![]() |
| মুক্তিযোদ্ধা জলিলের দ্বিতীয় স্ত্রী জাহেরা ও তার ছেলে শরিফ মিয়া |
পুত্র শরিফ মিয়ার বয়স যখন এক বছর। জলিল চলে আসেন নিজ এলাকা জামালপুরের মেলান্দহ উপজেলার আগপয়লা গ্রামে। এরপর জলিল দ্বিতীয় স্ত্রী-পুত্রের খবর নেন নি। ওদিকে প্রথম স্ত্রীর সাথে সংসারকালে জলিলের ঘরে জন্ম নেয় আরো তিন সন্তান। এরা হলো আল আমিন, লিটন এবং জোহরা খাতুন। এদের মধ্যে আল আমিন কলেজ ছাত্র। বাকি দু’জন চাকরিজীবি। আব্দুল জলিল দ্বিতীয় স্ত্রী জাহেরা বেগম এবং পুত্র শরিফ মিয়ার কথা গোপন রাখেন। অল্প বয়সে বিয়ে হওয়ায় স্ত্রী জাহেরা বেগম স্বামীর নাম আব্দুল জলিল ছাড়া আর কিছুই জানতেন না। স্ত্রী জাহেরা বেগম (৫৬) এখন বয়োবৃদ্ধা। পুত্র শরিফ মিয়াও এখন দু’ সন্তানের জনক।
এভাবেই কেটে যায় প্রায় ৩৫ বছর। পিতা আব্দুল জলিলের সাথে পরিচয় হয় নি; পুত্র শরিফ মিয়ার। শরিফ মিয়া বড় হয়ে জানতে পারেন, পিতার নিরুদ্দেশের কথা। ২০০৫ সালে আব্দুল জলিল খবর পাঠায়-পুত্র শরিফ মিয়া এবং স্ত্রী জাহেরা বেগমকে একনজরে দেখবেন। তৎক্ষণে আব্দুল জলিল বয়সভারে কুব্জ, কোমায়। ভর্তি হয়েছেন ঢাকা শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে। এতদিন পর নিরুদ্দেশ জলিলের সন্ধান পেয়ে স্ত্রী জাহেরা বেগম এবং পুত্র শরিফ মিয়া ছুটে আসেন হাসপাতালে।
স্বামী আব্দুল জলিল জাহেরা বেগমকে বুকে জড়িয়ে কান্নাকাটি করেন। জাহেরা বেগমের কাছে ছেলের নাম ধরে আব্দুল জলিল বলেন, আমার পুত্র শরিফ মিয়া কোথায়? মা জাহেরা বেগম পুত্র শরিফ মিয়াকে পিতা আব্দুল জলিলের সাথে পরিচয়কালে এক হৃদয় বিদারক দৃশ্যের অবতারণা ঘটে।
আব্দুল জলিল সুস্থ্য হবার পর চলে আসেন গ্রামের বাড়ি মেলান্দহের আগপয়লা গ্রামে। জলিলের খোঁজ নিতে আসেন দ্বিতীয় স্ত্রী জাহেরা বেগম এবং সন্তান শরিফ মিয়াও। জলিল ইউপি চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলী জিন্নাহসহ গণ্যমান্য ব্যক্তি-আত্মীয়-স্বজনদের ডেকে দ্বিতীয় স্ত্রী জাহেরা বেগম এবং ছেলে শরিফ মিয়াকে পরিচয় করিয়ে দেন। জলিলের মৃত্যুর পর সম্পদ এবং মুক্তিযোদ্ধার সম্মানী ভাতা দুই স্ত্রী এবং তাদের সন্তানদের মধ্যে সুষ্ঠু বন্টনের ওছিয়ত করেন। জলিল কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন-দ্বিতীয় স্ত্রী জাহেরা এবং সন্তান শরিফকে এতোদিন দুরে রেখে অন্যায় করেছেন। বিবেকের ধ্বংশনে তিনি অসুস্থ্য হয়ে পড়েছেন। এরপর থেকেই জাহেরা বেগম এবং শরিফ মিয়া টানা দুই বছর জলিলের নিজ বাড়িতেই অবস্থান করেন। ২০০৭ সালের দিকে বীরমুক্তিযোদ্ধা আব্দুল জলিল মারা যান।
ভূক্তভোগিদের অভিযোগ, আব্দুল জলিল মারা যাবার পর প্রথম স্ত্রীর সন্তানরা জাহেরা বেগম এবং তার সন্তান শরিফ মিয়াকে ওয়ারিশ হিসেবে মেনে নিচ্ছেন না। আব্দুল জলিলের মৃত্যুর কিছুদিন পরই জাহেরা বেগম এবং তার সন্তান শরিফ মিয়াকে এলাকা থেকে বিতাড়িত করে প্রথম স্ত্রীর সন্তানরা। দ্বিতীয় স্ত্রী-সন্তানকে জলিলের সম্পদ এবং মুক্তিযোদ্ধার সম্মানীর অংশ থেকেও বাদ রাখা হয়েছে। এ নিয়ে স্ত্রী জাহেরা বেগম এবং সন্তান শরিফ মিয়া মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রণালয়, জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল এবং স্থানীয় প্রশাসন বরাবরে আবেদন করেও কোন প্রতিকার পাচ্ছেন না। আব্দুল জলিলের মুক্তিযোদ্ধা গেজেট নং-২৬০৫, সনদ নং-১১৭১৩৮, ক্রমিক নং-২৩৯৬।
প্রয়াত বীরমুক্তিযোদ্ধা আব্দুল জলিলের প্রথম স্ত্রীর সন্তানদের বাড়িতে না পেয়ে, কথা হয় জলিলের নিকট আত্মীয়-পাড়া পড়শীদের সাথে। আগপয়লা গ্রামের আ: মান্নান (৯০), আবুল কাশেম (৬৭), বুলু মিয়া (৩৭)সহ আরো অনেকেই জানান-জলিল জীবিত থাকাবস্থায় দ্বিতীয় স্ত্রী জাহেরা বেগম এবং তার সন্তান শরিফ মিয়াকে পরিচয় করিয়েছেন। এ নিয়ে সালিশও করেছি। নরসিংদী জেলার শিবপুরের মাছিমপুর গ্রামের মাসুক মিয়া (৩৮) জানান-জলিলের সাথে হাসপাতালে প্রথম পরিচয়কালে এবং স্থানীয়ভাবে সালিশেও আমি উপস্থিত ছিলাম।
মাহমুদপুর ইউপি চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ জানান-আব্দুল জলিলের স্ত্রী জাহেরা বেগম এবং শরিফ মিয়াকে পরিচয় করিয়ে দেন। ছেলে শরিফের চেহারা দেখতে পিতা জলিলের মতোই। তখনো আমি ইলেক্টেট চেয়ারম্যান। তাদের থাকার জন্য টিন এবং জাহেরার নামে দু:স্থ মাতার কার্ডও করে দিয়েছি। এরপর দ্বিতীয় স্ত্রী এবং সন্তানদের অত্যাচারে তারা চলে গেছেন। মেলান্দহ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও মুক্তিযোদ্ধা সংসদের প্রশাসক তামিম আল ইয়ামীন জানান-ভুক্তভোগিদের দরখাস্ত পেয়েছি। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
-সেবা হট নিউজ: সত্য প্রকাশে আপোষহীন


খবর/তথ্যের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, সেবা হট নিউজ এর দায়ভার কখনই নেবে না।