![]() |
| বিশ্ব উচ্চ রক্তচাপ দিবস: সচেতনতা ও প্রতিরোধে কিংবদন্তি চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. জাকির হোসেনের অবদান |
বিশ্ব উচ্চ রক্তচাপ দিবস: সচেতনতা, প্রতিরোধ এবং একজন ডা. জাকির হোসেন
প্রতি বছর ১৭ মে বিশ্বব্যাপী 'বিশ্ব উচ্চ রক্তচাপ দিবস' পালিত হয়। উচ্চ রক্তচাপ বা 'নীরব ঘাতক' (Silent Killer) সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি, প্রতিরোধ, শনাক্তকরণ এবং নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে ওয়ার্ল্ড হাইপারটেনশন লীগ (WHL) ২০০৫ সাল থেকে এই দিনটি পালন করে আসছে। এবারের ১৭ই মে রবিবার বিশ্ব উচ্চ রক্তচাপ দিবসের (World Hypertension Day) প্রতিপাদ্য : Controlling Hypertension Together! যা ওয়ার্ল্ড হাইপারটেনশন লীগ (WHL) কর্তৃক তৈরি যার মূলভাব হলো একসাথে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ এবং এতে ট্যাগলাইন হিসেবে রয়েছে নিয়মিত আপনার রক্তচাপ পরীক্ষা করুন, নীরব ঘাতককে পরাজিত করুন।
বাংলাদেশে উচ্চ রক্তচাপ আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে চলেছে। এ রোগে শুধু একজন ব্যক্তির নয়, তার পুরো পরিবারের জন্য বিপর্যয় বয়ে আনে। এ রোগ শুধু শারীরিক নয়, মানসিক এবং অর্থনৈতিক বিপর্যয়ও ঘটায়। বাংলাদেশে গত কয়েক বছরে উচ্চ রক্তচাপ আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। দেশে গড়ে এক-চতুর্থাংশ মানুষের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপ রোগটি রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফলে এ রোগটির সুচিকিৎসার কথাটি প্রথমেই চলে আসে। এ রোগ প্রতিরোধে সচেতনতার বিকল্প নেই। সচেতনতা উচ্চ রক্তচাপ প্রতিরোধে ভূমিকা রাখতে পারে। উচ্চ রক্তচাপ বা হাই ব্লাড প্রেসার নীরব ঘাতক ব্যাধি হিসেবে অভিহিত। সাধারণত অন্যান্য রোগের মতো এই রোগের কোনো উপসর্গ থাকে না এবং তেমন কোনো কষ্ট অনুভূত না হওয়ায় অধিকাংশ মানুষ রোগটির চিকিৎসা গ্রহণে উদ্যোগী হয় না কিংবা চিকিৎসা নিলেও চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ না করে নিয়মিত ওষুধ সেবন বন্ধ করে দেয়। রক্তচাপ স্বাভাবিক মাত্রায় না থাকলে আমাদের অজান্তেই হৃৎপিণ্ড, মস্তিষ্ক, কিডনি, চোখ ও রক্তনালীগুলোর নানা রকম ক্ষতি হতে থাকে। ফলে আমরা আকস্মিক হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক ও কিডনি রোগের মতো গুরুতর রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকি। এমনকি এই রোগের জটিলতায় পরিণামে বরণ করে নিতে হতে পারে পঙ্গুত্ব অথবা অকাল মৃত্যু।
স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপনের মাধ্যমে উচ্চ রক্তচাপ রোগটিকে যেমন প্রতিরোধ করা সম্ভব তেমনি যথাযথ চিকিৎসা নিয়ে এ রোগ নিয়ন্ত্রণ করার মাধ্যমে এই ঝুঁকিগুলোও অনেকাংশে কমানো সম্ভব। প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে এদেশে এই রোগের চিকিৎসা দেওয়ার মতো সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বড়ই অভাব। বাংলা একাডেমির ফেলো, বিশিষ্ট লেখক, রংপুর মেডিকেল কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ, বর্তমানে টিএমএসএস মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ, মেডিসিনের দিকপাল চিকিৎসক ও সমাজসেবক অধ্যাপক ডা. মো. জাকির হোসেন এই মারাত্মক ব্যাধির সমস্যায় সর্ব প্রথম এগিয়ে এসেছেন। তিনি ২০০৮ সালের ১৪ই নভেম্বর উচ্চ রক্তচাপ রোগী ও জনগণকে সচেতনতা করতে রংপুরে হাইপারটেনশন এ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার প্রতিষ্ঠা করেছেন। বাংলাদেশে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে তার প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান এবং তিনি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এসেছেন। অধ্যাপক ডা. জাকির হোসেন এবং তার এই প্রতিষ্ঠানের অকৃত্তিম সেবাধর্মী কাজের জন্য বাংলাদেশের চিকিৎসকদের আইকন হয়েছেন। উচ্চ রক্তচাপ রোগের চিকিৎসায় এদেশে তার অবদান অলোকসামান্য।
হাইপারটেনশন এ্যান্ড রিসার্চ সেন্টারটির মাধ্যমে অধ্যাপক ডা. জাকির উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস রোগীদের কমিউনিটি লেবেলে প্রাথমিক পর্যায়ে রোগটি শনাক্ত করেছেন এবং কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছেন। ফলে স্টোক, অন্ধত্ব, হার্ট অ্যাটাক, কিডনি ফেইল্যুরের মতো নানাবিধ জটিলতা থেকে অসংখ্য রোগী বেঁচে যাচ্ছেন। যাদের উচ্চ রক্তচাপ অথবা ডায়াবেটিস আছে তারা মাত্র ৫০ (পঞ্চাশ) টাকার বিনিময়ে রেজিস্টেশন করে এই প্রতিষ্ঠান থেকে বিশেজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে পারেন এবং পরবর্তী কালে ৪০ (চল্লিশ) টাকা প্রদান করে আজীবন ফলোআপ করতে পারেন। প্রতিষ্ঠানটিতে বীর মুক্তিযোদ্ধা, অসহায় দুঃস্থ ও প্রতিবন্ধী রোগীদের বিনামূল্যে চিকিৎসা পরামর্শ প্রদান করা হয়।
আমরা মনে করছি, অধ্যাপক ডা. জাকিরের জীবনে এই প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলা এক বিরাট মহত্তম কাজ। তিনি এই প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও প্রধান পৃষ্ঠপোষক। অধ্যাপক ডা. জাকির দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে অদ্যবধি বিনামূল্যে এই প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধিত রোগীদের চিকিৎসাসেবা প্রদান করে আসেছেন। তথ্যসূত্রে জানা যায়, এ প্রতিষ্ঠানে ২৯.০৪.২০২৬ তারিখ পর্যন্ত ৬০,৬০১ জন নিবন্ধনকৃত রোগী নিয়মিত চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করেছেন। তন্মধ্যে ৪৫,৭৯৭ জন উচ্চ রক্তচাপের রোগী রয়েছে। ডা. জাকিরের একটি বিশেষ গুণ হলো কেউ অসুস্থ হলে তিনি জানতে পেলে সার্বিকভাবে সহযোগিতা করেন। যেখানে বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের চিকিৎসাসেবা প্রদান প্রায় অসম্ভব সেখানে এবং দেশের বিভিন্ন জায়গায় বিনামূল্যে রোগীদের চিকিৎসা সেবা প্রদানের লক্ষ্যে নির্দিষ্ট সময় পর পর তিনি নিয়মিত ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প ও জনসমাগমের বিভিন্ন মেলায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে দেশব্যাপী চিকিৎসা সেবা দিয়ে এসেছেন। এ সকল ক্যাম্পে নির্ধারিত চিকিৎসগণ ছাড়াও স্বয়ং তিনি প্রতি মাসে মাসে পূর্ব ঘোষণা দিয়ে কিংবা নির্দিষ্ট দিনে উপস্থিত থেকে চিকিৎসা কেন্দ্রে বা ক্যাম্পে বিনামূল্যে রোগী দেখে এসেছেন। তার চিকিৎসাসেবার এই প্রয়াস গণমানুষের জনস্বাস্থ্য উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। গত ২৯.০৪.২০২৬ তারিখ পর্যন্ত তিনি ব্যক্তিগতভাবে প্রায় দেড় লাখ রোগীকে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা দিয়েছেন। তিনি বগুড়ায় বাস করলেও দেশজুড়ে ডক্টর কমিউনিটিজ ও হাসপাতাল নেটওয়ার্কের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত।
অধ্যাপক ডা. জাকিরের হাইপারটেনশন এ্যান্ড রিসার্চ সেন্টারটিতে বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার, নার্স, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, টেকনিশিয়ন রয়েছেন। এখানে স্বল্পমূল্যে এবং ক্ষেত্র বিশেষে বিনামূল্যে সকল রকম ল্যাব ইনভেস্টিগেশন হয়। প্রতিষ্ঠানটি রংপুরে হলেও সারাদেশের মানুষকে সেবা দিচ্ছে। বিশেষ করে রংপুরের বাইরে বগুড়া, নাটোর, রাজশাহী, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাও, দিনাজপুর, ঢাকাসহ বিভিন্ন জায়গায় সচেতনতমূলক সেমিনার, উঠান বৈঠক, মেডিকেল ক্যাম্প, এনসিডি ক্যাম্প করে উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস সম্পর্কে জনসচেতনতা করেছে।
প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি মাসব্যাপী বাংলা একাডেমির অমর একুশে বইমেলায় হাইপারটেনশন এ্যান্ড রিসার্চ সেন্টারের নিয়মিত অংশগ্রহণের মাধ্যমে বিনামূল্যে ব্লাড প্রেসার, ডায়াবেটিস ও বিএমআই নির্ণয় করে হাজার হাজার মানুষকে উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস শনাক্ত এবং শনাক্তকৃত রোগীদের রোগ সম্পর্কে কাউন্সেলিং করা হচ্ছে। এ প্রতিষ্ঠানে আধুনিক প্রযুক্তি সম্পন্ন ডিজিটাইজেশনের মাধ্যমে কমিউনিটি লেভেলে বিনামূল্যে উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস শনাক্তকরণ ও চিকিৎসা প্রদান কার্যক্রম সুনিপুণভাবে সম্পাদন করা হয়। উচ্চ রক্তচাপ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে, ডাটা সংরক্ষণ, রিসার্চ মেথডোলজিসহ কয়েকটি একাডেমিক প্রশিক্ষণ কোর্স ও গবেষণায় এটিই বাংলাদেশের একমাত্র প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠান থেকে একটি হাইপারটেনশন পত্রিকা প্রকাশিত হয়। প্রতিষ্ঠান থেকে কয়েকটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। কিংবদন্তি চিকিৎসক অধ্যাপক জাকির ও তার প্রতিষ্ঠান দেশে উচ্চ রক্তচাপ সম্পর্কে জনসাধারণের মধ্যে সচেতনতা তৈরি ও রোগ নিয়ন্ত্রণে স্মরণীয় ভূমিকা রেখে চলেছেন।
অধ্যাপক ডা. জাকির হোসেন তার ব্যক্তিগত জীবনের উল্লেখযোগ্য সময় ও উপার্জিত অর্থের অনেকটাই ব্যয় করেন সমাজসেবায়। তিনি মানুষের কল্যাণে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। হাইপারটেনশন এ্যান্ড রিসার্চ সেন্টারসহ তাঁর প্রতিষ্ঠিত আরও ৭টি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তিনি নানা কল্যাণমুখী সামাজিক কাজকর্ম ছড়িয়ে দিচ্ছেন। শিক্ষানুরাগী অধ্যাপক ডা. জাকির হোসেনের পিতা ডা. ওয়াছিম উদ্দিন আহমেদ (১৯১৫-১৯৯৪) নিজ এলাকায় বগুড়ার ধুনটের গোঁসাইবাড়িতে নারী শিক্ষার প্রসারে বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে জমি ও নগদ অর্থ দান করেন। এই অর্থে গোসাঁইবাড়ীতে করিম বকস ওয়াছিম উদ্দিন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় গড়ে উঠেছে। এই স্কুলটি আশির দশকের শুরুতে এমপিও ভুক্ত হয় যা পরবর্তীকালে অধ্যাপক ডা. জাকির হোসেনের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে বিদ্যালয়টির কাঠামোগত উন্নয়ন ঘটে। এ প্রতিষ্ঠানে ঝড়ে পড়া ও পিছিয়ে পড়া কোমলমতি শিক্ষার্থীরা যাতে শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত না হয় সেই জন্য তিনি শিক্ষার্থীদের নিয়মিত পাঠ ̈সামগ্রী ও নগদ অর্থ বিতরণ করে এসেছেন। অধ্যাপক ডা. জাকির ও তার পরিবারের অপরাপর সদস্যদের সহযোগিতা এবং প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধায়নে এ বিদ্যালয় পরিচালনায়সহায়ক ভূমিকা রাখছেন। তাদের প্রদত্ত ডা. ওয়াছিম-ওয়ালেদা শিক্ষাবৃত্তি এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে। স্কুলটির কাঠামোগত উন্নয়নের জন্য তাদের নানা পরিকল্পনা রয়েছে।
অধ্যাপক ডা. জাকির বগুড়ার ঐতিহ্যবাহী গোসাইবাড়ী আমির উদ্দিন আয়েজ উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়ের কৃতী শিক্ষার্থীদেরকে ২০০৫ সাল থেকে শিক্ষাবৃত্তি প্রদান করেছেন। তার নেতৃত্বে রংপুর ও বগুড়া অঞ্চলে গড়ে ওঠেছে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু ও জ্যেষ্ঠ নাগরিকদের জন্য স্বাস্থ্য পরিচর্যায় দুটি প্রতিষ্ঠানসহ নিজ নামে 'অধ্যাপক ডা. মো. জাকির হোসেন গণগ্রন্থাগার'। এই গ্রন্থাগারে প্রবন্ধ, সাহিত্য, কবিতা, বিজ্ঞান, বিজ্ঞান কল্পকাহিনি, কিশোর সাহিত্য, উপন্যাস, রাজনীতি, ইতিহাস, খেলাধুলা, শিশুদের গল্প ও ধর্মীয় বইসহ জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রায় ৫০টি শাখার ওপর বই রয়েছে। পাঠাগারের বর্তমান বই সংখ্যা প্রায় সাড়ে চার হাজার। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ সংগ্রহের তালিকায় রয়েছে- বাংলাপিডিয়া, রবীন্দ্র-নজরুলের রচনাবলী, বাংলা একাডেমির বই, জেলা গেজেটিয়ার, জেলাভিত্তিক ইতিহাস ও মুক্তিযুদ্ধের বই প্রভৃতি। গ্রন্থাগারটি সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তরের ‘ক’ ক্যাটাগরি ‘র তালিকাভুক্ত। গ্রন্থাগারে পত্রিকা পড়ার আলাদা ব্যবস্থা আছে। লাইব্রেরিতে বই পড়তে কোনো টাকা লাগে না। বাড়িতে নিয়ে পড়তে হলে সদস্য হতে হয়। সদস্য হতে কোনো ফিস লাগে না, কিছু তথ্য ও ডকুমেন্টস প্রদান করতে হয়।
অধ্যাপক ডা. জাকির তার নিজের স্বোপার্জিত অর্থে প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৭টি, যেখানে প্রয়োজনীয় সংখ্যক দক্ষ শতাধিক কর্মী কর্মরত রয়েছেন। অধ্যাপক ডা. জাকির দীর্ঘদিন ধরে বয়স্ক, বিধবা, অস্বচ্ছল আত্মীয়স্বজনদের নিয়মিত হারে মাসিক ভাতা প্রদানসহ দুর্যোগ দুর্বিপাকে এলাকার মানুষের জন্য সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন। মসজিদ, ইদগাহ মাঠ, কবরস্থান, গুচ্ছগ্রামসহ নিজ গ্রামে নিজ নামে ‘অধ্যাপক ডা. মো. জাকির হোসেন কমিউনিটি ক্লিনিক’ নির্মাণে জমিসহ আর্থিক সহায়তা করছেন তিনি। ঈদের আনন্দ থেকে নিজ গ্রামের প্রান্তিক মানুষ যাতে বঞ্চিত না হয় সে জন্য তিনি প্রত্যেক বছর ঈদ উৎসবে ঈদ উপহার হিসেবে নগদ অর্থ ও খাদ্য সামগ্রী প্রদান করে থাকেন।
বর্ণাঢ্য কর্মজীবনে অধ্যাপক ডা. জাকির রংপুর মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ও অধ্যক্ষসহ বিভিন্ন সরকারি মেডিকেল কলেজে পেশাগত জীবন অতিবাহিত করেন। বর্তমানে বগুড়ার টিএমএসএস মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি বিসিএস ক্যাডার অফিসারদের স্বাস্থ্যবিষয়ক প্রশিক্ষণের প্রশিক্ষক এবং মেডিকেল সম্পর্কিত উচ্চতর ডিগ্রির অন্যতম শিক্ষক ও পরীক্ষক। দেশের অসংখ্য চিকিৎসক তার ছাত্র। অধ্যাপক ডা. জাকির ১৯৮৫ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করে সেখানেই চিকিৎসক হিসেবে কর্মজীবন শুরু। ১৯৯৪ সালে বাংলাদেশ কলেজ অব ফিজিশিয়ানস অ্যান্ড সার্জনস (বিসিপিএস) থেকে মেডিসিনে এফসিপিএস এবং ১৯৯৮ সালে তদানীন্তন আইপিজিএম অ্যান্ড আর যা সমকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতাধীন (বর্তমানে বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়) থেকে ইন্টারনাল মেডিসিনের ওপর এমডি ডিগ্রি অর্জন করেন।
২০০৫ সালে আমেরিকান কলেজ অব ফিজিশিয়ানস থেকে এফএসিপি এবং ২০১৩ সালে যুক্তরাজ্যের দি রয়েল কলেজ অব ফিজিশিয়ানস অব এডিনবার্গ থেকে এফআরসিপি ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। ডা. জাকির হোসেন কেবল একজন প্র্যাকটিসিং চিকিৎসকই নন, বরং একজন সক্রিয় গবেষক, লেখক। তিনি এবং তার সেন্টার এক বিশাল গবেষণা ভাণ্ডার।
চিকিৎসাবিজ্ঞান বিষয়ে এ পর্যন্ত প্রায় ১০০টির বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর দেশে-বিদেশে বিভিন্ন সেমিনারে উপস্থাপন করেছেন তিনি। বিভিন্ন মেডিক্যাল জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে তার ৪৫টির বেশি প্রবন্ধ। দেশের পত্রপত্রিকা ও টিভি চ্যানেলে স্বাস্থ্যসমস্যা ও সচেতনতা নিয়ে সাক্ষাৎকার ও আলোচনা অনুষ্ঠানে তিনি নিয়মিতভাবে অংশগ্রহণ করছেন এবং তা ব্যাপক জনপ্রিয়তাও পেয়েছে। উচ্চ রক্তচাপ রোগী ও ছাত্র-চিকিৎসকদের উন্নয়নে গ্রন্থ লিখেছেন ও প্রকাশ করেছেন তিনি।
অধ্যাপক ডা. জাকির উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস সম্পর্কে জনসাধারণকে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে তার সুদীর্ঘ চিকিৎসক কর্মজীবনের অভিজ্ঞতার আলোকে বাংলা ভাষায় প্রথম ‘রক্তচাপ ও উচ্চ রক্তচাপ ’ (২০২৪) বিষয়ে তিনি একটি বই লিখেছেন। এই বইটি উচ্চ রক্তচাপ বিষয়ে সাধারণ পাঠক ও রোগীদের বোধগম্য ভাষায় লেখা। এ বইটি উচ্চ রক্তচাপের রোগী ও তাদের স্বজন, সাধারণ মানুষসহ চিকিৎসাবিজ্ঞানের ছাত্রছাত্রী ও চিকিৎসকদের অশেষ উপকারে আসছে।
অধ্যাপক ডা. জাকির কর্মের স্বীকৃতি হিসিবে বাংলা একাডেমি সাম্মানিক ফেলোশিপ ২০২২, প্রফেসর এসজিএম চৌধুরী মেমোরিয়াল অরেশনস গোল্ড মেডেল ২০২৩, আউটস্ট্যান্ডিং কন্ট্রিবিউশন ইন কার্ডিওভাসকুলার রিসার্চ সম্মাননা ২০২৩ প্রভৃতি পুরস্কার ও সম্মাননা লাভ করেন।
উচ্চ রক্তচাপ একটি নিরব ঘাতক। জাতিকে সচেতন করা ছাড়া এই রোগ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। তাই চিকিৎসক ও সাধারণ মানুষদের উচ্চ রক্তচাপ সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। অধ্যাপক ডা. মো. জাকির হোসেন তার হাইপারটেনশন এ্যান্ড রিসার্চ সেন্টারের মাধ্যমে উচ্চ রক্তচাপের সচেতনতা ও প্রতিরোধে যে অবদান রেখে যাচ্ছেন যা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। তার এই কর্মকাণ্ডের মূলে আছে মানুষের প্রতি ভালোবাসা। আর মানুষের প্রতি ভালোবাসা মহত্তম গুণ। জনসমর্থন এ ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আমরা মনে করি, অধ্যাপক ডা. জাকিরের মানব সেবার মহত্তম কাজগুলো উত্তরোত্তর অব্যাহত থাকে, এটিই প্রত্যাশা। তার মতো অন্যরাও এগিয়ে আসুন এমন মহতি কাজে।
লেখক : প্রাবন্ধিক ও সাহিত্য-সমালোচক







খবর/তথ্যের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, সেবা হট নিউজ এর দায়ভার কখনই নেবে না।