লস্কর-ই তৈয়বার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে পাকিস্তান বাইরের দেশে হামলার জন্য পাকিস্তানের মাটি ব্যবহার করতে দেয়া হবে না যৌথ বিবৃতিকে স্বাগত জানালো ভারত
দক্ষিণ এশিয়ায় স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা বজায় রাখতে পরমাণু অস্ত্রের নিরাপত্তার ওপর জোর দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ। প্রেসিডেন্ট ওবামা পাকিস্তানকে পরমাণু অস্ত্রের আধুনিকায়ন না করতেও আহবান জানিয়েছেন। বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটনে মার্কিন প্রেসিডেন্টের বাসভবন ও সরকারি কার্যালয় হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে এই দুই শীর্ষ নেতার মধ্যে অনুষ্ঠিত হয়। পরে দুই দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যৌথ বিবৃতিতে এসব কথা জানানো হয়। বৈঠকে নওয়াজ শরিফ লস্কর-ই তৈয়বা ও আইএসের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার অঙ্গীকার করেন। এছাড়া বাইরের কোন দেশে হামলার জন্য সন্ত্রাসীদের পাকিস্তানের মাটি ব্যবহার করতে দেয়া হবে না। যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানের এই যৌথ বিবৃতির বিষয়ে সতর্ক প্রতিক্রিয়া দিয়েছে ভারত। দেশটি নওয়াজ শরিফের অঙ্গীকারের বাস্তবায়ন দেখতে চায়। খবর রয়টার্স, এনডিটিভি, ডন, এক্সপ্রেস ট্রিবিউন ও দ্য হিন্দু’র
পরমাণু অস্ত্রের নিরাপত্তা
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী পত্রিকা ওয়াশিংটন পোস্টে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়, পাকিস্তানের সঙ্গে অসামরিক পরমাণু চুক্তি করতে পারে যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু ওবামা ও নওয়াজের মধ্যে অনুষ্ঠিত বৈঠকে সেই চুক্তি হয়নি বলে জানা গেছে। যদিও পাকিস্তান সরকারের পক্ষ থেকে এই ধরনের কোনো চুক্তি করার বিষয়টি অস্বীকার করা হয়েছিল। উল্লেখ্য, ভারতের সঙ্গে ২০০৫ সালে অসামরিক পরমাণু চুক্তি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। দক্ষিণ এশিয়ায় দুই পরমাণু শক্তিধর দেশের মধ্যে উত্তেজনায় দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে যুক্তরাষ্ট্র। পাকিস্তানি কর্মকর্তারা এর আগে জানিয়েছিলেন, তারা ক্ষুদ্র পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারে কোনো নিষেধাজ্ঞা মানবে না। হোয়াইট হাউসের বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, নওয়াজ শরিফের সঙ্গে বৈঠকে কোনো ধরনের পরমাণু অস্ত্রের আধুনিকায়ন না করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন ওবামা। কারণ এই পদক্ষেপ এই অঞ্চলে নিরাপত্তা এবং অস্থিতিশীলতার ঝুঁকি তৈরি করবে বলে মন্তব্য করেছেন
ওবামা। উভয় নেতাই দক্ষিণ এশিয়াকে নিরাপদ করতে এবং নিরাপত্তা বজায় রাখতে ও কৌশলগত স্থিতিশীলতা ধরে রাখার স্বার্থে পরমাণু অস্ত্রের উন্নয়ন না করার ওপর জোর দেন। সম্প্রতি পাকিস্তানের পররাষ্ট্র সচিব জানান, পাকিস্তান ভারতের পক্ষ থেকে হামলা প্রতিরোধের জন্যই পরমাণু অস্ত্রের আধুনিকায়ন করছে। এরপর বিষয়টি নিয়ে দুই দেশের গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়। এক মার্কিন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, পরমাণু অস্ত্র নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও ওবামা প্রশাসন ইসলামাবাদের কাছে আটটি এফ-১৬ যুদ্ধবিমান বিক্রি করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। যদিও যৌথ বিবৃতিতে এই বিষয়ে কিছু উল্লেখ করা হয়নি। নওয়াজ শরিফ পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সহযোগিতার বিষয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
লস্কর ই-তৈয়বা ইস্যু
বৈঠকে ওবামা পাকিস্তান ভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন লস্কর-ই-তৈয়বা (এলইটি) এবং এর সহযোগী সংগঠনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে পাকিস্তানের প্রতি আহবান জানিয়েছেন। জবাবে নওয়াজ শরিফ এলইটি’র বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে অঙ্গীকার করেন। এদিকে এরই মধ্যে পাকিস্তান ব্যবস্থা নিতে শুরু করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গতকাল শুক্রবার পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনী লস্কর-ই-তৈয়বার ৫ জন সদস্যকে গ্রেফতার করেছে। তারা পবিত্র আশুরার অনুষ্ঠানে হামলার পরিকল্পনা করেছিল। এরা জঙ্গি সংগঠনটির ডেথ স্কোয়াডের সদস্য। ভারত দীর্ঘদিন ধরে এলইটি ইস্যুতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। গোষ্ঠীটির প্রধান হাফিজ সাঈদ ২৬/১১ মুম্বাই হামলার মূল পরিকল্পনাকারী বলে মনে করে ভারত। আর এই জঙ্গি সংগঠনটির প্রধান (অপারেশন) জাকি-উর-রহমান লাকভি বর্তমানে জামিনে মুক্ত আছেন। তার মুক্তির পর ভারত ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেছিল। বৈঠকে নওয়াজ শরিফ অঙ্গীকার করেন, বাইরের কোনো দেশে হামলার জন্য সন্ত্রাসীদের পাকিস্তানের মাটি ব্যবহার করতে দেয়া হবে না। তিনি জাতিসংঘ কর্তৃক নিষিদ্ধ সকল জঙ্গি সংগঠনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে ওবামাকে আশ্বস্ত করেন।
ভারত-পাকিস্তান আলোচনা
দক্ষিণ এশিয়ায় স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং উন্নয়নের স্বার্থে ওবামা ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের শান্তি আলোচনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। ওবামা দুই দেশের সীমান্ত এলাকা লাইন অব কন্ট্রোলে (এলওসি) সংঘাতের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি দুই দেশের মধ্যে আলোচনা শুরু করতে এবং এই প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে যুক্তরাষ্ট্র সব ধরনের সহযোগিতা দেবে বলে আশ্বাস দেন। দুই নেতাই কাশ্মীরসহ বিভিন্ন ইস্যুতে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে চলমান দ্বন্দ্ব নিরসনে শান্তিপূর্ণ সমাধানের ওপর গুরুত্ব দেন।
পাকিস্তানের বিদ্যুত্ কেন্দ্র
ভারতের উদ্বেগ আছে একটি বিষয়ে। তাহলো দুই দেশের মধ্যে বিরোধপূর্ণ জম্মু ও কাশ্মীরে পাকিস্তানের একটি পানি বিদ্যুত্ কেন্দ্র নির্মানকে কেন্দ্র করে। ভারত বরাবরই এই বিদ্যুত্ কেন্দ্র নির্মানের বিরোধিতা করে আসছে। তবে প্রেসিডেন্ট ওবামা জ্তালানি ও বিদ্যুতের চাহিদা পূরণে পাকিস্তানকে এ ব্যাপারে সহায়তা দেয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। এই বিদ্যুত্ কেন্দ্র নির্মিত হলে পাকিস্তানের বিদ্যুত্ সমস্যা অনেকটা দূর হবে বলে মনে করেন দেশটির কর্মকর্তারা। ভারত এর আগে চীন-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডোরের বিরোধিতা করেছিল। কারণ করিডোরের আওতায় এই বিদ্যুত্ কেন্দ্রটি রয়েছে। এমনকি বিষয়টি জাতিসংঘেও উত্থাপন করেছিলেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ।
এছাড়া বৈঠকে প্রেসিডেন্ট ওবামা তালেবানের সঙ্গে আফগান সরকারের স্থগিত শান্তি আলোচনা শুরু করতে পাকিস্তানকে সহায়তা করার আহবান জানান। ওবামা পাকিস্তানে মার্কিন দম্পতিকে জঙ্গিদের অপহরণ এবং জিম্মি রাখার বিষয়টিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। ২০১২ সালে এক মার্কিন দম্পতিকে অপহরণ করে জঙ্গিরা। দুই দেশ দক্ষিণ এশিয়ায় ইসলামিক স্টেট বা আইএসের বিরুদ্ধে একযোগে কাজ করবে বলেও দুই নেতার বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। শরিফ সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে পাকিস্তানকে সহায়তা দেয়ার জন্য ওবামাকে ধন্যবাদ জানান।
স্বাগত জানালো ভারত
যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানের যৌথ বিবৃতিকে স্বাগত জানিয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বিকাশ স্বরুপ গতকাল শুক্রবার রাজধানী নয়াদিল্লিতে এক ব্রিফিংয়ে বলেন, আমরা জানতে পেরেছি, ওবামার সঙ্গে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ এলইটি’ এবং এর সহযোগী সংগঠনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার অঙ্গীকার করেছেন। আমরা তার এই অঙ্গীকারকে স্বাগত জানাই, তবে আমরা এর বাস্তবায়ন দেখতে চাই। তিনি বলেন, পাকিস্তানের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা পর্যায়ে বৈঠক অনুষ্ঠানের ব্যাপারে ভারত প্রস্তুত। তিনি বলেন, সন্ত্রাসবাদের কথা নিয়ে যখন আলোচনা হয় তখন স্বাভাবকিভাবেই পাকিস্তানের নামটি মাথায় চলে আসে। পাকিস্তান-যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ বিবৃতিতেও এই বিষয়টি স্থান পেয়েছে।

