দীর্ঘ তিন যুগ ধরে কৃষি জমিতে লবণ পানি আটকে রেখে বাগদা চিংড়ি চাষের প্রসার ঘটায় দেশের একমাত্র আন্তর্জাতিক নৌ-পথ মংলা-ঘষিয়াখালী চ্যানেলসহ মংলা ও রামপাল উপজেলার ২৯৩টি ছোট-বড় নদী ও খাল নাব্যতা হারিয়েছে। জোয়ার-ভাটায় নদীর পানি শাখা খালসহ দু’পাশের প্লাবন ভূমিতে ওঠা-নামা করতে না পারায় পলি জমে নদী ও প্রধান খালগুলো ভরাট হয়ে গেছে। মাটি ও পানিতে মাত্রাতিরিক্ত লবণের কারণে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে কৃষি ও সবুজ বেষ্টনী। পানি চলাচলের প্রাকৃতিক পথ বন্ধ করে দেয়ায় সৃষ্টি হয়েছে জলাবদ্ধতা। দেখা দিয়েছে পরিবেশ বিপর্যয়। এখনই যত্রতত্র চিংড়ি চাষ নিয়ন্ত্রণ ও নদী-খালের অবৈধ দখল উচ্ছেদ করে প্লাবন ভূমি তৈরি করা না গেলে নিকট ভবিষ্যতে এই এলাকা মানুষের বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে বলে আশংকা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এলাকার প্রবীণদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, ১৯৭৯-৮০ সালে এই এলাকায় লবণ পানির বাগদা চিংড়ি চাষ শুরু হয়। তখন খুলনা ও বাগেরহাট শহরের প্রভাবশালীরা ঐ এলাকার মধ্যম ও নিম্ন আয়ের কৃষকদের জমি নামমাত্র মূল্যে ইজারা নিয়ে বা জবর দখল করে চিংড়ি চাষ শুরু করেন। সুন্দরবন সংলগ্ন উপকূলীয় এই এলাকার পরিবেশ ও প্রতিবেশগত অবস্থা লবণ পানির চিংড়ি চাষের জন্য অতিমাত্রায় অনুকূল থাকায় ঐসব প্রভাবশালীদের লোভ বেড়ে যায়। দীর্ঘ প্রায় দেড় যুগেরও বেশি সময় ধরে রামপাল-মংলার কৃষি মাঠ এসব বহিরাগতদের দখলে থেকে লবণ পানির চিংড়ি ঘেরে রূপান্তরিত হয়। বছরের পর বছর ধরে লবণ পানি আটকে মাছ চাষ করায় জমির উর্বরা শক্তি নষ্ট হতে থাকে। অন্যদিকে কোন কোন জমি মালিক চিংড়ি চাষি ঐ প্রভাবশালীদের কাছ থেকে জমিভাড়া (হারি) পেলেও অধিকাংশ জমি মালিক কোন হারি পেতেন না। বরং একটি সময়ে এসে চিংড়ি মৌসুম শেষেও প্রভাবশালীরা তাদের নিজ জমিতে চাষবাস করা থেকে বিরত থাকতে বাধ্য করেন। ক্রমে এলাকায় বহিরাগত চিংড়ি চাষীদের বিরুদ্ধে জনমত সংগঠিত হয় এবং অসংখ্য সন্ত্রাসী ঘটনার মধ্য দিয়ে তারা ঐ এলাকা ছেড়ে যান। ১৯৯৬ সাল নাগাদ এলাকায় প্রকৃত জমি মালিকরা নিজেরা ব্যাপকভাবে চিংড়ি চাষ শুরু করেন। এখন ঐ এলাকার কৃষি জমি ছাড়াও প্রতিটি বাড়ির সাধারণ পুকুর, ডোবা, জলাশয়েও চিংড়ি চাষ হচ্ছে।
রামপাল উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান শেখ আব্দুল জলিল বলেন, প্রথম দিকে চিংড়ি চাষ ছিলো এক প্রকার বিনা পুঁজির ব্যবসা। মৌসুমের সময় ঘেরে জোয়ারের পানি ঢুকালেই প্রাকৃতিক চিংড়ির রেণু ও বিভিন্ন মাছের পোনায় ঘের ভরে যেতো। পানি ও মাটিতে প্রাকৃতিক খাবার ছিলো। উত্পাদন হয়েছে প্রচুর। মৌসুম শেষে মোটা দামে চিংড়ি বিক্রি হয়েছে। টাকার লোভে বহিরাগতরা আরও বেশি করে এলাকায় এসে কৃষি মাঠ জবরদখল করেছে। ঐ সময় সম্পর্কে তিনি বলেন, বহিরাগতরা নিজেদের টিকিয়ে রাখতে এলাকায় দলাদলি সৃষ্টি করে সামাজিক বন্ধন ভেঙ্গে দেয়। বছরের পর বছর হারি না দিয়ে জমি মালিককে ঠকায়। রাজনীতিবিদ ও প্রশাসনের অসাধু কর্মকর্তাদের আশ্রয় পেয়ে বেপরোয়া আচরণ করে। নিজের জমি চাষ করতে না পেরে দরিদ্র কৃষক আরো দরিদ্র হয়। হত্যা, ধর্ষণ, মারামারি তখন ছিল নিত্যদিনের ঘটনা।
রামপাল উপজেলার বাঁশতলী ইউনিয়নের তালবুনিয়া গ্রামের নরেন বিশ্বাস (৮৩) বলেন, রামপাল ছিলো ধানের দেশ। আমার পরিবারের ৩০০ বিঘা ধানি জমি ছিল। বিঘা প্রতি ১৮-২০ মণ ধান হতো। গোয়ালে পঁচিশ-ত্রিশটি করে গরু থাকতো। গোলা ভরা ধান, পুকুরে বড় বড় মাছ ছিল, শাকসবজি, নারকেল, সুপারি ছিল প্রচুর। চিংড়ি চাষ আমাদের সব কিছু কেড়ে নিয়েছে। প্রভাবশালীরা জোর করে জমিতে চিংড়ি চাষ করেছে। তারা আমাদের হারির টাকাও দেয়নি। নিরুপায় হয়ে কম দামে জমি বিক্রি করে জীবন ধারণ করতে যেয়ে আমরা নিঃস্ব হয়ে গেছি।
রামপাল উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মোজাফ্ফর হোসেন বলেন, চিংড়ি চাষ করতে যেয়ে লোভে পড়ে খাল ও জলাভূমি দখল করা হয়েছে। রেকর্ডিয় খালে বাঁধ দিয়ে জোয়ার-ভাটা আটকে দেয়া হয়েছে। প্রবাহমান খালকে বদ্ধ জলাভূমি দেখিয়ে ইজারা নিয়ে মাছ চাষ করা হয়েছে। এখন আমরা সবাই তার পরিণতি ভোগ করছি। এখন নদী প্রবাহ ঠিক রাখতে গেলে মংলা-ঘষিয়াখালী চ্যানেলসহ প্রধান নদী-খালের দুই পাশে প্লাবনভূমি গড়ে তুলতে হবে। সরিয়ে নিতে হবে চিংড়ি ঘের। এসব করতে হবে দ্রুত, আরেকটি চিংড়ি মৌসুম শুরুর আগেই।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মনোজিত কুমার মল্লিক বলেন, নথি থেকে দেখা যায়, ১৯৮৬-৮৭ অর্থ-বছরে রামপাল উপজেলায় ৭০ হাজার একর জমিতে ২৮ হাজার মেট্রিক টন এবং মংলা উপজেলায় ৩৩ হাজার ৬৫০ একর জমিতে ১৪ হাজার ৭৩৮ মেট্রিক টন আমন চাল উত্পাদন হয়েছে। বর্তমানে এ দু’টি উপজেলায় আমন ধানের আবাদ নেই বললেই চলে। তিনি আরও জানান, চিংড়ি চাষের কারণে রামপাল ও মংলা উপজেলায় মাটি ও পানি কৃষির জন্য অনুপোযোগী হয়ে পড়ায় আগে সেখানে ধান ছাড়াও গম, পাট, আখ, সরিষা, তামাকসহ বিভিন্ন প্রকার সবজি উত্পাদন হয়েছে। এখন তা কল্পনারও বাইরে।
প্রসঙ্গত, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে আটক রাখা এসব নদী-খালের বাঁধ অপসারণ ও পুনঃখননের কাজ সম্প্রতি শুরু হয়েছে। বলা বাহুল্য এই কাজে ব্যয় হচ্ছে বিপুল পরিমাণ অর্থ।

