ক্রিকেট দুনিয়া তখনও তার নাম জানে না। বাংলাদেশের প্রিয় মুখ তখনও তিনি হয়ে ওঠেননি।
সেই ২০১২ সালে তিনি ‘ইউটিউব সেনসেশন’ হয়ে গিয়েছিলেন। হঠাত্ করেই, সারা বিশ্বে, বিশেষত ইংল্যান্ডে জনপ্রিয় হয়ে উঠলো তার ছোট একটা ভিডিও ফুটেজ। ইউটিউবের ভিডিওটায় দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশি একজন ফাস্ট বোলার বাংলাদেশের মরা উইকেটে বুলেটের মতো বল ছুঁড়ছেন। ইংল্যান্ড অনূর্ধ্ব-১৯ দলের ব্যাটসম্যানরা রীতিমতো খাবি খাচ্ছেন সেই বোলিংয়ের সামনে।
কে এই ফাস্ট বোলার? কে আসছেন বাংলাদেশের ক্রিকেট কাঁপাতে!
নাম তার তাসকিন আহমেদ। সেদিন, সেই ২০১২ সালে, আন্তর্জাতিক অভিষেক হওয়ার দু’বছর আগে এক ইউটিউব ভিডিও দিয়ে তাকে সারা পৃথিবী চিনে ফেলেছিলো। তবে পৃথিবী যে তথ্য জানে না, তা হলো ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেই যুবদলের সিরিজেই হাঁটুতে একটা ব্যথা পেয়েছিলেন। যে ব্যথা কালক্রমে তাসকিনের পুরো ক্যারিয়ারটা গ্রাস করতে বসেছিলো, যে ব্যথা আজও তাসকিনকে টেস্ট ক্রিকেট থেকে দূরে রেখেছে। যে ব্যথা গত তিন বছর ধরে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট খেলতে দেয় না বাংলাদেশের এই সুদর্শন-দীর্ঘদেহী ফাস্ট বোলারকে।
অবশেষে সেই প্রতীক্ষার অবসান ঘটতে চলেছে। বাংলাদেশ জাতীয় দলের ফিজিও ও স্বয়ং তাসকিনের বোঝা যদি ভুল না হয়, প্রায় ৩২ মাস পর আসছে জাতীয় লিগ দিয়ে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ফিরছেন তাসকিন। আগামী পরশু সোমবার পরীক্ষায় তাসকিন ঠিকঠাক মতো উের যেতে পারলে ১৮ সেপ্টেম্বর শুরু হতে যাওয়া জাতীয় ক্রিকেট লিগের প্রথম রাউন্ডেই মাঠে দেখা যেতে পারে এই ফাস্ট বোলারকে। সর্বশেষ ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে খেলেছিলেন প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট; বিসিএল ফাইনাল।
তাসকিন নিজে খুবই আশাবাদী। এখনও তাকে ফিজিও বা বোর্ডের কেউ আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু না জানালেও তিনি বুঝতে পারছেন, আবার কোনো দুর্বিপাক না হলে এই জাতীয় লিগে ফেরাটা তার সময়ের ব্যাপার মাত্র, ‘এখন টের পাচ্ছি, আমি পারবো। আমাকে নিয়ে ফিজিও ও ট্রেনার অনেক বাড়তি কষ্ট করছেন। আমিও গত তিনটে বছর ধরে এই ফেরার জন্যই কষ্ট করে যাচ্ছি। কেউ এখনও কিছু বলেনি। তবে বুঝতে পারছি, এবার খেলা সম্ভব। সবকিছু এমন চললে প্রথম ম্যাচেই খেলতে পারি।’
তাসকিনের কথায় ঈষত্ সমর্থন পাওয়া গেলো ফিজিও বায়োজিদ ইসলাম খানের কণ্ঠেও। তিনি বলছেন, তাসকিনের উন্নতি যেভাবে চলছে, তাতে এবার জাতীয় লিগে কিছু ম্যাচ এই পেসার খেলতে পারবেন। তবে প্রথম ম্যাচেই খেলতে পারবেন কি না, সেটা একটু সময় নিয়ে বলতে চান, ‘আসলে আমরা তো অনুমতি দেবো না। সেটা বোর্ড ঠিক করবেন, ও খেলবে কি না। তবে ওর উন্নতি খুব ভালো। সর্বশেষ যে চোট ছিলো ভারতের বিপক্ষে, সেটার ধাক্কা পুরোই কাটিয়ে উঠেছে। এখন যে অবস্থা, ওর জাতীয় লিগে কিছু ম্যাচ খেলা সম্ভব। আমরা সোমবার আরেক দফা পরীক্ষা করবো। সব ঠিক থাকলে বোর্ডকে জানাবো যে, ওকে নির্বাচনের জন্য পাওয়া যাবে।’
এরকম একটা ঘোষণার জন্য তাসকিন যে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন, তা আর বুঝিয়ে বলতে হয় না। জাতীয় লিগ খেলা তো উপলক্ষ। আসল ব্যাপার হলো, স্বপ্নের টেস্ট খেলতে চান, ‘দেখুন, আমাকে তো নামতেই হবে মাঠে একসময়। না খেললে বুঝতে পারবো না, আসলেই লংগার ভার্শন খেলতে পারবো কি না। আমি খেলতে চাই। জাতীয় লিগ বা বিসিএল না খেললে আমাকে তো টেস্ট দলে নেবে না। আর টেস্ট না খেলতে পারলে ক্রিকেট খেলার আর অর্থ কী!’
টেস্ট খেলার এই আপ্রাণ আকুতি নিয়ে কথা বলতে থাকা তাসকিনের কিন্তু স্বীকৃত ক্রিকেটে যাত্রা শুরু হয়েছিলো লংগার ভার্শন দিয়েই। ২০১০ সালে কলকাতার বিপক্ষে অনূর্ধ্ব-১৭ দলের হয়ে তিন দিনের ম্যাচ খেলে শুরু করেছিলেন। পরের দুটো বছর বয়সভিত্তিক ক্রিকেটে নিজেকে দারুণ প্রমাণ করেছেন। কিন্তু প্রথম ঝামেলাটা হয় ২০১২ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে অনূর্ধ্ব-১৯ দলের সিরিজে। হাঁটুতে চোট পান তিনি। এই চোট নিয়ে ২০১৩ সালের শুরু পর্যন্ত খেলেছেন। কিন্তু সে বছরই বিপিএলে ওই হাঁটুতে চূড়ান্ত এক চোট পেয়ে দেড় বছরের জন্য ছিটকে যান ক্রিকেট থেকে।
এর আগে ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে সর্বশেষ প্রথম শ্রেণির ম্যাচ খেলেছেন বিসিএলের ফাইনালে; সেখানেও প্রথম ইনিংসে ৩ উইকেট নিয়েছিলেন। বিসিএলে সাকুল্যে ওই একটাই ম্যাচ খেলেছেন। আর সব মিলিয়ে প্রথম শ্রেণির ম্যাচ খেলেছেন এ পর্যন্ত দশটি। বাকি ৯টি খেলেছেন জাতীয় লিগে।
এরপর আন্তর্জাতিক অভিষেক হয়েছে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট দিয়ে। কাঁপিয়েছেন ওয়ানডে অভিষেকেও। কিন্তু সাদা পোশাক আর পরা হয়নি। অবশেষে আবার সেই জাতীয় লিগ দিয়েই ফেরার অপেক্ষা।

