ে গেল কয়েকটি বাক্যও তৈরী করতে পারলো না।
আরবের নেতৃস'ানীয় লোকগুলো কোরআন ও ইসলাম সর্ম্পূণ উৎখাত এবং রাসূল (সাঃ) কে পরাজিত করার জন্য যেভাবে সর্বশক্তি নিয়োগ করেছিল, তা শিক্ষিত লোকমাত্র-ই অবগত।
প্রাথমিক অবস'ায় হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) এর স্বল্প সংখ্যক অনুসারীর প্রতি নানা উৎপীড়নের মাধ্যমে ইসলাম থেকে সরিয়ে আনার চেষ্টা করেছিল। কিন্ত এতে ব্যর্থ হয়ে তারা তোষামোদের পথ ধরলো। আরবের বড় সরদার ওতবা ইবনে রাবীয়া সকলের প্রতিনিধিরূপে হুযুর (সাঃ) এর দরবারে উপসি'ত হয়ে নিবেদন করলো, আপনি ইসলাম প্রচার থেকে বিরত থাকুন। আপনাকে সমগ্র আরবের ধন-সম্পদ, রাজত্ব এবং সুন্দরী মেয়ে দান করা হবে এবং তুমি যা চাইবে; আমরা তার ব্যবস'া করে দিব। তিনি এর উত্তরে কোরআনের কয়েকটি আয়াত পাঠ করে শোনালেন। ফলে তারা এ প্রচেষ্টা সফল না হওয়ায় তারা যুদ্ধের জন্য প্রস'ত হল। হিজরতের পূর্বেও পরে সর্বশক্তি নিয়োগ করে যুদ্ধে অবর্তীণ হলো। কিন্ত কেউই কোরআনের চ্যালেঞ্জ গ্রহন করতে অগ্রসর হল না-তারা কোরআনের অনুরূপ একটি সুরা এমনকি কয়েকটি ছত্রও তৈরী করতে পারল না। ভাষাশৈলী ও পান্ডিত্বের মাধ্যমে কোরআনের মোকাবেলা করার ব্যাপারে আরবদের এহেন নীরবতাই প্রমাণ করে যে, কোরআন মানবরচিত গ্রন' নয় বরং তা আল্লাহরই কালাম। মানুষ তো দূরের কথা,সমগ্র সৃষ্টিজগত মিলেও এ কালামের মোকাবেলা করতে পারে নাই, কোন দিনই পারবে না।
আবরবাসীরা যে এ ব্যাপারে শুধু নির্বাকই রয়েছে তাই নয়, তাদের একান্ত আলোচনায় এরূপ মন্তব্য করেছে যে, এ কিতাব কোন মানুষের রচনা হতে পারে না। আরবদের মধ্যে যাদের কিছুটা সুস'্য বিবেক ছিল তারা শুধু মুখেই একথা প্রকাশ করেনি, এরূপ স্বীকৃতির সাথে সাথে স্বত:স্ফূর্তভাবে অনেকেই ইসলাম গ্রহণও করেছে। আবার কেউ কেউ পৈত্রিক ধর্মের প্রতি অন্ধ আবেগের কারণে অথবা বনী-আব্দে মনাফের প্রতি বিদ্বেষবশত: কোরআনকে আল্লাহর কালাম বলে স্বীকার করেও ইসলাম গ্রহণ থেকে বিরত হয়েছে।
কুরাইশদের ইতিহাসই সে সমস্ত ঘটনার সাক্ষী। তারই মধ্য থেকে এখানে কয়েকটি ঘটনার উল্লেখ করা হচ্ছে, যাতে অতি সহজে বুঝা যাবে যে, সমগ্র আরববাসী কোরআনকে অদ্বিতীয় ও নযীরবিহীন কালাম বলে স্বীকার করেছে এবং এর নযীর পেশ করার ব্যর্থ প্রচেষ্টায় অবতীর্ণ হওয়ার ঝুঁকি নিয়ে সচেতনভাবে বিরত হয়েছে।
রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এবং কোরআন নাযিলের কথা মক্কার গন্ডী ছাড়িয়ে হেজাযের অন্যান্য এলাকায় ছড়িয়ে পড়ার পর বিরুদ্ববাদীদের অন্তরে এরূপ সংশয়ের সৃষ্টি হলো যে, আসন্ন হজ্জের মওসুমে আরবের বিভিন্ন এলাকা থেকে হাজীগণ যখন মক্কায় আগমন করবে, তখন তারা রসূল (সা:) এর কথাবার্তা শুনে প্রভাবান্বিত না হয়ে পারবে না। এমতাবস'ায় এরূপ সম্ভাবনার পথ রুদ্ধ করার পন'া নিরূপণ সভার আয়োজন করলো। এ বৈঠকে আবের বিশিষ্ট সরদারগণও উপসি'ত ছিলেন। তাদের মধ্যে ওলীদ ইবনে মুগীরা বয়সে ও বিচক্ষণতায় ছিলেন শীর্ষস'ানীয়। সবাই তার নিকট সমস্যার কথা উত্থাপন করলো। তারা বললো, এখন চারদিক থেকে মানুষ আসবে এবং মুহাম্মদ (সা:) সর্ম্পকে আমাদেরকে জিজ্ঞেস করবে। তাদের এসব প্রশ্নের জবাবে আমরা কি বলবো? আপনি আমাদেরকে এমন একটি উত্তর বলে দিন, যেন আমরা সবাই একই কথা বলতে পারি।
অনেক ভাবনা-চিন্তার পর তিনি উত্তর দিলেন, যদি তোমাদের কিছু বলতেই হয়, তবে তাঁকে জাদুকর বলতে পার। লোকদেরকে বলো যে, এ লোক জাদুর-বলে পিতা-পুত্র ও স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করেন। সমবেত লোকেরা তখনকার মতো এ প্রস্তাবে একমত ও নিশ্চিত হয়ে গেল। তখন থেকেই তারা আগন্তকদের নিকট একথা বলতে আরম্ভ করলো, কিন্ত আল্লাহর জ্বালানো প্রদীপ কারো ফুৎকারে নির্বাপিত হবার নয়। আরবের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সাধারণ লোকদের অনেকেই কোরআনের অমীয় বাণী শুনে মুসলমান হয়ে গেল। ফলে মক্কার বাইরেও ইসলামের বিস্তার সুচিত হলো। (সূত্র:খাসায়েসে-কুবরা)
এমনিভাবে বিশিষ্ট কুরাইশ সরদার নযর ইবনে হারেস তার স্বজাতিকে লক্ষ্য করে বলেছিলেন, আজ তোমরা এমন এক বিপদের সম্মুখীন হয়েছ, যা ইতিপূর্বে কখনো দেখা যায়নি। মুহাম্মদ (সা:) তোমাদেরই মধ্যে যৌবন অতিবাহিত করেছে, তোমরা তার চরিত্র মাধূর্যে বিমুগ্ধ ছিলে, তাকে তোমরা সবার চাইতে সত্যবাদী বলে বিশ্বাস করতে, আমানতদার বলে অভিহিত করতে। কিন্ত যখন তার মাথার চুল সাদা হতে আরম্ভ করেছে, আর তিনি আল্লাহর কালাম তোমাদেরকে শোনাতে শুরু করেছেন, তখন তোমরা তাকে জাদুকর বলে অভিহিত করছ। আল্লাহর কসম, তিনি জাদুকর নন। আমি বহু জাদুকর দেখেছি, তাদের পরীক্ষা-নিরিক্ষা করেছি, তাদের সঙ্গে মেলাশো করেছি, কিন্ত মুহাম্মদ (সা:) কোন অবস'াতেই তাদের মত নন। তিনি সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্ব। আরও জেনে রাখো। আমি অনেক জাদুকরের কথাবার্তা শুনেছি, কিন্ত তার কথাবার্তা জাদুকরের কথাবার্তার সাথে কোন বিচারেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তোমরা তাকে কবি বল, অথচ আমি অনেক কবি দেখেছি, এ বিদ্যা আয়ত্ত করেছি, অনেক বড় বড় কবির কবিতা শুনেছি, অনেক কবিতা আমার মুখস্তও আছে, কিন্ত তার কালামের সাথে কবিদের কবিতার কোন সাদৃশ্য আমি খুঁজে পাইনি। কখনো কখনো তোমরা তাকে পাগল বল, তিনি পাগলও নন। আমি অনেক পাগল দেখেছি, তাদের পাগলামীপূর্ণ কথাবার্তাও শুনেছি, কিন্ত তার মধ্যে তাদের মত কোন লক্ষণই পাওয়া যায় না। হে আমার জাতি! তোমরা ন্যায়নীতির ভিত্তিতে এ ব্যাপারে চিন্তা কর, সহজে এড়িয়ে যাওয়ার মতো ব্যক্তিত্ব তিনি নন।
হযরত আবু যর (রা:) বলেছেন, আমার ভাই আনীস একবার মক্কায় গিয়েছিলেন। তিনি ফিরে এসে আমাকে বলেছিলেন যে, মক্কার এক ব্যক্তি নিজেকে আল্লাহর রসুল বলে দাবী করছেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, সেখানকার মানুষ এ সর্ম্পকে কি ধারণা পোষন করে? তিনি উত্তর দিলেন, তাকে কেউ কবি, কেউ পাগল, কেউ-বা জাদুকর বলে। আমার ভাই আনীস একজন বিশিষ্ট কবি এবং বিভিন্ন বিষয়ে বিজ্ঞ লোক ছিলেন। তিনি আমাকে বললেন, আমি যতটুকু লক্ষ্য করেছি, মানুষের এসব কথা ভুল ও মিথ্যা। তার কালাম কবিতাও নয়, জাদুও নয়, আমার ধারণায় সে কালাম সত্য।
আবু যর (রা:) বলেন যে, ভাইয়ের কথা শুনে আমি মক্কায় চলে এলাম। মসজিদে হারামে অবস'ান করলাম এবং ত্রিশ দিন শুধু অপেক্ষা করেই অতিবাহিত করলাম। এ সময় যমযম কূপের পানি ব্যতীত আমি অন্য কিছুই পানাহার করিনি। কিন্ত এতে আমার ক্ষুধার কষ্ট অনুভব হয়নি। দূর্বলতাও উপলব্ধি করিনি। শেষ পর্যন্ত কাবা প্রাঙ্গন থেকে বের হয়ে লোকের নিকট বললাম, আমি রোম ও পারস্যের বড় বড় জ্ঞানী-গুণী লোকদের অনেক কথা শুনেছি, অনেক জাদুকর দেখেছি, কিন্ত মুহাম্মদ (সা:) এর বাণীর মত কোন বাণী আজও পর্যন্ত কোথাও শুনিনি। কাজেই সবাই আমার কথা শোন এবং তার অনুসরণ কর। আবু যরের এ প্রচারে উদ্ববুদ্ধ হয়েই মক্কা বিজয়ের বছর তার কওমের প্রায় এক হাজার লোক মক্কায় গিয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন।
ইসলাম ও হযরতের সবচাইতে বড় শত্রু আবু জাহল এবং আখনাস ইবনে শোরাইকও লোকচক্ষুর অগোচলে কোরআন শুনত, কোরআনের অসাধারণ বর্ণনাভঙ্গি এবং অনন্য রচনারীতির প্রভাবে প্রভান্বিত হতো। কিন্ত গোত্রের লোকেরা যখন তাদেরকে বলতো যে, তোমরা যখন এ কালামের গুণ সর্ম্পকে এতই অবগত এবং একে অদ্বিতীয় কালামরূপে বিশ্বাস কর, তখন কেন তা গ্রহণ করছ না? প্রত্যুত্তরে আবু জাহল বলতো, তোমরা জান যে, বনি আবদে মনাফ এবং আমাদের মধ্যে পূর্ব থেকেই বিরামহীন শত্রুতা চলে আসছে; তারা যখন কোন কাজে অগ্রসর হতে চায়, তখন আমরা তার প্রতিদ্বন্দ্বীরূপে বাঁধা দেই। উভয় গোত্রই সমপর্যায়ের। এমবতাবস'ায় তারা যখন বলছে যে, আমাদের মধ্যে এমন এক নবীর আাভির্ভাব হয়েছে, যার নিকট আল্লাহর বাণী আসে, তখন আমরা কিভাবে তাদের মোকাবেলা করব, তাই আমার চিন্তা। আমি কখনো তাদের একথা মেনে নিতে পারি না।
মোট কথা কোরআনের এ দাবী ও চ্যালেঞ্জে সারা আরববাসী যে পরাজয় বরণ করেই ক্ষান্ত হয়েছে তাই নয়, বরং একে অদ্বিতীয় ও অনন্য বলে প্রকাশ্য ভাবে স্বীকারও করেছে। যতি কোরআন মানব রচিত কালাম হতো, তবে সমগ্র আবরবাসী তথা সমগ্র বিশ্ববাসী অনুরূপ কোন না কোন একটি ছোট সুরা রচনা করতে অপারগ হতো না এবং এ কিতাবের অনন্য বৈশিষ্ট্যের কথা স্বীকারও করতো না। কোরআনের বাহক পয়গাম্বরের বিরুদ্ধে জান-মাল, ধন-সম্পদ,মান-উজ্জত সবকিছু ব্যয় করার জন্য তারা প্রস'ত ছিল, কিন্ত কোরআনের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে দুটি শব্দও রচনা করতে কেউ সাহসী হয়নি।
এর কারণ এই যে, যে সমস্ত মানুষ তাদের মুর্খতাজনিত কার্যকলাপ ও আমল সত্ত্বেও কিছুটা বিবেকসম্পন্ন ছিল;তাদের মিথ্যার প্রতি একটা সহজাত ঘৃণাবোধ ছিল। কোরআন শুনে তারা যখন বুঝতে পারলো যে, এমন কালাম রচনা আমাদের পক্ষে আদৌ সম্ভব নয়, তখন তারা কেবল একগুয়েমীর মাধ্যমে কোন বাক্য রচনা করে তা জনসমেক্ষ তুলে ধরতে নিজেদের জন্য লজ্জার ব্যাপার বলে মনে করতো। তারা জানতো যে, আমরা যদি কোন বাক্য পেশ করিও, তবে সমগ্র আরবের শুদ্ধভাষী লোকেরা তুলনামূলক পরীক্ষায় আমাদেরকে অকৃতকার্যই ঘোষণা করবে এবং এজন্য অনর্থক লজ্জিত হতে হবে। এজন্য সমগ্র জাতিই চুপ করে ছিল। আর যারা কিছুটা ন্যায়পথে চিন্তা করেছে, তারা খোলাখুলিভাবে স্বীকার করে নিতেও কুন্ঠিত হয়নি যে, এটা আল্লাহর কালাম।
এসব ঘটনার মধ্যে একটি হচ্ছে এই যে, আরবের একজন সরদার আস’আদ ইবনে যেরার হযরতের চাচা আব্বাস (রা:) এর নিকট স্বীকার করেছেন যে, তোমরা অনর্থক মুহাম্মদ (সা:) এর বিরুদ্ধোচারণ করে নিজেদের ক্ষতি করছ এবং পারস্পারিক সর্ম্পকচ্ছেদ করছ। আমি দৃঢ় বিশ্বাসের সাথে বলতে পারি যে, নিশ্চয়ই তিনি আল্লাহর রসূল এবং তিনি যে কালাম পেশ করেছেন তা আল্লাহর কালাম এতে বিন্দুমাত্রও সন্দেহ নেই।
তৃতীয় কারণ:
তৃতীয় কারণ হচ্ছে এই যে, কোরআন কিছু গায়েবী সংবাদ এবং ভবিষ্যতে ঘটবে এমন অনেক ঘটনার সংবাদ দিয়েছে, যা হুবহু সংঘঠিত হয়েছে। যথা- কোরআন ঘোষণা করেছে, রোম ও পারস্যের যুদ্ধে প্রথমত: পারস্যবাসী জয়লাভ করবে এবং দশ বছর যেতে না যেতেই পনুরায় রোম পারস্যকে পরাজিত করবে। এ আয়াত নাযিল হওয়ার পর মক্কার সরদারগণ হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা:) এর সাথে এ ভবিষ্যদ্বাণীর যথার্থতা সর্ম্পকে বাজী ধরল। শেষ পর্যন্ত কোরআনের ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী রোম জয়লাভ করলো এবং বাজীর শর্তানুযায়ী যে মাল দেয়ার কথা ছিল, তা তাদের দিতে হলো। রসূলুল্লাহ (সা:) অবশ্য এ মাল গ্রহন করেননি। কেননা, এরূপ বাজী ধরা শরীয়ত অনুমোদন করে না। এমন আরো অনেক ঘটনা কোরআনে উল্লেখিত রয়েছে, যা গায়েবের সাথে সর্ম্পকযুক্ত এবং নিকট অতীতে হুবহু ঘটেছেও।
চুতুর্থ কারণ:
চতুর্থ কারণ এই যে, কোরআন শরীফে পূবর্বর্তী উম্মত, শরীয়ত ও তাদের ইতিহাস এমন পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, সে যুগের ইহুদী-খৃষ্টানদের পন্ডিতগণ, যাদেরকে পুর্ববর্তী আসমানী কিতাবসমুহের বিজ্ঞ লোক মনে করা হতো, তারাও এতটা অবগত ছিল না। রসূল (সা:) এর কোন প্রতিষ্ঠানগত শিক্ষা ছিল না। কোন শিক্ষিত লোকের সাহায্যও তিনি গ্রহণ করেননি। কোন কিতাব কোনদিন সর্ম্পশও করেন নি। এতদসত্ত্বেও দুনিয়ার প্রথম থেকে তার যুগ পর্যন্ত সমগ্র বিশ্ববাসীর ঐতিহাসিক অবস'া এবং তাদের শরীয়ত সর্ম্পকে অতি নিখুঁতভাবে বিস্তারিত আলোচনা করা আল্লাহর কালাম ব্যতীত কিছুতেই তার পক্ষে সম্ভব হতে পারে না। প্রকৃত পক্ষে আল্লাহ তা’আলাই যে তাকে এ সংবাদ দিয়েছেন এতে সন্দেহের অবকাশ নেই।
পঞ্চম কারণ:
পঞ্চম করণ হচ্ছে এই যে, কোরআনের বিভিন্ন আয়াতে মানুষের অন্তর্নিহিত বিষয়াদি সম্পর্কিত যে সব সংবাদ দেয়া হয়েছে পরে সংশ্লিষ্ট লোকদের স্কীকারোক্তিতে প্রমাণিত হয়েছে যে, এ সব কথাই সত্য। একাজও আল্লাহ তা’আলারই কাজ, তা কোন মানুষের পক্ষে সম্ভব ছিল না।
ষষ্ঠ কারণ:
ষষ্ঠ কারণ হচ্ছে যে, কোরআনে এমন সব আয়াত রয়েছে যাতে কোন সম্প্রদায় বা কোন ব্যক্তি সর্ম্পকে ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে যে, তাদের দ্বারা অমুক কাজ হবে না; তারা তা করতে পারবে না। ইহুদীদের সর্ম্পকে বলা হয়েছে, যদি তারা নিজেদেরকে আল্লাহর প্রিয় বান্দা বলেই মনে করে, তবে তারা নিশ্চয় তার নিকট যেতে পছন্দ করবে। সুতরাং এমতাবস'ায় তাদের পক্ষে মৃত্যু কামনা করা অপছন্দীয় হতে পারে না। মৃত্যু কামনা করা তাদের পক্ষে কঠিন ছিল না। বিশেষ করে ঐ সমস্ত লোকদের জন্য যারা কোরআনকে মিথ্যা বলে অভিহিত করতো। কোরআনের এরশাদ মোতাবেক তাদের মৃত্যু কামনা করার ব্যাপারে ভয় পাওয়ার কোন কারণ ছিল না। ইহুদীদের পক্ষে মৃত্যু কামনার (মোবাহালা) এ চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে মুসলমানদেরকে পরাজিত করার অত্যন্ত সুবর্ণ সুযোগ ছিল। কেরাআনের দাবীর পরিপ্রেক্ষিতে সঙ্গে সঙ্গেই তাতে সম্মত হওয়া তাদের পক্ষে উচিত ছিল। কিন্ত উহুদী ও মুশরিকরা মুখে কোরআনকে যতই মিথ্যা বলুক না কেন, তাদের মন জানতো যে, কোরআন সত্য, তাতে কনো সন্দেহের অবকাশ নেই। সুতরাং মৃত্যু কামনার চ্যালেঞ্জ সাড়া দিলে সত্য-সত্যই তা ঘটবে। এজন্যই তারা কোরআনের এ প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে সাহস পায়নি এবং একটি বারের জন্যও মুখ দিয়ে মৃত্যুর কথা বলেনি।
সপ্তম কারণ:
কোরআন শরীফ শ্রবণ করলে মুমিন, কাফির,সাধারণ-অসাধারণ নির্বিশেষে সবার উপর দু’ধনের প্রভাব সৃষ্টি হতে দেখা যায়। যেমন, হযরত জুবাইর ইবনে মোতআম (রাঃ) ইসলাম গ্রহণের পুর্বে একদিন হুযুর (সাঃ) কে মাগরিবের নামাযে সূরা তুর পড়তে শুনেন। হুযুর (সাঃ) যখন শেষ আয়াতে পৌঁছলেন,তখন জুবাইর (রাঃ) বলেন যে, মনে হলো, যেন আমার অন্তর উড়ে যাচ্ছে। তার কোরআন পাঠ শ্রবণের এটাই ছিল প্রথম ঘটনা। তিনি বলেন, সেদিনই কোরআন আমার উপর প্রভাব বিস্তার করে ফেলেছিল।
আয়াতটির বাংলা অনুবাদ হচ্ছে- তারা কি নিজেরাই সৃষ্ট হয়েছে, না তারাই আকাশ ও যমীন সৃষ্টি করেছে? কোন কিছুতেই ওরা ইয়াকীন করছে না। তাদের নিকট কি তোমার পালনর্কতার ভান্ডারসমুহ গচ্ছিত রয়েছে, না তারাই রক্ষক?
অষ্টম কারণ:
অষ্টম কারণ হচ্ছে, কোরআনকে বারংবার পাঠ করলেও মনে বিরক্তি আসে না। বরং যতই বেশি পাঠ করা যায় , ততই তাতে আগ্রহ বাড়তে থাকে। দুনিয়ার যত ভাল ও আকর্ষনীয় পুস্তকই হোক না কেন, বড়জোড় দু-চারবার পাঠ করার পর তা আর পড়তে মন চায় না, অন্যে পাঠ করলেও তা শুনতে ইচ্ছে হয় না। কিন্ত কোরআনের এ বৈশিষ্ট্য রয়েছে যে, যত বেশি পাঠ করা হয়, ততই মনের আগ্রহ আরো বাড়তে থাকে। অন্যের পাঠ শুনতেও আগ্রহ জন্মে।
নবম কারণ:
নবম কারণ হচ্ছে, কোরআন ঘোষণা করেছে যে, কোরআনের সংরক্ষণের দায়িত্ব স্বয়ং আল্লাহ গ্রহণ করেছেন। কিয়ামত পর্যন্ত এর মধ্যে বিন্দুবিসর্গ পরিমাণ পরিবর্তন-পরিবর্ধন না হয়ে তা সংরক্ষিত থাকবে। আল্লাহ তা’আলা এ ওয়াদা এভাবে পুরণ করেছেন যে, প্রত্যেক যুগে লক্ষ লক্ষ মানুষ ছিলেন এবং রয়েছেন, যারা কোরআনকে এমনভাবে স্বীয় স্মৃতিপটে ধারণ করেছেন যে, এর প্রতিটি যের, যবর তথা স্বরচিহ্ন পর্যন্ত অবিকৃত রয়েছে। নাযিলের সময় থেকে চৌদ্দ শতাধিক বছর অতিবাহিত হয়েছে; এ দীর্ঘ সময়ের মধ্যেও এ কিতাব কোন পরিবর্তন-পরিবর্ধন পরিলক্ষিত হয়নি। প্রতি যুগেই স্ত্রী-পুরুষ, শিশু-বৃদ্ধ নির্বিশেষে কোরআনের হাফেয ছিলেন ও রয়েছেন। বড় বড় আলেম যদি একটি যের-যবর, পেশ-কম করেন, তবে ছোট বাচ্চারাও তার ভুল ধরে ফেলে। পৃথিবীর কোন ধর্মীয় কিতাবের এমন সংরক্ষণ ব্যবস'া সে ধর্মের লোকেরা এক দশমাংশও পেশ করতে পারবে না। আর কোরআনের মত নির্ভুল দৃষ্টান্ত বা নযীর স'াপন করা তো অণ্য কোন গ্রন' সম্বন্ধে এটা সি'র করাও মুশকিল যে, এ কিতাব কোন ভাষায় অবর্তীণ হয়েছিল এবং তাতে কয়টি অধ্যায় ছিল।
গ্রন'াকারে প্রতি যুগে কোরআনের যত প্রচার ও প্রকাশ হয়েছে, অন্য কোন ধর্ম-গ্রনে'র ক্ষেত্রে তা হয়নি অথচ ইতিহাস সাক্ষী যে, প্রতি যুগেই মুসলমানদের সংখ্যা কাফের-মুশরিকদের তুলনায় কম ছিল এবং প্রচার-মাধ্যমও অন্যান্য ধর্মাবলম্বী লোকেদের তুলনায় কম ছিল। এতদসত্ত্বেও কোরআনের প্রচার ও প্রকাশের তুলনায় অন্য কোন ধর্মগ্রনে'র প্রচার ও প্রকাশনা সম্ভব হয়নি। তারপরেও কোরআনের সংরক্ষণ আল্লাহ তা’আলা শুধু গ্রন' ও পুস্তকেই সীমাবদ্ধ রাখেননি যা জ্বলে গেলে বা অন্য কোন কারণে নষ্ট হয়ে গেলে আর সংগ্রহ করার সম্ভাবনা থাকে না। তাই স্বীয় বান্দগণের স্মৃতিপটেও সংরক্ষিত করে দিয়েছেন। সমগ্র বিশ্বের কোরআনও যদি কোন কারণে ধ্বংস হয়ে যায, তবু এ গ্রন' পূর্বের ন্যায়ই সংরক্ষিত থাকবে। কয়েকজন হাফেয একত্রে বসে কয়েক ঘন্টার মধ্যেই তা লিখে দিতে পারবেন। এ অদ্ভুত সংরক্ষণও আল কোরআনেরই বিশেষত্ব এবং এ যে আল্লাহরই কালাম তার অন্যতম উজ্জ্বল প্রমাণ। যেভাবে আল্লাহর সত্তা সর্বযুগে বিদ্যমান থাকবে, তাতে কোন সৃষ্টির হস্তক্ষেপের কোন ক্ষমতা নেই, অনুরূপভাবে তার কালাম সকল সৃষ্টির রদ-বদলের ঊর্ধ্বে এবং সর্বযুগে বিদ্যমান থাকবে। কোরআনের এই ভবিষ্যদ্বানীর সত্যতা বিগত চৌদ্দশত বছরের অভিজ্ঞতা থেকে প্রমাণিত হয়েছে এবং কিয়ামত পর্যন্ত বিদ্যমান থাকবে। এ প্রকাশ্য মু‘জেযার পর কোরআন আল্লাহর কালাম হওয়াতে কোন প্রকার সন্দেহ- সংশয় থাকতে পারে না।
দশম কারণ:
কোরআনে এলম ও জ্ঞানের যে সাগর পুঞ্জীভূত করা হয়েছে, অন্য কোন কিতাবে আজ পর্যন্ত তা করা হয়নি। ভবিষ্যতেও তা হওযার সম্ভাবনা নেই। এই সংক্ষিপ্ত ও সীমিত শব্দসম্ভাবরের মধ্যে এত জ্ঞান ও বিষয়বস'র সমাবেশ ঘটেছে যে, তাতে সমগ্র সৃষ্টির সর্বকালের প্রয়োজন এবং মানবজীবনের প্রত্যেক দিক পরিপূর্ণভাবে আলোচিত হয়েছে। আর বিশ্বপরিচালনার সুন্দরতম নিয়ম এবং ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত জীবন থেকে সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনের নির্ভুল বিধান বর্ণিত হয়েছে। এ ছাড়া মাথার উপরে ও নীচে যত সম্পদ রয়েছে সে সবের প্রসঙ্গ ছাড়াও জীব-বিজ্ঞান, উদ্ভিদ বিজ্ঞান এমনকি রাজনীতি, অর্থনীতি ও সমাজ নীতির সকল দিকের পথনির্দেশ সম্বলিত এমন সমাহার বিশ্বের অণ্য কোন আসামানী কিতাবে দেখা যায় না।
শুধু আপাত: দৃষ্টিতে পথনির্দেশই নয়, এর নমুনা পাওয়া এবং সে সব নির্দেশ একটা জাতির বাস্তব জীবনে অক্ষরে অক্ষরে প্রতিফলিত হয়ে তাদের জীবনধারা এমনকি ধ্যান-ধ্যারণা, অভ্যাস এবং রুচিরও এমন বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধন দুনিয়ার অন্য কোন গ্রনে'র মাধ্যমে সম্ভব হয়েছে এমন নযীর আর একটা খুঁজে পাওয়া যায় না। একটা নিরক্ষর উম্মী জাতিকে জ্ঞানে, রুচিতে, সভ্যতায় ও সংস্কৃতিতে এত অল্পকালের মধ্যে এমন পরিবর্তিত করে দেয়ার নযীরও আর দ্বিতীয়টি নেই।
সংক্ষেপে এই হচ্ছে কোরআনের সেই বিস্ময় সৃষ্টিকারী প্রভাব, যাতে কোরআনকে আল্লাহর কালাম বলে প্রতিটি মানুষ স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে। যাদের বুদ্ধি-বিবেচনা বিদ্বেষের কালিমায় সম্পূর্ণ কলুষিত হয়ে যায়নি, এমন কোন লোকই কোরআনের এ অনন্যসাধারণ মু‘জেযা সর্ম্পকে অকুণ্ঠ স্বীকৃতি প্রদান করতে কার্পণ্য করেনি। যারা কোরআনকে জীবনবিধান হিসাবে গ্রহণ করেনি, এমন অনেক অ-মুসলিম লোকও কোরআনের এ নযীরবিহীন মু‘জেযা কথা স্বীকার করেছেন। ফ্রান্সের বিখ্যাত মণীষী ডঃ মারড্রেসকে ফরাসী সরকারের পক্ষ থেকে কোরআনের বাষট্টিটি সূরা ফরাসী ভাষায় অনুবাদ করার জন্য নিয়োগ করা হয়েছিল। তার স্বীকারোক্তিও এ ব্যাপারে প্রাণিধানযোগ্য। তিনি লিখেছেন- ‘নিশ্চয়ই কোরআনের বর্ণনাভঙ্গি সৃষ্টিকর্তার বর্ণনাভঙ্গিরই স্বাক্ষর। একথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, কোরআনে যেসব তথ্যাদি বর্ণিত হয়েছে, আল্লাহর বাণী ব্যতীত অন্য কোন বাণীতে তা থাকতে পারে না।
এতে সন্দেহ পোষনকারীরাও যখন এর অনন্যাসাধারণ প্রভাব লক্ষ্য করে, তখন তারাও এ কিতাবের সত্যতা স্বীকার বাধ্য হয়। বিশ্বের সর্বত্র শতাধিক কোটি মুলসমান ছড়িয়ে রয়েছে, তাদের মধ্যে কোরআনের বিশেষ প্রভাব দেখে খৃষ্টান মিশনগুলোতে কর্মরত সকলেই একবাক্যে স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে, যেসব মুসলমান কোরআন বুঝে পড়ার সুযোগ লাভ করেছে, তাদের মধ্যে একটি লোকও ধর্মত্যাগী-মুরতাদ হয়নি।
ড. গ্যারি মিলার ছিলেন কানাডার একজন খ্রিষ্ট ধর্ম প্রচারক। তিনি পবিত্র কুরআনের ভুল খোঁজার চেষ্টা করেছিলেন, যাতে ইসলাম ও কুরআন বিরোধী প্রচারণা চালানো সহজ হয়। কিন' ফল হয়েছিল বিপরীত। তিনি বলেন, আমি কোন একদিন কুরআন সংগ্রহ করে তা পড়া শুরু করলাম। প্রথমে ভেবেছিলাম কুরআন নাযিল হয়েছিল আরবের মরুচারীদের মধ্যে। তাই এতে নিশ্চয় মরুভূমি সম্পর্কে কথা থাকবে। কুরআন নাযিল হয়েছিল ১৪০০ বছর আগে। তাই খুব সহজেই এতে অনেক ভুল খুঁজে পাব ও সেসব ভুল মুসলিমদের সামনে তুলে ধরব বলে সংকল্প করেছিলাম। কিন' কয়েক ঘণ্টা ধরে কুরআন পড়ার পরে বুঝলাম আমার এসব ধারণা ঠিক নয়, বরং এমন একটা গ্রনে' অনেক আকর্ষণীয় তথ্য পেলাম। বিশেষ করে সূরা নিসার ৮২ নম্বর আয়াতটি আমাকে গভীর ভাবনায় নিমজ্জিত করে। সেখানে আল্লাহ বলেন, ‘এরা কী লক্ষ্য করে না কুরআনের প্রতি? এটা যদি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও পক্ষ থেকে নাযিল হত, তবে এতে অবশ্যই বহু বৈপরিত্য দেখতে পেত’। খ্রিষ্ট ধর্ম প্রচারক গ্যারি মিলার এভাবে ইসলামের দোষ খুঁজতে গিয়ে মুসলিম হয়ে যান।
তিনি বলেছেন, ‘আমি খুব বিস্মিত হয়েছি যে, কুরআনে ঈসা (আঃ)-এর মাতা মারিয়ামের নামে একটি বড় পরিপূর্ণ সূরা রয়েছে। আর এ সূরায় তাঁর এত ব্যাপক প্রশংসা ও সম্মান করা হয়েছে যে, এত প্রশংসা বাইবেলেও দেখা যায় না। পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন স'ানে বিশ্বনবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর নাম মাত্র ৫ বার এসেছে। কিন' ঈসা (আঃ)-এর নাম এসেছে ২৫ বার। আর এ বিষয়টি ইসলাম ধর্ম গ্রহণের ক্ষেত্রে আমার ওপর ব্যাপক প্রভাব রেখেছে’।
মোট কথা, কোরআনের অনন্য বৈশিষ্ট্য সর্ম্পকে যথাযোগ্য বিস্তারিত আলোচনা সম্ভব না হলেও সংক্ষিপ্তভাবে যতটুকু বলা হলো, এতেই সুস' বিবেকসম্পন্ন ব্যক্তিমাত্রই একথা স্বীকার করতে বাধ্য হবে যে, কোরআন আল্লাহরই কালাম এবং রসূলে মকবুল সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের একটি সর্বশ্রেষ্ঠ মু‘জেযা।
