সেবা ডেস্ক: মানবিক বিপর্যয়ের মধ্যে বেড়ে উঠছে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পের হাজার হাজার শিশু। খাদ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থানসহ সবক্ষেত্রেই তারা উপেক্ষিত। সাত শতাধিক শিশু একটি এনজিও পরিচালিত স্কুলে শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পেলেও বহু শিশু রয়ে যাচ্ছে এর বাইরে। বিশেষ করে আটকে পড়া পাকিস্তানিদের শিশুর সোনালি ভবিষ্যত্ অমানিশার ঘোর অন্ধকারে ঢাকা পড়ছে।
বিহারি ক্যাম্পগুলো রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সরকার সংশ্লিষ্ট জেলার জেলা প্রশাসকদের দায়িত্ব দিলেও কর্তৃপক্ষ কার্যত তাদের কোনো খবরই রাখছে না। অতীতে জেলা প্রশাসন থেকে প্রতিমাসে মাথা পিছু ৩ কেজি গম বরাদ্দ করা হলেও তা ২০০৩ সালের পর থেকে বন্ধ রয়েছে। প্রায় কাজ-কর্মহীন অবস্থায় জেনেভা ক্যাম্পের সাড়ে ৫ হাজার পরিবার মানবেতর জীবন যাপন করছে।
এ ব্যাপারে ঢাকা জেলার জেলা প্রশাসক মো. সালাউদ্দিন ইত্তেফাককে বলেন, বিহারি ক্যাম্পগুলোর খোঁজ-খবর রাখা হচ্ছে না এমন অভিযোগ সঠিক নয়। সেখানে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে একটি রিলিফ কমিটি করে দেওয়া হয়েছে। ক্যাম্পের জন্য কোনো ধরনের সাহায্য আসলে ঐ কমিটির মাধ্যমে তা বিতরণ করা হয়। এছাড়া সেখানে বিনামূল্যে বিশুদ্ধ পানি ও বিদ্যুত্ সরবরাহের ব্যবস্থা করা হয়েছে। জানা গেছে, ৪২ হাজার বর্গফুট এলাকা জুড়ে জেনেভা ক্যাম্পের অবস্থান। সাড়ে পাঁচ হাজার পরিবারের প্রায় ৪০ হাজার লোকের বাস এখানে। ৮ ফুট বাই ৮ ফুটের প্রতিটি রুমে ১০ থেকে ১২ জন লোকের বাস। ছোট ছোট খুপড়ি ঘর। পর্যাপ্ত আলো নেই। ঘরের অন্ধকার দূর করতে সারাক্ষণই আলো জ্বালিয়ে রাখা হচ্ছে। জমির মালিকানা না থাকায় একবার বিদ্যুত্ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে পুরো ক্যাম্প জুড়ে মানবিক বিপর্যয়ের সৃষ্টি করা হয়েছিল। পরে হাইকোর্টের আদেশে পুনরায় সংযোগ দেওয়া হয়েছে। এখানে গ্যাস সংযোগ না থাকায় বেশিরভাগ মানুষ মাটির চুলায় রান্না করছে।
স্যানিটেশন সংকট এখানে প্রকট। ৪০ হাজার লোকের জন্য টয়লেট রয়েছে মাত্র দেড় শতাধিক। অপর্যাপ্ত টয়লেটের কারণে প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যায় লাইনে দাঁড়িয়ে মহিলা পুরুষদের অপেক্ষা করতে হয়। রয়েছে বিশুদ্ধ পানির অভাব। ঢাকা ওয়াসা সমপ্রতি এখানে বিনামূল্যে পানি সরবরাহের ব্যবস্থা করলেও সেই পানি দুর্গন্ধযুক্ত। এই পানি পান করে অনেকেই নানা পেটের পীড়ায় আক্রান্ত হচ্ছে। ক্যাম্প এলাকার যত্রতত্র ময়লা আবর্জনা ছড়িয়ে পড়ে থাকতে দেখা গেছে।
সিটি করপোরেশনের কোনো পরিচ্ছন্ন কর্মীর এখানে না আসার চিত্র নিত্য দিনই চোখে পড়ে। খাদ্য সংকট ও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন অধিকাংশ বাসিন্দা।
ক্যাম্পের অধিকাংশ বাসিন্দার জাতীয় পরিচয়পত্র থাকা সত্ত্বেও তারা রাষ্ট্রীয় নানা সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। সংশয় আর চরম দারিদ্র্যের মধ্যেই বেড়ে উঠছে ক্যাম্পের সিংহ ভাগ শিশু। এদের জীবন যাপনের চিত্র সত্যিকার অর্থেই মানবতাকে হার মানায়।
বিহারিদের জীবন-জীবিকা সম্পর্কে জানা যায়, ক্যাম্পের অধিকাংশ লোকই দিনমজুর। কেউ রিকশা চালায়, কেউ ঠেলা গাড়ি। কেউবা আবার মুচি, নাপিত, ধোপা, কসাইয়ের কাজ করে। তরুণরা ওয়ার্কসপে, ইলেকট্রিক, ইলেকট্রনিক্সসহ নানা কাজ করে। কেউ কেউ কাপড়ে জরির কাজ করে।
বৃদ্ধ আম্বিয়া বেগম বলেন, মানুষ হিসেবে এ লজ্জা আমাদের রাখার জায়গা নেই। অধিকাংশ শিশুই বাসার সামনের ড্রেনে পায়খানা করে। কারণ তারা টয়লেটে যাওয়ার সুযোগ পায় না। বড়দের প্রতিযোগিতার কাছে ছোটরা অসহায়।
বৃদ্ধ রেজিয়া বেগম বলেন, এখনো স্বদেশে ফেরার স্বপ্ন দেখি। দীর্ঘ ৪৫ বছর ধরে স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের আশায় বুক বেঁধে আছি। এই অমর্যাদাকর জীবনের চেয়ে মৃত্যু অনেক ভালো।
জেনেভা ক্যাম্পের তরুণ সেলিম সাজ্জাদ বলেন, বাংলাদেশে আমাদের জন্ম। এদেশের আলো, বাতাস আর মাটিতে বেড়ে উঠেছি। জন্মেছি এদেশে, মরতেও চাই এদেশের মাটিতে। তরুণ-তরুণীরা নাগরিক হয়ে এদেশে থাকতে চায়। বেঁচে থাকার অবলম্বন হিসাবে সরকারের কাছে চাকরি ও মাথা গোজার ঠাঁই চায়।
ইত্তেফাক