যাত্রীবাহী বাসে ভাড়া নিয়ে নৈরাজ্য শুরু হয়েছে। সরকার নির্ধারিত বর্ধিত ভাড়ার পাঁচগুণ আদায় করা হচ্ছে। এই নিয়ে প্রতিদিনই পরিবহন শ্রমিকদের সঙ্গে যাত্রীদের বাকবিতণ্ডা, হাতাহাতির ঘটনা ঘটছে। সমস্যা সমাধানে বাস স্টপেজে ভাড়ার তালিকা ঝুলানোর দাবি জানিয়েছে দেশের বিশিষ্ট নাগরিকরা। এছাড়া অতিরিক্ত ভাড়া আদায় ঠেকাতে চারটি ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
সমপ্রতি গ্যাসের দাম বাড়ায় ঢাকা ও আশপাশের পাঁচ জেলা এবং চট্টগ্রামের যাত্রীবাহী বাসের ভাড়া কিলোমিটার প্রতি ১০ পয়সা হারে বাড়ানো হয়। নতুন এই বর্ধিত ভাড়া গত ১ অক্টোবর থেকে কার্যকর হয়েছে। তবে রাজধানীতে চলাচল করা বাসে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তালিকার চেয়ে বেশি ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। লোকাল বাসে এই প্রবণতা বেশি বলে যাত্রীরা অভিযোগ করেছেন।
জানা গেছে, সিটিং সার্ভিসের নামে বেশিরভাগ বাসে বাড়তি ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। অবশ্য মোটরযান আইনে ‘সিটিং সার্ভিস’ বলে কোনো পরিবহনের কথা উল্লেখ নেই। প্রতিটি বাস-মিনিবাসে ২০ শতাংশ আসন খালি যাবে এটা ধরে নিয়ে ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে।
গত মঙ্গলবার সড়ক পরিবহন মন্ত্রী এ প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের বলেছেন, সিটিং সার্ভিস কিংবা অন্য যে নামেই হোক, বাড়তি ভাড়া আদায় করা যাবে না। ভ্রাম্যমাণ আদালত এসব পেলে ব্যবস্থা নেবে।
বিআরটিএ’র একজন উপ-পরিচালক বলেন, সর্বশেষ যে ভাড়া বেড়েছে তাতে সিটি সার্ভিসের সর্বোচ্চ গন্তব্যে মোট দূরত্বের জন্য প্রায় সাড়ে চার টাকার মতো ভাড়া বাড়তে পারে। এর বেশি বাড়ালে সেটা অবৈধ।
একজন যাত্রী জানান, গাবতলী থেকে মহাখালী পর্যন্ত তিনি নিয়মিত ১৫ টাকা ভাড়া দিয়ে যাতায়াত করতেন। কিন্তু এখন ২০ টাকা করে ভাড়া আদায় করা হচ্ছে।
মতিঝিল থেকে ফার্মগেটে দশ টাকার ভাড়া ১২ টাকা হয়েছে। মতিঝিল থেকে ফার্মগেটের দূরত্ব সাড়ে ৭ কিলোমিটার। ভাড়া হওয়ার কথা ১০ টাকা ৭৫ পয়সা। তবে তা মানা হচ্ছে না।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি বলছে, ১৭০টি রোডে পর্যবেক্ষণ করে তারা দেখেছে ঢাকা শহরের প্রায় ৮৭ ভাগ যানবাহন যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করছে। জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধির অজুহাতে গণপরিবহনের ভাড়া ইচ্ছেমতো বাড়ানো হয়েছে। সেই তুলনায় যাত্রীদের সেবার বদলে নানা হয়রানির শিকার হতে হয়।
সংগঠনটির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশের গণপরিবহনগুলো আইন-কানুন কিছুই তোয়াক্কা করে না। আর এখানে মালিকদের এমন একটা শক্তিশালী সিন্ডিকেট কাজ করছে যারা কোন না কোন রাজনৈতিক আশ্রয়ে দিন দিন বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।
ঢাকা সড়ক পরিবহন সমিতির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার এনায়েত উল্যাহ জানান, বিআরটিএ বেশ কিছু রুটের ভাড়ার তালিকা এখনও সম্পন্ন করতে পারেনি। তালিকা পেলে এই নৈরাজ্য আর থাকবে না।
তিনি আরও জানান, ভাড়া বাড়ানোর পর কয়েকদিন একটু ঝামেলা হওয়াই স্বাভাবিক। আমরা সমিতির পক্ষ থেকে কাজ করে যাচ্ছি। বিভিন্ন রুট কমিটির নেতাদের নিয়ে মিটিং করছি। কেউ যাতে কোনভাবে বাড়তি ভাড়া আদায় করতে না পারে তা পর্যবেক্ষণ করার জন্য বিভিন্ন পয়েন্টে লোক নিয়োগ করা হচ্ছে।
সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের যানবাহন মালিকদের যাত্রীসেবা নিশ্চিত করতে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় না করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, অতিরিক্ত ভাড়া আদায় বন্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান অব্যাহত থাকবে। এখন চারটি আদালত বসে। ভবিষ্যতে আরও দুটি আদালত বাড়বে।
সমপ্রতি এক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির প্রধান উপদেষ্টা সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, গণপরিবহনে চলমান ভাড়া নৈরাজ্য রোধে প্রত্যেক বাস স্টপেজে সরকার নির্ধারিত ভাড়ার তালিকা বিলবোর্ড আকারে টাঙানোর দাবি করছি।
একই অনুষ্ঠানে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আনু মুহাম্মদ বলেন, অযৌক্তিকভাবে গ্যাস ও তেলের দাম বাড়ানোর কারণেই এ ভাড়া নৈরাজ্য শুরু হয়েছে। সরকার যে পরিমাণ ভাড়া বাড়িয়েছে তার চেয় বেশি ভাড়া আদায় করছে বাস মালিকরা। কারণ বেশিরভাগ বাসের মালিক সরকার সংশ্লিষ্ট।

