
সেবা ডেস্ক: বৈশ্বিক মহামারি নভেল করোনাভাইরাসে বাংলাদেশে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে থাকলেও প্রতিদিনই মিলছে সুস্থ হওয়ার সুখবরও। গতকাল সোমবার পর্যন্ত মোট সুস্থ হয়েছে ৩৪ হাজার ২৭ জন। প্রতিদিনই ৫০০ থেকে ৬০০ জন করোনা জয় করে হাসপাতাল থেকে হাসিমুখে ঘরে ফিরছে। এর বাইরে বাসায় আইসোলেশন বা চিকিৎসাধীন থেকেও সুস্থ হচ্ছে অনেকে। আক্রান্তের তুলনায় দেশে সুস্থতার হার ৩৭ দশমিক ৫৫ শতাংশ। অন্যদিকে মৃত্যুর হার ১ দশমিক ৩৩ শতাংশ। বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিচ্ছেন রোগতত্ত্ববিদরা। জোর দিয়ে তাঁরা বলছেন, আক্রান্ত হওয়ার পর যারা সুস্থ হচ্ছে, ২১ দিন পার করছে, তাদের আর ভয়ের কারণ নেই। এসব রোগীর দ্বিতীয়বার সংক্রমিত হওয়ার নজির প্রায় নেই। এ ধরনের রোগীর কারো কারো নমুনায় ফের ফল পজিটিভ এলেও সে ভাইরাস সক্রিয় থাকে না। ভাইরাস এতটাই অকার্যকর অবস্থায় থাকে, ওই রোগীকে কাবু করার সক্ষমতা রাখে না, অন্যকেও সংক্রমিত করতে পারে না। এসব কারণে করোনাজয়ীদের নিয়ে করোনা নিয়ন্ত্রণ, আক্রান্তদের সেবায় যুক্ত করা—এ সব বিষয়ে ভাবা হচ্ছে। সামাজিকভাবে বিভিন্ন এলাকায় করোনাজয়ীদের কাজে লাগানোর পরিকল্পনাও করা হচ্ছে বলে সরকারি-বেসরকারি পর্যায় থেকে জানা গেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, করোনাজয়ীরা করোনার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চিকিৎসকসহ চিকিৎসাকর্মীদের মধ্যে যাঁরা সুস্থ হয়ে উঠছেন, তাঁরা নির্দিষ্ট সময় পর আবার নির্ভয়ে রোগীর সেবায় নিয়োজিত হচ্ছেন। সুস্থ হওয়া পুলিশ সদস্যরাও একইভাবে তাঁদের দায়িত্বে ফিরছেন। সংবাদকর্মীরাও ফিরছেন কর্মক্ষেত্রে। আবার তাঁদের অনেকে প্লাজমা দিয়ে অন্য রোগীদের সহায়তা করছেন। সামাজিকভাবে করোনাজয়ীরা বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে অন্য আক্রান্তদের নানামুখি সেবায় যেমন স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করতে পারে, সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে সংক্রমণ প্রতিরোধমূলক কাজেও তাদের সহায়তা নেওয়া যেতে পারে। দিন দিন যেহেতু সুস্থ হওয়া মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, তাদের কাজে লাগানো গেলে করোনা মোকাবেলায় দ্রুত সুফল আসতে পারে। রোগতত্ত্ববিদ ও সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ড. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘যারা করোনামুক্ত হয়েছে, তাদের ফের সংক্রমণের ঝুঁকি নেই বললেই চলে। কোথাও কোথাও নমুনা পরীক্ষা পজিটিভ এলেও ওই ভাইরাস মৃত থাকায় কোনো ক্ষতি করতে পারে না বলেই জানতে পারছি। ফলে করোনাজয়ী ব্যক্তির যদি অন্য কোনো রোগের জটিলতা না থাকে, তবে তাদের এলাকায় রোগী শনাক্ত, নমুনা সংগ্রহ, আক্রান্তদের নানামুখি সেবামূলক কাজে লাগানো যেতে পারে। তবে সুস্থ হলেও সবাইকে অন্যদের মতো স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। মাস্ক ব্যবহার করতে হবে, সাবান দিয়ে হাত ধোয়াসহ অন্য নিয়মগুলোও মানতে হবে।’ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘আমরা বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে সামনে এগোচ্ছি। বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট বিভাগের বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা চলছে। বৈজ্ঞানিক বিষয়গুলো আরেকটু নিশ্চিত হয়ে আমরা এ বিষয়ে নতুন নির্দেশনা তৈরি করব। করোনাজয়ীরা দেশের করোনা মোকাবেলায় বড় ধরনের ভূমিকা রাখতে পারে।’ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক নিজেও করোনায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে আবার কাজে যোগ দিয়েছেন। আইইডিসিআরের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. এ এস এম আলমগীর বলেন, ‘আমাদের পর্যবেক্ষণে আমরা দেখতে পাচ্ছি, আক্রান্ত অনেকে সাত থেকে ১০ দিনের মধ্যে করোনামুক্ত হচ্ছে। কারো কারো আরেকটু বেশি সময় লাগছে। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রটোকল অনুযায়ী আমরা ১৪ দিনকে ধরে সব কিছু বিবেচনা করে থাকি। ১৪ দিনের সঙ্গে আরো সাত দিন যোগ করে ২১ দিন চিকিৎসা এবং আইসোলেশনে থাকার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। এরপর সুস্থ কারো শরীরে কার্যকর কোনো ভাইরাসের উপস্থিতি থাকে না। কারো কারো ২১ দিন পর দুবার নেগেটিভ এলেও আবারও জিহ্বায় বা নাকের নমুনায় পজিটিভ রেজাল্ট আসতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয়, তিনি আবার আক্রান্ত হচ্ছেন। এ পর্যায়ে ওই ভাইরাস আর আক্রান্ত ব্যক্তির ক্ষতি করার সক্ষমতা রাখে না। ফলে যারা সুস্থ হয়ে যাচ্ছে, তাদের নিয়ে আর কোনো উদ্বেগের কারণ নেই।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের দেশে ফের পরীক্ষায় কিছু নমুনা পজিটিভ এলেও তা ওই নিষ্ক্রিয় ক্যাটাগরির ভাইরাস বলেই প্রতীয়মান হয়েছে। অন্য দেশেও তাই দেখছি। আমরা এরই মধ্যে যারা হাসপাতাল থেকে সুস্থ এবং বাসাবাড়িতে থেকে সুস্থ হয়েছে তাদের তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে পাঠিয়েছি।’ গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত বুলেটিনেও জানানো হয়েছে, হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরাদের সঙ্গে গতকাল বাসাবাড়িতে সুস্থ হওয়া প্রায় সাড়ে ১৪ হাজার জন যোগ করা হয়েছে, যা নিয়ে গতকাল এক দিনে সুস্থ ব্যক্তির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৫ হাজার ২৯৭ জন। এর আগের দিন পর্যন্ত দেশে মোট হাসপাতাল থেকে সুস্থ হওয়া রোগীর সংখ্যা ছিল ১৮ হাজার ৭৩০ জন। আগের ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ৯০৩ জন। এদিকে দেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত মোট শনাক্তদের মধ্যে সর্বোচ্চ ৬৭.৫৬ শতাংশ ঢাকা মহানগরীসহ ঢাকা বিভাগে। তবে মোট সুস্থ হওয়ার হার ছাপিয়ে গেছে আক্রান্তের হারকে। গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বুলেটিনে উল্লেখ করা সুস্থ ৩৪ হাজার ২৭ জনের মধ্যে ৬৮.৬৫ শতাংশ ঢাকা বিভাগে। এর পরই ১৬.৭৭ শতাংশ চট্টগ্রামে, ৩.৬৩ শতাংশ রংপুরে, ২.৮২ শতাংশ সিলেটে, ২.৮৭ শতাংশ ময়মনসিংহে, ২.২৯ শতাংশ রাজশাহী বিভাগে, খুলনা বিভাগে ১.৭৭ শতাংশ, বরিশাল বিভাগে ১.১৭ শতাংশ সুস্থ হয়েছে আক্রান্তের তুলনায়। গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের বিজ্ঞানী ড. বিজন শীল বলেন, ‘আমরাও পরীক্ষা করে দেখেছি, পুনর্বার সংক্রমিত হওয়ার হার প্রায় শূন্যের কাছাকাছি। আরেকটি বিষয়, করোনাভাইরাসের একটি চরিত্র হচ্ছে এরা সুস্থ হওয়া যেকোনো ব্যক্তির শরীরে ছয় মাস পর্যন্ত থাকতে পারে। তবে তা বড় কোনো ক্ষতি করার সক্ষমতা রাখে না।’

খবর/তথ্যের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, সেবা হট নিউজ এর দায়ভার কখনই নেবে না।