শাকিব-পরী মুগ্ধতা বনাম ধীর-দুর্বল গল্পের চরম বিরক্তি!

S M Ashraful Azom
চলচ্চিত্রের স্বার্থেই এখন আমরা ইতিবাচক। মন্দাক্রান্ত চলচ্চিত্রের পথ থেকে যখন কিছুটা আলোর পথে হাঁটতে শুরু করেছে সিনেমা। তখনকার চলচ্চিত্রের সেই সুবাতাসে একঘেঁয়েমি আর দুর্বল গল্প নিয়ে যখন  কেউ ছবি নির্মাণ করেন, যার হাত ধরে ‘হূদয়ের কথা’র মতো ব্লকবাস্টার ছবি নির্মিত হয়েছিল। তখন অতি লজ্জায় অবাক হতেই হয়! হ্যাঁ নির্মাতা এসএ হক অলীকের কথাই বলছি। টিভি নির্মাতারা চলচ্চিত্র নির্মাণ করলে এমনিতেই একটা শুদ্ধি’র সুবাতাস লক্ষ্য করা যায় মিডিয়াতে। ব্যাপারটা এমন যেন তারাই চলচ্চিত্রের সুবাতাস ফেরাচ্ছেন। এমনকি তারা নিজেরাও বিভিন্ন টকশোতে কলার উঁচিয়ে দাবি করেন, তারাই নাকি ছবির অবস্থা বদলে ফেলবেন। তবে এই কী তার নমুনা! হায়, এতটাই দুর্ভাগা আমরা বাংলদেশি সাধারণ দর্শক? অথচ কমার্শিয়াল পরিচালকদের তারা নানাভাবে ভিন্ন পথের লোক বলে দাবি করতে থাকেন। কিন্তু সেই শুদ্ধ নির্মাতা অলীক তার প্রায় ৭ বছর ধরে লেখা নতুন চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্যে কি দেখালেন? মাত্র ১ লাইনে ২০ সেকেন্ডের যে গল্প বলা যায়, সেই দুর্বল গল্পের জন্য প্রায় ৩ ঘণ্টা কেন নষ্ট করতে হবে? চলচ্চিত্রের স্বার্থেই যেমন আমরা সবসময় ইতিবাচক থাকি তেমনি চলচ্চিত্রের এখনকার দুর্দান্ত গল্পের ছবির বাজারে সস্তা, একঘেঁয়ে গল্পের বিষয়টি দর্শকদের জানানোটাও সিনেমার জন্য ইতিবাচক মনে করি বলেই কথাগুলোর উল্লেখ করতে হচ্ছে। নয়তো সাধারণ দর্শক-পাঠক বিভ্রান্ত হবে। যে সময় কলকাতার রাজীব অমানুষ টু-এর মতো গল্পের দুর্দান্ত মোচড় দেখাচ্ছেন, কবির খান তার ‘বাজরাঙ্গি ভাইজান’-এর মতো অদ্ভুত এক মোহাচ্ছন্ন গল্প দেখাচ্ছেন কিংবা আমাদের তথাকথিক কমার্শিয়াল নির্মাতা ‘লাভ ম্যারেজ’ বানিয়ে শাকিবের মুখে ঢাকাইয়া কথনসহ নানা বৈচিত্র্য দেখানোর চেষ্টা করছেন। আর জাজ-এর অগ্নি টু তো দুর্দান্ত এক নির্মাণ। তখন এই ১ লাইনের জানা গল্প দেখানোর জন্য কেন ‘আরো ভালোবাসবো তোমায়’ দর্শকদের গিলতে হবে? আমাদের আর ভালো নির্মাতা নেই বলে? সেই একই মেলো ড্রামা, পুরোনো যাত্রাপালার মতো সংলাপ..!
 
পরীমনির সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে কিংবা শাকিবের অন্ধভক্ত হয়ে যে দর্শক প্রথম সপ্তাহে আপনার ছবিটি দেখতে এসে চরম হতাশ হচ্ছেন, তাদের কি জবাব দেবেন। পরীর নতুন ক্যারিয়ারে এই ক্ষতি কিংবা শাকিবের অগণিত দর্শকদের চরম হতাশ করার অধিকার আপনি রাখেন না!
 
ছবিতে পরীমনি বা শকিবের দুর্দান্ত অভিনয়ের প্রতি ধন্যবাদ দিতেই হয়। কারণ তারা ছবির স্ক্রীপ্ট অনুযায়ী যথেষ্ট করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু গল্পই যদি না থাকে তো তারা কি মুন্সিয়ানা দেখাবেন? গল্পের মূল অবকাঠামো পুরোনো আমলে পাকিস্তানি ছবি ‘নায়িকা’ ছবিটির সাথে অনেকখানি মেলে। সেই নকলবাজিও না হয় মানলাম। কিন্তু এত খাপছাড়া, ধীর লয়ের জানা গল্প কার ধৈর্য্যে কুলায়? দেশ বরেণ্য চিত্রনায়িকা চম্পা এই ছবিতে এই অনর্থক এবং প্রায় অবাস্তব চরিত্রে কি ভেবে কাজ করলেন সেই বড় প্রশ্ন এই গুণী অভিনেত্রীর প্রতি আমরা রাখতেই পারি। ছবির এক দৃশ্যে চম্পা ও পরীমনি টিকেট কেটে সিনেমা দেখতে ঢুকবেন। তখন হলের সামনে এক বখাটে রূপী খেরশেদ আলম খোসরু (ছবির প্রযোজক)’র আজে বাজে মন্তব্যে তারা বেরিয়ে যান। এই দৃশ্য দেখিয়ে পরিচালক বাংলা ছবিকে কি আরও খানিক অপমান করলেন না? আর এটাই কি বাস্তবতা? এছাড়া ফ্রাস্ট্রেশনে থাকা সিনেমার হিরো শাকিব খান, তার এক ভক্তের প্রেম বিরহে বসে আছেন। সব পরিচালককে ফিরিয়ে দিচ্ছেন, অথচ নির্মাতা দেখাচ্ছেন নায়ক শাকিব তখন মোটা মেকআপ ক্লিন সেভড হয়ে ফুলবাবু হয়ে বসে আছেন। ঠোঁটে সেই হালকা লিপস্টিকও ঠাওর হলো। নির্মাতা অলীকের ছবিতে কি এ রকম গাজাখোরি দৃশ্য আমরা প্রত্যাশা করি? ছবির শেষ সিকোয়েন্সে একমাত্র ক্লাইমেক্স আনার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু সেখানেও হঠাত্ পিস্তল উঁচিয়ে একেবারে নায়িকার বাবাকে গুলি! এর মোরাল অব দ্য স্টোরি কি তা খোদ পরিচালক জানেন? উদ্ভট ছাড়া আর কী?
 
বলিউডের ‘মাস্ত’ বা হালের ‘আশিকী টু’ ছবিতেও তো ফ্যান থেকে প্রেমিক বা প্রেমিকার রূপায়ণ দেখিয়েছে নির্মাতারা। অলীক কি বাজি লাগিয়ে বলতে পারবেন যে, সেই ছবিগুলোর মতো ক্লাইমেক্স, টানটান গল্পের রসদ তিনি দেখাতে পেরেছেন? বারবার এই বাজেটের দোহাই দিয়ে আর কত ঠকাবেন দর্শকদের! আর কত প্রডিউসারের হাহাকারে এই ফিল্ম ইন্ডাষ্ট্রি শেষ হবে! ৭ বছর সময় পেলেন একটি সিনেমার স্ক্রীপ্ট লিখতে। শেষে ফিল্মের সবচেয়ে প্রভাবশালী প্রযোজকের টাকায় এইরকম অসংলগ্ন গল্পের ছবি নির্মাণ করলেন। দর্শকরা তাই কিছুক্ষণ গানের দৃশ্যে স্বস্তি গুনেছেন, কারণ গাঁটের পয়সা খরচ করে যারা হলে বসেছেন তারা তো বাজরাঙ্গি ভাইজান, পিকু এইসব ছবি দেখে এসেই বসেছেন। যেসব ছবির গল্পই মূল হিরো। আর আপনার ছবিতে পরীমনির অসাধারণ গ্ল্যামার আর শাকিব খানের নিজস্ব অর্জিত দর্শকই একমাত্র শক্তি। এই যদি হয় নির্মাতা হিসেবে আপনার ছবির মূল আকর্ষণ তাহলে তাদের দুজনার পরপর কিছু গানের চিত্রায়ণ করে দেখালেই পারতেন। নয়তো ওই মান্ধাতা আমলের ডায়ালগ এখনকার হার্ডকোর কমার্শিয়াল ছবির নির্মাতারা বা চিত্রনাট্যকাররাও তো লেখেন না। এছাড়া ‘হূদয়ের কথা’ ছবির প্রধান আকর্ষণ ছিল এর গান। এই ছবিতে সেই গানের শক্তিও ম্লান। হূদয় খানের একটি গান খানিক মুগ্ধতা জাগায়, সেটাও তো নির্মাতার কোনো মুন্সিয়ানা নয়! তবে এটুকু বলা যায়, দৃষ্টিনন্দন সিলেটকে দেখিয়েছেন নির্মাতা তার তৈরি কিছু মিউজিক ভিডিওতে, যা এই ছবির অন্যতম আকর্ষণ।

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Know about Cookies
Ok, Go it!
To Top