অর্থনৈতিক অঙ্গনেও অনিশ্চয়তা

S M Ashraful Azom
বিদেশি নাগরিক হত্যার ঘটনায় বিনিয়োগ-কারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। দেশের উন্নয়ন ও বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত রয়েছেন এমন বিদেশি নাগরিকদের অনেকেই দেশ ছাড়ছেন। সীমিত করা হয়েছে বিদেশিদের চলাচল। এতে করে ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে আসা বিদেশিরাও ঢাকা ত্যাগ করছেন। গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক বৈঠকও স্থগিত হচ্ছে। অস্থিরতা দেখা দিয়েছে অর্থনেতিক অঙ্গনে।
 
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিদেশি নাগরিক হত্যা ও সতর্ক বার্তা জারি করায় বিশ্বজুড়ে ‘ব্যাড সিগন্যাল’ যাচ্ছে যা বাংলাদেশে বিনিয়োগ ও বাণিজ্যে আস্থার সংকট সৃষ্টি করতে পারে। দেশের প্রধান রফতানি পণ্য তৈরি পোশাকের বায়ার প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত বায়ার্স ফোরামের বৈঠকও বাতিল হয়ে গেছে। গত ৫ অক্টোবর এই বৈঠক হওয়ার কথা ছিল।
 
দেশের অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি পোশাক খাতেও এ ঘটনার পর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। সমপ্রতি বেশ কিছু বায়ার বাংলাদেশ সফর স্থগিত করেছেন। পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা মনে করছেন, এ ধরনের ঘটনা বাংলাদেশের ইমেজকে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। বিজিএমইএ’র ঊর্ধ্বতন সহসভাপতি ফারুক হাসান বলেন, ‘বায়াররা এখনো পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। যারা আসছেন না তারা তৃতীয় কোন দেশে গিয়ে অর্ডার নিয়ে আলোচনা করতে বলছেন। ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের মাধ্যমেও আলোচনা হচ্ছে। আবার কেউ কেউ অপেক্ষা করছেন। আমরা ভয় পাচ্ছি এসব সম্ভাব্য অর্ডার পিছিয়ে যায় কি না’।
 
বিষয়টি নিয়ে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীসহ সরকারের শীর্ষ পর্যায়েও আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে বিজিএমইএ। আলোচনা করতে প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাত্ চাওয়া হয়েছে বলেও জানিয়েছেন ফারুক হাসান। অবশ্য সংগঠনের সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান মনে করেন এ ধরনের ঘটনা আর না ঘটলে বিদেশিদের মধ্যে আস্থা ফিরতে শুরু করবে।
 
বিদেশি হত্যার ঘটনায় বিদেশি বিনিয়োগ ও রপ্তানি আয় বাধাগ্রস্ত হতে পারে বলে উদ্বেগের কথা জানিয়েছে ঢাকা চেম্বার (ডিসিসিআই), ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস ফোরাম অব বাংলাদেশসহ (আইবিএফবি) একাধিক ব্যবসায়ী সংগঠন। এদের পক্ষ থেকে এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিদেশিদের নিরাপত্তা জোরদারের দাবি করা হয়।
 
এদিকে হাজার হাজার বিদেশি নাগরিক গার্মেন্টস ও টেক্সটাইল খাতসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ ও মধ্যম পর্যায়ের ব্যবস্থাপনায় কাজ করছেন। তাদের মধ্যেও আতঙ্ক বিরাজ করছে। উদ্যোক্তারা মনে করছেন, তাদের মধ্যকার এ ভীতি দূর করা প্রয়োজন।
 
গত ২৮ সেপ্টেম্বর গুলশানে ইতালির নাগরিক চেজার তাবেল্লা ও ৩ অক্টোবর রংপুরে জাপানের নাগরিক কুনিয়ো হোশি নির্মমভাবে নিহত হওয়ার পর আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। সরকার অবশ্য বিদেশি নাগরিকদের নিরাপত্তার ইস্যুকে গুরুত্বসহ দেখছে।
 
তবে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য তাদের নাগরিকদের সতর্ক বার্তা দেয়ায় অন্যান্য দেশের নাগরিকরাও নির্বিঘ্নে চলাচল করছেন না। বিভিন্ন প্রকল্প, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান কিংবা কারখানায় কর্মরতরা ফিরে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন। ইতিমধ্যে বাংলাদেশে কয়েকটি বিদ্যুেকন্দ্রে কর্মরত বিদেশি বেশকিছু শ্রমিক নিজ দেশে ফিরে গেছেন বলেও জানা গেছে। অনেকে হোটেল বুকিং বাতিল করেছেন।
 
এসব আতঙ্কের খবর ভারতসহ বিদেশি সংবাদ মাধ্যমেও গুরুত্ব পাচ্ছে। ভারতের আউটলুক ম্যাগাজিনের সিনিয়র এডিটর প্রণয় শর্মা এক নিবন্ধে বলেন, এসব হামলা বাংলাদেশি ও বাংলাদেশে বসবাসকারী বিপুলসংখ্যক বিদেশির মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে দিয়েছে। সব থেকে বড় উদ্বেগের মধ্যে অন্যতম হলো দেশে ২৫০০ কোটি ডলারের গার্মেন্ট শিল্প যা দেশটির অর্থনীতির শক্তিশালী স্তম্ভ।
 
অর্থনীতিবিদ ড. ফাহমিদা খাতুনের মতে, এই ঘটনা বিদেশিদের কাছে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে ভিন্নভাবে দেখাবে। ফলে ‘ব্র্যান্ডিং বাংলাদেশ’ ক্ষতির মুখে পড়বে। যেহেতু তাদের যে কোন অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে ইমেজ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে- তাই এ ধরনের হত্যাকাণ্ড তাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করবে। বাণিজ্য, বিনিয়োগ, বৈদেশিক সহায়তা ও প্রবাসী আয়সহ দেশের অর্থনীতির প্রায় ৬০ শতাংশই আন্তর্জাতিক অর্থনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত।
 
তিনি বলেন, এ ধরনের ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের অনেক উন্নত দেশেও ঘটে কিন্তু তারা উন্নত অর্থনীতির দেশ। বাংলাদেশ কেবল নিম্ন আয় থেকে নিম্ন মধ্য আয়ের দেশে উন্নীত হলো। আমাদের মাথাপিছু আয়ও তাদের তুলনায় অনেক কম।
ট্যাগস

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Know about Cookies
Ok, Go it!
To Top