চোখের পানি পড়া রোগে আমরা সকলেই কমবেশী ভুগে থাকি। অক্ষিকোটরের উপরের দেয়ালের সামনে ও বাহিরের দিকে অশ্রু গ্রন্থি অবস্থিত। এই অশ্রু গ্রন্থি থেকে পানি তৈরী হয়ে নালীর সাহায্যে চোখে আসে এবং চোখকে ভিজিয়ে রাখে। বাহিরের ধূলাবালি ও ময়লা যা প্রতিনিয়ত আমাদের চোখে পড়ে তা চোখের পানির সাথে মিশে চোখের নাকের দিকের কোণায় আসে। নাকের দিকে চোখের দুই পাতা যেখানে মিলিত হয় তার ঠিক আগে চোখের উপরের ও নীচের পাতায় একটি করে ছিদ্র আছে। এই ছিদ্র দুইটিকে পাংটা বলে। এই ছিদ্র দুইটি দিয়ে চোখের পানি নালী বা ক্যানালিকুলাস-এর সাহাযে নেত্রথলিতে যায়। নেত্রথলি নাকের গোড়ার চামড়ার নীচে নাকের হাড়ের কুঠুরিতে অবস্থিত। নেত্রথলি থেকে পানি নেত্রনালীর সাহায্যে নাকের ভিতর প্রবেশ করে।
যদি কোন কারণে অতিরিক্ত পানি তৈরী হয় অথবা পানি তৈরীর পরিমাণ ঠিক আছে কিন্তু নেত্রনালী দিয়ে পানি যাওয়ার সময় বাধাপ্রাপ্ত হয় অর্থাত্ নেত্রনালী বন্ধ থাকে তখনই সেই পানি চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ে।
চোখ দিয়ে পড়ার কারণসমূহ
১.অতিরিক্ত পানি তৈরী হওয়া
lচোখ উঠলে
lচোখে কোন বস্তু বা ময়লা পড়লে
lচোখে কোন আঘাত লাগলে
lকর্ণিয়াতে ঘা হলে
lগ্লুকোমা, আইরিশের প্রদাহ ইত্যাদি চোখের রোগ হলে
lবেশী আবেগ হলে
চিকিত্সাঃ যে কারণে বেশী পানি তৈরী হয় তার চিকিত্সা করতে হবে।
২. নেত্রনালী বন্ধ হওয়া
(ক) শিশুদের নেত্রনালী বন্ধ হওয়াঃ কোন কোন শিশুর ক্ষেত্রে দেখা যায় জন্মের পর পরই চোখ দিয়ে সব সময় পানি পড়ে। কখনো কখনো কিছুটা পিচুটি জমে ও চোখ লাল হয়ে যায়। জন্মগতভাবে নেত্রনালী বন্ধ থাকলে এমন হয়। নেত্রনালীর নীচের দিকে একটি পর্দা থাকে। জন্মের পর পরই সাধারণত: এ পর্দা ফেটে গিয়ে নেত্রনালী খুলে যায়। কারো কারো ক্ষেত্রে এই পর্দা ফাটে না। ফলে নেত্রনালী বন্ধ থাকে ও চোখ দিয়ে পানি পড়ে।
চিকিত্সাঃ নেত্রথলির অবস্থানে চোখের কোণায় ম্যাসেজ করতে হবে দিনে ৩০-৪০ বার। সেই সাথে চোখে জীবাণু নাশক ফোঁটা দিতে হবে। নেত্রথলির অবস্থানে চোখের কোণায় ম্যাসেজ করলে নেত্রনালীর ভিতরের চাপ বেড়ে যায়। এতে নেত্রনালীর নীচের দিকের পর্দা ফেটে গিয়ে নেত্রনালী খুলে যায়। শতকরা ৯৫ ভাগ ক্ষেত্রে এতেই রোগ সেরে যায়। এক বত্সর বয়সের মধ্যে এ চিকিত্সায় রোগ ভাল না হলে প্রোবিং করে নেত্রনালী খুলে দেয়া হয়। এ পদ্ধতিতেও রোগ ভাল না হলে পরবর্তীতে ৩-৪ বত্সর বয়সে বা তার পরে অপারেশন করার দরকার হতে পারে।
(খ) বড়দের নেত্রনালী বন্ধ হওয়াঃ নেত্রথলিত প্রদাহ বা সংক্রমণ দেখা দিলে পরবর্তীতে নেত্রনালী বন্ধ হয়ে যায়। নেত্রনালী বন্ধ হয়ে গেলে চোখ দিয়ে পানি পড়ে। নেত্রথলির অবস্থানে চোখের কোণায় চাপ দিলে অনেক সময় পুঁজ মিশ্রিত পানি আসে। মাঝে মাঝে চোখের কোণা ফুলে যেতে পারে ও ব্যথা হতে পারে। আবার কখনো নেত্রথলি ফুলে ফোড়ার আকার ধারণ করতে পারে। একে নেত্রথলির ফোড়া বা ল্যাক্রিমাল অ্যাবসেস বলে। এতে চোখের কোণায় ভীষণ ব্যথা হয়্।
চিকিত্সাঃ প্রাথমিক অবস্থায় ওষুধ দ্বারা চিকিত্সা করা হয়। নেত্রথলির প্রদাহ থাকলে এন্টিবায়োটিক ওষুধ খেতে হয় এবং চোখে এন্টিবায়োটিক ফোঁটা দিতে হয়। ব্যথা থাকলে চোখের কোণায় নেত্রথলির অবস্থানে হালকা গরম স্যাঁক দিতে হয় ও বেদনা নাশক ওষুধ খেতে হয়। নেত্রথলির ফোড়া বা ল্যাক্রিমাল অ্যাবসেস হলে অপারেশনের মাধ্যমে পুঁজ বের করে দেয়া হয়। পরবর্তীতে সম্পূর্ণরূপে আরোগ্য লাভের জন্য অপারেশন করতে হয়। অপারেশন দুই ধরণের আছে। একটি হলো ডি,সি,আর বা ড্যাক্রোসিস্টোরাইনোস্টমি। এ পদ্ধতিতে নাকের হাড় ছিদ্র করে নেত্রথলির সামনের অংশের সাথে নাকের পর্দা জুড়ে দিয়ে নাকের সাথে নতুন রাস্তা তৈরী করে দেয়া হয়। এ পদ্ধতিতে অপারেশন করলে সাধারণত: চোখ দিয়ে পানি পড়া বন্ধ হয়ে যায়। অপর পদ্ধতি হলো ডি,সি,টি বা ড্যাক্রোসিস্টেক্টোমি। এ পদ্ধতিতে নেত্রথলি ফেলে দেয়া হয়। অতি বৃদ্ধ বয়সে এ পদ্ধতিতে অপারেশন করা হয়। নেত্রথলি ফেলে দিলে চোখ দিয়ে একটু একটু পানি পড়বে। তবে চোখের কোণা ফুলবে না বা ব্যথা হবে না ও চোখ দিয়ে পুঁজ বের হবে না।

