ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ:প্রয়োজন সচেতনতা এবং শৃঙ্খলা

S M Ashraful Azom
বাংলাদেশ সহ সারা বিশ্বে ডায়াবেটিস এক মহামারী রোগ। কয়েক দশক আগেও এটি ছির খুব স্বল্প পরিচিত রোগ। অথচ বর্তমানে শুধু উন্নত বিশ্বেই নয়, বরং উন্নয়নশলি এবং অনুন্নত বিশ্বেও অসংক্রমক ব্যাধির মধ্যে ডায়াবেটিস অন্যতম স্বাস্থ্য সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুধু শহরাঞ্চলে নয়, গ্রামীণ জনপদে এমনকি শিশুদের মধ্যেও ডায়াবেটিস বিস্তার লাভ করেছে। এর ফলে সমাজ হারাচ্ছে কর্মক্ষম ও সম্ভাবনাময় এক তরুণ যুবা প্রজন্মকে, যার সামাজিক ও অর্থনৈতিক মন্দ প্রভাব গোটা জাতিকে স্থবির করে দিচ্ছে। বেড়ে যাচ্ছে অন্ধত্ব, স্নায়ুরোগ, কিডনি ও হূদযন্ত্র বিকল হওয়া, পায়ে আলসার এবং পরিনামে পা কেটে ফেলতে বাধ্য হওয়ার মতো ভয়াবহ জটিলতাগুলো। অসংখ্য মানুষ নিজেদের কর্মক্ষমতা হারিয়ে, পরিবারের ও সমাজের ওপর অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
 
ডায়াবেটিস কি এবং কেন-
 
শর্করা বা কার্বোহাইড্রেট বিপাক ক্রিয়া নিয়ন্ত্রণকারী হরমোনের নাম ইনসুলিন। অগ্ন্যাশয় থেকে নি:সৃত এই হরমোন শরীরের কোষে গ্লুকোজ প্রবিষ্ট করতে এবং সেই গ্লুকোজকে ‘গ্লাইকোলাইসিস’ নামক বিপাকীয় ক্রিয়ার মাধ্যমে শরীরের জন্য শক্তি উত্পাদন করতে সহায়তা করে। আবার অতিরিক্ত গ্লুকোজকে লিভারে গ্লাইকোজেন হিসেবে সঞ্চয় করে। ফলে রক্তের গ্লুকোজ এটি স্বাভাবিক মাত্রায় থাকে। এই হরমোন অগ্ন্যাশয় থেকে পর্যাপ্ত নি:সৃত না হলে, ঘাটতি হলে বা উত্পাদিত ইনসুলিন কোষে কার্যকর না হলে বা শরীরের ইনসুলিন নিষ্ক্রিয় থাকলে, রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে বৃদ্ধি পায় এবং প্রস্রাবের সাথে গ্লুকোজ বের হয়ে যায়। এটিই হচ্ছে ডায়াবেটিস মেলাইটাস বা বহুমূত্র রোগ। অনেকেই এক সময় ডায়াবেটিসের গ্লুকোজ সমৃদ্ধ প্রস্রাবকে “মধুমূত্র” নামে আখ্যায়িত করতেন। নামের সাথে মধুর সংশ্রব থাকলেও আসলে ইহার যে মধুময় নয়, তা ভূক্তভোগী মাত্রই জানেন।
 
ডায়াবেটিস সাধারণত: দুই রকম। টাইপ-১ বা ইনসুলিন নির্ভর ডায়াবেটিস, যা মুলত: কম বয়সে হয়ে থাকে। তাতে অগ্ন্যাশয় ইনসুলিন তৈরি করার ক্ষমতা হারায় এবং এসব রোগীদের ইনসুলিন অপরিহার্য। আরেকটি হচ্ছে টাইপ-২ বা ইনসুলিন অনির্ভর ডায়াবেটিস।
 
বিশ্বেজুড়ে ৮০ শতাংশ হলো টাইপ-২ ডায়াবেটিস, যা বয়স্কদের হয়ে থাকে। স্থূলতা বা ওজন বৃদ্ধি, মন্দ খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, মানসিক চাপ, ধুমপান ইত্যাদি টাইপ-২ ডায়াবেটিসের অন্যতম কারণ। বর্তমানে একই সঙ্গে বাড়ছে নারীদের গর্ভকালীন ডায়াবেটিস বা জিডিএম এর প্রবণতা।
 
ডায়াবেটিসের কারণ-
 
টাইপ-১ জন্মগত কিংবা পরিবেশগত কারণে এই ডায়াবেটিসের প্রকোপ দেখা যায়। বছরে তিন শতাংশ এই ডায়াবেটিস বাড়ছে এবং সাধারণত তরুণরাই এতে আক্রান্ত হচ্ছে।
 
টাইপ-২ অতিরিক্ত ওজন, মেদবাহুল্য, কায়িক পরিশ্রমরে অভাব, উচ্চ শর্করা এবং কম আঁশযুক্ত খাদ্যাভ্যাস তাকলে এই ডাযাবেটিরেস ঝুঁকি বেড়ে যায়। বংশগত কারণেও এই ধরণের ডায়অবেটিসের ঝুঁকি বাড়ে। বাবা মা কারও এক জনের ডায়াবেটিস থাকলে ঝুঁকি বাড়ে, আর দুজনেরই থালে ডায়াবেটিসের আশঙ্কা অনেক গুণ বেড়ে যায়।
 
গর্ভকালীন ডায়াবেটিস-
 
অনেক সময় শুধ গর্ভকালেই ডায়াবেটিসের উদ্ভব ঘটে। মেডিকেল সাইন্সের পরিভাষায় একে জিডিএম বলে। এটি মা এবং শিশুর অসংখ্য জটিলতার কারণ হতে পারে। সঠিক কারণ জানা না গেলেও পরিবারে ডায়াবেটিস থাকলে গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বেড়ে যায়। (চলবে)
 
 
 
 লেখক:ডীন, মেডিসিন অনুষদ
 
অধ্যাপক, মেডিসিন বিভাগ
 
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Know about Cookies
Ok, Go it!
To Top