বঙ্গবন্ধুর সংগ্রামী জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে গোটা জাতি একযোগে কাজ করলে দেশের অর্থনীতির চিত্র পাল্টে যাবে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমান। আর এর মধ্য দিয়ে দেশকে ক্ষুধা ও দারিদ্রমুক্ত সোনার বাংলা হিসাবে গড়ে তোলা সম্ভব বলে জানান তিনি।
সোমবার বাংলা একাডেমি আয়োজিত বঙ্গবন্ধুর ৪০তম শাহাদাতবার্ষিকী ও জাতীয় শোক দিবসের এক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় তিনি বঙ্গবন্ধুর জীবন ও জীবন দর্শন, রাজনৈতিক জীবনের ওপর আলোচনা করেন।
বঙ্গবন্ধুর রাজনীতি ধরন ও বর্তমান রাজনীতির তুলনা করতে গিয়ে গভর্নর বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর রাজনীতির মর্মকথাই ছিল দেশকে ভালোবাসা, মানুষের দু:খ-কষ্টে পাশে দাঁড়ানো; আর সততা নিয়ে লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাওয়া। তার রাজনীতির সঙ্গে বর্তমান রাজনীতির অনেক দূরত্ব। বর্তমানে শর্টকাটে নেতা হওয়ার মানসিকতা ও বিত্তশালী হওয়ার অসুস্থ প্রতিযোগিতায় রাজনীতি প্রায়ই প্রশ্নবিদ্ধ হতে দেখা যায়। দেশপ্রেম, ত্যাগ ও সততার অভাবে রাজনীতির প্রতি মানুষের আস্থা কমে যাচ্ছে। ফলে সত্যিকার রাজনীতিকদের জন্য সুস্থ রাজনীতি করাই এক বিরাট চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
বঙ্গবন্ধুকে দেশের অগ্রগতির জন্য দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক পরিকল্পনার প্রবর্তক উল্লেখ করে তিনি বলেন, তার অর্থনৈতিক আদর্শ ও কৌশল ছিল নিজস্ব সম্পদের ওপর দেশকে দাঁড় করানো। এজন্য স্বাধীনতা লাভের পরপরই নেন নানা উদ্যোগ। যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের প্রথম কয়েকটি বছর ছিল চড়াই-উতরাইপূর্ণ। তখন বাংলাদেশের পরিচিতি ছিল প্রাকৃতিক দুর্যোগপূর্ণ, বিধ্বস্ত অর্থনৈতিক কাঠামোর একটি অভাব অনটনের দেশ হিসাবে। দারিদ্র্যপীড়িত সাব-সাহার কয়েকটি দেশের সঙ্গে উচ্চারিত হতো বাংলাদেশের নাম। ছিল না অর্থ, অবকাঠামো, দক্ষ জনশক্তি, শিল্প-কারখানা, রপ্তানি আয়, রেমিট্যান্স ও বিদেশি মুদ্রার মজুদ।
এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশকে টিকে থাকার এক তীব্র লড়াই করতে হয়েছে। তখন পাশ্চাত্যের অর্থনীতিবিদরা বাংলাদেশকে উন্নয়নের পরীক্ষার মুখে পড়া এক অসহায় দেশ হিসাবে দেখেছেন। সেখান থেকে নিন্দুকদের মুখে ছাই দিয়ে বাংলাদেশ সম্বন্ধে সব ধরণের মিথ্যা ও ভ্রান্ত ধারণাকে মিথ্যা প্রমাণ করে অভাবনীয়ভাবে ধ্বংসাবশেষ থেকে স্ফিনিকস পাখির ন্যায় তুলে এনেছেন বলে জানান তিনি।
আতিউর রহমান বলেন, যারা সে সময়ে হতাশা ছড়িয়েছিলেন তারাই এখন বাংলাদেশকে উদীয়মান অর্থনীতির দেশ হিসাবে স্বীকৃতি দিচ্ছেন। বাংলাদেশ টেকসই প্রবৃদ্ধি ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের আদর্শ হিসাবে বিশ্বব্যাপী পরিচিত হয়ে উঠেছে। ইতোমধ্যেই বাংলাদেশ নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশের পরিচয় পেয়ে গেছে। এখন আমরা দ্রুত এগুচ্ছি উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশ হবার পথে।
কৃষকদের ভাগ্যোন্নয়নে বঙ্গবন্ধু নানা পদক্ষেপের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, সদ্য স্বাধীন হওয়া দেশের ত্রিশ লাখ টন খাদ্য ঘাটতি পূরণে তাৎক্ষণিক আমদানি, স্বল্প মেয়াদে উন্নত পদ্ধতিতে চাষাবাদ, উন্নত বীজ, সেচ ও অন্যান্য কৃষি-উপকরণ সরবরাহ, কৃষি ঋণ মওকুফ, সার্টিফিকেট মামলা প্রত্যাহার এবং কৃষকের মাঝে খাসজমি বিতরণ করে কৃষির উৎপাদনশীলতা ও উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে খাদ্যে স্বনির্ভরতা অর্জনের চেষ্টা করেন তিনি।
কৃষিতে প্রয়োজনীয় অর্থায়নের জন্য কৃষি ব্যাংক স্থাপন করেন। উচ্চতর কৃষি গবেষণা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। ১৯৭৩ সালের মধ্যেই ধ্বংসপ্রাপ্ত কৃষি-অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ করেন। পাকিস্তানি শাসনকালের দশ লাখ সার্টিফিকেট মামলা থেকে কৃষকদের মুক্তি ও তাদের সকল ঋণ সুদসহ মাফ করে দেন।
এছাড়া ২৫ বিঘা পর্যন্ত জমির খাজনা চিরদিনের জন্য রহিত করেন। পরিবার পিছু জমির সিলিং ১০০ বিঘায় নির্ধারণ করেন। আর এসব কাজ থেকেই বুঝা যায় কৃষকদের প্রতি কতটা উদার ছিলেন তিনি। করণ তিনি বিশ্বাস করতেন, কৃষিই এ দেশের জাতীয় আয়ের প্রধান উৎস। কৃষির উন্নতি তো দেশের উন্নতি।
গভর্নর বলেন, বঙ্গবন্ধুর সচেতন ও কৃষকদরদী নীতির ফলে কৃষিতে অগ্রগতির যে ধারা সূচিত হয়েছিল তারই ফলে আজ কৃষি খাত শক্তিশালী হয়েছে। কৃষকবান্ধব কৃষি উৎপাদন ও সহযোগী কৃষি ঋণ, কৃষি সম্প্রসারণ নীতিমালা প্রয়োগের ফলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক বিপ্লব ঘটে গেছে। বর্তমানে চার কোটি টন খাদ্য উৎপাদন হচ্ছে। পাঁচ-ছয় বছর আগেও বাংলাদেশকে প্রতিবছর এক বিলিয়ন ডলার বা তার বেশি খরচ করে চাল আমদানি করতে হতো। এখন চাল আমদানি করতে হয় না বললেই চলে। বর্তমান সরকার যে কল্যাণধর্মী ও কৃষকবান্ধব উন্নয়ন নীতি-কৌশল গ্রহণ করেছে তা বঙ্গবন্ধুর কৃষি-ভাবনারই প্রতিফলন বলে উল্লেখ করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন- বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক শামসুজ্জামান খান, এমেরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র ম. মাহফুজুর রহমানসহ আরও অনেকে।

