জিকিরে আত্মার প্রশান্তি

S M Ashraful Azom
সূরা নিসার ১০৩নং আয়াতে আল্লাহ আদেশ করেছেন, যখন তোমরা নামাজ শেষ করিবে তখন দাঁড়াইয়া, বসিয়া এবং শুইয়া আল্লাহকে স্মরণ করিবে। সূরা আরাফ ২০৫ নং আয়াতে নির্দেশ করা হয়েছে, তোমরা প্রতিপালকে মনে মনে বিনীতভাবে ও আশঙ্কা মুক্ত হয়ে মনে মনে সকাল ও সন্ধ্যায় স্মরণ করিবে এবং তুমি উদাসীন হইবে না। সূরা আরাফের ২০৬ নং আয়াতে আল্লাহ আমাদের স্মরণ করিয়ে ঘোষণা প্রদান করেন, যাহারা তোমার প্রতিপালকের সান্নিধ্যে রহিয়াছে তাহারা অহংকার বশত, যেন তাহাদের ইবাদত থেকে বিমুখ না হয়। মেশকাত শরীফের ২১৫৭ নং হাদিছে হযরত আবু হোরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত হযরত রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন, আল্লাহ তায়ালা বলেন, আমি আমার বান্দার নিকট ঠিক এরূপ, যেরূপে সে আমাকে মনে করে, আমিও তাকে আমার মনে স্মরণ করি। আর যদি সে আমাকে তার মনে স্মরণ করে আমিও তাকে আমার মনে স্মরণ করি। আর যদি সে আমাকে স্মরণ করে মানুষের মধ্যে, আমিও তাকে স্মরণ করি তদপেক্ষা উত্তম মানুষের মধ্যে (বুখারী ও মুসলিম)। মেশকাত শরীফের ২১৭৪ নং হাদিছে হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত হযরত রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন, শয়তান আদম সন্তানের অন্তরে মজবুতভাবে বসে থাকে। যখন সে আল্লাহর যিকির শুরু করে তখন সে দূরে সরে যায়। আর যখন আল্লাহর জিকির বন্ধ রাখে শয়তান ঐ ব্যক্তির অন্তরে নানা ধরনের কুমন্ত্রণা দিতে থাকে (বুখারী)। মানুষ মাত্রই জিকির প্রিয়। আমরা সকলে জিকির করতে ভালোবাসি। আমরা কম-বেশি সকাল-সন্ধ্যায় রাতের বেলায় জিকির করে থাকি। জিকির শব্দের সাধারণ অর্থ স্মরণ করা।  উচ্চারণ কিংবা আওয়াজের উপর ভিত্তি করে জিকিরকে দুইভাগে ভাগ করা হয়। জিকিরে জলি এবং জিকিরে খফি। জিকিরে জলি হল উচ্চস্বরের জিকির এবং জিকিরে খফি হল নিম্ন স্বর কিংবা মনে মনে জিকির। অনেক লোক একত্রে সমবেত হয়ে উচ্চস্বরের মাধ্যমে যে জিকির করে তাকে জিকিরে জলি বলে। জিকিরের সময় যে সকল শব্দের সমন্বয়ের মাধ্যমে আব্লাহকে স্মরণ করেন তা হল- আল্লাহু আল্লাহ, লা ইলাহ ইল্লাল্লাহ, আল্লাহু, আল্লাহ, লা মাকুসদা ইল্লাল্লাহ, লা মাবুদা ইল্লাল্লাহ, লা ফায়েলা ইল্লাল্লাহ, লা মাওজুদা ইল্লাল্লাহ, ইয়া রাব্বুল আলামিন, ইয়া রাহমাতালিল আলামিন, লা ইলাহ ইল্লাল্লাহু মোহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ; আল্লাহ-নবীর প্রেমে মোরে করগো দেওয়ানা ইত্যাদি। জিকির কিংবা জিকিরের মাহফিল সম্পর্কে কেউ কেউ বিরূপ ধারণা পোষণ করেন। অপ-প্রচার করে থাকেন। বিভ্রান্তি ছড়ান। জিকির মাহফিলে বাধার সৃষ্টি করেন। জিকিরে মাহফিল সম্পর্কে আমাদের পরিষ্কার ধারণা থাকার প্রয়োজন বোধ থেকে এই লেখাটি শুরু করেছি। জিকিরের মাহফিলের ধর্মীয় ও সামাজিক গুরুত্ব অনেক। আমাদের সমাজে ইছালে সওয়াবের মাহফিল বললে মনে হয় কিছু একটা বিরাট ব্যাপার স্যাপার। অনেক সওয়াব পাওয়া যাবে। আমার সমস্ত ইচ্ছা পূরণ হয়ে যাবে। মাহফিল সম্পর্কে আমাদের মধ্যে অনেক ইতিবাচক ধারণা  রয়েছে। মাহফিল হল ধর্মীয় বিষয়াদি জানা অজানার স্থান কিংবা কোরআন ও হাদিছের আলোকে আমাদের কিভাবে জীবনযাপন করা উচিত এই বিষয়ে সম্মিলিতভাবে জ্ঞান আদান-প্রদানের স্থান। তদ্রƒপ জিকিরের মাহফিল হল কিভাবে জিকির করতে হয়। জিকিরের পবিত্রতা ও আদব কিভাবে রক্ষা করতে হয়। জিকিরের মাধ্যমে কিভাবে স্রষ্টার দিদার লাভ হয়। কখন কিভাবে জিকির করতে হয় এসবের আলোচনার স্থান। জিকিরের মাহফিলে জিকিরের বিভিন্ন বিষয়াদি খুটিনাটি বিষয়ে তালিম দেয়া হয়। মুখে আল্লাহু উচ্চারণের সাথে অন্তরে মিল রেখে জিকির না করলে পরিপূর্ণ ভাবে জিকিরের ফজিলত কিংবা কাক্সিক্ষত ফলাফল পাওয়া যায় না। যেমন নফি এসবাতের জিকির, চার জরবি জিকির, পাঁচ জরবি জিকির, মকামে তওবার জিকির, দশ লতিফার জিকির, পাস আন পাস জিকির ইত্যাদি। পাস আন পাস জিকিরকে সাধারণত শ্বাস-প্রশ্বাসের জিকির বলা হয়। একজন ব্যক্তি যখন আল্লাহু, আল্লাহ আল্লাহ, লা ইলাহ ইল্লাল্লাহ কিংবা অন্য শব্দের মাধ্যমে আল্লাহকে সারাক্ষণ স্মরণ করতে থাকে এক পর্যায়ে ঐ ব্যক্তির শ্বাস প্রশ্বাসে আল্লাহু কিংবা লা ইলাহ ইল্লাল্লাহ শব্দ আসা-যাওয়া করতে থাকে। তখন আমরা বলি অমুকের পাস আন পাস হয়ে গেছে। পাস আন পাসের অধিকারী ব্যক্তি যখন ঘুমিয়ে থাকেন কিংবা হাঁটা, বসা, গোসল, খাওয়া অবস্থায় থাকেন তখন অবিরাম তার জিকির চলতে থাকে। জিকিরের মাহফিলের লক্ষ্য হল সম্মিলিতভাবে আল্লাহকে স্মরণ করার মাধ্যমে নিজের মুক্তি লাভের পাশাপাশি অন্য মুসলমান ভাইকে মুক্তি লাভে কিংবা মাওলার দিদার লাভে সহায়তা করা। কায়েম শব্দের অর্থই হল নিজের মুক্তির পাশাপাশি অন্যকে মুক্তি বা নাজাত লাভের পথে আহ্বান করা। আমাদের দেহের শূন্য খাঁচাটি মাটির তৈরি। মাটির খাঁচার ভেতরে আত্মা কিংবা রূহের অবস্থান। রূহ আল্লাহ সুবহানুতায়লার একটি নির্দেশ মাত্র। মাটির দেহ মূলত একটি পাখির খাঁচাস্বরূপ। পাখি বিহীন খাঁচার যেমন মূল্য নেই তেমনি রূহ কিংবা আত্মা ব্যতীত মাটির দেহের কোন মূল্য নেই। রূহ মাটির দেহে প্রাণ সঞ্চার করে। রূহ বেরিয়ে গেলে মানুষকে মৃত বলা হয়। পাখির খাঁচায় যেন সহজে মরিচিকা কিংবা ঝং ধরে সেজন্য আমরা নানা প্রকার রং ব্যবহার করি। দেহকে সুস্থ স্বাভাবিক রাখার জন্য মাটি থেকে উৎপাদিত পুষ্টিকর ফলমূল, শাক-সবজি, আলু, মুলা, গাজর ও টমেটো খেয়ে থাকি। আবার অসুস্থতা বোধ করলে ডাক্তারের পরামর্শ মোতাবেক ঔষধ সেবন করি। মুমিনের রোগের দাওয়াই হিসেবে সূরা বনিঈসরাইলের ৮২ নং আয়াতে আল্লাহ বলেন, আমি অবতীর্ণ করি কুরআন, যাহা মুমিনদের জন্য আরোগ্য ও রহমত স্বরূপ। মুমিনের চিকৎসক স্বয়ং আল্লাহ আর ওষুধ হল মহাগ্রন্থ আল কোরআন।দেহের ভেতরে রূহের খাবার মাটিতে উৎপন্ন হয় না। রূহের খাবার দুনিয়াবি ফার্মেসি পাওয়া যায় না। মাটির দেহের খাবার পানিতে ধুয়ে পরিষ্কার করে আগুনে রান্না করে খাওয়া যায়। আত্মার খাবার সিদ্ধ করার প্রয়োজন হয় না। আত্মার খাবার জিকিরের মাধ্যমে সিদ্ধ করতে হয়। আত্মার খাবার সংগ্রহ করার জন্য আর্থিক কোন প্রকার টাকা-পয়সা ধন-দৌলত ব্যয় করতে হয় না। তবে বান্দার একাগ্রতা ও ইচ্ছা শক্তির প্রয়োজন হয়। আত্মা বিশুদ্ধ না হলে কোন আমল ইবাদত কাজে আসবে না। আত্মা বিশুদ্ধ হওয়ার একটি উপায় তাকওয়া অর্জন ও হালাল রুজি খাওয়া। আত্মাকে জীবিত রাখার উপায় হল প্রতি দমে দমে আল্লাহকে স্মরণে রাখা, ওযুর সাথে থাকা, সুদ ঘুষ গ্রহণ ও পরনিন্দা থেকে বিরত থাকা,  জিনা-ব্যভিচার থেকে বিরত থাকা, শরীয়তের হুকুম আহকামগুলো পরিপূর্ণভাবে মেনে চলা। আল্লাহ সুবহানুতায়ালা কোরআনে নির্দেশ করেছেন, তোমরা বিশুদ্ধ চিত্তে তওবা কর। বিশুদ্ধ চিত্তে ইবাদত কর। বিশুদ্ধ চিত্তে নামাজে দাঁড়াও।আল্লাহ তাঁর বান্দার প্রতি অনেক বেশি দয়াবান। আল্লাহ নিজেই শিখিয়ে দিচ্ছেন তোমরা আমর নিকট প্রার্থনা কর “রাব্বানা আতিনা ফিদ্দুনিয়া হাসানাতাও ওয়াবিল আখিরাতে, হাসানাতাও অকেনা আজাব্বান্নার”। আল্লাহ কঠিন কেয়ামতের দিনে বিচারকের আসনে বসবেন। বান্দার পাপ-পুণ্যর বিচার করবেন। অথচ বান্দা তার নিজ সম্পর্কে বেখেয়াল। মানুষ তার সহজ-সরল জীবন যাপনের উপায় কৌশলকে পিছনে ফেলে অন্ধকার জীবনের দিকে ছুটছে। যারা আল্লাহর জিকিরের মাধ্যমে নিজের নফসের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছেন ওইসব বান্দার মৃত্যুর পরও তাদের কালব রূহ জিন্দা থাকে। দেহের মৃত্যু হয় রূহের মৃত্যু হয় না। মুমিনের কলব আল্লাহর আবাসস্থল। যে রূহে কালবে আল্লাহর অবস্থান তার মৃত্যু কিভাবে সম্ভব? হুয়াল হাইয়ুল কাইয়ুম। আল্লাহ চিরস্থায়ী ও চিরঞ্জীব। দুনিয়া ধ্বংস হয়ে যাবে। আল্লাহ স্থির থাকবেন। কালব দিল একবার জিন্দা হলে সেই দিলের কখনও মৃত্যু হয় না। সূরা আল ইমরানের ১৬৯নং আয়াতে আল্লাহ নির্দেশ করে বলেন, যাহারা আল্লাহর (আমার) পথে নিহত হইয়াছে তাহাদের কখনই তোমরা মৃত মনে করিও না, তাহারা জীবিত এবং তাহাদের প্রতিপালকের নিকট হইতে তাহারা জীবিকা প্রাপ্ত।স্রষ্টা ও তাঁর সৃষ্টির সঙ্গে যারা সমভাবে সদ্বব্যবহার বজায় রাখতে পেরেছেন তাদের আত্মাই বিশুদ্ধ পবিত্র। যাদের আত্মা বিশুদ্ধ তারাই সালেহীন আল্লাহ তায়ালার মকবুল বান্দা। সূফী সাধকগণ আত্মসংযম ও আত্মার পরিচর্চা করেন। জমিতে বীজবপন করলেই ফসল হয় না। তার জন্য পরিচর্চা করতে হয়। আগাছা বাছাই করতে হয়। সময়মত সার ও পানি দিতে হয়। সুতরাং আত্মা কলবকে জিন্দা ও বিশুদ্ধ রাখতে হলে রিয়াজত সাধনা করতে হয়। নামাজ, রোজা, হজ্ব ও যাকাতের জন্য নির্ধারিত সময় বা ওয়াক্ত আছে। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের ভেতরে ওয়াক্ত ভিত্তিক রাকায়াতের সংখ্যা ও সময় নির্ধারিত আছে। ফরজ রোজার নির্দিষ্ট মাস ও সংখ্যা রয়েছে। কিন্তু আল্লাহর জিকির কিংবা জিকিরের মাহফিলের নির্দিষ্ট সময় ও সংখ্যা নেই। ফরজ ইবাদত আদায় করার আগে ও পরে জিকির চালু রাখতে হবে। যে ব্যক্তি যত বেশি আল্লাহকে স্মরণ করবে ঔ ব্যক্তি আল্লাহর তত নিকটে থাকবে। হাদিছে কুদসিতে আছে, নফল ইবাদতের মাধ্যমে বান্দা আমার এতটাই নিকটে আসে, তখন বান্দা যখন শোনে আমার কানে শোনে, বান্দা যেদিকে তাকায় আমার খুবি নূর দেখে, বান্দা যা বলে আমার মুখ দ্বারা বলে। সুতরাং নফল ইবাদতের মধ্যে আল্লাহর জিকির সবচেয়ে উত্তম এবং সহজ। সূরা রাদের ২৮ নং আয়াতে আল্লাহ ঘোষণা করেন, ঈমানদারদের অন্তর আল্লাহর জিকিরের দ্বারা প্রশান্তি লাভ করে।
ট্যাগস

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Know about Cookies
Ok, Go it!
To Top