![]() |
| ইরান যুদ্ধ ২০২৬: ট্রাম্পের দায় এড়ানোর কৌশল, মোসাদের গোয়েন্দা ব্যর্থতা এবং মধ্যপ্রাচ্যের নতুন সমীকরণ |
ইরান যুদ্ধ ২০২৬: ট্রাম্পের দায়মুক্তি বনাম মোসাদের গোয়েন্দা গোলকধাঁধা—একটি কৌশলগত ব্যবচ্ছেদ
২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি। আধুনিক পৃথিবীর ইতিহাসে অন্যতম এক কালো অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে এই দিনটি। এদিনই শুরু হয় ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ এবং ‘অপারেশন রোয়ারিং লায়ন’।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ এই বিমান হামলা ইরানকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করার লক্ষ্য নিয়ে শুরু হলেও, যুদ্ধের মাসখানেক পেরোতেই এখন শুরু হয়েছে ‘ব্লেম গেম’ বা দায় চাপানোর রাজনীতি।
ওয়াশিংটন থেকে তেল আবিব—সর্বত্রই এখন প্রশ্ন উঠছে, কার বুদ্ধিতে বা কার উসকানিতে এই ভয়াবহ যুদ্ধে জড়াল বিশ্বশক্তিগুলো?
![]() |
| দায়ভারের স্থানান্তর: ট্রাম্পের নতুন রাজনৈতিক চাল। ছবি: সংগৃহিত |
দায়ভারের স্থানান্তর: ট্রাম্পের নতুন রাজনৈতিক চাল
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সবসময়ই নিজেকে ‘শান্তিপ্রিয়’ হিসেবে তুলে ধরতে পছন্দ করেন। কিন্তু ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর যখন তেলের বাজার অস্থির এবং মার্কিন নাগরিকদের মধ্যে দুশ্চিন্তা বাড়ছে, তখন তিনি অত্যন্ত কৌশলে যুদ্ধের দায়ভার নিজের কাঁধ থেকে সরিয়ে দিয়েছেন।
সোমবার (২৩ মার্চ) মেম্ফিসে এক গোলটেবিল বৈঠকে ট্রাম্প স্পষ্টভাবে আঙুল তুলেছেন তাঁর প্রতিরক্ষা মন্ত্রী পিট হেগসেথের দিকে।
ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী, পিট হেগসেথই ছিলেন তাঁর প্রশাসনের সেই প্রথম শীর্ষ ব্যক্তি, যিনি ইরানের ওপর সরাসরি সামরিক হামলার পক্ষে সওয়াল করেছিলেন। ট্রাম্পের এই মন্তব্য কেবল একটি তথ্য নয়, বরং এটি একটি সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক কৌশল।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যুদ্ধের ফলাফল যদি আশানুরূপ না হয়, তবে ট্রাম্প জনগণের কাছে বলতে পারবেন যে তিনি কেবল তাঁর সামরিক উপদেষ্টাদের কথা শুনেছিলেন। যদিও এই হামলায় ট্রাম্পের নিজের ‘আল্টিমেটাম’ এবং ব্যক্তিগত জেদই মুখ্য ছিল বলে অনেকের ধারণা।
![]() |
| মোসাদ ও ‘রেজিম চেঞ্জ’-এর মরীচিকা। ছবি: সংগৃহিত |
মোসাদ ও ‘রেজিম চেঞ্জ’-এর মরীচিকা
ইসরাইলের অন্দরমহলে এখন সবচেয়ে বড় বিতর্কের নাম ‘মোসাদ’। গোয়েন্দা সংস্থাটির প্রধান ডেভিড বার্নিয়া যুদ্ধের আগে এক পূর্বাভাসে জানিয়েছিলেন যে, ইরানে ‘রেজিম চেঞ্জ’ বা বর্তমান সরকারের পতন ঘটাতে বড়জোর এক বছর সময় লাগবে। এমনকি তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন যে, হামলার কয়েক দিনের মধ্যেই ইরানের ভেতরে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়বে এবং সাধারণ মানুষ সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করবে।
বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। খামেনি বা লারিজানির মতো শীর্ষ নেতাদের হত্যার পরও ইরানের শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়েনি, বরং তারা আরও আক্রমণাত্মক হয়ে উঠেছে। এখন ইসরাইলের মন্ত্রিসভায় বার্নিয়াকে অভিযুক্ত করা হচ্ছে এই বলে যে, তিনি ভুল তথ্য দিয়ে নেতানিয়াহু এবং ট্রাম্পকে যুদ্ধে প্ররোচিত করেছেন। কিন্তু বার্নিয়ার অনুসারীদের দাবি, তিনি সবসময়ই শর্তসাপেক্ষ পূর্বাভাস দিয়েছিলেন।
মূলত নেতানিয়াহু নিজের রাজনৈতিক ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে এবং ট্রাম্প নিজের আধিপত্য বজায় রাখতে বার্নিয়ার তথ্যগুলোকে ‘অতি-আশাবাদী’ দৃষ্টিতে গ্রহণ করেছিলেন।
![]() |
| যুদ্ধের ভয়াবহতা: লাশের মিছিল ও ধ্বংসের আর্তনাদ। ছবি: সংগৃহিত |
যুদ্ধের ভয়াবহতা: লাশের মিছিল ও ধ্বংসের আর্তনাদ
গত কয়েক সপ্তাহের যুদ্ধে ইরান এক মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে। মার্কিন ও ইসরাইলি হামলায় ইতোমধ্যেই ২ হাজারের বেশি ইরানি নাগরিক নিহত হয়েছেন। নিহতদের তালিকায় রয়েছেন সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এবং আইআরজিসি-র শীর্ষ কমান্ডার মোহাম্মদ পাকপৌর।
তেহরানের আকাশ এখন ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন, ধ্বংস হয়েছে অসংখ্য ড্রোন উৎপাদন কেন্দ্র ও পারমাণবিক স্থাপনা।
পাল্টা আঘাত থেকে রেহাই পায়নি ইসরাইলও। ইরানের খাইবার শেকান ক্ষেপণাস্ত্র এবং ধ্বংসাত্মক ড্রোনের আঘাতে ইসরাইলে এ পর্যন্ত ৪ হাজার ৮২৯ জন আহত হয়েছেন। ইসরাইলের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মতে, ১১১ জন এখনো হাসপাতালে কাতরাচ্ছেন এবং অনেকের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোও ইরানের ‘৭৭তম’ পর্যায়ের হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। কুয়েত, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে নিয়মিত আছড়ে পড়ছে ইরানি ড্রোন।
![]() |
| কৌশলগত দোলাচল: ট্রাম্পের উভয় সংকট। ছবি: সংগৃহিত |
কৌশলগত দোলাচল: ট্রাম্পের উভয় সংকট
সিএনএন-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ট্রাম্প এখন নীতিগত এক গোলকধাঁধায় আটকা পড়েছেন। একদিকে তিনি হামলার হুমকি স্থগিত করে আলোচনার কথা বলছেন, অন্যদিকে তাঁর সামরিক বাহিনী যুদ্ধের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত নয়।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ট্রাম্প আসলে ‘সময় কিনতে’ চাইছেন। হরমুজ প্রণালী বা খার্গ আইল্যান্ডের মতো গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অঞ্চল দখল করার মতো স্থলবাহিনী এখনো ওই অঞ্চলে পুরোপুরি মোতায়েন করা সম্ভব হয়নি।
ট্রাম্পের এই দোলাচল মার্কিন মিত্রদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। দক্ষিণ কোরিয়া বা জাপানের মতো দেশগুলো এখন আর যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার ওপর শতভাগ ভরসা রাখতে পারছে না।
বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে বিশ্ব অর্থনীতির যে ক্ষতি হচ্ছে, তা ট্রাম্প কীভাবে সামাল দেবেন, তা নিয়ে বড় প্রশ্নচিহ্ন দেখা দিয়েছে।
![]() |
| অর্থনীতির অস্থিরতা ও তেলের বাজার। ছবি: সংগৃহিত |
অর্থনীতির অস্থিরতা ও তেলের বাজার
যুদ্ধের ডামাডোলে বিশ্ব অর্থনীতির নাভিশ্বাস উঠেছে। ট্রাম্পের সাম্প্রতিক হামলা স্থগিতের ঘোষণার পর তেলের দাম কিছুটা কমলেও (ব্যারেলে ৯৬ ডলারের নিচে), এটি যেকোনো সময় আবার ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।
তেলের দামের এই অস্থিরতা সরাসরি প্রভাব ফেলছে বৈশ্বিক শেয়ারবাজারে। তবে ট্রাম্পের ‘ফলপ্রসূ আলোচনার’ দাবিতে মার্কিন শেয়ারবাজারের সূচকগুলো কিছুটা ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে। একে অনেক বিশ্লেষক ‘কৃত্রিম স্বস্তি’ হিসেবে অভিহিত করছেন।
![]() |
| মোসাদের ‘সহস্র ক্ষত’ কৌশল ও বর্তমান বাস্তবতা। ছবি: সংগৃহিত |
মোসাদের ‘সহস্র ক্ষত’ কৌশল ও বর্তমান বাস্তবতা
সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট এবং মোসাদ প্রধান বার্নিয়া যৌথভাবে ‘ডেথ বাই অ্যা থাউজেন্ড কাটস’ বা ‘সহস্র ক্ষত দিয়ে মৃত্যু’ নামক এক কৌশল গ্রহণ করেছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল সরাসরি যুদ্ধে না গিয়ে ইরানকে ভেতর থেকে দুর্বল করে দেওয়া। কিন্তু ২০২৬ সালের এই সরাসরি যুদ্ধ সেই কৌশলের সম্পূর্ণ বিপরীত।
বর্তমান যুদ্ধে ইরানকে সামরিকভাবে আঘাত করা হলেও তাদের আদর্শিক ভিত্তি বা আঞ্চলিক প্রক্সি নেটওয়ার্ক (হিজবুল্লাহ, হুতি) এখনো অক্ষত। ফলে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এই যুদ্ধ এক দীর্ঘস্থায়ী চোরাবালিতে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
![]() |
| কোন পথে মধ্যপ্রাচ্য? ছবি: সংগৃহিত |
কোন পথে মধ্যপ্রাচ্য?
ইরান ইস্যু এখন আর কেবল একটি আঞ্চলিক সংঘাত নয়, এটি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের এক ক্ষুদ্র সংস্করণে রূপ নিয়েছে। ট্রাম্পের দায় এড়ানোর চেষ্টা, নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক টিকে থাকার লড়াই এবং ইরানের প্রতিশোধের নেশা—এই তিনের যাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছে সাধারণ মানুষ।
ট্রাম্পের প্রস্তাবিত ১৫টি সমঝোতার পয়েন্ট ইরান মেনে নেবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। কারণ তেহরান এখন মনে করছে, পারমাণবিক অস্ত্র ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিই তাদের টিকে থাকার শেষ অবলম্বন।
সব মিলিয়ে, ২০২৬ সালের এই বসন্ত মধ্যপ্রাচ্যের জন্য কোনো সুখবর নিয়ে আসেনি। যুদ্ধ শুরুর সিদ্ধান্ত নেওয়া যতটা সহজ ছিল, এটি সম্মানজনকভাবে শেষ করা তার চেয়ে বহুগুণ কঠিন প্রমাণিত হচ্ছে।
ট্রাম্পের সামনে এখন দুটি পথ—হয় এক ভয়াবহ দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া, নয়তো বড় কোনো কূটনৈতিক ছাড় দিয়ে পিছু হটা। ইতিহাস বলবে, ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু কোন পথে হাঁটেন।














খবর/তথ্যের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, সেবা হট নিউজ এর দায়ভার কখনই নেবে না।