
শামীম তালুকদার: বীরপ্রতীক কাঁকন বিবি (নুরজাহান বেগম) ১৯৭১ সালে সংঘটিত বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের এক বীরযোদ্ধা, বীরাঙ্গনা ও গুপ্তচর। সুনামগঞ্জ জেলার দোয়ারাবাজার উপজেলার লীপুর ইউনিয়নের ঝিরাগাঁও গ্রামে।
মুলত দোয়ারাবাজার সংলগ্ন ভারতের খাসিয়া পাহাড়ের নথরাইয়ে কাকন বিবির বাড়ি ছিল,বাবার নাম গিসো খাসিয়া এবং মায়ের নাম মেলি খাসিয়া। ৬ ভাই ১ বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়।
১৯৭১ এপ্রিল মাসে তৎকালিন ইপিআর সৈনিক মজিদ খানের সাথে তার বিয়ে হয় যুদ্ধকালীন সময়ে স্বামী-স্ত্রী আলাদা হয়ে পড়েন,দোয়ারা বাজারের টেংরাটিলা ক্যাম্পে স্বামীর খোঁজ করতে গেলে নরপিশাচ পাকবাহিনিরা তাঁকে আটক করে, ক্যাম্পে তাঁর ওপর হানাদার ও স্থানীয় দোসর রাজাকাররা চালায় পাশবিকশারীরিক ও মানসিক নির্যাতন।ক্যাম্পে নিজের উপর নেমে আসা
এ অত্যাচার ও ধরে আনা অন্যান্য বাঙালির ওপর পাকিস্তানি হানাদার বাহনীর নির্মম অত্যাচার দেখে এ খাসিয়া নারী জীবনবাজি রেখে স্বাধীনতার সূর্য ছিনিয়ে আনলেও স্বামীকে ফিরে আনতে পারেননি।হয়ত তার স্বামী দেশের জন্য নিজের রক্ত মাটিতে মিশিয়ে দিয়েছেন।
প্রতিশোধ গ্রহণ
তারপর দেখা করেন স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা রহমত আলীর সঙ্গে। রহমত আলী তাঁকে সেক্টর কমান্ডার লেফট্যানেন্ট কর্নেল মীর শওকত আলীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। মীর শওকতের নির্দেশেই তিনি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে গুপ্তচরবৃত্তি শুরু করেন,তার রিপোর্টের ভিত্তিতে মুক্তিযোদ্ধারা একাধিক সফল অপারেশন চালান।ভিক্ষুকবেশে গুপ্তচরের কাজ করতে গিয়ে দোয়ারাবাজার উপজেলার বাংলাবাজার এলাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে আবারও ধরা পড়েন, একনাগাড়ে ৭ দিন বিবস্ত্র করে অমানুষিক নির্যাতন চালানো হয়,লোহার রড গরম করে বিভিন্ন অঙ্গ প্রত্যঙ্গে ছ্যাকা দেওয়া হয়, অকথ্য, অবণর্নীয়, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন শেষে মৃত ভেবে ফেলে রেখে যায় হানাদার বাহিনী। ফেলে যাওয়ার পরদিন জ্ঞান ফিরে এলে মুমূর্ষ অবস’স্থায় বালাট সাব-সেক্টরে নিয়ে যাওয়া হয়।
সেখানে চিকিৎসা করানোর পর কিছুটা সুস’হয়ে আবার বাংলাবাজারে ফিরে আসেন,সেখানে মুক্তিযোদ্ধা রহমত আলীর কাছে এবার অস্ত্র চালনায় প্রশিক্ষণ নেন দৃঢ় মনোবলধারী বীর কাকন বিবি। রহমত আলীর দলে মুক্তিসদস্য হিসেবে সরাসরি সম্মুখযুদ্ধে অবতীর্ণহন এভাবেই।
১৯৭১ সালের নভেম্বর মাসে পাহাড়ঘেরা টেংরাটিলায় অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে পাকিস্তানি হানাদারদের সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধে অবতীর্ণ হন,সে যুদ্ধে মারাত্নকভাবে গুলিবিদ্ধ হন,ডান উরুতে গুলির বিভৎসতা জীবনের শেষদিন পযন্ত বহন করতে হয় তার।
টেংরাটিলা যুদ্ধের পর আমবাড়ি, বাংলাবাজার, টেবলাই, বালিউরা, মহব্বতপুর, বেতুরা, দুর্বিনটিলা, আধারটিলাসহ প্রায় ৯টি সম্মুখযুদ্ধে অংশ নেন এ বীরযোদ্ধা। নভেম্বর মাসের শেষ দিকে রহমত আলীসহ আরো কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধাকে নিয়ে যাওয়া সুনামগঞ্জ সিলেট সড়কের জাউয়া ব্রিজে সফল অপারেশন পরিচালনা করেন।
আমবাড়িবাজার যুদ্ধের সময় তাঁর পায়ে আবারও গুলিবিদ্ধ হন,সৌভাগ্যক্রমে বেচে গেলেও সারাজীবন এর কষ্ট বহন করতে হয়।তার বীরোত্বপূর্ণ অবদান এখনো বীর সহযোদ্ধারা অত্যন্ত সম্মানের সাথে উচ্চারণ করেন।
যুদ্ধ শেষে
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর দোয়ারাবাজার উপজেলার লক্ষ্মীপুর ইউনিয়নের ঝিরাগাঁও গ্রামের একটি পরিত্যক্ত কুড়েঘরে আশ্রয় নিরবে,নিভৃতে বসবাস করতে থাকেন এভাবে কেটে যায় একযুগেরও বেশি সময়। জীবন যুদ্ধে বীরের তখন বাড়িতে বাড়িতে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে দিন চলত।স্বীকৃতি?
একদিন তাঁর সর্বস্ব ত্যাগের কথা, তাঁর বীরত্বের কথা, তাঁর দুরবস্থার কথা তাকে বুঝিয়ে স্থানীয় গনমাধ্যম নিউজ করেন। দেশব্যপি তুলপার শুরু হয় বীরাঙ্গনা বীর সেনানীকে নিয়ে। নজরে আসায় ১৯৯৭ সালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁকে এক একর খাস জমি প্রদান ও বীরপ্রতিক উপাধি ঘোষণা করেন। ইতোমধ্যে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সম্মাননা, চিকিৎসা করিয়েছে। একজন দানশীল ব্যক্তির সহায়তায় হজ্বও করেন।কেমন বীরমাতা?
দেশের জন্য জীবন বাজি রাখা এ মুক্তিযোদ্ধা কাকন বিবি থেমে থাকেননি। এলাকার উন্নয়নে নিজের অবস্থান থেকে কাজ করেছেন। তাঁর ইচ্ছায় ঝিরাগাঁওয়ে গ্রামবাসী বিদ্যুৎ পেয়েছে,পেয়েছে রাস্তাঘাট আর নলকূপ।এই যুদ্ধজয়ী নারী এলাকার মানুষের বিপদে-আপদে পাশে দাঁড়াতেন তার এ মানসিকতার প্রতিদানে তাঁর একমাত্র মেয়েকে বিগত নির্বাচনে এলাকাবাসী বিনা প্রতিদ্বন্দিতায় নারী সদস্য নির্বাচিত করেছে। মায়ের হয়ে মেয়ে সখিনা এখন এলাকার উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছেন।মৃত্যু
ব্রেন স্ট্রোক করে ২০১৭ সালের ২১ জুলাই সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন কাঁকন বিবি। দীর্ঘদিন চিকিৎসার চলাকালিন ২১ মার্চ বুধবার রাত ১১টা ৫ মিনিটে এখানেই মৃত্যুবরণ করেন বীর এই মুক্তিযোদ্ধা,বীরাঙ্গনা।⇘সংবাদদাতা: শামীম তালুকদার

খবর/তথ্যের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, সেবা হট নিউজ এর দায়ভার কখনই নেবে না।