দলীয় প্রতীকে স্থানীয় নির্বাচন

S M Ashraful Azom
দলীয় প্রতীকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে যাবে না এমন আভাস মিলছে বিএনপিতে। এ নিয়ে নতুন শঙ্কায়ও রয়েছে দলটি। এমনকি এই প্রক্রিয়ায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে সরকারের হস্তক্ষেপ আরো বেড়ে যাবে এবং বিএনপি মনোনীত প্রার্থীদের সরকার সমর্থকরা ভোটকেন্দ্র থেকে বের করে দেবে বলে আশঙ্কা করছেন দলটির নেতারা। দলীয় সূত্র জানায়, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া এই মূহর্তে চিকিৎসার জন্য লন্ডনে অবস্থান করছেন। দল গুছিয়ে বড় একটি প্লাটফর্ম তৈরি করে জাতীয় নির্বাচনের দাবিতে রাজপথে নামার চিন্তা রয়েছে তাদের। এই মুহূর্তে হুট করে দলীয় প্রতীকে নির্বাচনের যাওয়ার বিষয়ে ভাবছে না দলটি। তাছাড়া দলের সাংগঠনিক কাঠামোয় বিশৃঙ্খলাসহ দমন-পীড়ন, হামলা-মামলার মধ্যে এতো অল্প সময়ে নির্বাচনে প্রতিদ্ব›িদ্বতা করার মতো অবস্থা নেতাকর্মীদের নেই। দলসমর্থিত সম্ভাব্য প্রার্থীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা তো আছেই, প্রার্থীর পক্ষে কাজ করতে পারেন এমন নেতাকর্মীরাও জেলে আছেন। এমন হাত-পা বাঁধা অবস্থায় নির্বাচনে অংশ নেয়া কারো পক্ষে সম্ভব হবে না। তবে এ বিষয়টি নিয়ে লন্ডনে অবস্থানরত দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের মধ্যে রুদ্ধদ্বার বৈঠক হয়েছে বলে দলটির নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক নেতা জানিয়েছেন। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে না যাওয়ার বিষয়েই খালেদা জিয়া টেলিফোনে সিনিয়র নেতাদের আভাস দিয়েছেন বলেও দলীয় সূত্র নিশ্চিত করেছেন। আগামীতে রাজনৈতিক পরিচয়ে দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিত হবে স্থানীয় সরকারের নির্বাচন। এর অংশ হিসেবে আগামী ডিসেম্বরে অনুষ্ঠেয় পৌরসভা নির্বাচন দলীয় প্রতীকে হচ্ছে। এ লক্ষ্যে আইন সংশোধনের প্রক্রিয়া শুরু করেছে সরকার। এমন খবরে বেশ অস্বস্ততিতে পড়েছেন বিএনপির তৃণমূলের নেতারা। দলের ভেতরে ও বাইরে এ নিয়ে চলছে জোর আলোচনা। দল পুনর্গঠনে যেখানে লেজে গোবরে অবস্থা সেখানে হঠাৎ করেই দলীয় প্রতীকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের খবরে নতুন করে শঙ্কায় পড়েছেন তারা। সিনিয়র নেতারা এ বিষয়ে নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা করছেন। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে যেহেতু তৃণমূলের অংশ, স্থানীয় নেতাকর্মীদের আশা-অকাক্সক্ষার বিষয় জড়িত, তাই দলের তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মনোভাব বুঝতে তাদের সঙ্গেও আলোচনা করা হচ্ছে। আগামী ১৬ অক্টোবর বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার লন্ডনে চিকিৎসা শেষে দেশে ফেরার কথা রয়েছে। জানা গেছে, দেশে ফিরে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ গ্রহণের বিষয়টি সামনে রেখে শিগগিরই দল ও জোটের নেতাদের নিয়ে বৈঠকে বসবেন তিনি। এ বিষয়ে বিএনপির সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এ মূহর্তে বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণের চেয়ে দল পুনর্গঠনের বিষয়ে বেশি মনোযোগী। কঠিন সময় অতিক্রম করার জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে তারা। এ মুহূর্তে জেলে থাকা নেতাকর্মীদের জামিনে মুক্ত করাই দলটির সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। এর পাশাপাশি দলের সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধি করাই মূল চ্যালেঞ্জ। এছাড়া আগামী ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে বিএনপির ষষ্ঠ কাউন্সিল করার চিন্তাভাবনা চলছে। এতে পুরো দলকে ঢেলে সাজানো হবে। এই মুহ‚র্তে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়টি মাথায় নেই তাদের। তারা অভিযোগ করেন, সারা দেশে জেলা-উপজেলা চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান পর্যায়ে জনপ্রতিনিধিদের ক্ষমতাচ্যুত করা হয়েছে। শাসকদলীয় লোকদের তারা সেই কালো আইনের ভিত্তিতে ভারপ্রাপ্ত মেয়র, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান পদে বসিয়েছেন এবং গেজেট নোটিফিকেশন করে তাদের ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করেছে। যেখানে দলীয় প্রতীক ছাড়াই নির্বাচনের এ হাল, তখন দলীয় প্রতীকের মাধ্যমে যখন এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে, তখন তারা বিএনপির প্রার্থীদের, বিএনপির মনোনীত এবং বিএনপি থেকে যারা জিতবেন, তাদের সরকার বের করে দিতে পারবে। এ পথটি আরো বেশি পরিষ্কার হবে তাদের কাছে। এ ছাড়া জাতীয় নির্বাচনের দাবিকে পাশ কাটানোর উদ্দেশ্যেই সরকার এ উদ্যোগ নিচ্ছে বলে অভিযোগ তাদের। ইসি সূত্র জানিয়েছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন সংক্রান্ত এ আইনটি সংশোধিত হলে ৪০টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের বাইরে আর কোনো দল নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না। ইসির পরিকল্পনা অনুযায়ী ডিসেম্বরে সারা দেশের পৌরসভা নির্বাচন করতে শিগগিরই স্থানীয় সরকার বিভাগকে আইন সংশোধনের কাজ শেষ করার অনুরোধ করেছে কমিশন। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সচিব সিরাজুল ইসলাম বলেন, নভেম্বরের কোনো একটি সময়ে তফসিল ঘোষণা করে ডিসেম্বরে নির্বাচনটি করতে চাই আমরা। বিধিমালার খসড়াটি করে ফেলা যায় কিনা সেই চেষ্টা নির্বাচন কমিশন করে যাচ্ছে। কারণ আইন পরিবর্তন করতে গিয়ে যেন নির্বাচন করতে দেরি না হয়ে যায় সেই ব্যাপারটি লক্ষ্য রাখা হচ্ছে। সচিব আরো বলেন, নির্বাচন যেহেতু রাজনৈতিক ভিত্তিতে হবে; সেহেতু রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য নির্দিষ্ট প্রতীক নির্ধারিত থাকবে। আমাদের ধারণা, রাজনৈতিক দলের প্রতীক ব্যবহার করা সমীচীন হবে। জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচনে অংশ নেয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আদালত যেহেতু জামায়াত দলের নিবন্ধন বাতিল করেছে সে ক্ষেত্রে এই নির্বাচনে তাদের অংশ নেয়ার কোনো সুযোগ নেই। দলীয় প্রতীকে নির্বাচনের বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, উন্নত দেশগুলোতে দলীয় প্রতীকে ও মনোনয়নে নির্বাচন হয়। এটাকে নীতিগতভাবে সমর্থন করাই যায়। তবে বাংলাদেশের বিভাজিত রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থায় এবং রাজনীতিতে যেভাবে অপরাজনীতি চর্চা হয়, তাতে করে শঙ্কা জাগে সেখানে ভিন্ন দলের লোকেরা নির্বাচিত মেয়র ও জনপ্রতিনিধিদের কাছ থেকে সত্যিকার নাগরিক সেবাটা পাবেন কিনা। সে জন্য বিষয়টি আমরা বিবেচনার করার কথা বলতে চাই। নির্বাচনে অংশ নেয়ার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দলের চেয়ারপারসন বর্তমানে দেশে নেই। এই মূহর্তে নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়ে আমরা ভাবছি না। এ বিষয়ে দলীয় প্রধান সিদ্ধান্ত নেবেন। আর নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হলে অবশ্যই সেটিকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নেয়া হবে। এই সম্পর্কে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) হান্নান শাহ বলেন, এটা সরকারের নতুন ষড়যন্ত্র। সরকার জনগণকে বিব্রত করতে চাইছে। ক্ষমতার অপব্যবহার করতেই তারা একের পর এক পরিকল্পনা করে যাচ্ছে। তিনি বলেন, আমরা চেয়েছিলাম স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয়ভাবে না হয়ে নির্দলীয়ভাবেই হোক, কিন্তু সরকার তা মেনে নেয়নি। আমাদের দাবি সরকার যেন এই নির্বাচন থেকে সরে আসে। যেহেতু দলের চেয়ারপারসন এই মূহর্তে দেশে নেই, তিনি দেশে ফিরলেই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানো হবে বলে এই বিএনপি নেতা উল্লেখ করেন। দলটির ভাইস চেয়ারম্যান সেলিমা রহমান বলেন, সরকার হুট করে কোনো সিদ্ধান্ত নিলেই তারা তা মেনে নেবেন না। তা হতে পারে না। তিনিও দলের চেয়ারপারসন দেশে না থাকায় এই মূহর্তে নির্বাচনে অংশ গ্রহণের বিষয়ে কিছু ভাবছেন না বলে জানান। তিনি বলেন, নির্বাচনে যাওয়ার বিষয়ে ভবিষ্যতে সময়, পরিস্থিতি ও দলের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে। বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব মো. শাহজাহান বলেন, বর্তমান নির্বাচন কমিশনের অধীনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন কেন কোনো নির্বাচনই সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠিত হওয়া সম্ভব নেই। আমরা তো গত সিটি নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলাম, শেষ পর্যন্ত তা বর্জন করতে হয়েছে। সরকার ভোটারদের ভোট রক্ষা করতে পারেনি। মানুষকে ভোট কেন্দ্রে আসার সাহস যোগাতেও তারা ব্যর্থ হয়েছে। তাদের তো শক্তি, সামর্থ ও নিরপেক্ষতা কোনোটাই নেই। তাছাড়া আগামী ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে দলের কাউন্সিলের চিন্তা চলছে, এই মূহর্তে নির্বাচনে অংশগ্রহণের কোনো কারণ আছে বলে আমি মনে করি না। তারপরেও দলীয় প্রধানের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। বিএনপির মুখপাত্র ড. আসাদুজ্জান রিপন বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠানের আয়োজন একটা নীল নকশা ছাড়া আর কিছুই নয়। আমরা জাতীয় নির্বাচনের দাবি করছি। সরকার এটাকে পাশ কাটাতে দলীয় প্রতীকে নির্বাচনের দিকে যাচ্ছে। এর মাধ্যমে বিএনপিকে কিছু সিট দিয়ে তারা সুকৌশলে দেশের জনগণ ও বিশ্ব স¤প্রদায়কে দেখাতে চাইবে, জনগণ তাদের সঙ্গে আছে। তিনি বলেন, শাসক দলের যে চরিত্র প্রকাশ হচ্ছে, তাতে স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় পরিচয়ে হলে ভিন্ন দল ও মতের লোকরা সেবা না পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণ না করলে দল কোনো ক্ষতির সম্মুখীন হবে না বলেও মনে করেন তিনি। প্রসঙ্গত, বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের দ্বিতীয় মেয়াদে স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয়ভাবে করার দাবি জানায়। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম প্রকাশ্যেই স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয়ভাবে করার ওপর জোর দেন। তারই ধারাবাহিকতায় নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের মনোনয়ন ও প্রতীকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের জন্য পাঁচটি আইন সংশোধনের প্রস্তাবে গতকাল সোমবার অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার নিয়মিত বৈঠকে ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা, জেলা পরিষদ ও সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন আইন সংশোধনের খসড়ায় নীতিগত ও চূড়ান্ত এ অনুমোদন দেয়া হয়। বৈঠকের পর মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ মোশাররাফ হোসাইন ভূইঞা সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান। 

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Know about Cookies
Ok, Go it!
To Top