আবারও নিষ্ঠুর নির্মম শিশু হত্যা বরগুনায় মাদ্রাসা ছাত্রের চোখবিহীন লাশ উদ্ধার * চাঁদপুরে অলৌকিক ক্ষমতার প্রমাণ দিতে নিজ সন্তানকে খুন করলেন মা-বাবা

S M Ashraful Azom
সিলেটে রাজন, খুলনায় রাকিবকে মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতন করে হত্যার পর এবার চাঁদপুরে লাঠি দিয়ে পিটিয়ে ও বরগুনায় শাবল দিয়ে কুপিয়ে চোখ উপড়ে দুই শিশুকে হত্যা করা হলো! প্রথম ঘটনায় চাঁদপুরের শাহরাস্তিতে অলৌকিক ক্ষমতার প্রমাণ দিতে গিয়ে নিজ কন্যা সুমাইয়া আক্তারকে (৩) পিটিয়ে খুন করেছেন এক দম্পতি। গত মঙ্গলবার সুমাইয়ার লাশ উদ্ধার করে ঘাতক মা-বাবাকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। অন্যদিকে গতকাল বুধবার সকালে বরগুনার তালতলী উপজেলা থেকে চোখ উপড়ানো এক শিশুর লাশ উদ্ধার করা হয়। নিহত শিশুর নাম রবিউল আউয়াল (১১)। সে স্থানীয় একটি মাদ্রাসার ছাত্র ছিল। মাছ চুরির অভিযোগে শাবল দিয়ে নির্মমভাবে কুপিয়ে তাকে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
 
চাঁদপুর প্রতিনিধি জানান, সুমাইয়া হত্যার ঘটনায় উপজেলার মেহের (উ.) ইউনিয়নের তারাপুর কামার বাড়ি থেকে শিশুটির মা আমেনা বেগম ও বাবা এমরান হোসেনকে আটক করেছে শাহরাস্তি থানা পুলিশ। গতকাল বুধবার দুপুরে তাদের আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
 
শাহরাস্তি থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) নিজাম উদ্দিন জানান, এলাকার কয়েকটি এনজিও থেকে সুমাইয়ার মা আমেনা বেগম ১ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছিলেন। ঋণের টাকা পরিশোধে ব্যর্থ হয়ে আমেনা বেগম স্বামীর সঙ্গে যোগসাজশ করে ‘কবিরাজি’র মাধ্যমে টাকা আয়ের পরিকল্পনা করেন। এরই ধারাবাহিকতায় কয়েক দিন পূর্বে আমেনা বেগমকে ‘জিন’ ধরেছে এবং সে অলৌকিক ক্ষমতা লাভ করেছে বলে এলাকায় প্রচার করা হয়। আর তার প্রমাণ হিসাবে বলা হয়-আমেনা কোন শিশুকে পেটালেও সে কান্নাকাটি করে না। তাই লোকজনকে বিশ্বাস করানোর জন্য আমেনা ও এমরান তাদের শিশুকন্যা সুমাইয়াকে লাঠি দিয়ে পেটাতে শুরু করেন। গত ৬ দিন ধরে ধারাবাহিক ভাবে চলে এ নির্মম নির্যাতন। এক পর্যায়ে নির্যাতন সইতে না পেরে শিশুটি মঙ্গলবার ভোর ৫টার দিকে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। খবর পেয়ে ওই দিন বিকালে পুলিশ লাশ উদ্ধার করে  ঘাতক বাবা-মাকে গ্রেফতার করে থানায় নিয়ে আসে। সুমাইয়া হত্যার ঘটনায় মামলা হয়েছে বলে জানিয়েছেন শাহরাস্তি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মিজানুর রহমান।
 
বরগুনা (দক্ষিণ) প্রতিনিধি ও আমতলী সংবাদদাতা জানান, জেলার তালতলী উপজেলার সোনাকাটা ইউনিয়নে মাছ চুরির অভিযোগে চোখ উত্পাটন করে শিশু রবিউলকে শাবল দিয়ে কুপিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করেছে পাষণ্ডরা। এ ঘটনায় নিহতের বাবা দুলাল মৃধা বাদী হয়ে তালতলী থানায় একই গ্রামের দেলোয়ার হোসেনের ছেলে মিরাজকে আসামি করে হত্যা মামলা করেছেন। মিরাজকে গতকালই গ্রেফতার করেছে পুলিশ। স্থানীয় ফরাজী বাড়ি দাখিল মাদ্রাসার চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র ছিল রবিউল।
 
দুলাল মৃধা জানান, তাদের বাড়ির পাশের লুতরার খালে জাল পেতে মাছ ধরতো প্রতিবেশী মিরাজ (২৫)। দু’দিন আগে মিরাজ তাদের জানায় যে তার জালের মাছ কে বা কারা নিয়ে যায়। তাদের ছেলে রবিউল আউয়ালকে সে সন্দেহ করছে। একবার যদি সে রবিউলকে পায় তবে সে দেখিয়ে দেবে বলে হুমকি দেয়।
 
এ ঘটনার পর সোমবার সন্ধ্যার দিকে রবিউল তার মায়ের অনুমতি নিয়ে বাড়ির বাইরে যায়। এরপর থেকেই নিখোঁজ ছিলো সে। মঙ্গলবার বিকালে সোহাগ নামের এক কিশোর স্থানীয় আমখোলা গ্রামের খালপাড়ে রবিউলের লাশ পড়ে থাকতে দেখে তাদের খবর দেয়। বুধবার সকালে পুলিশ লাশ উদ্ধার করে ময়না তদন্তের জন্যে মর্গে পাঠায়। রবিউলের পিতা আরও জানান, ছেলের মৃতদেহ তিনি দেখেছেন, ডান চোখ উত্পাটন করে তাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে বলে তিনি জানান।
 
রবিউলের ফুপাতো বোন মোসা. সাহিদা আক্তার জানান, রবিউলের একটি চোখ উপড়ে ফেলা হয়েছে এবং কপালের একাংশ তুলে ফেলা হয়েছে। তার ধারণা শাবল দিয়ে তাকে আঘাত করা হয়েছে।
 
ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বরগুনার পুলিশ সুপার বিজয় বসাক জানান, এ ঘটনার প্রধান সন্দেহভাজনকে আটক করা হয়েছে। প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটনে পুলিশ সচেষ্ট রয়েছে।
 
নাটোরে কিশোরকে গাছে বেঁধে নির্যাতন:নাটোর প্রতিনিধি জানান, জেলার বড়াইগ্রাম উপজেলার দক্ষিণ মালিপাড়া গ্রামে দোকানে চুরির অভিযোগে এক কিশোরসহ ২ জনকে গাছের সাথে বেঁধে পিটিয়ে আহত করার ঘটনা ঘটেছে। মোবাইল ফোনে ধারণকৃত এ দৃশ্য ইন্টারনেটের মাধ্যমে প্রচারিত হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়। মঙ্গলবার রাতেই নাটোরের পুলিশ সুপারসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। তবে এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোন মামলা বা কাউকে আটক করা হয়নি।
 
পুলিশ ও স্থানীয়রা জানান, গত ৩১ জুলাই গ্রামের বুলবুল হোসেনের মুদির দোকানে চুরির ঘটনা ঘটে। এ ঘটনার দু’দিন পর সন্দেহমূলক ভাবে গ্রামেরই দিনমজুর আবু সামা ও শাকিল নামে এক কিশোরকে ধরে চুরি হওয়া দোকানের সামনে সুপারি গাছের সাথে বেঁধে নির্দয়ভাবে পেটানো হয়।
 
আবু সামার স্ত্রী মাবিয়া বেগম ও শাকিলের মা হাসিনা বেগম জানান, চুরি হওয়া মালামাল উদ্ধার হয়েছে অন্য একটি বাড়ি থেকে। তারপরও নির্দয়ভাবে দু’জনকে পেটানো হয়েছে। স্বজনরা এর বিচার দাবি করেছেন।
 
চুরি হওয়া দোকানের মালিক বুলবুল হোসেন বলেন, অভিযুক্তরা চুরির সাথে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে। স্থানীয় সাবেক মেম্বার আবদুস সোবহান জানান, সামাজিক ভাবে সালিশী বৈঠকের মাধ্যমে তাদের বিচার করা হয়েছে। তবে স্থানীয়রা বলেছেন, প্রচলিত আইন উপেক্ষা করে সামজিক বিচারের নামে আইন হাতে তুলে নেয়ার প্রবণতা ঠেকাতে কার্যকর উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন।
 
নাটোরের পুলিশ সুপার শ্যামল কুমার মুখার্জী জানান, তিনি নিজে সেখানে গিয়েছিলেন। তবে এ ব্যাপারে কেউ কোন লিখিত অভিযোগ দেননি। তারপরও তদন্ত করে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Know about Cookies
Ok, Go it!
To Top