
শ্যালা নদীতে ট্যাংকার ডুবির ক্ষতিকর প্রভাব এখনও পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেনি সুন্দরবন। এক বছর পার হতে চললেও ম্যাগগ্রোভ এ বনের জীববৈচিত্র্যের ক্ষতির আশঙ্কা রয়েই গেছে। দেশ-বিদেশে আলোড়ন সৃষ্টিকারী পরিবেশ বিপর্যয়ের ওই ঘটনার পর সুন্দরবন সুরক্ষায় জাতিসংঘের পর্যবেক্ষক দলসহ সরকারি বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার সুপারিশ আজও বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। এ ঘটনার পর ভবিষ্যত্ দুর্ঘটনার রোধে নেয়া হয়নি কার্যকর ব্যবস্থা। অপরদিকে তেলবাহী ট্যাংকার ডুবির ঘটনায় বন বিভাগের দায়ের করা একশ’ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণের মামলার এখন পর্যন্ত সুরাহা হয়নি। সুন্দরবনের অভ্যন্তরে শ্যালা নদী দিয়ে এখনও চলছে তেলবাহী ট্যাংকারসহ পণ্যবাহী ভারী নৌযান। সুন্দরবনের নৌপথে ঘটছে ছোট-বড় দুর্ঘটনা। আর এ সব ঘটনা এড়াতে যেন দুর্বল ও অসহায় বনবিভাগ। নিজেদের নজরদারি থাকার কথা বনবিভাগ দাবি করলেও একের পর এক নৌযান ডুবির ঘটনা ঘটেই চলছে।
গত বছর ৯ ডিসেম্বর সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের কাছে শ্যালা নদীতে অপর একটি জাহাজের ধাক্কায় তেলবাহী ট্যাঙ্কার ‘ওটি সাউদার্ন স্টার-৭’ ডুবে যায়। তেল ছড়িয়ে পড়ে পুরো পূর্ব সুন্দরবনের নদী ও সংযুক্ত খালগুলোতে। তেল ছড়িয়ে যায় পশুর নদী হয়ে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত। ক্ষতিগ্রস্ত হয় চাঁদপাই রেঞ্জের বিস্তীর্ণ এলাকা। বনের পরিবেশের ক্ষতির পাশাপাশি আশ-পাশের লোকালয়ের মানুষও ক্ষতিগ্রস্ত হয় ট্যাংকার থেকে ছড়িয়ে পড়া ফার্নেস অয়েলে। পরে সরকারি বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার আর্থিক সহায়তায় স্থানীয় জনগণকে দিয়ে আনুমানিক ৬৮ হাজার লিটার তেল উদ্ধার করতে সক্ষম হয়। ঘটনার পর শ্যালা নদী দিয়ে সব ধরনের নৌযান চলাচল বন্ধ করে দেয়া হলেও মাসখানেক পর তা পুনরায় চালু করা হয়।
এ পরিস্থিতিতে সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল স্থানীয় লোকজনের ওপর নিঃসরিত তেলের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে উদ্বিগ্ন সরকার ১৫ ডিসেম্বর পরিস্থিতির মূল্যায়ন এবং তা নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করতে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচিকে (ইউএনডিপি) অনুরোধ করে। জাতিসংঘের দুর্যোগ পর্যালোচনা ও সমন্বয় বিষয়ক বিশেষজ্ঞ, সরকারি কর্মকর্তা, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, ইউএনডিপি, ইউএসএআইডি, ইউনিয়ন সিভিল প্রটেকশন মেকানিজ্ম, ফরাসি সরকার এবং ওয়াইল্ডলাইফ কনজারভেশন সোসাইটির প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত ২৫ সদস্যের বিশেষজ্ঞ দল সুন্দরবন এলাকা পর্যবেক্ষণ করে।
তারা এ পথে নৌচলাচল করতে দেয়ার আগে প্রয়োজনীয় সুরক্ষা এবং নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করে নেয়ার পরামর্শ দেয়া হয়। একইরকম দাবি ও সুন্দরবনের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত নৌ-রুট বন্ধের সুপারিশ করে দেশের পরিবেশবাদীসহ সরকারি বেসরকারি নানা সংস্থা। কিন্তু শ্যালা নদীতে তেলবাহী ট্যাংকার ডুবির এক বছরেও জাতিসংঘসহ দেশি-বিদেশি পরিবেশবাদীসহ বিভিন্ন সংগঠনের সুপারিশ আজও বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে সুন্দরবনের শ্যালা নদী ও অভ্যন্তরের নৌপথে এখনও তেলবাহী ট্যাংকারসহ পণ্যবাহী নৌযান চলাচল করছে। পরিবেশবিদরা বলছেন, বনের ভিতর দিয়ে পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল বন্ধে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা ইউনেস্কো, ইউএনডিপি, দেশি ও আন্তর্জাতিক পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। সব মতামত উপেক্ষা করে বনের ভেতর দিয়ে এখনও চলছে পণ্যবাহী জাহাজ। বার বার সতর্ক করা সত্ত্বেও সুন্দরবনের নিরাপত্তা নিয়ে উদাসীন থাকায় সরকারের প্রতি তারা প্রশ্ন রেখেছেন, কত ক্ষতি হলে টনক নড়বে সবার?
বর্তমানে এই শ্যালা নদী দিয়ে চলছে তেল, সারসহ পণ্যবাহী কার্গোবাহী, কোস্টার ও ট্যাংকার। নৌ চলাচলের জন্য মংলা-ঘষিয়াখালী নদী চালু হলেও তা পুরোপুরি কাজে আসছে না। এ রুট দিয়ে জোয়ারের সময় ছোট নৌযান চলাচল করলেও বড় ও ভারী নৌযানগুলো শ্যালা রুটে চলাচল করছে। এ প্রসঙ্গে গবেষণামূলক বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সেভ দ্য সুন্দরবন-এর চেয়ারম্যান ড. ফরিদুল ইসলাম জানান, তেলবাহী টাংকার দুর্ঘটনার জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থাসহ কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি সরকার। এছাড়া বনবিভাগের ক্ষতিপূরণের একশ’ কোটি টাকা আদায় এবং মামলা নিষ্পত্তির গতিতে শংকা প্রকাশ করেন তিনি। তিনি আরও জানান. ম্যানগ্রোভ এ বন সুরক্ষায় আলাদা মন্ত্রণালয় গঠনসহ অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের তত্পরতা রোধ, বন সংলগ্ন এলাকায় তাপবিদুত্ কেন্দ্র ও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর শিল্প প্রতিষ্ঠান না করা এবং বনের সাথে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা প্রয়োজন।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি প্রযুক্তি অনুষদের প্রফেসর ড. সরদার সাইফুল ইসলাম বলেন, তেলের ট্যাংকার দুর্ঘটনায় যে সম্ভাব্য ক্ষতির আশংকা করা হয়েছিল তার চেয়ে কিছুটা কম হয়েছে। যতটুকু ক্ষতি হয়েছিল তা হয়তো সহনশীল ক্ষমতা দিয়ে পুষিয়ে নিয়েছে সুন্দরবন। তবে ম্যানগ্রোভ এ বনের ওপর আন্তর্জাতিক বন্যপ্রাণীর পাচারকারী চক্রের আগ্রাসন রয়েছে জানিয়ে তিনি সুন্দরবনের ভবিষ্যত্ নিয়ে শংকা প্রকাশ করেন।
গতকাল মঙ্গলবার মংলার জয়মনীর শ্যালা নদীতে বিআইডব্লিউটিএ’র মার্কম্যান মো. মোতালেব হোসেন বললেন, শুধু ভোর ৬টা থেকে বেলা ১১ পর্যন্ত জোয়ারের সময় নৌযানগুলো চলাচল করছে। তবে তেলবাহী ট্যাংকারসহ সকল ধরনের নৌযানই চলছে সুন্দরবনের এই নদী দিয়ে। নৌযান চলাচল বন্ধ হবে কি না তা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের বিষয়। রিভার মরফোলজি ডিভিশনের বিশেষজ্ঞ এটিএম কামাল হোসেন বলেন, ছোট-ছোট কিছু নৌযান চলাচল করছে মংলা-ঘষিয়াখালী চ্যানেল দিয়ে। তবে চ্যানেলটি পুরোপুরি চালু না হওয়ায় ও খননকৃত জায়গা দ্রুত পলি পড়ে ভরাট হয়ে যাওয়ায় আদৌ পুরোপুরিভাবে নৌপথটি চালু করা সম্ভব হবে কি না তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
সুন্দরবন পূর্ব বনবিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষণ মো. বেলায়েত হোসেন জানান, গত জুন মাসের মধ্যে মংলা-ঘষিয়াখালী চ্যানেল পুরোপুরি চালু করে সুন্দরবনের শ্যালা নদী দিয়ে নৌযান চলাচল বন্ধ করার কথা থাকলেও তা কার্যকর করা হয়নি। ট্যাংকার ডুবির ঘটনায় দায়ের করা একশ’ কোটি টাকার ক্ষতিপূরণের মামলা আদালতে শুনানির পর্যায় রয়েছে। এখন পর্যন্ত চার্জ গঠন হয়নি। তিনি জানান, ট্যাংকার ডুবির বছর পার হতে চললেও ক্ষতিকর প্রভাব এখনও পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেনি সুন্দরবন। জীববৈচিত্র্যের ক্ষতির আশংকা রয়েই গেছে।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর ড. আব্দুল্লাহ হারুন চৌধুরী বলেন, মংলা-ঘষিয়াখালী চ্যানেলটি পুরোপুরি চালু না হওয়ায় সুন্দরবনের ভিতরে শ্যালা নদী দিয়ে এখনও বড় ভারী জাহাজ চলাচল করছে। শ্যালা নদীর দুর্ঘটনার পর যে সব সুপারিশ করা হয়েছিল তা বাস্তবায়িত না হওয়ায় সুন্দরবনের অভ্যন্তরে নৌ-দুর্ঘটনাসহ পরিবেশ বিপর্যয়ের আশংকা রয়েই গেছে।

খবর/তথ্যের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, সেবা হট নিউজ এর দায়ভার কখনই নেবে না।