প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা— ভাবমূর্তি নষ্টকারীদের কোনো ছাড় নয় :স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী *কঠোর ব্যবস্থা নিতে এসপিদের কাছে পুলিশ সদর দপ্তরের ই-মেইল
অবশেষে অ্যাকশন শুরু করেছে সরকার। অপরাধী যেই হোক তাকে আর ছাড় নয়। হোক দলীয় নেতা-কর্মী বা অন্য কেউ— কাউকেই রেহাই দেয়া হবে না। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সরকারের এই অ্যাকশন চলবে। খোদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, সন্ত্রাসী যে দলেরই হোক, কোন ধরনের ছাড় না দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। যদিও কথিত বন্দুকযুদ্ধে আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন ছাত্রলীগ বা যুবলীগের নেতারাই মারা যাচ্ছেন— এমন প্রেক্ষাপটে সরকার সমর্থকরা ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। এমন অবস্থায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলছেন, প্রধানমন্ত্রী আগেই ‘মেসেজ’ দিয়েছেন আর কোন ছাড় নয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যখন গতকাল বুধবার এ কথা বলেন, তার আগের দিন পুলিশ সদর দফতর থেকে সব এসপির কাছে বিশেষ ই-মেইল বার্তা পাঠানো হয়েছে। সেখানে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে—কেউ অপরাধ করলে যাতে কোন ধরনের ছাড় দেয়া না হয়।
তবে মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিস কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক সুলতানা কামাল বলেছেন, ‘বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে সন্ত্রাসী কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণের যে প্রবণতা সরকারের মধ্যে লক্ষ্য করা যাচ্ছে— তা গভীর উদ্বেগের। সাম্প্রতিক সময়ে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র ও যুব সংগঠনের কর্মকাণ্ডে সরকার ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছে। সম্প্রতি আলোচিত তিনটি ঘটনায় জড়িত ছাত্রলীগ ও যুবলীগের তিনজন নেতা র্যাব ও পুলিশের কথিত ক্রসফায়ারে নিহত হয়েছেন। এ প্রসঙ্গে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, অ্যাকশন শুরু হয়ে গেছে। অপরাধী যে দলেরই হোক ছাড় না দেয়ার সিদ্ধান্ত ইতিবাচক; কিন্তু আইন বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে পরিস্থিতির উন্নতি ঘটবে না। বরং উল্টো মানবাধিকারের চরম লংঘন হচ্ছে।’
সাম্প্রতিক ‘বন্দুকযুদ্ধের’ ঘটনাগুলোকে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার প্রতিফলন বলতে রাজি নন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। হাজারীবাগের ঘটনায় স্থানীয় ছাত্রলীগ নেতা আরজু মিয়া নিহতের ঘটনাটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলেও তিনি জানিয়েছেন। গত দুই দিনে ঢাকা, মাগুরা ও কুষ্টিয়ায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে সরকার সমর্থক তিনজন নেতার মৃত্যুর প্রেক্ষাপটে গতকাল রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানের পর সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রাইম মিনিস্টার মেসেজ আগেই দিয়েছেন। অপরাধী যে কেউ হোক, তাকে আইনের আওতায় আনা হবে। আমরা কাউকে ছাড় দেব না। সে ছাত্রলীগ করুক, ছাত্রদল করুক বা অন্য দল করুক।’
মাগুরায় মাতৃগর্ভে শিশু গুলিবিদ্ধ হওয়ার মামলার তিন নম্বর আসামি মেহেদী হাসান আজিবর ওরফে আজিবর শেখ মঙ্গলবার গভীর রাতে পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন। রাজধানীর হাজারীবাগে মোবাইল ফোন চুরির অভিযোগে এক কিশোরকে পিটিয়ে হত্যার প্রধান আসামি আরজু মিয়া র্যাবের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন একই রাতে। সর্বশেষ কুষ্টিয়ায় শোক দিবসের অনুষ্ঠানে যুবলীগ কর্মী সবুজ হত্যা মামলার সন্দেহভাজন আসামি জাকির হোসেন মঙ্গলবার রাতে পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হন। আরজু হাজারীবাগ থানা ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন। মাগুরায় নিহত আজিবর শেখ জেলা ছাত্রলীগের আগের কমিটির নেতা ছিলেন।
পুলিশের মহাপরিদর্শক এ কে এম শহীদুল হক ইত্তেফাককে বলেন, ‘সকল পুলিশ সুপারের কাছে ইতিমধ্যে বার্তা পৌঁছে দেয়া হয়েছে। অপরাধী যেই হোক তাকে কোন ছাড় দেয়া হবে না। এক্ষেত্রে কোন দল বা মতের লোক তা দেখা হবে না। কোন জনপ্রতিনিধির অযৌক্তিক তদবিরও রাখা যাবে না বলে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।’
আইন ও সালিস কেন্দ্রের হিসাবে দেখা গেছে, গত বছর কথিত বন্দুকযুদ্ধে ১২৮ জনের মৃত্যু হয়েছে, যে ধারা চলতি বছরও অব্যাহত আছে। সাম্প্রতিক সময়ে দেখা গেছে, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, ঝুট-মাদক ও অস্ত্র ব্যবসা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হল ও এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করতে সরকারের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা নিজেদের মধ্যে খুনোখুনিতে লিপ্ত হয়েছেন। এসব ঘটনায় নেতা-কর্মীসহ নিরীহ মানুষকেও প্রাণ দিতে হচ্ছে। এমনকি তাদের বুলেট থেকে রক্ষা পায়নি মাতৃগর্ভের শিশুও। জাতীয় শোক দিবসকে কেন্দ্র করে সংগৃহীত চাঁদা নিয়েও ঘটেছে খুনের ঘটনা।
গত সোমবার মন্ত্রিসভার বৈঠকের পর রাতেই র্যাব ও পুলিশ অভিযান শুরু করে। এতে ঢাকায় র্যাবের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে হাজারীবাগ থানা ছাত্রলীগ সভাপতি আরজু মিয়া এবং মাগুরায় আরেক ছাত্রলীগ নেতা মেহেদী হাসান ওরফে আজিবর শেখ পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন। ছাত্রলীগের এ দুই নেতা নিহত হওয়ার পর সরকারি দলে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। বিভিন্ন ধরনের অপকর্মে জড়িত নেতাকর্মীরা ইতিমধ্যে গা ঢাকা দিয়েছেন।
র্যাবের মহাপরিচালক বেনজির আহমেদ ইত্তেফাককে বলেন, ‘সন্ত্রাস দমনে র্যাবের অভিযান একটি চলমান প্রক্রিয়া। জননিরাপত্তার জন্য এ অভিযান অব্যাহত থাকবে। র্যাব কোন ক্রসফায়ার করে না। অপরাধীরা গুলি করলেই পাল্টা র্যাব সদস্যরা গুলি করে। এই গোলাগুলির বিষয় নিয়ে ভুল বোঝাবুঝির কোন সুযোগ নেই।’
এর আগে ২০০২ সালে নিজ দলের নেতাকর্মীদের অব্যাহত সন্ত্রাস এবং খুনোখুনিতে অতিষ্ঠ বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ‘অপারেশন ক্লিনহার্ট’ শুরু করলে কমপক্ষে ৪৫ থেকে ৫০ জন মারা যায়। এর মধ্যে তত্কালীন ক্ষমতাসীন বিএনপির একাধিক নেতাকর্মী ছিল। ব্যাপক সমালোচনার মুখেও তখন সরকার সেই অভিযান অব্যাহত রাখে।
বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর দলীয় নেতাকর্মীদের লাগাম টানার চেষ্টা এবারই প্রথম নয়, ২০১৩ সালের ২৯ জুলাই র্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছিলেন ঢাকা মহানগর যুবলীগ উত্তরের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহিদ সিদ্দিকী তারেক। তিনি যুবলীগ নেতা রিয়াজুল হক খান মিল্কিকে খুন করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এসব বিষয়ে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সরকারের কঠোর অবস্থানের বিষয়টি পরিষ্কার করেন। মঙ্গলবার দুপুরে রাজধানীর বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজে ছাত্রলীগের জাতীয় শোক দিবসের অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, অনেক নেতাকে আমরা চিনিও না। অনেক নতুন মুখ আছে। বিল বোর্ড দেখলে মনে হয়- বাংলাদেশ এখন নেতা উত্পাদনের কারখানা। ছাত্রলীগের মূলমন্ত্র কারও কণ্ঠে উচ্চারিত হয় না। তারা ছাত্র রাজনীতি বা ছাত্রদের সমস্যা নিয়ে কথা বলে না।
গত বৃহস্পতিবার ঢাকার বাড্ডায় এবং শনিবার কুষ্টিয়া ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে পৃথক ঘটনায় আওয়ামী লীগ এবং সহযোগী সংগঠনের ৬ নেতাকর্মী নিহত হন। নিজ দলের প্রতিপক্ষ গ্রুপের হাতেই তারা নিহত হয়েছেন। গত ১২ আগস্ট সিলেটের মদন মোহন কলেজে ছাত্রলীগের প্রতিপক্ষ গ্রুপের ছুরিকাঘাতে আবু আলী, বৃহস্পতিবার রাজধানীর বাড্ডায় হামলা চালিয়ে হত্যা করা হয় স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা মাহবুবুর রহমান গামা, আওয়ামী লীগ নেতা শামসু মোল্লা এবং চাকরিজীবী ফিরোজ আহমেদ মানিককে, শনিবার কুষ্টিয়ায় সবুজ হোসেন এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে রবিউল ইসলাম নামের দুই আওয়ামী লীগ কর্মী নিহত হন।
সর্বশেষ সোমবার রাজধানীর হাজারীবাগে রাজা মিয়া নামের এক কিশোরকে নৃশংসভাবে পিটিয়ে হত্যা করে স্থানীয় ছাত্রলীগের সভাপতি। এর আগে রবিবার চাঁদপুরের কচুয়ায় জাতীয় শোক দিবসের চাঁদা আদায়কে কেন্দ্র করে ভূঁইয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের ওপর বর্বরোচিত হামলা চালায় স্থানীয় যুবলীগের নেতাকর্মীরা।
এর আগে গত সোমবার ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইওয়ের বাইপাস এলাকায় র্যাবের কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত যুবলীগ নেতা জাহিদুল ইসলাম আলোর কাছ থেকে র্যাব ১৯ লাখ টাকা ও ২ লাখ ১৪ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার করে। জাহিদুল ইসলাম আলো কক্সবাজার এলাকার সরকার দলীয় এক সংসদ সদস্যের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত। ১৩ এপ্রিল দিবাগত রাত পৌনে ২টার দিকে মদ্যপ অবস্থায় নিজের লাইসেন্সকৃত অস্ত্র দিয়ে রাজধানীর নিউ ইস্কাটন রোডে প্রাডো গাড়ি থেকে এলোপাতাড়ি গুলি ছোঁড়েন মহিলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ও সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য পিনু খানের ছেলে বখতিয়ার আলম রনি। এতে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান নীরিহ রিকশাচালক আবদুল হাকিম ও দৈনিক জনকণ্ঠের সিএনজি চালক ইয়াকুব আলী।

