দুই বিদেশি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ফেঁসে যাচ্ছেন একাধিক বিএনপি নেতা! গোয়েন্দারা দাবি করছেন, বিএনপির প্রভাবশালী কয়েক নেতার সম্পৃক্ততার প্রাথমিক তথ্যপ্রমাণ তারা পেয়েছেন। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, চেজার তাভেল্লা হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে একজন কিলারসহ গ্রেফতারকৃত চারজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে নেপথ্যের হোতাদের সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য পাওয়া গেছে। কথিত ‘বড়ভাই’ ছাড়াও নেপথ্যের নায়ক হিসেবে বাড্ডার একজন প্রভাবশালী বিএনপি নেতা এবং কেন্দ্রীয় এক নেতাসহ আরো একাধিক নেতার নাম উঠে আসছে তদন্তে। এদের মধ্যে দুইজন নেতা বর্তমানে লন্ডনে ও ভারতে অবস্থান করছেন বলেও জানা গেছে। এদিকে গ্রেফতারকৃতদের নির্দোষ দাবি করে তাদের মুক্তি চেয়েছেন পরিবারের সদস্যরা।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালও বলেছেন, ইতালির নাগরিক চেজার তাভেল্লা ও জাপানের নাগরিক কোনিয়ো হোশি হত্যাকাণ্ডে রাজনীতিবিদরা জড়িত। গতকাল মঙ্গলবার সচিবালয়ে নিজ দফতরে তিনি সাংবাদিকদের আরো জানিয়েছেন, জড়িত রাজনীতিবিদদের কেউ কেউ বর্তমানে গোয়েন্দা নজরদারিতে আছেন। আর কেউ বিদেশে আছেন।
তাভেল্লা হত্যা মামলার তদন্ত তদারক কর্মকর্তা ও ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) অতিরিক্ত উপ-কমিশনার মাহফুজুল ইসলাম বলেন, রিমান্ডে তিনজন আসামি চাকতি রাসেল, মিনহাজুল ওরফে ভাগ্নে রাসেল এবং শাখাওয়াত ওরফে শরীফ এখনো হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা সরাসরি স্বীকার করেননি। তবে তাদের কথাবার্তায় কিছুটা অসংলগ্নতা পাওয়া যাচ্ছে। আট দিনের রিমান্ডের প্রথম দিন ছিল গতকাল। তিনি আরো জানান, গ্রেফতারকৃত অপরজন তামজিদ আহম্মেদ রুবেল ওরফে শুটার রুবেল হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন। শুটার রুবেল ডিবি পুলিশকে নেপথ্যের ‘বড় ভাই’ সম্পর্কে কিছু তথ্য দিয়েছে। এখন আদালতে দেয়া জবানবন্দির কপির জন্য অপেক্ষা করছি। সেটি পেলেই আরো অনেক বিষয়ে পরিষ্কার হওয়া যাবে।
জানা গেছে, কয়েক দিন আগে ঢাকা মহানগর বিএনপির নেতা আব্দুল কাইয়ুম ওরফে কাইয়ুম কমিশনারের ছোট ভাই মতিনকে বাড্ডা এলাকা থেকে আটক করেছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। তাভেল্লা হত্যায় তার সম্পৃক্ততার আভাস দিচ্ছেন গোয়েন্দারা। কিন্তু মতিনকে আটকের বিষয়টি এখনো নিশ্চিত করেনি গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। সংশ্লিষ্ট মাধ্যমগুলোর তথ্যমতে, নেপথ্যের কথিত ‘বড়ভাই’ হিসেবে মতিনকে সন্দেহ করা হচ্ছে। মতিনের পেছনেও আবার বিএনপির কেন্দ্রীয় ও মধ্যম সারির প্রভাবশালী অন্তত চারজন নেতার জড়িত থাকার তথ্য পেয়েছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। সে তথ্যগুলো যাচাই বাছাই করা হচ্ছে। এরপরই মূলত তাদের গ্রেফতার ও পুরো বিষয়টি গণমাধ্যমে আরেক দফায় উপস্থাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা।
গত ২৮ সেপ্টেম্বর গুলশান-২ এলাকায় চেজার তাভেল্লা খুন হওয়ার পাঁচদিন পর গত ৩ অক্টোবর রংপুরে একই কায়দায় জাপানের নাগরিক কুনিয়ো হোশিকে হত্যা করা হয়। পুলিশ মনে করছে, দুটি হত্যাকাণ্ড একইসূত্রে গাঁথা। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও গতকাল অভিন্ন কথা বলে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, তাভেল্লার মত কুনিয়ো হত্যাকাণ্ডে রাজনৈতিক নেতাদের সম্পৃক্ততা আছে। এদিকে কুনিয়ো হত্যাকাণ্ডে জড়িত অভিযোগে ঘটনার পরপরই গ্রেফতার করা হয় ঢাকা মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব ও স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি হাবিবুন্নবী খান সোহেলের ভাই রাশেদুন্নবী বিপ্লব ও নিহতের ব্যবসায়িক অংশীদার হুমায়ুন কবির হিরাকে। দুই দফায় রিমান্ড শেষে তারা কারাগারে আছেন।
গ্রেফতারকৃতদের পরিবারের ভিন্নমত
এদিকে মিনহাজুল আরেফিন রাসেল ওরফে ভাগ্নে রাসেল ওরফে কালা রাসেল সপরিবারে রাজধানীর মধ্য বাড্ডায় থাকেন। তার বাবা সিরাজুল ইসলাম বলেন, মিনহাজুল পুরোনো আসবাবের ব্যবসা করেন। ১২ অক্টোবর এলাকার রাস্তা থেকে ডিবি পরিচয়ে তাকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তার মুক্তি দাবি করেন তিনি। গ্রেফতারকৃত শাখাওয়াত হোসেন ওরফে শরীফ মধ্য বাড্ডায় থাকতেন। তার ভাই মো. সোহাগ বলেন, ১৪ অক্টোবর রাতে মোটরসাইকেলসহ তাকে ডিবি পরিচয়ে আটক করে নিয়ে যায়। তিনি বলেন, মধ্য বাড্ডা তাদের একাধিক বাড়ি আছে। এসব বাড়ির ভাড়া তুলে সে চলত। শাখাওয়াত স্থানীয় বিএনপির কর্মী। রাসেল চৌধুরী ওরফে চাকতি রাসেলকে ১০ অক্টোবর দক্ষিণ বাড্ডার বাসা থেকে ডিবি পরিচয়ে আটক করা হয়। তার মা আফরোজা আক্তারের দাবি, রাসেল বিএনপির সমর্থক, কোনো পদে নেই। বিএনপির মিছিল-সমাবেশে যেতেন। তার ছেলে মানুষ খুনে জড়িত নন বলে দাবি করেন তিনি। গ্রেফতারকৃত প্রত্যেককে নির্দোষ দাবি করে মুক্তি চান পরিবারের সদস্যরা।

