বছরে হাজার কোটি টাকার বিদ্যুৎ চুরি

S M Ashraful Azom
ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে বিদ্যুৎ চুরি বন্ধ করতে পারছে না ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ডিপিডিসি)। কোম্পানির কর্মীদের একটি অংশের সহযোগিতায় ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ছত্রছায়ায় এ বিদ্যুত্ চুরি করা হচ্ছে। মিটার টেম্পারিং, বাইপাস সংযোগ, অননুমোদিত সিলবিহীন মিটার ব্যবহারসহ নানা কৌশলে বিদ্যুত্ চুরি করছেন অসাধু গ্রাহকরা। ফলে ন্যায্য আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে ডিপিডিসি। আর দৃশ্যত এসব ক্ষতি পুষিয়ে নেয়ার জন্য দফায় দফায় দাম বাড়ছে বিদ্যুতের।
বিদ্যুত্, জ্বালানি  ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং ডিপিডিসি সূত্রে জানা যায়, গত দশ মাসে কোম্পানির বিশেষ টাস্কফোর্সের অভিযানে প্রায় দেড়শ’ বিদ্যুত্ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। বিদ্যুত্ চুরির দায়ে ক্ষতিপূরণ আদায় করা হয় আড়াই কোটি টাকার বেশি। কোম্পানির ৩৬টি এনওসিএস (আঞ্চলিক অফিস)-এর অন্তর্ভুক্ত সব এলাকাতেই বিদ্যুত্ চুরি হচ্ছে। অভিযান-অনুসন্ধানেও বন্ধ করা যাচ্ছে না দুর্বৃত্তপনা। যে সংখ্যক গ্রাহক বিদ্যুত্ চুরি করেন তার তুলনায় জরিমানাকৃত গ্রাহকের সংখ্যা সামান্যই। ফলে বছরে হাজার কোটি টাকার আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে ডিপিডিসি।
এ বছর ডিপিডিসি’র বিশেষ টাস্কফোর্স পরিচালিত অভিযানগুলোর তথ্যাদি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, গ্রাহকদের একটি বড় অংশ মিটার টেম্পারিং করে (মিটার ঘুরিয়ে ইউনিট কম দেখানো) অপেক্ষাকৃত কম বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করতে আগ্রহী। ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক, উভয়ক্ষেত্রেই চুরি হচ্ছে। এ জন্য তারা মূল সড়কের কমন সংযোগ তার থেকে সংযোগ টানেন। আবার পার্শ্ববর্তী বৈদ্যুতিক তার বা খুঁটি থেকে বাইপাস সংযোগ নেন। এছাড়া অনুমোদিত মিটার পুড়িয়ে ফেলে অননুমোদিত নতুন মিটার ব্যবহার করে বিদ্যুত্ চুরি করা হয়। আবার মিটারে বহু ইউনিট জমলেও রিডিং ইউনিট কম দেখিয়ে অনেকে বছরের পর বছর ধরে বিদ্যুত্ চুরি করছেন। এক্ষেত্রে মিটার রিডারকে ঘুষ দেয়া হয়। 
যেভাবে চুরি হচ্ছে বিদ্যুৎ
অভিযানের সময় বিদ্যুৎ চুরির অভিনব সব কৌশল বেরিয়ে আসছে। গত ২৬ এপ্রিলের অভিযানে দেখা যায়, ফার্মগেটের বাণিজ্যিক স্থাপনা ফার্মভিউ সুপার মার্কেটের মিটারের সিলগুলো প্রকৃত পেপার সিল নয়। পরে মিটার থেকে ডাটা ডাউনলোড করে দেখা যায়, ৩২১ দিন ধরে মিটারের ‘ওয়াই ফেজ’-এ রিডিং রেকর্ড করা হচ্ছে না। প্রাথমিকভাবে জানা যায়, ভবনটিতে অরেকর্ডকৃত বিদ্যুত্ সরবরাহের পরিমাণ এক লাখ ৯০ হাজার ৬৮৪ ইউনিট। এর মূল্য ১৪ লাখ ৩৯ হাজার টাকা। ৫ মের অভিযানে দেখা যায়, ৫৯, দিলকুশার একটি চারতলা বাণিজ্যিক ভবনের গ্রাহক উচ্চচাপের বিদ্যুত্ গ্রাহক হিসেবে বিবেচিত হওয়ার বিধান থাকলেও তিনি নিম্নচাপের বিদ্যুত্ গ্রাহক হিসেবে বিল নিচ্ছেন। এ ভবনটির মিটারেও কোনো সিল নেই। মার্চ মাসে ওই গ্রাহকের বিলে ২ হাজার ৫৯৩ ইউনিট দেখানো হলেও প্রকৃতপক্ষে তিনি ৪ হাজারের বেশি ইউনিট ব্যবহার করেন। বাইপাস সংযোগের মাধ্যমে ২০০৮ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০১৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বিদ্যুত্ ইউনিট ফাঁকি দিয়েছে এনসিসি ব্যাংকের তখনকার প্রধান কার্যালয়। এ সময় ১০ লাখ ২০ হাজার ১৫১ ইউনিট বিদ্যুত্ অবৈধভাবে ব্যবহার করা হয়। বিদ্যুৎ ট্যারিফ বিধি অনুযায়ী এ পরিমাণ বিদ্যুত্ চুরিতে ক্ষতিপূরণ বিল দাঁড়ায় ২ কোটি ৬৪ লাখ ৬০ হাজার টাকা। গত ২ জুলাইয়ে দেখা যায়, তেজগাঁও শিল্প এলাকার ইউরো মার্বেল এন্ড গ্রানাইট ইন্ডাস্ট্রিজের কারখানায় পুরনো মিটার গায়েব করে সিলবিহীন নতুন মিটার স্থাপন করা হয়েছে। ৬ বছরের বেশি সময় ধরে কারখানাটিতে মিটার রিডিং-এ ব্যাপক কারচুপি করা হচ্ছিল। পুরনো অনুমোদিত মিটারটি পাওয়া না যাওয়ায় এ স্থাপনায় কত ইউনিট বিদ্যুৎ চুরি হয়েছে তা জানা যায়নি। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, এর মাধ্যমে কোম্পানিটি কয়েক কোটি টাকা বিদ্যুৎ বিল ফাঁকি দিয়েছে। ৩০ জুনের অনুসন্ধানে জানা যায়, পূর্ব জুরাইনের একটি বহুতল ভবনে ৬০ হাজার ইউনিট মিটার রিডিং জমা রেখে বিল ফাঁকি দেয়া হয়। ২৩ জুনে দেখা যায়, লালবাগের উমেষ দত্ত রোডের এইচ বি গার্মেন্টসে পুরনো মিটার টেম্পারিংয়ের মাধ্যমে বিলে কারচুপি করা হত দীর্ঘদিন ধরে। প্রতি মাসে গড়ে ৫৯ হাজার ৯৪৮ ইউনিট হ্রাস করে বিল ধার্য করা হত। স্থানীয় এনওসিএস’র কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এ অনিয়মের সঙ্গে জড়িত। গত ১১ মের অভিযানে দেখা যায়, ৪১/৩, মালিবাগের সামনে এইচটি লাইন এক্সটেনশন করা হয়েছে। এভাবে অনৈতিকভাবে বিদ্যুৎ চুরি করা হয়।
এ প্রসঙ্গে ডিপিডিসি’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. নজরুল হাসান বলেন, গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুৎ চুরির ঘটনা এখনও একবারে বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। তবে নিয়মিত অভিযানের কারণে কমে আসছে। আর যে সকল কর্মকর্তা-কর্মচারী এ অনৈতিক কাজে জড়িত তাদের বিরুদ্ধেও তদন্ত সাপেক্ষে ধারাবাহিকভাবে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Know about Cookies
Ok, Go it!
To Top