সেবা ডেস্ক: বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসের বিচিত্র ও ঘটনাবহুল মুহূর্তগুলো নিয়ে প্রথম আলো’র বিশেষ প্রতিবেদন। গণপরিষদ থেকে দ্বাদশ সংসদ পর্যন্ত উদ্বোধনী দিনের নানা অজানা স্মৃতি।
![]() |
| পঞ্চম সংসদের প্রথম অধিবেশন নিয়ে ১৯৯১ সালের ৬ এপ্রিল দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত প্রতিবেদনছবি: সংগ্রামের নোটবুকের সৌজন্যে |
প্রথম আলো’র এক বিশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসের নানা রোমাঞ্চকর ও সংঘাতময় অধ্যায়। নবগঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের যাত্রা শুরুর মধ্য দিয়ে দেশে নতুন রাজনৈতিক আবহাওয়া তৈরি হয়েছে। প্রথম অধিবেশনেই বিরোধী দলের ওয়াকআউট আর উত্তপ্ত বাদানুবাদ নতুন কোনো বিষয় নয়, বরং দেশের সংসদীয় ঐতিহ্যেরই একটি অংশ। দ্বাদশ সংসদ ভেঙে যাওয়ার পর দীর্ঘ দুই বছর ছয় দিন বিরতি শেষে এই সংসদ শুরু হয়েছে। মাঝে রক্তক্ষয়ী জুলাই অভ্যুত্থান এবং বিশাল রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটে গেছে। পেছনের বারোটি সংসদের দিকে তাকালে দেখা যায়, প্রতিটি সংসদের শুরুটাই ছিল কোনো না কোনো নাটকীয়তায় ভরা। কখনো শপথ গ্রহণ নিয়ে বিতর্ক, কখনো অধিবেশন কক্ষে ধূমপানের মতো ঘটনা, আবার কখনো সাংবাদিকদের বর্জনের মধ্য দিয়ে সূচিত হয়েছে আইনসভার পথচলা। সংগ্রামের নোটবুক ওয়েবসাইটের নথিপত্র ব্যবহার করে প্রথম আলো এই অনুসন্ধানী প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে।
গণপরিষদ ও প্রথম সংসদ: লুঙ্গি পরে অধিবেশনে যোগদান
স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান রচনার জন্য ১৯৭২ সালের ১০ এপ্রিল প্রথম গণপরিষদের অধিবেশন বসে। তেজগাঁওয়ের সাবেক পূর্ব পাকিস্তান পরিষদে অনুষ্ঠিত সেই সভায় মাইকের সংকট আর বিশৃঙ্খলার মাঝেও এক অনন্য পরিবেশ ছিল। পাকিস্তান আমলের কোট-টাইয়ের আভিজাত্য ভেঙে নোয়াখালীর খাজা আহমদ লুঙ্গি ও শার্ট পরে অধিবেশনে যোগ দিয়ে নতুন এক নজির স্থাপন করেছিলেন। তখন নিয়ম না থাকলেও এক সদস্যকে অধিবেশন কক্ষে ধূমপান করতে দেখা গিয়েছিল। এরপর ১৯৭৩ সালের ৭ এপ্রিল শুরু হয় প্রথম জাতীয় সংসদ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে সেই সংসদ আড়াই বছর টিকে ছিল এবং সেখানেই সংবিধানের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনীগুলো আনা হয়েছিল।
দ্বিতীয় থেকে চতুর্থ সংসদ: বৈধতা বিতর্ক ও সাংবাদিকদের বর্জন
১৯৭৯ সালে দ্বিতীয় সংসদের শুরুতে স্পিকারের বৈধতা নিয়ে চরম বাকবিতণ্ডা শুরু হয়। উপরাষ্ট্রপতি আবদুস সাত্তারকে অস্থায়ী স্পিকার নিযুক্ত করার প্রতিবাদে আওয়ামী লীগসহ বিরোধী দলের ৫৩ জন সদস্য শপথ বর্জন করেন এবং অধিবেশন কক্ষে হট্টগোল সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে তাদের বের করে দিয়ে পুনরায় শপথ পাঠ করানো হয়েছিল। এরপর ১৯৮৬ সালে এরশাদ সরকারের অধীনে হওয়া তৃতীয় সংসদ বিএনপি বর্জন করে। আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ নিলেও তারা ভবনের বাইরে সিঁড়িতে বসে উন্মুক্ত সংসদ পরিচালনা করে প্রতিবাদ জানায়। ১৯৮৮ সালের চতুর্থ সংসদের চিত্র ছিল আরও ভিন্ন। সংবাদপত্র নিষিদ্ধ করার প্রতিবাদে সাংবাদিকেরা পুরো উদ্বোধনী অধিবেশন বর্জন করেছিলেন এবং জাসদের সদস্যরা এক মিনিটের জন্য ওয়াকআউট করে সংহতি প্রকাশ করেন।
পঞ্চম থেকে সপ্তম সংসদ: দুই বেগমের দ্বৈরথ ও বুড়ো আঙুল বিতর্ক
১৯৯১ সালের পঞ্চম সংসদে প্রথমবারের মতো খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা সংসদ নেতা ও বিরোধীদলীয় নেতার আসনে বসেন, যা আন্তর্জাতিক মহলে দুই বেগমের লড়াই হিসেবে পরিচিতি পায়। ১৯৯৬ সালে সপ্তম সংসদের শুরুতেই এক উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। আওয়ামী লীগ নেতা আ স ম আবদুর রব বিরোধী দলের দিকে আঙুল তুলেছিলেন বলে অভিযোগ ওঠে। বিরোধীদলীয় হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুক অভিযোগ করেন যে রব তাদের বুড়ো আঙুল দেখিয়েছেন। যদিও পরে জানা যায় যে তিনি মামলার সংখ্যা বোঝাতে দুই হাতের সাতটি আঙুল দেখিয়েছিলেন। এই বিষয়টি নিয়ে তৎকালীন রাজনীতিতে ব্যাপক হাস্যরসের সৃষ্টি হয়েছিল।
অষ্টম থেকে দ্বাদশ সংসদ: বর্জন ও অভ্যুত্থানের পথে যাত্রা
২০০১ সালের অষ্টম সংসদের প্রথম দিনেই বিরোধী দল আওয়ামী লীগ অনুপস্থিত ছিল। পুরো মেয়াদে তারা রাজপথের আন্দোলনে ব্যস্ত ছিল, যা শেষ পর্যন্ত ২০০৭ সালের ওয়ান-ইলেভেন বা জরুরি অবস্থা ডেকে আনে। ২০০৯ সালের নবম সংসদে বিএনপি রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের বিরুদ্ধে সংবিধান লঙ্ঘনের অভিযোগ এনে তার ভাষণ বর্জন করে ওয়াকআউট করে। ২০১৪ সালের দশম সংসদ ছিল বর্জনের সংসদ, যেখানে বিরোধী দল হওয়া সত্ত্বেও জাতীয় পার্টি সরকারের অংশ হয়ে কাজ করেছিল। ২০১৮ সালের একাদশ সংসদ ছিল রাতের ভোটের অভিযোগে বিতর্কিত। সবশেষে ২০২৪ সালের দ্বাদশ সংসদ মাত্র সাত মাস স্থায়ী ছিল। জুলাই মাসের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে ৫ আগস্ট সরকারের পতনের পর রাষ্ট্রপতি সেই সংসদ বিলুপ্ত ঘোষণা করেন। দীর্ঘ এই পরিক্রমায় দেখা যায়, বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রতিটি ধাপই ছিল আন্দোলন, সংঘাত এবং নানা বিচিত্র অভিজ্ঞতায় ভরপুর।
সূত্র: /সেবা হট নিউজ: সত্য প্রকাশ্যে আপোষহীন
ফিচার- নিয়ে আরও পড়ুন

রাষ্ট্রপতির কাছে শপথ নিয়ে এখন বিরোধিতা কেন: সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন

যুবকদের বেকার ভাতা দিয়ে অপমানিত করতে চাই না: জামালপুরে ডা. শফিকুর রহমান

বিএনপির পূর্ণাঙ্গ চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নিলেন তারেক রহমান

তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন: নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয়ে ঢাকবে রাজধানী

অবশেষে ট্রাভেল পাস হাতে পেলেন তারেক রহমান: ২৫ ডিসেম্বর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন চূড়ান্ত


খবর/তথ্যের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, সেবা হট নিউজ এর দায়ভার কখনই নেবে না।