প্রাকৃতিক হিমাগার

S M Ashraful Azom

চাষিদের জন্য অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক খবর হইল, রাজশাহী নগরের নামোভদ্রা এলাকায় নির্মিত বিকল্প হিমাগারটি কাজ করিতেছে। গত ডিসেম্বরে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আতিউর রহমান ইহা উদ্বোধন করিয়াছিলেন। সংরক্ষণের জন্য রাখা হইয়াছিল ৫০০ মণ পেঁয়াজ। প্রায় চার মাস পরে গত সোমবার সেই পেঁয়াজ বাহির করা হইয়াছে। ওজন কমেনি, পচনের হারও সামান্য। কৃষকেরা খুশি। ইতোপূর্বে দুই হাজার মণ আলু রাখিয়াও ভালো ফল মিলিয়াছে। স্বল্প আয়ের কৃষকের জন্য ব্যয়সাশ্রয়ী এই শস্য সংরক্ষণাগারটি চালাইতে বিদ্যুতের প্রয়োজন নাই। প্রাকৃতিক বাতাসকে কাজে লাগানো হয়। যে কয়েকটি ফ্যান ব্যবহূত হয়, তাহাও চলে সৌরশক্তিতে। জলীয় বাষ্পের খুব সাধারণ একটি ধর্মকে কাজে লাগাইয়া ঘর ঠাণ্ডা রাখা হয়। আর বাঁশের তৈরি আরেক ধরনের প্রযুক্তি বাতাসের আর্দ্রতা ঠেকায়। কেহ কেহ ইহাকে প্রাকৃতিক হিমাগার না বলিয়া প্রাকৃতিক শস্য সংরক্ষণাগার বলাই সঙ্গত মনে করেন। তবে, যে নামেই ডাকি না কেন, ৩০০ টন ধারণক্ষমতার এই হিমাগারটি তৈরিতে ব্যয় হইয়াছে মাত্র ১৪ লক্ষ টাকা এবং নির্মাণ করিতে সময় লাগিয়াছে ছয় মাস। অথচ, প্রচলিত পদ্ধতিতে এই ধরনের একটি হিমাগার তৈরি করিতে প্রায় আড়াই কোটি টাকা লাগিয়া যায়।

উল্লেখ্য, ২০১২ সনে দিনাজপুরের বীরগঞ্জ উপজেলায় প্রাকৃতিকভাবে আলু ও সবজিসহ কৃষিপণ্য সংরক্ষণের জন্য নূতন এক হিমাগার নির্মাণ করিয়াছিলেন একজন প্রকৌশলী। তাহাতে মেঝেয় পানি দিয়া ঘর ঠাণ্ডা রাখা হইত। সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগাইয়া আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করিয়া আলো হিমাগারটি নির্মাণ করা হয়। সাধারণত, ৮৫ কেজির এক বস্তা আলু হিমাগারে রাখিতে কৃষকের খরচ হয় ৩৫০ টাকা। কিন্তু এই হিমাগারে লাগিবে মাত্র ১০০ টাকা। দেশে আদা ও পেঁয়াজের কোনো সংরক্ষণাগার নাই। ফলত, কৃষকের পেঁয়াজ ও আদা ৬০ শতাংশ নষ্ট হইয়া যায়। এই হিমাগারে আদা, পেঁয়াজ ব্যতীতও এক মাসের জন্য মরিচ, বেগুন, ফুলকপি ও বাঁধাকপি ইত্যাদি সবজি সংরক্ষণ করা যাইবে।

আমাদের দেশে সোয়া তিন কোটি টন খাদ্যশস্য উত্পন্ন হয়। অথচ খাদ্য মওজুতের জন্য রহিয়াছে মাত্র ১৫ লক্ষ টন ধারণক্ষমতাসম্পন্ন গুদাম। দেশে বর্তমানে আলুর হিমাগারের সংখ্যা চার শতাধিক। এইগুলিতে আলু সংরক্ষণক্ষমতা প্রায় ৫০ লক্ষ টন। কিন্তু বিশ্বের মধ্যে আলু উত্পাদনে বাংলাদেশের অবস্থান ১৫তম হইলেও এশিয়ার মধ্যে অবস্থান ৪র্থ। ফলত আলু চাষিরা প্রতিবত্সরেই বিপাকে পড়েন। অন্যরাও তাহাদের উদ্বৃত্ত ফসল সংরক্ষণ করিতে পারেন না, ভরা মৌসুমে ন্যায্য মূল্যও পান না। অন্যদিকে মধ্যস্বত্বঃভোগী ও সিন্ডিকেট এবং চাঁদাবাজ ও দুর্নীতিবাজদের দৌরাত্ম্যে সাধারণ নাগরিক চড়া মূল্যে খাদ্য কিনে। এই পরিপ্রেক্ষিতে রাজশাহীর এই নূতন শস্যসংরক্ষণাগারটি স্বল্প খরচে হিমাগার স্থাপন ও ফসল সংরক্ষণের ক্ষেত্রে আশার আলো দেখাইতেছে। দেশের সবগুলি থানাতেই হিমাগার তৈরি কিংবা অন্তত প্রাকৃতিক শস্য সংরক্ষণাগার স্থাপন উত্সাহিত করা সরকারের একান্ত কর্তব্য।
ট্যাগস

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Know about Cookies
Ok, Go it!
To Top