রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) চারুকলা অনুষদের গ্রাফিক ডিজাইন, কারু শিল্প ও শিল্পকলার ইতিহাস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আজাদী পারভিনের বিরুদ্ধে তার ছাত্রের পিএইচডি থিসিসের প্রায় ৯০ ভাগ হুবহু নকলের অভিযোগ উঠেছে। টাকার বিনিময়ে বিভাগেরই আরেক শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে তিনি ডিগ্রি গ্রহণে অবৈধ পন্থা অবলম্বন করেছেন বলে জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষক। বিষয়টি জানাজানি হওয়ায় শাস্তি এড়াতে ওই শিক্ষক নিজেই তার পিএইচডি থিসিস বাতিলের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় রেজিস্ট্রারের কাছে লিখিত আবেদন জানিয়েছেন। এ নিয়ে ক্যাম্পাসে তোলপাড় শুরু হয়েছে।
চারুকলা অনুষদ সূত্রে জানা গেছে, ২০০৯ সালের অক্টোবরে ‘বাংলাদেশের কারুশিল্প : একটি নৃতাত্ত্বিক সমীক্ষা’ শীর্ষক অভিসন্দর্ভের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট একই বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ আলীর পিএচডি ডিগ্রি অনুমোদন করে। তার থিসিসের তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন একই বিভাগের অধ্যাপক বিলকিস বেগম। মোহাম্মদ আলীর ডিগ্রি গ্রহণের তিন বছরের মাথায় ২০১২ সালের জুলাইয়ে তারই বিভাগীয় সহযোগী অধ্যাপক ও সাবেক শিক্ষক আজাদী পারভিনের ‘বাংলাদেশের কারুশিল্প : ঐতিহ্য ও আধুনিকতা’ শীর্ষক আরেকটি পিএইচডি থিসিস অনুমোদ করে বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট। পরের থিসিসের তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের তত্কালীন অধ্যাপক মো. আমিরুল মোমেনীন চৌধুরী; যিনি বর্তমানে লিয়েন (ছুটি) নিয়ে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করছেন।
গত সোমবার রাবি কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের দুষ্প্রাপ্য শাখায় গিয়ে পিএইচডি থিসিস দুটি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, আজাদী পারভিনের গোটা থিসিসের প্রায় ৯০ ভাগ হুবহু মিল রয়েছে মোহাম্মদ আলীর থিসিস পেপারের সঙ্গে। প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত মোহাম্মদ আলীর থিসিস নিজের নামে চালিয়ে দিয়েছেন আজাদী পারভিন। অথচ থিসিস পেপারের প্রথমে তিনি লিখেছেন, ‘অভিসন্দর্ভটি আমার নিজস্ব রচনা। আমার জানা মতে এ বিষয়ে ইতিপূর্বে কোনো পূর্ণাঙ্গ গবেষণা হয়নি।’
বিষয়টি স্বীকার করে আজাদী পারভিন সাংবাদিকদের বলেন, থিসিস চুরির বিষয়টি সত্য হলেও তিনি এতে জড়িত নন। তার অজান্তেই থিসিসের তত্ত্বাবধায়ক এই কাজটি করেছেন। তিনি বিষয়টি জানার ও বোঝার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রারের কাছে নিজের নামে সিন্ডিকেটে অনুমোদিত হওয়া থিসিস পেপার বাতিলের জন্য লিখিত আবেদন করেছেন।
এ ব্যাপারে আজাদী পারভিনের থিসিসের তত্ত্বাবধায়ক মো. আমিরুল মোমেনীন চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘আজাদী থিসিসে যা লিখেছেন আমি তা অনুমোদনের সুপারিশ করেছি মাত্র। থিসিস নকল বা চুরির সঙ্গে সে নিজেই জড়িত। মোহাম্মদ আলীর থিসিসটি আমি আগে না দেখার কারণেই আজাদী এই সুযোগ নিতে পেরেছিল।’ তবে কারো কাছ থেকে কোনো অর্থ নেয়ার অভিযোগ সঠিক নয় বলে তিনি দাবি করেন।
রাবির একাধিক শিক্ষক বলেছেন, মো. আমিরুল মোমেনীন চৌধুরী আগেও একাধিক শিক্ষকের থিসিসের তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন। এ কাজে তিনি অনেকের নিকট থেকেই মোটা অঙ্কের টাকা নিয়েছেন বলে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। তাই আজাদী পারভিন ছাড়াও তার অধীনে অন্য শিক্ষকদের থিসিস পেপার তদন্তের দাবি জানাচ্ছি।
এ ব্যাপারে মূল থিসিসের রচয়িতা মোহাম্মদ আলী বলেন, আজাদী পারভিন ও আমিরুল মোমেনীন উভয়েই আমার শিক্ষক। তাদের একজন আমার থিসিস চুরি এবং আরেকজন তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে সম্মতি দিয়ে গোটা শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে ভয়ঙ্কর প্রতারণা করেছেন।
আজাদী পারভিনের থিসিস বাতিলের আবেদন প্রসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক এম এন্তাজুল হক সাংবাদিকদের বলেন, এ বিষয়ে আমার কাছে কেউ আবেদন করেছে কি না তা দেখে বলতে হবে। কারণ আমার কাছে কোনো ফাইল এলে তা সঙ্গে সঙ্গে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট দফতরে পাঠিয়ে দেই।

