ঝুঁকির মুখে রেললাইন: অবাধে চুরি হচ্ছে যন্ত্রাংশ

S M Ashraful Azom
সেবা ডেস্ক:  মুঠোফোনে কথা বলতে বলতে রেললাইনে হাঁটার সময় ট্রেনে কাটা পড়ে মারা গেছেন শিক্ষার্থী। রেললাইনে দাঁড়িয়ে সেলফি তুলতে গিয়ে মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে কিশোরের। এসব ঘটনা খুব বেশি দিন আগের নয়। অন্যদিকে অবাধে চুরি হচ্ছে রেললাইনের যন্ত্রাংশ, পাথর। দুপাশে গড়ে উঠেছে বস্তি, বাজারসহ বিভিন্ন অবৈধ প্রতিষ্ঠান। এভাবে মানুষের সচেতনতা আর কর্তৃপক্ষের তদারকির অভাবে ক্রমে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে দেশের রেললাইন।
দেখা গেছে, রাজধানীর মগবাজার থেকে মৌচাক রেলপথ যেন ফুটপাত। সেখান দিয়ে অবাধে হাঁটেন পথচারীরা। ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলাচল করেন শত শত মানুষ। রেলওয়ে পুলিশের তথ্য মতে, কমলাপুর থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত রেলপথে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটছে এই দুই ক্রসিংয়ের মাঝামাঝি এলাকায়। এ ছাড়া তেজগাঁও স্টেশন থেকে শাহজাহানপুর পর্যন্ত ১০৭টি স্থানে নেই ইলাস্টিক রেল (প্যান্ডেল) ক্লিপ ও নাট-বল্টু। যা রাতের আঁধারে খুলে নিয়ে গেছে দুর্বৃত্তরা।
দেশে বর্তমানে রেলপথ রয়েছে ২ হাজার ৮৭৭ কিলোমিটার। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রেলভবনের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, বছরে প্রায় পাঁচ লাখ পিস নাট-বল্টু ও ক্লিপ চুরি হয়। ওই কর্মকর্তা বলেন, মানুষ সচেতন না হলে এটা রেলওয়ের পক্ষে ঠেকানো কঠিন। তবে রেললাইন ঝুঁকিপূর্ণ এটা বলা যাবে না। ক্লিপ বা দু-একটা নাট-বল্টুর জন্য সাম্প্রতিক সময়ে কোনো ট্রেন লাইনচ্যুত হওয়ার নজির নেই। তিনি বলেন, রেল লোকসানি প্রতিষ্ঠানের বদনাম থেকে বেরুতে পেরেছে। আশা করি ছোটখাটো যে সমস্যা রয়েছে, তা দ্রুততম সময়ে লাঘব হবে।
সরেজমিনে পরিদর্শনকালে দেখা যায়, তেজগাঁও রেলস্টেশন থেকে শাজাহানপুর পর্যন্ত রেললাইনের ১০৫টি স্থানে ইলাস্টিক রেল (প্যান্ডেল) ক্লিপ ও দুটি স্থানে নাট-বল্টু নেই ( ৮টি থাকার কথা, আছে ৬টি)। মগবাজার রেলগেটের আশপাশে রেলওয়ের জায়গা দখল করে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন ইঞ্জিনিয়ারিং প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানের মিস্ত্রিরা রেললাইনের ওপরে রড পেতে পিটিয়ে পিটিয়ে সোজা করেন। বিক্রি করেন বিভিন্ন গাড়ির খুচরা যন্ত্রাংশ। বিভিন্ন স্থানে রেললাইন ঘুরে দেখা যায়, বস্তি এলাকায় রেললাইনের পাথর সরে গিয়ে মাটি বেরিয়ে পড়েছে। কোথাও কোথাও রান্নাবান্না, মানুষের গোসলের কারণে প্রতিদিন পানি জমে জমে কাদা হয়ে গেছে। রেললাইন ঘেঁষে গড়ে উঠেছে অবৈধ দোকানপাট।      কয়েকটি জায়গায় ছাপরা ঘরে সাজানো রয়েছে কেরাম বোর্ড, দিন-রাত সেখানে লোকজনের জটলা লেগেই থাকে। পাশাপাশি বেশ কয়েকটি জায়গায় বাসাবাড়ির ময়লার বিশাল স্তূপ পড়ে রয়েছে, যা গড়িয়ে পড়ছে রেললাইনের ওপর।
রেলওয়ের পূর্বাঞ্চল বিভাগের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, রেলের মূল্যবান ক্লিপ ও যন্ত্রাংশ চুরির ঘটনার সঙ্গে মাদকসেবীরাই বেশি জড়িত। রেলওয়ের অবকাঠামো বিভাগের কর্মকর্তারা বলেছেন, প্রতিবছরই বিপুল সংখ্যক ক্লিপ খোয়া যায়। যেখানে ঝুঁকিপূর্ণ মনে হয়, সেখানেই দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয়ে থাকে।
জিআরপি থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) ইয়াসিন ফারুক মজুমদার জানান, তিনি থানায় যোগদান করেছেন এক মাস আগে। এ সময় ক্লিপ বা অন্যান্য যন্ত্রাংশ চুরির অভিযোগে কোনো মামলা হয়নি। তবে থানায় বছর খানেক আছেন এমন একজন সাব-ইন্সপেক্টর জানান, বেশ আগে রেলওয়ের যন্ত্রাংশ চুরির অভিযোগে কয়েকটি মামলা হয়েছিল।
রেললাইনে বস্তি-বাজার: টঙ্গী থেকে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত ৪৫ কিলোমিটার রেললাইনের দুই পাশে ১০ থেকে ১২টি জায়গায় ছোট ছোট বস্তি গড়ে উঠেছে। অবৈধভাবে গড়ে ওঠা এসব বস্তিতে ঝুপড়িঘরের সংখ্যা সহস্রাধিক। এ ছাড়া দুই পাশে রয়েছে ৬৬টি বাজার। এর মধ্যে ১৭টি বাজার ট্রেন চলাচলের জন্য ভয়াবহ ঝুঁকিপূর্ণ ।
এ প্রসঙ্গে রেলওয়ের লাইন রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগের সিনিয়র উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. হামিদুর রহমান বলেন, ১৮৬১ সালের আইন মোতাবেক রেললাইনের দু পাশে ২০ ফুটের মধ্যে নির্দিষ্ট লোক ছাড়া কোনো সাধারণ মানুষ কিংবা গবাদিপশুর প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ওই এলাকায় সব সময়ই ১৪৪ ধারা জারি থাকে। ওই সীমানার ভেতর কাউকে পাওয়া গেলে ওই আইনের ১০১ ধারায় গ্রেফতার করা যাবে। গবাদিপশু আটক করে তা বেচে সেই অর্থ সরকারের কোষাগারে জমা দেওয়ারও বিধান রয়েছে আইনটিতে। কিন্তু কেউই এ আইন মানে না।
তিনি আরো বলেন, রেলের দুই ধারে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে অভিযান চালানো হয়। কিন্তু একটি স্বার্থান্বেষী মহলের কারণে আবার তা পূর্বের অবস্থায় ফিরে আসে। কাওরান বাজারের বস্তির উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, শত চেষ্টা করেও এ বস্তিটি উচ্ছেদ করা যাচ্ছে না। এ বস্তির কারণে সব সময় ভেজা থাকে রেললাইন। ফলে মরিচা ধরে নষ্ট হচ্ছে রেললাইনের যন্ত্রাংশ। ক্লিপ বা নাট-বল্টু না থাকায় ট্রেন চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা নিয়মিতই তদারক করছি। তবে রেললাইন ঝুঁকিপূর্ণ এটা বলা যাবে না।
কমলাপুর রেলের আরএনবির অফিসার ইনচার্জ মো. মজিবুর রহমান জানান, বর্তমানে রেললাইনের নিরাপত্তার জন্য ৬২ জন আর্মড পুলিশ রয়েছে। তবে তারা কমলাপুর স্টেশনের বাইরে কোনো কাজে যেতে পারে না। লাইনের নিরাপত্তায় তাই আরো অনেক লোকবলের প্রয়োজন।
রেললাইনে হাঁটলে শাস্তি: ট্রেনে কাটা পড়ে মানুষ মৃত্যুর ধারাবাহিকতায় এবার কঠোর হতে চলেছে রেলপথ মন্ত্রণালয়। এজন্য মোবাইল কোর্ট ও রেলওয়ে আইন অনুযায়ী শাস্তির সিদ্ধান্ত হয়েছে। সম্প্রতি এক বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত হয়। এর আগে বিষয়টি জনসাধারণকে জানাতে চায় মন্ত্রণালয়। রেল কর্মকর্তারা জানান, রেললাইনে সর্বসাধারণের হাঁটাচলা বা অবস্থান আইন অনুযায়ী দণ্ডনীয় অপরাধ। কিন্তু রেললাইন ঘিরে বাজার, বসতি গড়ে ওঠায় এ আইন ভুলতে বসেছে সাধারণ মানুষ। শুধু তাই নয়, যত্রতত্র তৈরি হচ্ছে অবৈধ রেলক্রসিং। ফলে দুর্ঘটনায় হতাহতের ঘটনা ঘটছে অহরহ। তারা আরো জানান, মোবাইলে কথা বলার সময় ট্রেনে কাটা পড়ে মৃত্যু বা সেলফি তুলতে গিয়ে মারা যাওয়ার দায় রেলের নয়। তবু মানবিক কারণে আমরা এ ব্যাপারে জনসাধারণকে সচেতন করতে চাই।
অতি ঝুঁকিপূর্ণ ৯ রেলক্রসিং: এদিকে রাজধানীতে অতি ঝুঁকিপূর্ণ নয়টি রেলক্রসিং চিহ্নিত করেছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। এগুলো হলো— জুরাইন, খিলগাঁও, মগবাজার, মালিবাগ, তেজগাঁও, সায়েদাবাদ, এফডিসি মোড়, বনানী ও কাওরান বাজার।-ইত্তেফাক
ট্যাগস

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Know about Cookies
Ok, Go it!
To Top