চার মাসেই সঞ্চয়পত্র বিক্রির লক্ষ্যমাত্রার ৮২ শতাংশই পূরণ হয়ে

S M Ashraful Azom
সেবা ডেস্ক:  সঞ্চয়পত্র বিক্রির লক্ষ্যমাত্রার ৮২ শতাংশই পূরণ হয়ে গেছে প্রথম চার মাসে (জুলাই-অক্টোবর)। বাজেট ঘাটতি পূরণে ২০১৬-১৭ অর্থবছরের সঞ্চয়পত্র থেকে সরকার ১৯ হাজার ৬১০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করে। অর্থবছরের প্রথম চার মাসে সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি হয়েছে ১৫ হাজার ৯৬০ কোটি টাকার। সে হিসাবে প্রতিদিন প্রায় ২০০ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে।
 
জাতীয় সঞ্চয় অধিদফতরের সর্বশেষ তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত অর্থবছরের একই সময়ে সঞ্চয়পত্র বিক্রির নিট পরিমাণ ছিল ৯ হাজার ৩৩ কোটি টাকা। সে হিসাবে গত বছরের তুলনায় এ অর্থবছরের একই সময়ে বিক্রি প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে। এটি বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৮২ শতাংশ।
 
২০১৫-১৬ অর্থবছরের বাজেটে সরকার সঞ্চয়পত্র থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকার ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছিল। তবে সঞ্চয়পত্রে সুদের হার কমানোর পরও বিক্রির পরিমাণ তর তর করে বাড়ছিল। পরে সংশোধিত বাজেটে লক্ষ্যমাত্রা বাড়াতে ২৮ হাজার কোটি টাকা করা হয়। বছর শেষে দেখা যায়, ৩৩ হাজার ৬৮৯ কোটি টাকায় গিয়ে দাঁড়ায়।
 
জাতীয় সঞ্চয়পত্র অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি অর্থবছরের অক্টোবরে সঞ্চয়পত্র বিক্রি থেকে নিট আয় হয়েছে চার হাজার ২৬৬ কোটি টাকা। গত অর্থবছরের একই মাসে সঞ্চয়পত্র বিক্রি থেকে নিট আয় ছিল দুই হাজার ২৫২ কোটি টাকা। পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে বিক্রি বেড়েছে ৯০ শতাংশ। সঞ্চয়পত্র বিক্রির হিসাবে দেখা যায়, গত অক্টোবর মাসে ছয় হাজার ২০০ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে। অগাস্ট মাসে বিক্রি হয়েছিল ছয় হাজার ৩২৮ কোটি টাকার। সেপ্টেম্বর মাসে পাঁচ হাজার ৩৯০ কোটি ৫০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছিল। আর অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে সঞ্চয়পত্র বিক্রির পরিমাণ ছিল চার হাজার ৯৩২ কোটি টাকা।
 
প্রসঙ্গত, প্রতিদিনের সঞ্চয়পত্র বিক্রির পরিমাণ থেকে আগের বিক্রি করা সঞ্চয়পত্রের সুদ-আসল পরিশোধের পর যেটি অবশিষ্ট থাকে, সেটাকেই নিট বিক্রি বলে হিসাব করা হয়।
 
সাধারণত বাজেট ঘাটতি মেটাতে বৈদেশিক এবং অভ্যন্তরীণ উত্স থেকে সরকার ঋণ নিয়ে থাকে। এ ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ উেসর মধ্যে রয়েছে ব্যাংক ও ব্যাংকবহির্ভূত খাত। ব্যাংক বহির্ভূত খাতের প্রধান উত্স সঞ্চয়পত্র বিক্রি। এছাড়া ট্রেজারি বিল ও বন্ডের বিপরীতেও ঋণ নেওয়া হয়। এদিকে, গত বছরের মে মাসে সব ধরনের সঞ্চয়পত্রের সুদের হার প্রায় ২ শতাংশ কমায় সরকার। তা সত্ত্বেও আগের বছরগুলোর তুলনায় গত বছর এবং চলতি অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র বিক্রির পরিমাণ বেড়েছে কয়েকগুণ।
 
জাতীয় সঞ্চয় অধিদফতরের তথ্য মতে, সরকার এ খাতে গড়ে ১২ দশমিক ৫৯ থেকে ১৩ দশমিক ৪৫ শতাংশ হারে সুদ দিত। কিন্তু সম্প্রতি অস্বাভাবিক হারে সঞ্চয়পত্রের বিক্রি বাড়ায় ভবিষ্যতে সরকারের ঋণের বোঝা বেড়ে যাবে-এমন আশঙ্কায় সুদ হার গড়ে দুই শতাংশ কমানো হয়। পাঁচ বছরমেয়াদি সঞ্চয়পত্রের সুদের হার ১১ দশমিক ২৮ শতাংশের মধ্যে নামিয়ে আনা হয়েছে। আগে এটি কিনলে ১৩ দশমিক ২৬ শতাংশ হারে সুদ দেওয়া হতো।
 
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষক ড. জায়েদ বখত বলেন, ব্যাংকগুলোতে আমানতের সুদ হার কমায় মানুষ সঞ্চয়পত্রের দিকে ঝুঁকছে। এ সুযোগে অন্যান্য জায়গার সঞ্চয় ভেঙ্গে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করছে। এতে সঞ্চয়পত্র বিক্রির পরিমাণও বাড়ছে। ফলে সরকারের বাজেট ব্যবস্থাপনা একটা ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে বলে এ অর্থনীতিবিদের আশঙ্কা। তিনি সঞ্চয়পত্রে সুদের হার আরো কমানোর পক্ষে মত দিয়েছেন।
 
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা জানান, স্থায়ী আমানতের বিপরীতে বর্তমানে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো গড়ে ছয় থেকে সাত শতাংশ হারে সুদ প্রদান করছে। যেটি সঞ্চয়পত্রের সুদের তুলনায় অনেক কম। এ অবস্থায় সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগকেই বেশি লাভজনক মনে করছেন গ্রাহকরা। অন্যদিকে, সঞ্চয়পত্র বিক্রি বাড়ায় চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধে ব্যাংকখাত থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণের পরিমাণ কমেছে। ফলে সরকার এ সময়ে যে পরিমাণ ঋণ নিয়েছে, পরিশোধ করেছে তার চেয়ে বেশি।
 
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এ ছয় মাসে ব্যাংকখাত থেকে সরকার কোনো ঋণ নেয়নি, বরং পরিশোধ করেছে তিন হাজার ৫৭৬ কোটি টাকা। এতে সরকারের নিট ঋণের স্থিতি কমে এক লাখ এক হাজার ৯০৫ কোটি টাকা দাঁড়িয়েছে। যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল এক লাখ পাঁচ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা।
 
জানা গেছে, লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় সঞ্চয়পত্র বিক্রি বেশি হওয়ায় গত অর্থবছর জুড়েই ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার চাহিদা ছিল কম। এবারও একই অবস্থার দিকে যাচ্ছে।
 
এখন সঞ্চয়পত্র ভাঙানো ও মুনাফা সংগ্রহ করা অনেক সহজ হয়ে গেছে। সঞ্চয়পত্রের টাকার জন্য বই জমা দিয়ে টোকেন নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় না। মাস শেষে মুনাফার টাকা ও মেয়াদ শেষে আসল টাকা সরাসরি গ্রাহকের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা হয়। আর টাকা জমা হওয়ার সঙ্গে গ্রাহকের মোবাইল শর্ট ম্যাসেজ সার্ভিস (এসএমএস) ও ইমেইল করে জানিয়ে দেওয়া হয়। সময়, অর্থের সাশ্রয় ও ভোগান্তি দূর করতে বাংলাদেশ ব্যাংক ইএফটি (ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার) নামে গত বছর একটি একটি সফ্টওয়্যার চালু করে। এ সফট্ওয়ারের মাধ্যমেই গ্রাহকরা এ সুবিধা পাচ্ছেন।
ট্যাগস

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Know about Cookies
Ok, Go it!
To Top