বাংলাদেশের মঞ্চে দক্ষিণ ভারতীয় লোকনাট্য ‘যক্ষগান’

S M Ashraful Azom
পিতার সঙ্গে পুত্রদের পরিচয় ছিল না। বনবাসে থাকা দুই পুত্র লব ও কুশের সঙ্গে ঘোরতর যুদ্ধ শুরু হয়। এ সময় মা সীতা এসে পুত্রদের কাছে তাদের পিতা রামচন্দ্রের পরিচয় দেন। ভারতীয় মহাকাব্য রামচন্দ্রের সঙ্গে তার দুই জমজ পুত্র লব ও কুশ এবং তার মা সীতার মিলন কাহিনী। শত শত বছর ধরে কর্নাটকের লোকনাট্য এ ধারা মানুষের মনোরঞ্জন করে চলেছে। আধুনিক বিনোদনের নানা উপকরণের মাঝেও নিজেদের বর্ণিল উপস্থাপন দিয়ে আজো টিকে আছে যক্ষগান।
 
ঢোল, মৃদঙ্গ এবং মন্দিরা যোগে মঞ্চে বসে গাইছেন আর সুরের জাদু ছড়াচ্ছেন তিন শিল্পী। আর তাদের লোকজ গানের সুরে সুরে নেচে যাচ্ছেন দুই শিল্পী। নাচে আর গানে একটা গল্পও বলা হচ্ছে। আই সেই পরিবেশনাই দর্শক   শ্রোতারা মন্ত্র মুগ্ধের মতো উপভোগ করছেন। পিতা রামচন্দ্রের সঙ্গে দুই যমজ বালক লব-কুশের এ মিলনের দৃশ্য দেখা গেলো মঙ্গলবার সন্ধ্যায়। জাতীয় জাদুঘরের প্রধান মিলনায়তনে দক্ষিণ ভারতের কর্নাটক অঞ্চলের ‘যক্ষগান লোকনাট্যদল’ নুপুরের ঝংকারের সঙ্গে পিতা আর পুত্রের মিলনকে সবার সামনে তুলে আনে। প্রায় দেড় ঘন্টার মুগ্ধকর এ নৃত্যশৈলীর নাম যক্ষগান। যার আয়োজন করে ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব কালাচারাল রিলেশন (আইসিসিআর)। সার্বিক ব্যবস্থাপনায় ছিল ইন্ধিরা গান্ধী কালচালার সেন্টার।
 
অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ছিলেন বন ও পরিবেশ মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু। তিনি মঙ্গলপ্রদীপ প্রজ্বলন করে অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন। অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথি ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার পঙ্কজ সরন। স্বাগত বক্তব্য রাখেন ইন্ধিরা গান্ধী কালচারাল সেন্টারের পরিচালক জয়শ্রী কুন্ডু।
 
গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় জাতীয় জাদুঘরে আয়োজিত এ লোকনাট্যে নৃত্যে-সংলাপে দেখানো হয় ভারতীয় মহাকাব্য রামায়ণের রামচন্দ্র ও তাঁর দুই যমজপুত্র লব-কুশের মিলন কাহিনী। এটির আয়োজক ইন্দিরা গান্ধী সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। অনুষ্ঠান সহযোগী ছিল ইন্ডিয়ান কাউন্সিল ফর কালচারাল রিলেশন।
 
বাংলাদেশের দর্শকদের কাছে যক্ষগান একেবারেই অপরিচিত। তাই উপস্থিত দর্শকরা বেশ আগ্রহ নিয়ে উপভোগ করলেন ভারতীয় শিল্পীদের পরিবেশনা। যক্ষগান ভারতের কর্নাটক অঞ্চলের লোকনাট্য শিল্পকলা। এর শাব্দিক অর্থ যক্ষের গান। এ লোকগানের শিল্পরূপের ইতিহাস শতাব্দী প্রাচীন। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের দুই মহাকাব্য মহাভারত ও রামায়ণের কাহিনী অবলম্বনে নাট্যাকারে পরিবেশিত হয়ে থাকে।
 
নাট্যকলায় স্নাতক ডিগ্রিধারী আট সদস্যের এই যক্ষগান দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন শ্রী নাগরাজ যোশী। তিনি গেল সাড়ে তিন দশক তাঁর গানের দল ‘শবর’-এর মাধ্যমে কয়েকশ’ যক্ষগানের আয়োজন করেছেন। গত সোমবার চট্টগ্রামের দর্শক-শ্রোতাদের মুগ্ধ করে এ দল। গতকাল মঙ্গলবার রাজধানী ঢাকায় ছিল তাদের দ্বিতীয় পরিবেশনা। এরপরই তারা সাতক্ষীরায় বুধবার ও খুলনায় বৃহস্পতিবার পরিবেশন করবেন এ যক্ষগান। এ লোকনাট্যে আছে সঙ্গীত, সাহিত্য, নৃত্য, অভিনয়, সংলাপ, অঙ্গসজ্জা— সব মিলিয়ে শিল্পকলার এক অনবদ্য রূপ। এর গঠনশৈলীও ভিন্ন। যক্ষগানে মঞ্চের পেছনে থাকেন যন্ত্রী ও গায়কদল, সামনে থাকেন নৃত্য ও অভিনয় শিল্পীদল, যাঁরা একযোগে মহাকাব্যের অংশবিশেষ অভিনয় করেন। এ শিল্পরূপকে পশ্চিমা অপেরার সঙ্গে তুলনা করা হয়।
 
যক্ষগানে বর্ণনা করা হয়েছে রামায়নে বর্ণিত পিতা-পুত্রের মিলনের এক খণ্ড-আখ্যান। মা সীতা দেবীর সঙ্গে মহর্ষি বাল্মীকির আশ্রমে প্রতিপালিত লব-কুশ। এই দু’সন্তান জানতেন না যে তাদের বাবা রামচন্দ্র, যিনি অযোধ্যার রাজা। একদিন দুই বালক খেলাচ্ছলে রামচন্দ্রের অশ্বমেধ যজ্ঞের ঘোড়া বেঁধে রাখলেন। অশ্বমেধের ঘোড়া নির্বিঘ্নে পৃথিবী প্রদক্ষিণ করে এলেই কেবল পৃথ্বীশ্বর হওয়া যায়। যজ্ঞের ঘোড়া বাঁধা পড়ায় রামচন্দ্র এলেন ঘোড়া উদ্ধারে। ঘোড়া উদ্ধার করতে গিয়ে আত্মজের সঙ্গে নিজের অজান্তেই লিপ্ত হলেন যুদ্ধে। দুই শিশু রামচন্দ্রের সঙ্গে বীরবিক্রমে যুদ্ধ  করলেন। কেউ কাউকে ছাড়ার পাত্র নয়। পরে মা সীতা এসে তাদের পিতৃপরিচয় জানিয়ে যুদ্ধের অবসান ঘটান। রামচন্দ্রও জানতেন না এই দুই বালক তারই সন্তান। পরিচয় পেয়ে তিনি আপ্লুত হয়ে পড়েন আর সাথে সাথেই জড়িয়ে ধরেন। তারপর সবাইকে নিয়ে রামচন্দ্র অযোধ্যায় ফিরে যান।
 
জাতীয় জাদুঘরে নভেরা আহমেদের ভাস্কর্য হস্তান্তর
 
বাংলাদেশের আধুনিক ভাস্কর্য শিল্পের পথিকৃত্ নভেরা আহমেদ। বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে নভেরা আহমেদের ৪০টি শিল্পকর্ম। গত ৭ অক্টোবর নভেরা আহমেদের শ্রদ্ধার্পণ স্বরূপ বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর আয়োজিত একটি প্রদর্শনী চলছে। এ প্রদর্শনীতে উপস্থাপিত হচ্ছে শিল্পীর ৩৪টি ভাস্কর্য এবং ২৮টি চিত্রকর্মের আলোকচিত্র। গতকাল এই প্রদর্শনীর সঙ্গে যুক্ত হলো নভেরা আহমেদের আরেকটি ভাস্কর্য যেটি বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাষ্ট্রিজ করপোরেশনের সদর দপ্তরে ছিল। গতকাল শুধু প্রদর্শনীর জন্য ধার হিসেবে জাদুঘরের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে ভাস্কর্যটি হস্তান্তর করা হয়।
 
হস্তান্তর অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন জাদুঘর বোর্ড অব ট্রাস্টিজের সভাপতি এম. আজিজুর রহমান। বক্তব্য রাখেন বিসিআইসির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ইকবাল এবং শিল্পী হাশেম খান। স্বাগত বক্তব্য রাখেন জাদুঘরের মহাপরিচালক ফয়জুল লতিফ চৌধুরী। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সাবেক সংস্কৃতি সচিব ড. রনজিত্ কুমার বিশ্বাস।
ট্যাগস

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Know about Cookies
Ok, Go it!
To Top