শূন্যরেখায় শূন্যই যাদের জীবন

S M Ashraful Azom
0
Those whose lives are zero in the line
সেবা ডেস্ক: যে কোন ২টি দেশের সীমান্তবর্তী এলাকার ঠিক মাঝখানে এমন একটি এলাকা থাকে, যেখানে সর্বসাধারণের প্রবেশ নিষেধ, দুই দেশের মাঝে বিদ্যমান সেই ভূখণ্ডকে নো ম্যানস ল্যান্ড বলে। নো ম্যানস ল্যান্ড অথবা শূন্যরেখা একটা নিখুঁত ফারাক। কার মধ্যে? কিসের মধ্যে? মাপামাপি করতে যাওয়া নিতান্তই বোকামি। তবে এই শূন্যরেখা তৈরি করেছে আটকে থাকার আক্ষেপ, দীর্ঘশ্বাস, ভয়। এর মাঝখানটায় রয়েছে চরম অসামঞ্জস্য, দগদগে অপমান-বেদনা ও শিকড়হীন জীবন।

২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর থেকে রোহিঙ্গারা যখন দলে দলে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে ঢুকছে- তখন কিছু লোক আটকা পড়ে মিয়ানমার এবং বাংলাদেশের মাঝামাঝি এক স্থানে- যাকে বলে 'নো-ম্যানস ল্যান্ড'- সেইখানে, যেখানে সর্বসাধারণের প্রবেশ নিষেধ। কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার বাংলাদেশ-মিয়ানমার মৈত্রী সড়ক থেকে চার কিলোমিটার দূরে পার্বত্য বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি এলাকায় শূন্যরেখার খালের ছড়ার তীরের সেই জায়গায় এখন শুধুই বেদনা। প্রেম নেই এখানে, ভবিষ্যতও নেই; আছে কেবল নিশ্চুপ অনাদরে রোদ-বৃষ্টি সহ্য করে পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে থাকা। একূলে বান্দরবানের সীমান্তের কোনারপাড়া। ওকূলে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের রাইম্ম্যাখালী গ্রাম। বাংলাদেশ ও মিয়ানমার দুই সীমান্তে এই এলাকাটির নাম তুমব্রু। রোহিঙ্গা ভাষায় তুমব্রু রাইট। নো-ম্যানস ল্যান্ডে আটকা, নিজ দেশ থেকে বিতাড়িত উদ্বাস্তু ছয় হাজার রোহিঙ্গার এখানে পেরিয়ে গেল দুটি বছর। শূন্যরেখায় শূন্য হয়ে আছেন তারা- একূল-ওকূল কোনোটাই নেই তাদের। ঘোরাফেরায়ও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থার (ইউএনএইচসিআর) প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, বান্দরবানের তুমব্রু খালের কাছে শূন্যরেখায় প্রায় এক হাজার ৩০০ রোহিঙ্গা পরিবার রয়েছে। উখিয়া ও টেকনাফের অন্য ৩৪টি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নাগরিক সুবিধা থাকলেও এখানে কিছুই নেই। রোহিঙ্গাদের নিয়ে দেড়শ'র মতো এনজিও কাজ করলেও এদিকে কারও নজর নেই। তবে জাতিসংঘের খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) আওতায় ইন্টারন্যাশনাল কমিটি অব রেড ক্রস (আইসিআরসি) প্রতি মাসে দু'বার করে নো-ম্যানস ল্যান্ডে ত্রাণ দিচ্ছে।

সরেজমিনে পরিদর্শনে গিয়ে কক্সবাজার জেলার সীমানা পেরোতেই অস্থায়ী পোস্টে আটকে দিল পুলিশ। আটকানো হলো 'অনুমতি নেই' বলে। বাধ্য হয়ে এ পাড়ে বসেই আটকেপড়া রোহিঙ্গাদের জীবন প্রত্যক্ষ করতে হলো। দেখা গেল, একটি ছোট খাল দিয়ে অঞ্চলটি বিভক্ত করেছে মিয়ানমার ও বাংলাদেশ সীমান্তকে। চেক পয়েন্টে থাকা মিয়ানমার সীমান্ত পুলিশ রোহিঙ্গাদের রাখাইনে প্রবেশ করতে দিচ্ছে না। তবে বাংলাদেশ সাড়া দিচ্ছে তাদের মানবিক আর্তিতে। খাদ্য, স্বাস্থ্য ও অন্যান্য সুবিধার জন্য কিছু রোহিঙ্গাকে মাঝে মধ্যেই আসতে হচ্ছে এ পাড়ে।

এ পাড়ে আসা শূন্যরেখায় বসবাসকারী রোহিঙ্গারা জানান, সীমান্তের কাঁটাতারে বিভক্ত দুই রাষ্ট্রের মধ্যকার নিরপেক্ষ সীমানায় জাতিগত পরিচয়হীন, রাষ্ট্রহীন রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর একটি ছোট্ট অংশ নো-ম্যানস ল্যান্ডে আশ্রয় নেয় ২০১৭ সালে ২৫ আগস্টের দুই দিন পর। সেখানে তাদের মাথা গোঁজার ঠাঁই করে দেওয়া হয় কুঁড়েঘর বানিয়ে। অস্থায়ী এই বাড়িগুলোর একটু পেছনেই কাঁটাতারের বেড়া। তার পেছনেই অস্ত্র হাতে মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিপি। এখানে বসবাসকারী বেশির ভাগই ওপারের তুমব্রু, রাইম্ম্যাখালী, মেদী, পানিরছড়া গ্রামসহ সীমান্তের আশপাশের গ্রামের।

একদিন নিজ গ্রামে ফিরে যাওয়ার স্বপ্ন নিয়ে কাঁটাতারে ঘেরা বেড়া দিয়েই অপলক তাকিয়ে সময় কাটান শূন্যরেখার ছয় হাজার মানুষের নেতৃত্বকারী চেয়ারম্যান মোহাম্মদ দিল মোহাম্মদ। বাংলা ভাষা ভালোই বুঝতে পারেন তিনি। বলেন, এখানে দুটি বছর পেরিয়ে গেল। কিন্তু কোনো কূলকিনারা পাচ্ছি না। কূলহীন মানুষের জীবন আর কত ভালো হতে পারে! আমরা বাংলাদেশে আর ঢুকতে চাই না, নিজ ভূমিতে ফিরে যেতে চাই।

আশ্রয় নেওয়ার সময়েই তাদের সঙ্গে এগারোশর মতো শিশু ছিল জানিয়ে এই রোহিঙ্গা নেতা বলেন, গত দুই বছরে এ ক্যাম্পে জন্ম নিয়েছে আরও একশর বেশি শিশু। আমাদের জীবন তো অন্ধকারেই ফুরিয়ে গেল। কিন্তু এই শিশুদের জীবনও কি তেমন হবে? অন্য শরণার্থী শিবিরের মতো ত্রাণ এখানে পৌঁছায় না। নেই পর্যাপ্ত খাবার পানি, নেই টয়লেট ও স্বাস্থ্যসেবা। তবে এখানে যেসব শিশু আছে, তাদের পড়াশোনার জন্য রোহিঙ্গাদের উদ্যোগেই একটি মাদ্রাসা ও দুটি স্কুল করা হয়েছে।

তবে উখিয়া ও টেকনাফের অন্য ৩৪টি রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মানুষের চেয়ে তাদের জীবন একটু আলাদা। তারা এক জায়গায়ই বন্দি হয়ে আছেন। দেশের অন্য শিবিরগুলোতে যতটা ত্রাণ পৌঁছাচ্ছে, নো-ম্যানস ল্যান্ডের শিবিরে তা পৌঁছাচ্ছে না। বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট এই শিবিরে কিছু ত্রাণ পাঠাচ্ছে। বিজিবি ও সেনারা সেই ত্রাণ বণ্টন করছে।

রহমত ওমর ফারুকের (৩৯) বাড়ি মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের পানিরছড়া গ্রামে। তিনি বলেন, বর্ষার সময় এখানে লোকজনকে খুবই কষ্টের মধ্যে থাকতে হয়। একটিমাত্র এনজিও ত্রাণ বিতরণ করে এখানে। কিন্তু তাও এক আজব হিসাবে। ফলে তিন সদস্যের পরিবার যতটুকু ত্রাণ পায়, ৮-১০ সদস্যের পরিবারও ততটুকুই পায়। ফলে প্রায় ১৫০ পরিবারের দিন কাটছে খাবার সংকটে।

রহমত ওমর আরও বললেন, এখানে টয়লেটের একটিও নারীদের ব্যবহারোপযোগী নয়। তাই অধিকাংশ নারীই দিনের বেলায় সে পথে পা বাড়ান না। তবে এসব সমস্যা ছাপিয়ে তাদের মূল আক্ষেপ দেশে ফিরতে না পারার।

এই অঞ্চলে দায়িত্বরত কক্সবাজার-৩৪ বিজিবি ব্যাটালিয়নের পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আলী হায়দার আজাদ আহমেদ বললেন, তারা সীমান্তের শূন্যরেখায় আশ্রয় নিয়েছেন। তাই এই ক্ষেত্রে আমরা তাদের দেখভালের মূল দায়িত্ব পালন করছি। মাঝে মধ্যে তারা বাংলাদেশে প্রবেশের চেষ্টা চালালেও বাধা দেওয়া হচ্ছে।

 -সেবা হট নিউজ: সত্য প্রকাশে আপোষহীন

ট্যাগস

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

খবর/তথ্যের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, সেবা হট নিউজ এর দায়ভার কখনই নেবে না।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Know about Cookies
Ok, Go it!
To Top