পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ও অবকাঠামোগত সমস্যায় খাতুনগঞ্জ-চাক্তাই বাণিজ্যিক কেন্দ্রে পাইকারি ব্যবসা হুমকির মুখে পড়েছে। বৃষ্টি ও জোয়ারের পানি প্রতিনিয়ত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ঢুকে পড়ছে। এতে পাইকারি বিক্রেতারা আড়তে পণ্য রাখতে পারছেন না। পণ্য সরবরাহ সমস্যায় খাতুনগঞ্জ-চাক্তাইয়ে দীর্ঘদিনের পাইকারি ক্রেতারা পাহাড়তলী ও মোহরা কামাল বাজার থেকে পণ্য কিনে নিয়ে যাচ্ছেন বলে ব্যবসায়ীরা জানান।
জানা যায়, ১৯৯৫ সালে সিডিএ প্রণীত মাস্টার প্ল্যানের আওতায় নগরজুড়ে অবকাঠামোগত উন্নয়ন হলেও এই বৃহত্তর বাণিজ্যিক এলাকা উপেক্ষিত রয়ে গেছে। ফলে সমস্যা এখন প্রকট হয়েছে। সিডিএ সূত্র জানায়, খাতুনগঞ্জের জলাবদ্ধতা নিরসন ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে মাস্টার প্ল্যানে কিছু পরামর্শ উল্লেখ রয়েছে। এতে রয়েছে- চাক্তাই খাল ২৫ মিটার পর্যন্ত প্রশস্ত করে সংস্কার ও উন্নয়ন, প্রতিবন্ধকতা দূর করে পলি অপসারণসহ সংস্কারকরণ ও পানি ধারণ ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য এই এলাকায় চাক্তাই খালের সাইড স্লোব এবং গভীরতা বৃদ্ধি করা, কর্ণফুলী নদীর মুখে নৌকা চলাচলের জন্য গেট রেখে ২১ মিটার প্রশস্ত টাইডাল রেগুলেটর (জোয়ার-ভাটার পানি প্রতিরোধক) নির্মাণ। এছাড়া এই এলাকায় সেকেন্ডারি ও রোড সাইড নালাসমূহের প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত করে সংস্কার করার কথা বলা হয়েছে; কিন্তু বিগত ২০ বছরেও এসব দিক-নির্দেশনা বাস্তবায়নে কোন উদ্যোগ নেয়নি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। এ প্রসঙ্গে সিডিএ প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ শাহীনুর ইসলাম খান ‘ইত্তেফাক’কে বলেন, ‘চাক্তাই খালের তীরে নির্মিত বিভিন্ন স্থাপনা থেকে পরিত্যক্ত জিনিসপত্র ফেলায় খাল ভরাট হয়ে যাচ্ছে। দেশের প্রাচীন বাণিজ্যিক কেন্দ্র খাতুনগঞ্জের ঐতিহ্য রক্ষা করতে মাস্টার প্ল্যানে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এখন বাস্তবায়ন বড় সমস্যা। খাতুনগঞ্জের রাস্তাগুলো কমপক্ষে ২০ ফুট প্রশস্ত করার কথা মাস্টার প্ল্যানে উল্লেখ রয়েছে। খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়-বাণিজ্য সুবিধার্থে আরশাফ আলী রোড সম্প্রসারণের উপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে মাস্টার প্ল্যান।’
গত কয়েক মাস ধরে জলাবদ্ধতা খাতুনগঞ্জ-চাক্তাই এলাকার ব্যবসায়ীদের অতিষ্ঠ করে তুলেছে। দোকানে পানি ঢুকে শতশত কোটি টাকার পণ্য নষ্ট হয়ে গেছে। পণ্য সরানোর সময়ও পায়নি ব্যবসায়ীরা। এবারের ন্যায় পানি সমস্যা অতীতে কোন সময় হয়নি। আকস্মিক এই সমস্যায় বিপাকে পড়েছে ব্যবসায়ীরা। এটি যদি স্থায়ী হতে থাকে তাহলে পাইকারি ব্যবসা হুমকির মুখে পড়বে। চাক্তাই খালের পূর্ব পাশে চাক্তাই এবং পশ্চিম পাশে খাতুনগঞ্জের অবস্থান। চাক্তাই খালের উভয় পাশে গড়ে উঠা এই পাইকারি বাজারে ভোগ্যপণ্যসহ নানান ধরনের পণ্য বেচা-কেনা হয়ে থাকে। ব্যবসায়ীরা জানান, খাতুনগঞ্জ ও চাক্তাইয়ে পণ্য মজুদের বড় ধরনের কোন গুদাম নেই। পণ্য মজুদের বড় বড় গুদামগুলো নগরীর মাঝিরঘাট, অলংকার মোড়, নাসিরাবাদ এলাকায় অবস্থিত। খাতুনগঞ্জে বিক্রিত পণ্য এসব গুদাম থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ দেয়া হয়। তবে চট্টগ্রাম শহরের আশপাশের উপজেলা ও জেলার পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতারা ২/১ গাড়ি করে পণ্য নিয়ে থাকে। আর এসব পণ্য চাক্তাই-খাতুনগঞ্জের দোকান থেকে সরবরাহ দেয়া হয়। এখন জলাবদ্ধতায় ছোটখাটো পাইকারি পণ্য সরবরাহ নিয়ে সমস্যা দেখা দিয়েছে। পাইকারি বিক্রেতারা দোকানে পণ্য রাখতে পারছে না। এলাকার ব্যবসায়ীদের অভিযোগ ছোট-খাট পাইকারিরা ক্রেতারা এখন খাতুনগঞ্জ-চাক্তাই থেকে অন্যত্র চলে যাচ্ছে। তারা নগরীর পাহাড়তলী বাজার, মোহরা কামাল বাজারসহ অন্যান্য পাইকারি বাজার থেকে পণ্য নিয়ে যাচ্ছে। এতে খাতুনগঞ্জের পাইকারি ব্যবসায় চরম মন্দা দেখা দিয়েছে।
খাতুনগঞ্জ-চাক্তাইয়ের অবকাঠামো উন্নয়ন প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান আবদুচ ছালাম ইত্তেফাককে বলেন, ‘বক্সিরহাট থেকে চাক্তাই পর্যন্ত প্রধান সড়কটির সম্প্রসারণের জন্য একটি প্রকল্প তৈরি করে অনুমোদনের জন্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন পাওয়া গেলে সড়ক সম্প্রসারণের কাজ করা হবে। তবে ড্রেনেজ সমস্যা নিরসনের দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের।’
জানা যায়, খাতুনগঞ্জ-চাক্তাই এলাকায় জলাবদ্ধতা সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প নিয়ে চাইনিজ কোম্পানির সাথে আলোচনা চলছে। এতে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে। প্রকল্পের আওতায় ৭০ কিলোমিটার মেরিন ড্রাইভ সড়ক নির্মাণ, স্লুইজ গেইট নির্মাণ, পাম্প স্থাপন করা হবে। এ প্রসঙ্গে খাতুনগঞ্জের আমদানিকারক, ব্যবসায়ী ও চট্টগ্রাম চেম্বার সভাপতি মাহাবুবুল আলম ইত্তেফাককে বলেন, ‘খাতুনগঞ্জ-চাক্তাইয়ে প্রতিদিন দেড় হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয়ে থাকে। সম্প্রতি জলাবদ্ধতা সমস্যায় দৈনিক লেনদেন ৬/৭শ কোটিতে নেমে এসেছে। এ ধরনের নেতিবাচক প্রভাব অর্থনৈতিক বিকাশ, ব্যাংক ঋণ পরিশোধ ও রাজস্ব আদায় ক্ষতিগ্রস্ত হবে। খাতুনগঞ্জ-চাক্তাই এলাকার অবকাঠামো ও জলাবদ্ধতা নিরসনে এলাকার ব্যবসায়ী সংগঠনের প্রতিনিধি, সিটি করপোরেশন ও সিডিএ-এর সাথে আলাপ করে স্বল্পমেয়াদি প্রকল্প গ্রহণের জন্য আমাকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। শীঘ্রই এ ব্যাপারে উদ্যোগ নেয়া হবে।’
এদিকে খাতুনগঞ্জ ট্রেড এন্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন দেশের অন্যতম বাণিজ্যিক কেন্দ্র খাতুনগঞ্জ-চাক্তাইয়ের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের কাছে স্মারকলিপি প্রদান করেছেন। এতে ব্যবসায়ী নেতারা বলেছেন, চাক্তাই খালের মোহনা ভরাট ও কর্ণফুলী নদীতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের অপরিকল্পিত ড্রেজিংয়ের ফলে চাক্তাই-খাতুনগঞ্জে অবর্ণনীয় বিপর্যয় ঘটেছে।

