ইংরেজি ভাষায় আল-কুরআনের অনুবাদক মুহাম্মদ মারমাডিউক পিকটাল

S M Ashraful Azom
‘ইসলাম গ্রহণের সময় পিকটালের প্রতিক্রিয়া ছিল, ‘আমি বহু পড়াশোনা ও গবেষণার পর মুসলমান হয়েছি। আমার জীবনে এর অসীম গুরুত্ব রয়েছে। মুসলমানরা ইসলাম মিরাসি সূত্রে প্রাপ্ত। এজন্যে ওরা এর কদর বুঝে না’

বি খ্যাত নওমুসলিম ও ইসলামি পণ্ডিত মুহাম্মদ মারমাডিউক পিকটাল ইংরেজি ভাষায় আল-কুরআনের প্রথম মুসলিম অনুবাদক, ইসলামি চিন্তক, সাহিত্যিক, তাত্ত্বিক, মুবাল্লিগ ও খতিব। তিনি ১৮৮৫ সালের ৭ এপ্রিল সকালে ইংল্যান্ডের সফকের (Suffolk) নিকটবর্তী একটি গ্রামে  জন্মগ্রহণ করেন। পিতা চার্লস পিকটাল ছিলেন স্থানীয় গির্জার পাদ্রী। চার্লসের ছিল দশ সন্তান। প্রথম স্ত্রী মারা গেলে তিনি দ্বিতীয় বিয়ে করেন। দ্বিতীয় স্ত্রী, ডি.এন. ও ব্রাইনের কন্যা মেরি হেল (Mary Hale) এর উদরে মারমাডিউক পিকটালের জন্ম। মাত্র ছয় বছর বয়সে পিতা ইনতিকাল করেন। তারপর গ্রাম ছেড়ে লন্ডনে চলে আসে পিকটালের পরিবার। শিশু মারমাডিউককে নারফুকের স্কুলে ভর্তি করে দেয়া হয়। এরপর হেরো (Harrow)- এর বিখ্যাত সরকারি স্কুলে পড়েন তিনি। এখানে ভুগোল ও ভাষার ওপর অসামান্য কৃতিত্ব অর্জন করেন। পড়াশোনা অবস্থায়ই উইন্সটন চার্চিলের সঙ্গে তার গভীর বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। এ বন্ধুত্ব আজীবন অটুট ছিল। পরবর্তী সময়ে চার্চিল বৃটিশ রাজনীতিতে অসাধারণ খ্যাতি অর্জন করেন। তিনি হন ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এদিকে মাধ্যমিক শিক্ষার পাঠ চুকিয়ে পিকটাল ফ্রান্সে চলে যান। ওখানে ফরাসি ভাষা শেখেন। ফ্রান্স থেকে যান ইটালিতে। ইটালিক ভাষায়ও তিনি দক্ষতা অর্জন করেন। দেশে ফিরে জার্মান ও স্প্যানিশ ভাষা শেখেন। ভাষার সঙ্গে মিতালি গড়া ছাড়াও সাহিত্য ও ইতিহাসেরও গভীর প্রেমে নিমজ্জিত হন পিকটাল। এ সূত্রেই তিনি প্রাচ্য ও প্রাচ্যের জীবন-সাহিত্যের বিশেষ পাঠকে পরিণত হন। পড়াশুনা শেষ করে তিনি মধ্যপ্রাচ্য সফরকে প্রাধান্য দেন।

মধ্যপ্রাচ্য সফরে তিনি প্রথমে মিসর যান। মিশরে পৌঁছেই মারমাডিউক পিকটাল ওখানকার সংস্কৃতিপাঠে মনোনিবেশ করেন। কিছু দিন পর সেখান থেকে সিরিয়ায় চলে যান। সেখানে পাদরী শপনুর-এর সঙ্গে মিলিত হন। শপনুর পুরাতত্ত্ব নিয়ে গবেষণা করছিলেন। পিকটাল পাদ্রীর সঙ্গে গভীর সম্পর্ক তৈরি করেন। তার কাছে আরবি শেখা শুরু করেন। একজন দোভাষী এবং গাইডকে সঙ্গে নিয়ে মরুভূমি পাড়ি দিয়ে রামাল্লা এবং গাজায় পৌঁছে যান। সফরাবস্থায় গেয়ো আরব কৃষকদের জীবন-জিজ্ঞাসা সম্পর্কে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। এ সময় তার আরবি শেখায় আরও অগ্রগতি হয়। অন্যদিকে তিনি উটে চড়ে জুদি পাহাড় পর্যন্ত সফর করেন। তিনি প্রাচ্যের সাদামাটা এবং প্রাকৃতিক জীবনধারায় খুবই প্রভাবিত হন। তার প্রথম উপন্যাস The Fisherman Said (সাঈদ: একজন জেলে) লেখেন, যা ইউরোপের অধিকাংশ প্রকাশনাই ছাপতে রাজি হননি। পরে ফরাসি, জার্মানসহ ইউরোপের অন্যান্য ভাষায়ও এর অনুবাদ হয়।

১৯০৪ সালে পিকটাল দ্বিতীয়বারের ন্যায় মিসরে পৌঁছেন। এ সময় নিজের অর্জিত অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণের উপর ভিত্তি করে লেখেন: 1. Children of the Nile, 2. Vieled Aaoman.  পিকটাল মিসর থেকে স্ত্রীর সঙ্গে বৈরুতে চলে যান। সেখান থেকে সিরিয়া এবং পরে বায়তুল মুকাদ্দাসে অবস্থান নেন। এ সফরে আরবি ভাষার উপর তিনি পূর্ণতা অর্জন করেন। ইসলাম সম্পর্কে তার জ্ঞানবৃদ্ধি হয়। প্রসিদ্ধ আলেমদের সঙ্গে দীর্ঘ আলাপ করেন। এ সময়ে তিনি ইসলাম দ্বারা এতই প্রভাবিত হন যে, মসজিদে আকসায় শায়খুল জামেয়ার কাছে আরবি পড়তে পড়তেই তিনি ইসলাম গ্রহণের ইচ্ছে প্রকাশ করেন। শায়খ ছিলেন পোড়খাওয়া বর্ষীয়ান বিজ্ঞব্যক্তি। এটি যেন একজন যুবকের স্রেফ আবেগি সিদ্ধান্ত মাত্র না হয়, এজন্যে শায়খ পিকটালকে পরামর্শ দিলেন, তুমি আরও ভাবো, মা-বাবার সঙ্গে পরামর্শ করো। পিকটাল লিখেন, ‘এ পরামর্শ আমার অন্তরে আশ্চর্য প্রভাব বিস্তার করল। আমি সাধারণ ইউরোপিয়ানদের মতো মনে করতাম যে, মুসলমানরা বিধর্মীদের মুসলমান বানানোর জন্যে অতি উত্সাহী হয়ে থাকে। কিন্তু এ আলাপই আমার ধারণা পাল্টে দিলো’।

 মিসর ও সিরিয়া ছাড়াও তিনি ইরাক ও তুর্কিস্থানও সফর করেন। তুর্কী ভাষাও রপ্ত করেন। এসব দেশের মুসলমানদের জীবন-যাপন খুব কাছ থেকে দেখেন। সব মিলিয়ে এসব তার মনে এতটাই প্রভাব বিস্তার করল যে, তিনি আরবি লেবাস-পোশাক পড়া শুরু করেন। তুর্কিস্থানে অবস্থানের সময় পিকটাল ইসলাম গ্রহণে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা নেন। এজন্যে তিনি গাজী তালাত বেককে বললেন, আমি মুসলমান হতে চাই। উত্তরে তিনি বললেন, “কনস্টান্টিনোপলে (তুরস্কে) তুমি ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা দিয়ো না। ভালো হয়, এ খবরটি যদি লন্ডন থেকে ঘোষিত হয়। ইউরোপে এর চমকপ্রদ ফল হবে।” এ পরামর্শের কারণেই পিকটাল লন্ডনে ফিরে ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দে ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা দেন। এ ঘোষণায় শিক্ষিত ও রাজনৈতিক সমাজে হইচই পড়ে যায়।

ইসলাম গ্রহণের সময় পিকটালের প্রতিক্রিয়া ছিল, ‘আমি বহু পড়াশোনা ও গবেষণার পর মুসলমান হয়েছি। আমার জীবনে এর অসীম গুরুত্ব রয়েছে। মুসলমানরা ইসলাম মিরাসি সূত্রে প্রাপ্ত। এজন্যে ওরা এর কদর বুঝে না। বাস্তবতা হলো, ইসলাম শান্তি ও নিরাপত্তার ভাণ্ডার। এ নেয়ামতের বিনিময়ে খোদা তায়ালার যত কৃতজ্ঞতাই প্রকাশ করি না কেন, তা কম হবে।’ দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময়ে পিকটাল লন্ডনে ইসলামের তাবলীগের দায়িত্ব আনজাম দিতেন। জুমআয় খুতবা দিতেন। ইমামতি করতেন। ঈদে-তারাবী হতে নামাজ পড়াতেন। ইসলামিক রিভিউ সাময়িকীর সংকলন ও সম্পাদনার দায়িত্বও এই সময়ে তার উপর ছিল। এ সময়ে ইসলামি শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে তিনি যুক্ত ছিলেন। এ সময়টাকে তুর্কীদের নিয়ে বিভিন্ন গবেষণা-প্রবন্ধ ছাড়াও তার তিনটি বই প্রকাশিত হয়। 

পুলাত, মুজাফ্ফরনগর থেকে প্রকাশিত দাওয়াতি উর্দু ম্যাগাজিন মাসিক আরমুগান এর  বর্ষ #২৩, সংখ্যা #৪ (এপ্রিল ২০১৫)  থেকে অনুবাদ : সালেহ ফুয়াদ

lলেখক : ভারতের বিখ্যাত দায়ী মাওলানা কলিম সিদ্দিকীর পুত্র
ট্যাগস

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Know about Cookies
Ok, Go it!
To Top