![]() |
| ধুনটে শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছে অধ্যাপক ডা. মো. জাকির হোসেন গণগ্রন্থাগার |
বই পড়ার আনন্দে বদলে যাচ্ছে চরাঞ্চল: ধুনটে ডা. জাকির হোসেন গণগ্রন্থাগারের সাফল্য
বইয়ের আকর্ষণ ও আবেদন কোনোদিনই শেষ হয়ে যাবে না। 'বই পড়ি জীবন গড়ি' স্লোগানে প্রতিষ্ঠিত ‘অধ্যাপক ডা. মো. জাকির হোসেন গণগ্রন্থাগার’টির কার্যক্রমের মাধ্যমে বগুড়া জেলার ধুনট উপজেলাবাসীর হূদয়ে স্থান করে নিয়েছে। এ গ্রন্থাগারের অবস্থান ধুনট উপজেলার ঐতিহ্যবাহী গোসাইবাড়ী গ্রামে। বাংলা একাডেমির ফেলো, বিশিষ্ট লেখক, রংপুর মেডিকেল কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ, বর্তমানে টিএমএসএস মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ, মেডিসিনের দিকপাল চিকিৎসক ও সমাজসেবক অধ্যাপক ডা. মো. জাকির হোসেন তার নিজ এলাকার জনসাধারণের শিক্ষা ও জ্ঞানের প্রসারে এই গ্রন্থাগারটি প্রতিষ্ঠা করেন। গ্রন্থাগারটি সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তরের ‘ক’ ক্যাটাগরি ‘র তালিকাভুক্ত।
এলাকার যুবসমাজকে মাদকের আসক্তি, মোবাইল নিয়ে ব্যস্ততা, মোবাইল গেইমের করাল গ্রাস, বোহেমিয়ান জীবনযাপন, উচ্ছৃঙ্খলতার বদলে গ্রন্থাগারমুখী করেছে এই প্রতিষ্ঠান। বই পড়ার পাশাপাশি জ্ঞানের প্রতিযোগিতা, বৃত্তি প্রদান, কবিতা আবৃত্তি, পাঠচক্র, জ্ঞানভিত্তিক, বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজ গঠন, চিকিৎসা সচেতনতাসহ বিভিন্ন সমসাময়িক বিষয় নিয়ে নিয়মিত গঠনমূলক আলোচনা ও বৈঠক হয়ে থাকে। সোশ্যাল মিডিয়ার এই যুগে বই বিমুখ শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় মনোযোগ সৃষ্টি ও সাধারণ মানুষের মধ্যে পাঠাভ্যাস তৈরিতে এ গ্রন্থাগার ব্যাপক ভূমিকা রাখছে।
প্রতিদিন বিকেল হলেই পাঠক ও পড়ুয়ারা ছুটে আসেন পাঠাগারটিতে। এখানে সব বয়সী পাঠকদের জন্য বইপত্র পড়ার আধুনিক ব্যবস্থা রয়েছে। খুঁজে খুঁজে পছন্দের বইটি পড়েন পাঠকরা। কেউ পড়েন পত্রপত্রিকা। শিল্পসংস্কৃতির এক টুকরা স্নিগ্ধ পরিবেশ এই গ্রন্থাগারে সব সময়ই ছড়ানো থাকে। এ গ্রন্থাগারের সময়সূচি : শনিবার থেকে বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত খোলা থাকে (শুক্রবার বন্ধ)।
এ গ্রন্থাগারে জ্ঞানবিজ্ঞানের প্রায় ৫০টি শাখার ওপর বই আছে প্রায় সাড়ে চার হাজারের মতো। পত্রপত্রিকা ও সাময়িকী আছে। লাইব্রেরিতে বসে বইপড়া ছাড়াও সদস্যরা বাসাবাড়িতে নিয়ে যেতে পারেন। গ্রন্থাগারে পত্রিকা পড়ার আলাদা ব্যবস্থা আছে। লাইব্রেরিতে বই পড়তে কোনো টাকা লাগে না। বাড়িতে নিয়ে পড়তে হলে সদস্য হতে হয়। সদস্য হতে কোনো ফিস লাগে না, কিছু তথ্য ও ডকুমেন্টস প্রদান করতে হয়। লাইব্রেরি পরিচালনার জন্য একটি পরিচালনা কমিটি আছে। এই কমিটির সভাপতি হচ্ছেন অধ্যাপক ডা. মো. জাকির হোসেন। লাইব্রেরিতে একজন গ্রন্থাগারিক আছেন। বিভিন্ন সময়ে বাংলা একাডেমির একাধিক মহাপরিচালক, পরিচালক, বিশিষ্ট ব্যক্তি, সরকারের সচিব ও জনপ্রতিনিধিগণ এ গ্রন্থাগার পরিদর্শন করেছেন। প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম দেখে তারা অভিভূত হয়েছেন এবং লিখিত অনুভূতি প্রকাশ করেছেন।
প্রধান পৃষ্ঠপোষক ও প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাকির হোসেন বলেন, “ভবিষ্যৎ সৃষ্টিশীল নবীন সমাজ গঠনে দেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে সঙ্গতিপূর্ণভাবে পড়তে হয়, জানতে হয়। এই গ্রন্থাগারটি উপজেলার সৃজনশীল ব্যক্তিদের মনন ও মেধা বিকাশের সময়োপযোগী একটি পাঠাগার হিসেবে রূপান্তরিত হয়েছে। জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। বিবিধ প্রকারের গ্রন্থ পাঠ করে শিক্ষার্থী, তরুণ-যুবকসহ সব শ্রেণির মানুষ সমৃদ্ধ হয়েছেন। অনেক মানুষ আছেন, যারা বই পড়তে ভালোবাসেন অথচ নিয়মিত বই কিনে পড়ার সামর্থ্য নেই, তাদের জন্য সহজে বই পড়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে এই পাঠাগারের মাধ্যমে। ”
তিনি আরও বলেন, “যেখানে এই অস্থির যান্ত্রিক সময়ে তরুণ-তরুণীরা বই পড়ে না, সুকুমারবৃত্তি-সংস্কৃতি চর্চা করে না, অহোরাত্র মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত থাকে—সেখানে এই গ্রন্থাগার প্রজন্মকে বদলে দিতে ভূমিকা রাখছে। তাদেরকে বইমুখী, সমাজমুখী, মননশীল করছে। দেশের প্রতিটি এলাকায় এমন একটি করে গ্রন্থাগার স্থাপিত হলে বদলে যেতে পারে বর্তমান সামাজিক অস্থিরতা, ক্ষয়িষ্ণু পরিবেশ।”
![]() |
| পাঠাভ্যাসের গুরুত্ব তুলে ধরছেন ডা. জাকির হোসেন |
পাঠাভ্যাসের গুরুত্ব তুলে ধরছেন ডা. জাকির হোসেন
ছাত্রছাত্রী, গৃহিণীসহ বয়স্ক মানুষ এই প্রতিষ্ঠান থেকে বই আদান-প্রদান করেছেন। এই লাইব্রেরিতে পড়াশোনা করে নিজেদের সামনে চলার পথ খুঁজে পেয়েছেন। গ্রন্থাগারের সেবা গ্রহণ করে অনেকে দেশবিদেশে বেরিয়ে গেছেন। তারা আজ সমাজে নানা ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। এ গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠা লাভের পর অল্প সময়ে উক্ত গ্রামসহ আশপাশের গ্রামের দৃশ্যপট বদলে গেছে। প্রত্যন্ত এ জনপদে এবং এর আশপাশে কোনো লাইব্রেরি না থাকায় অনেকের শিক্ষাজীবন বাঁধাগ্রস্ত হতো। জনপদটি দারিদ্র্যপীড়িত সন্তানেরা শিক্ষাদীক্ষায় বেশি দূর যেতেও পারে না। এ গ্রন্থাগারটি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর সেই সংকট কেটে গেছে। তাদের জন্য সত্যিকার অর্থে শিক্ষার আলো নিয়ে এসেছে লাইব্রেরিটি। পাঠাগার আন্দোলনে এই লাইব্রেরি বড়ো একটি উদাহরণ। ডা. মো. জাকির হোসেন প্রতিষ্ঠিত এ রকম আরও ৭টি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তিনি নানা কল্যাণমুখী সামাজিক কাজকর্ম করে যাচ্ছেন। তার এসব প্রতিষ্ঠানের নানা অনুষ্ঠানে আমরা কয়েকবার অতিথি হিসেবে গিয়েছি।
অধ্যাপক ডা. জাকিরের একটি বিশেষ গুণ হলো যে কেউ অসুস্থ হলে তিনি জানতে পেলে সার্বিকভাবে সহযোগিতা করেন। ২৯.০৪.২০২৬ তারিখ পর্যন্ত প্রায় দেড় লাখ রোগীকে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা দিয়েছেন তিনি। তিনি বগুড়ায় বাস করেন। কিন্তু দেশজুড়ে ডক্টর কমিউনিটিজ নেটওয়ার্কের সঙ্গে তিনি ওতপ্রোতভাবে যুক্ত। তিনি তার পিতামাতার নামে প্রতিষ্ঠিত ডা. ওয়াছিম-ওয়ালেদা বহুমুখী কল্যাণ ফাউন্ডেশনের ফান্ড থেকে ২০০৫ সাল হতে ধুনটের স্থানীয় দুটি স্কুলে গোসাইবাড়ী এ এ উচ্চ বিদ্যালয় এবং তার পিতার দানকৃত জমিতে প্রতিষ্ঠিত গোসাইবাড়ী করিম বক্স ওয়াছিম উদ্দিন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের মেধাবী ও দরিদ্র শিক্ষার্থীদেরকে নিয়মিত শিক্ষাবৃত্তি, পোশাক ও জুতা-মোজা প্রদান করে।
তিনি ২০০৮ সালের ১৪ই নভেম্বর উচ্চ রক্তচাপ রোগী ও জনগণকে সচেতনতা করতে রংপুরে হাইপারটেনশন এ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার প্রতিষ্ঠা করেন। যাদের উচ্চ রক্তচাপ অথবা ডায়াবেটিস আছে তারা মাত্র ৫০ (পঞ্চাশ) টাকার বিনিময়ে রেজিস্টেশন করে এই প্রতিষ্ঠানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা পরামর্শ নিতে পারে এবং পরবর্তীকালে আজীবন ৪০ (চল্লিশ) টাকা প্রদান করে ফলোআপ করতে পারেন। প্রতিষ্ঠানটিতে বীর মুক্তিযোদ্ধা, অসচ্ছল ও প্রতিবন্ধী রোগীদের বিনামূল্যে চিকিৎসা পরামর্শ প্রদান করা হয়। প্রতিষ্ঠানটি রংপুরে হলেও সারাদেশের মানুষকে সেবা দিচ্ছে। এ প্রতিষ্ঠানে মানসম্মত ল্যাবের মাধ্যমে সাশ্রয়ী মূল্যে সকল রকম মেডিকেল ইনভেস্টিগেশনের জন্য বিশেজ্ঞ ডাক্তার, নার্স, প্যাথলজি, রেডিওলজি, ও ইমেজিংসহ অন্যান্য ইউনিটের দক্ষ মেডিকেল টেকনোলজিস্ট এবং টেকনিশিয়ন রয়েছে। সারাদেশে সচেতনতামূলক সেমিনার, উঠান বৈঠক, ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প, এনসিডি ক্যাম্প এবং দেশের অভ্যন্তরে জনসমাগমের বিভিন্ন মেলায় এ সেন্টারের অংশগ্রহণের মাধ্যমে চিকিৎসাসেবা প্রদান করেছে। তথ্যসূত্রে জানা যায়, এ প্রতিষ্ঠানে ২৯.০৪.২০২৬ তারিখ পর্যন্ত ৬০,৬০১ জন নিবন্ধনকৃত রোগী নিয়মিত চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করেছেন। তন্মধ্যে ৪৫,৭৯৭ জন উচ্চ রক্তচাপের রোগী রয়েছে। ফেব্রুয়ারি মাসব্যাপী অমর একুশে বইমেলায় এ প্রতিষ্ঠানের নিয়মিত অংশগ্রহণের মাধ্যমে বিনামূল্যে ব্লাড প্রেসার, ডায়াবেটিস ও বিএমআই নির্ণয় করে হাজার হাজার মানুষকে উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস শনাক্ত এবং শনাক্তকৃত রোগীদের রোগ সম্পর্কে কাউন্সেলিং করা হয়। উচ্চ রক্তচাপ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে, ডাটা সংরক্ষণ, রিসার্চ মেথডোলজিসহ কয়েকটি একাডেমিক প্রশিক্ষণ কোর্স ও গবেষণায় এটিই বাংলাদেশের একমাত্র প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠান থেকে ‘হাইপারটেনশন বার্তা’ নামে একটি পত্রিকা ও বেশ কয়েকটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে।
অধ্যাপক ডা. জাকির দীর্ঘ ৪২ বছর ধরে অধ্যাপনার সমান্তরালে পেশায় চিকিৎসক হিসেবে রোগীদের নিয়মিত চিকিৎসাসেবা প্রদানের পাশাপাশি নিজ গ্রামে কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপন, বয়স্ক ভাতা প্রদান, গুচ্ছগ্রামে জমিদাতা, মসজিদ, কবরস্থান প্রতিষ্ঠাসহ নানা সামাজিক কার্যক্রমে সক্রিয়ভাবে নিজেকে যুক্ত রেখেছেন। উচ্চ রক্তচাপ (হাইপারটেনশন) বিষয়ে সাধারণ পাঠক ও রোগীদের বোধগম্য বাংলা ভাষায় তার লেখা প্রথম বই ‘রক্তচাপ ও উচ্চ রক্তচাপ’ (২০২৪)। গ্রন্থটি সর্ব সাধারণমহলে ব্যাপক আদৃত হয়েছে। মানুষের প্রতি ভালোবাসার স্বরূপ তার এই কাজগুলো সফল, সার্থক ও স্বায়ী হবে দীর্ঘদিন। এ ক্ষেত্রে জনসমর্থন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা মনে করি, অধ্যাপক ডা. জাকিরের সামাজিক প্রতিষ্ঠানসমূহের অগ্রযাত্রা উত্তরোত্তর অব্যাহত থাকে, এটিই প্রত্যাশা। তার মতো অন্যরাও এগিয়ে আসুন এমন কাজে।
লেখক : প্রাবন্ধিক ও সাহিত্য-সমালোচক









খবর/তথ্যের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, সেবা হট নিউজ এর দায়ভার কখনই নেবে না।