ওয়ান-ইলেভেনের সেই ক্ষমতাধর জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী গ্রেপ্তার: অবসান হলো এক রহস্যময় অধ্যায়ের
২০০৭ সালের বহুল আলোচিত ও বিতর্কিত ‘ওয়ান-ইলেভেন’ (১/১১) এর অন্যতম প্রধান কারিগর এবং তৎকালীন প্রভাবশালী সেনাকর্তা সাবেক লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করেছে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। মঙ্গলবার গভীর রাতে রাজধানীর বারিধারা ডিওএইচএস এলাকায় এক ঝটিকা অভিযান চালিয়ে তাঁকে আটক করা হয়। পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তাঁর বিরুদ্ধে অর্থ পাচার, প্রতারণা এবং অবৈধভাবে বিপুল অর্থ আদায়ের একাধিক সুনির্দিষ্ট মামলা রয়েছে। দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকার পর অবশেষে আইনের মুখোমুখি হলেন এই রহস্যময় ব্যক্তিত্ব।
![]() |
| ওয়ান-ইলেভেনের কুশীলব মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী গ্রেপ্তার: উন্মোচিত হচ্ছে অন্ধকার অধ্যায় |
অন্ধকার ওয়ান-ইলেভেনের সেই দিনগুলো
২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ দেশে জরুরি অবস্থা জারি করার পর ক্ষমতায় আসে সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার, যার নেতৃত্বে ছিলেন ফখরুদ্দিন আহমেদ। সেই সময়ে পর্দার আড়ালে থেকে রাষ্ট্রক্ষমতার মূল নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠেন মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী।
তিনি ছিলেন গুরুতর অপরাধ দমন সংক্রান্ত জাতীয় সমন্বয় কমিটির সমন্বয়ক। এই কমিটির আড়ালেই মূলত যৌথ বাহিনীর অভিযান পরিচালিত হতো। সেই সময় বেগম খালেদা জিয়া, শেখ হাসিনা এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানসহ দেশের শীর্ষস্থানীয় রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের গ্রেপ্তার করা হয়।
অভিযোগ ওঠে, তাঁর প্রত্যক্ষ নির্দেশে রিমান্ডে নিয়ে অমানুষিক নির্যাতন এবং জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি আদায়ের মাধ্যমে অনেককে রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। বিশেষ করে ‘মাইনাস টু ফর্মুলা’ কার্যকর করার অন্যতম মাস্টারমাইন্ড হিসেবে তাঁর নাম বারবার আলোচনায় এসেছে।
জনশক্তি রপ্তানি ও শতকোটি টাকার দুর্নীতির পাহাড়
সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেওয়ার পর মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী বড় ধরনের বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন। হোটেল ব্যবসা থেকে শুরু করে জনশক্তি রপ্তানি—সবখানেই ছিল তাঁর একচেটিয়া আধিপত্য। তদন্তে উঠে এসেছে, মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর নামে তিনি একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট তৈরি করেছিলেন।
সরকার নির্ধারিত ফির বাইরে হাজার হাজার সাধারণ কর্মীর কাছ থেকে অতিরিক্ত লাখ লাখ টাকা আদায়ের মাধ্যমে তিনি কয়েকশ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং সিআইডির তদন্তে ১০০ কোটি টাকারও বেশি অর্থ পাচারের প্রমাণ পাওয়া গেছে, যার প্রেক্ষিতেই তাঁর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছিল।
জাতীয় পার্টিতে যোগদান ও রাজনীতির ঢাল
বিতর্কিত অতীত থাকা সত্ত্বেও তিনি রাজনীতিতে নাম লেখান এবং সাবেক রাষ্ট্রপতি এইচ এম এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টিতে যোগ দেন। পরবর্তীতে তিনি সংসদ সদস্যও নির্বাচিত হন। অনেকে মনে করেন, আইনি জটিলতা থেকে বাঁচতেই তিনি সংসদ সদস্যের পদটিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। কিন্তু ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর এবং দীর্ঘদিনের জনদাবি ও তদন্তের মুখে অবশেষে তাঁর শেষ রক্ষা হলো না।
ওয়ান-ইলেভেনের সেই অন্ধকার অধ্যায়ের অনেক অজানা সত্য এখন তাঁর জবানবন্দির মাধ্যমে প্রকাশ পাবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। ক্ষমতার দাপটে এক সময় যিনি ধরাকে সরা জ্ঞান করতেন, আজ তিনি একজন অভিযুক্ত হিসেবে কারাগারের প্রকোষ্ঠে। ইতিহাস তাঁকে কীভাবে বিচার করবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।







খবর/তথ্যের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, সেবা হট নিউজ এর দায়ভার কখনই নেবে না।