বিদেশে বিনিয়োগের অনুমতি চান উদ্যোক্তারা

S M Ashraful Azom
বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় গ্যাস-বিদ্যুতের সরবরাহ দেশে নেই। চাহিদা অনুযায়ী জমিও পাওয়া যায় না। তার উপর রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বিনিয়োগকে বাধাগ্রস্ত করে। এ রকম পরিবেশে বিনিয়োগের সুযোগ নেই। তাই বিদেশে বিনিয়োগের অনুমতি চাইছেন উদ্যোক্তারা। গতকাল ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস ফোরাম অব বাংলাদেশ (আইবিএফবি) আয়োজিত মতবিনিময় সভায় এসব মতামত ব্যক্ত করেন তারা।
 
আইবিএফবির সভাপতি হাফিজুর রহমান খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. ফরাসউদ্দিন এবং বিশেষ অতিথি ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) সাবেক সভাপতি একে আজাদ।
 
ড. ফরাসউদ্দিন বলেন, বাংলাদেশে যেসব ক্ষেত্রে তুলনামূলক সুবিধা রয়েছে সে বিষয়গুলো বিবেচনা করে উদ্যোক্তারা বিনিয়োগ করতে পারেন। বিদেশি বিনিয়োগ পাওয়ার জন্য সরকার নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা দিয়েছে। এরপরও কিছু অনিশ্চয়তার কারণে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা প্রত্যাশা অনুযায়ী আসছেন না। অনিশ্চয়তা দূর করতে সরকারকে কাজ করতে হবে। এক্ষেত্রে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে কাজে লাগানোর পরামর্শ দেন তিনি।
 
ড. ফরাসউদ্দিন বলেন, রিজার্ভের অর্থ দিয়ে অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ করা যেতে পারে। তা করা হলে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা বিনিয়োগে আগ্রহী হবেন। তখন আর বিনিয়োগ করতে বিদেশে যাওয়ার প্রয়োজন হবে না। তাছাড়া উদ্যোক্তাদের জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী গ্যাস, বিদ্যুতের সরবরাহ দেয়ার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, বিশ্বের কোথাও গ্যাস দিয়ে বিদ্যুত্ উত্পাদন করা হয় না। বরং গ্যাস শুধু শিল্পে দেয়া হয়। বিষয়টি সরকারের ভাবা প্রয়োজন।
 
এফবিসিসিআইর সাবেক সভাপতি একে আজাদ বলেন, বিনিয়োগের জন্য যথেষ্ট পরিমাণে গ্যাস ও বিদ্যুত্ প্রয়োজন। আমরা তা পাচ্ছি না। সরকার বলছে, আগামী ১৫ বছর পর গ্যাসের সরবরাহ কমে যাবে। তখন এলএনজির (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) মাধ্যমে চাহিদা মেটানো হবে। কিন্তু এলএনজির জন্য সে ধরনের উদ্যোগও দেখা যাচ্ছে না। তাহলে আমরা কিভাবে কারখানা চালাবো? সরকারের দীর্ঘমেয়াদি কোন জ্বালানি নীতিমালাও নেই। কয়লা নীতিমালা নেই। কারখানায় জ্বালানির সরবরাহ নিয়ে আমরা এক ধরনের অন্ধকারের মধ্যে আছি। এ পরিবেশে আমরা কিসের ভিত্তিতে বিনিয়োগ করবো?
 
তিনি বলেন, কিছু দিন পর পর রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বিনিয়োগকে বাধাগ্রস্ত করছে। অথচ বিশ্বের অনেক দেশই সহজ শর্তে জমি ও জ্বালানি দিতে প্রস্তুত রয়েছে। সুতরাং আমাদের বিদেশে বিনিয়োগের সুযোগ দেয়া হোক।
 
সভায় অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন আইবিএফবির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী, ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি মতিউর রহমান, ট্যারিফ কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান, প্রথম আলোর বিজনেস এডিটর শওকত হোসেন মাসুম, ইত্তেফাকের বিজনেস এডিটর জামাল উদ্দীন, বণিকবার্তার সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ, ডেইলি সানের বিজনেস এডিটর গোলাম শাহনী প্রমুখ। অনুষ্ঠানে নিবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. ইসমাঈল হোসেন।
 
ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি মতিউর রহমান বলেন, আমরা এখন অর্থনীতিতে যে জায়গায় এসেছি তাতে দেশের বাইরে বিনিয়োগের অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। আমাদের দেশে দ্রুত নীতি পরিবর্তনকে সমস্যা তুলে ধরে তিনি বলেন, এখানে আগে থেকে কোন কিছু অনুমান করা যায় না। এটা বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তিনি অর্থনৈতিক অগ্রগতির স্বার্থে ব্যবসায়ী-নীতিনির্ধারকদের মানসিকতার পরিবর্তন জরুরি বলে অভিমত দেন।
 
মজিবুর রহমান বলেন, বাংলাদেশে ব্যবসায়িক খরচ অনেক বেশি। প্রতিযোগিতা সক্ষমতা না থাকলে পুঁজি বাইরে যাবেই। তাই জোর করে ধরে রাখা যাবে না। তবে শুরুতে আর্থিক ও সেবা প্রতিষ্ঠানের বাইরে বিনিয়োগে যাওয়া সুবিধাজনক হবে না বলে তিনি মন্তব্য করেন।
 
জামাল উদ্দীন বলেন, উদ্যোক্তাদের সুবিধা বিবেচনায় বিদেশে বিনিয়োগের অনুমতি দেয়ার সময় এসেছে। তবে বাংলাদেশই যেখানে বিদেশি বিনিয়োগ আনতে চেষ্টা করছে সেখানে আমাদের উদ্যোক্তারা বিদেশে বিনিয়োগ করলে কি ধরনের প্রভাব পড়বে তা ভাবা উচিত। তিনি আরও বলেন, দেশে গ্যাস বিদ্যুতের সংকট রয়েছে। জমির সংকট রয়েছে। যা বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এ বিষয়গুলো সমাধান করা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে কাজে লাগানো যায়।
 
নিবন্ধ উপস্থাপনকালে ড. ইসমাঈল হোসেন বলেন, বিদেশে বিনিয়োগ করলে শুধু অর্থ চলে যাবে এটা ভাবা ঠিক নয়, কারণ এর মাধ্যমে বড় অংকের অর্থ লভ্যাংশ হিসেবে ফেরতও আসবে। তাছাড়া এমনিতেই বাংলাদেশ থেকে ১ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে। যদি বিনিয়োগের অনুমতি দেয়া হয় তবে বৈধ পথেই টাকা যাবে।
 
দেওয়ান হানিফ মাহমুদ বলেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় বিদেশে বিনিয়োগের অনুমতি দেয়া যেতে পারে। তবে পাচার হয়ে যে অর্থ বিদেশে যাচ্ছে তার সাথে বিদেশে বিনিয়োগের তুলনা দেয়া ঠিক নয়। কারণ পাচারের সাথে বিনিয়োগের সম্পর্ক নেই।
 
সভায় বক্তারা বলেন, তাছাড়া বিদেশি গ্রাহকরা চায় আমাদের যেন তৃতীয় দেশের মাধ্যমে পণ্য সরবরাহ করার সক্ষমতা থাকে। তবে তারা কাজের পরিমাণও বাড়িয়ে দিবে। এসব বিবেচনায় বিদেশে বিনিয়োগের অনুমতি দেয়া প্রয়োজন। তবে সব খাতে বা সব দেশে না দিয়ে ধীরে ধীরে এ ব্যাপারে উদার হওয়া প্রয়োজন। সবার আগে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিদেশে বিনিয়োগের সুযোগ দেয়া দরকার। বক্তারা আরও বলেন, বিদেশে বিনিয়োগের অনুমতি দেয়া হলেও উদ্যোক্তারা কোথায় বিনিয়োগ করছেন বা তাদের উদ্দেশ্য কী তা সরকারকে নজরদারির মধ্যে রাখতে হবে।
ট্যাগস

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Know about Cookies
Ok, Go it!
To Top