নিরাপত্তার অজুহাতে অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেটদলের বাংলাদেশ সফর স্থগিত করা হয়েছে। তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল গতকাল এই অজুহাতকে ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন। আজ সোমবার দু’টি টেস্ট ও একটি প্রস্তুতিমূলক ম্যাচ খেলতে বাংলাদেশ সফরে আসার কথা ছিল অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেটদলের। অস্ট্রেলীয় নাগরিকদের জন্য বাংলাদেশকে অনিরাপদ হিসেবে উল্লেখ করে দেশটির পররাষ্ট্র ও বাণিজ্যবিষয়ক অধিদপ্তর (ডিএফএটি) গত শুক্রবার প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। তারই ফলশ্রুতিতে বাংলাদেশ সফরের ব্যাপারে আপাতত ‘ধীরে চলা’র নীতি গ্রহণ করেছে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া।
ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার এই ঘোষণার পর ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার নিরাপত্তা প্রধান শন ক্যারল গতকাল রবিবারই ঢাকায় এসেছেন। গতকালই তিনি প্রভাবশালী দু’টি গোয়েন্দা সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। আর আজ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করে নিরাপত্তা চিত্রের কথা জানাবেন তিনি। ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার প্রধান নির্বাহী জেমস সাদারল্যান্ড গতকাল ব্রিসবেনে সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘বাংলাদেশ সফরে দল পাঠানোর ব্যাপারে আমরা যথেষ্ট আগ্রহী। কিন্তু খেলোয়াড় ও সাপোর্ট স্টাফদের নিরাপত্তার ব্যাপারটি আমাদের কাছে অগ্রাধিকার।’ সাদারল্যান্ড বলেন, ‘বাংলাদেশে গিয়ে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা যে প্রতিবেদন আমাদের দেবেন, সেটা থেকেই আমরা পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেব।’
আজ সোমবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পর শন ক্যারল যে ঘোষণা দিবেন সেটাই হয়তো চূড়ান্ত, অর্থাত্ অস্ট্রেলিয়া আসছে কি-না সেটা আজই নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে। ক্যারল গতকাল ঢাকায় পৌঁছেই সোজা চলে যান অস্ট্রেলিয়া দূতাবাসে। সেখানে তিনি বৈঠক করেন বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান পাপনের সঙ্গে। বাংলাদেশের বোর্ড প্রধানের সঙ্গে ছিলেন ক্রিকেট বোর্ডের অন্যতম পরিচালক মাহবু্ব আনাম ও প্রধান নির্বাহী নিজামউদ্দিন চৌধুরী। বৈঠকের ব্যাপারে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বিসিবি সভাপতি বলেন, ‘সফরের ব্যাপারে আমরা আশাবাদী। তাদের নিরাপত্তাদলের সঙ্গে আমাদের আলাপ হয়েছে। তারা বাংলাদেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে একটি প্রতিবেদন জমা দেবেন তাদের দেশে। সেই প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করেই জানা যাবে, অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট দল কবে নাগাদ বাংলাদেশ সফরে আসছে।’
বিসিবি সভাপতির সঙ্গে বৈঠকের পর শন ক্যারল গতকাল জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই) ও সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার (ডিজিএফআই) কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। আজ সোমবার তার দেখা করার কথা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের সঙ্গে।
ডিএফএটি তাদের প্রতিবেদনে বেশ কিছু ব্যাপারে অস্ট্রেলীয় নাগরিকদের জন্য বাংলাদেশকে ‘অনিরাপদ’ ভাবছে। এর মধ্যে আছে জঙ্গি তত্পরতা, ঢাকা শহরের ‘সহিংসতা’, বাংলাদেশের ধারাবাহিক রাজনৈতিক অস্থিরতা। পাশাপাশি পার্বত্য চট্টগ্রামের ‘অস্থিতিশীল’ পরিস্থিতিকেও উদ্বেগের কারণ হিসেবে তারা নির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করেছে। অতীতে বাংলাদেশে জঙ্গি হামলার বিষয়টিকে আমলে নিয়েছে ডিএফএটি। এ ছাড়া জঙ্গিগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বাংলাদেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়মিত অভিযানকেও তারা এ দেশে জঙ্গি তত্পরতার প্রমাণ হিসেবে মনে করছে। চলতি বছরের শুরুর দিকে বিরোধী জোটের রাজনৈতিক কর্মসূচি চলাকালে দেশব্যাপী যে সহিংস পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল, তাকেও আমলে নিয়েছে ডিএফএটি।
তবে অস্ট্রেলিয়ার ‘হঠাত্’ এই ঘোষণাকে স্বাভাবিকভাবে নিতে পারেননি বাংলাদেশের ক্রিকেট ভক্তরা। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগের সাইটগুলোতে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। সফরের ঠিক দুই দিন আগে এই ধরনের অপবাদের পেছনে অন্য কোন ষড়যন্ত্রের গন্ধ পাচ্ছেন তারা। ডিএফএটি নিরাপত্তা নিয়ে যেসব বিষয় উদ্বেগের কারণ বলে উল্লেখ করেছে সেসব বিষয় অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে। তারপর পাকিস্তান, ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দেশ বাংলাদেশ সফর করে গেছে। প্রতিটি দেশের সঙ্গে বাংলাদেশ সিরিজ জিতেছে। এসব কারণে অস্ট্রেলিয়া ভয়ও পেতে পারে বলে ধারণা অনেকের। রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেও গত বছর বাংলাদেশ সফলভাবে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ও এশিয়া কাপ আয়োজন করার পরও অস্ট্রেলিয়ার এই সিদ্ধান্তে বিস্ময় প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)।
অনেকে আবার বলছেন, আইএস বিরোধী অভিযানে সরাসরি অস্ট্রেলিয়া অংশ নেয়ায় মুসলিম দেশ হিসাবে বাংলাদেশে আসতে ভয় পাচ্ছে।
প্রসঙ্গত, বাংলাদেশের বিপক্ষে দু’টি টেস্ট খেলতে নতুন অধিনায়ক স্টিভ স্মিথের নেতৃত্বে আজ সোমবার ঢাকায় পৌঁছানোর কথা ছিল অস্ট্রেলিয়া দলের। আগামী ৯ অক্টোবর চট্টগ্রামের জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে প্রথম ও ১৭ অক্টোবর মিরপুর শের-ই-বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে দ্বিতীয় ও শেষ টেস্ট শুরু হওয়ার কথা। সফরসূচিতে ৩ অক্টোবর ফতুল্লার খান সাহেব ওসমান আলী স্টেডিয়ামে বিসিবি একাদশের বিপক্ষে তিন দিনের একটি প্রস্তুতি ম্যাচও খেলার কথা ছিল।

