‘ঝুঁকিপূর্ণ’ বিমানে হাঙ্গেরি যাচ্ছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

S M Ashraful Azom
সেবা ডেস্ক:  প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে বিমানে চড়ে হাঙ্গেরি যাচ্ছিলেন সেটিকে প্রায় দুই বছর আগেই ‘নিরাপত্তার দিক থেকে ঝুঁকিপূর্ণ’ ঘোষণা করেছিল একটি তদন্ত কমিটি। ২০১৫ সালের ২ ফেব্রুয়ারি রাঙা প্রভাত নামের বিজি ০৪৮ বোয়িং ৭৭৭ এয়ারবাসটি থেকে ৬২ কেজি চোরাই সোনা উদ্ধার করেছিল শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর। পরে বিমানটিকে জব্দ করে শুল্ক বিভাগ। আদালতের নির্দেশে ওই দিনই বিমানটিকে বিমান পরিচালনা পর্ষদের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পক্ষে জিম্মায় নেন উপ-মহাব্যবস্থাপক নুরুল ইসলাম (আইন)। এরপর শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর, সিভিল এভিয়েশন ও বাংলাদেশ বিমানের সমন্বয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। দুই সপ্তাহ পর ওই কমিটি তাদের দেওয়া প্রতিবেদনে উল্লেখ করে, “বিমানবন্দরে কর্মরত বা এয়ারলাইন্সের কারোর সহায়তা ছাড়া এই ধরনের চোরাচালান সম্ভব নয়। নিরাপত্তার দিক দিয়ে এতে ঝুঁকির সংশ্লেষ রয়েছে। কারণ অন্য অপরাধী বা সন্ত্রাসী চক্র এসব কর্মচারীদের ব্যবহার করে যে কোন নাশকতামূলক কার্যক্রমে লিপ্ত হতে পারে। এ ক্ষেত্রে যাত্রী সাধারণের এবং ভিভিআইপি মুভমেন্ট-এর নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার আশংকা রয়েছে।” এই প্রতিবেদন একটি প্রভাবশালী গোয়েন্দা সংস্থার কাছে পাঠানো হয়।
 
শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের মহাপরিচালক ড. মঈনুল খান বলেন, ‘সোনা উদ্ধারের পর আমরা তদন্ত করে দেখেছিলাম ইঞ্জিনের পাশের সিলিংয়ের নাট-বোল্ট খুলে সেখানে সোনার বার আনা হয়েছিল। ফলে ওই জায়গার নাট-বোল্ট খুবই নাজুক অবস্থায় ছিল। যেহেতু এই বিমানে ভিআইপি ও ভিভিআইপিরা চলাফেরা করেন তাই বিমানটিকে ঝুঁকিপূর্ণ উল্লেখ করে অধিকতর তদন্ত করার জন্য আমরা একটি গোয়েন্দা সংস্থার কাছে প্রতিবেদন দিয়েছিলাম। এরপর ওই তদন্ত কতদূর এগিয়েছে সে বিষয়ে আমরা কিছু জানি না।’
 
জানা গেছে, ২০১৫ সালের ২ ফেব্রুয়ারি রাঙা প্রভাত নামের বোয়িং এয়ারবাসটি দুবাই থেকে প্রথমে চট্টগ্রামে আসে। সেখান থেকে ঢাকায় আসে। বিমানটি অবতরণের পর খবর পেয়ে এনবিআর চেয়ারম্যান ড. নজিবুর রহমান এবং শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের মহাপরিচালক ড. মঈনুল খান বিমানবন্দরে যান। তাদের উপস্থিতিতেই বিমানটিতে তল্লাশি চালিয়ে ইঞ্জিনের পাশের সিলিংয়ে ৬২ কেজি চোরাই সোনা পাওয়া যায়। ওই দিনই বিমানটিকে বিমান পরিচালনা পর্ষদের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পক্ষে উপ-মহাব্যবস্থাপক নুরুল ইসলামের জিম্মায় দেওয়া হয়। এরপর শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে প্রধান করে ৫ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি করা হয়। কমিটিতে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ ও বাংলাদেশ বিমানের কর্মকর্তারাও ছিলেন। দুই সপ্তাহ পর কমিটি প্রতিবেদন দিলেও দেড় মাস পর বিমানবন্দর থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়।
 
বিমানবন্দর থানা পুলিশ জানিয়েছে, ২০১৫ সালের ১৫ মার্চ তাদের থানায় ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলাটি (নম্বর ৩৪) দায়ের করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ বিমানের মেকানিক্যাল বিভাগের দুইজনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এরা হলেন মেকানিক মো. আনিস ও মেকানিক্যাল সুপারভাইজার মো. মাসুদ। গ্রেফতারের সময় তাদের মোবাইল ফোনও জব্দ করে পুলিশ। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ ও মোবাইল ফোন অনুসন্ধান করে চোরাচালানীদের সঙ্গে তাদের যোগাযোগের প্রমাণ পায় পুলিশ।
 
ওই ঘটনার পর রাঙা প্রভাত নামের বিমানটিতে কিছু সমস্যা দেখা দেয়। বিশেষ করে ভেতরে এয়ারকন্ডিশনার কাজ করছিল না। যেহেতু বিমানটি প্রধানমন্ত্রী উদ্বোধন করেছেন এবং ভিআইপি ও ভিভিআইপিরা চড়েন সে কারণে সমস্যা সমাধানে গুরুত্ব দেয় বাংলাদেশ বিমান কর্তৃপক্ষ। কিন্তু বাংলাদেশের প্রকৌশলীরা সঠিক সমস্যা শনাক্ত পারছিলেন না। পরে একজন বৃটিশ বিশেষজ্ঞকে ঢাকায় আনা হয়। তিনি বিমানটিতে অনুসন্ধান চালিয়ে দেখেন ইঞ্জিনের পাশের সিলিংয়ের নাট-বোল্ট বারবার খোলার কারণে দুর্বল হয়ে গেছে। পাশাপাশি ভারী কিছুর চাপ পড়ে এয়ারকন্ডিশনারের একটি তারও ছিঁড়ে গেছে। সংশ্লিষ্টরা তখন ধারণা করেন, সোনার বারের ভারী প্যাকেটগুলো রাখার কারণেই এমনটি হয়েছে। পরে সেই তার জোড়া লাগানো হয়।
 
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নাট-বোল্ট দুর্বল হলেও সেগুলো আর বদলানো হয়নি। ফলে প্রধানমন্ত্রী হাঙ্গেরি যাওয়ার সময় যে নাট খুলে যাচ্ছিল বলে বলা হচ্ছে তা সে-ই নাটই। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ইঞ্জিনের পাশে সোনার বার বহনের কারণে বিস্ফোরণও ঘটতে পারত, কেননা সোনা বিদ্যুত্ পরিবাহী। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিমানের প্রকৌশল বিভাগ ছাড়া কেউ ওইসব নাট খুলতে পারার কথা নয়। ফলে ওই সোনা চোরাচালানের সঙ্গে ওই বিভাগের কেউ না কেউ জড়িত। অথচ তাদের কাউকে আটক বা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়নি। শুধু মেকানিক্যাল বিভাগের দুজনকে গ্রেফতার করে বিষয়টি ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।- ইত্তেফাক
ট্যাগস

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Know about Cookies
Ok, Go it!
To Top