আরব দেশগুলোর কাছে ট্রিলিয়ন ডলারের দাবি ট্রাম্পের; হামলা স্থগিতের ঘোষণায় তেলের বাজারে বড় পতন
ইরানের বিরুদ্ধে চলমান মার্কিন-ইসরায়েলি আগ্রাসনের প্রেক্ষাপটে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে এক নতুন এবং অভাবনীয় মোড় এসেছে। একদিকে যুদ্ধের ভয়াবহতা, অন্যদিকে অর্থনৈতিক লেনদেনের এক বিশাল অংকের তথ্য সামনে এসেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) দেশগুলোর কাছে বিপুল পরিমাণ অর্থ দাবি করেছে বলে চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। একই সময়ে ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা স্থগিতের ঘোষণা বিশ্ব তেলের বাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে।
আরব দেশগুলোর ওপর ট্রাম্পের ৫ ট্রিলিয়ন ডলারের ‘ফাঁদ’
ইরানে যৌথভাবে আগ্রাসন চালাচ্ছে ইসরায়েল ও তাদের দীর্ঘদিনের মিত্র যুক্তরাষ্ট্র। তবে এই সংঘাতের সবচেয়ে বেশি অর্থনৈতিক এবং নিরাপত্তা সংক্রান্ত মাশুল গুনতে হচ্ছে উপসাগরীয় আরব দেশগুলোকে। এরই মধ্যে জানা গেছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আরব মিত্রদের নতুন এক আর্থিক ফাঁদে ফেলেছেন। ওমানের বিশিষ্ট সাংবাদিক সালেম আল-জুহুরি বিবিসি অ্যারাবিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দাবি করেছেন যে, ট্রাম্প প্রশাসন জিসিসি রাষ্ট্রগুলোর কাছে ট্রিলিয়ন ডলার দাবি করেছে।
জুহুরি জানান, কিছু ফাঁস হওয়া তথ্য অনুযায়ী ট্রাম্প প্রশাসনের বার্তাটি ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট। যদি জিসিসি রাষ্ট্রগুলো ইরানের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ চালিয়ে যেতে চায়, তবে তাদের প্রায় ৫ ট্রিলিয়ন ডলার দিতে হবে। আর যদি তারা এই মুহূর্তে যুদ্ধ বন্ধ করতে চায়, তবে বিগত কয়েক দিনের সামরিক অর্জনের বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রকে আড়াই ট্রিলিয়ন ডলার পরিশোধ করতে হবে। এই বিপুল অংকের অর্থ দাবিকে বিশ্লেষকরা আরব দেশগুলোর ওপর ট্রাম্পের এক চরম ‘আর্থিক ব্ল্যাকমেইল’ হিসেবে দেখছেন। সাংবাদিক জুহুরি দাবি করেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র কেবল আর্থিক নয়, বরং সামরিকভাবেও উপসাগরীয় দেশগুলোকে এই যুদ্ধে সরাসরি সম্পৃক্ত হতে চাপ দিচ্ছে। যদিও এই দাবির বিষয়ে ওয়াশিংটন বা কোনো আরব দেশের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
ট্রাম্পের পিছু হটা এবং ‘ফলপ্রসূ’ আলোচনার দাবি
ইরানের ওপর দেওয়া ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাম শেষ হওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে নিজের অবস্থান থেকে কিছুটা সরে এসেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি দাবি করেছেন যে, গত দুই দিনে ইরানের সঙ্গে তাঁর প্রশাসনের ‘খুব ভালো এবং ফলপ্রসূ’ আলোচনা হয়েছে। ট্রাম্প তাঁর সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম 'ট্রুথ সোশ্যাল'-এ বড় হাতের অক্ষরে দেওয়া এক বার্তায় জানান, মধ্যপ্রাচ্যে শত্রুতার চূড়ান্ত সমাধানের লক্ষ্যে এই বিস্তারিত এবং গঠনমূলক আলোচনা হয়েছে।
এই আলোচনার ওপর ভিত্তি করে ট্রাম্প যুদ্ধ বিভাগকে ইরানের বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর যেকোনো ধরনের সামরিক হামলা আগামী পাঁচ দিনের জন্য স্থগিত করার নির্দেশ দিয়েছেন। তবে ট্রাম্পের এই আলোচনার দাবিকে নাকচ করে দিয়েছে ইরান। ইরানের ফারস নিউজ এজেন্সি এক অজ্ঞাতনামা সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে যে, ট্রাম্পের সঙ্গে কোনো প্রত্যক্ষ যোগাযোগ বা মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমেও কোনো আলোচনা হয়নি। বরং ইরানের পক্ষ থেকে বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করার পাল্টা হুমকির কারণেই ট্রাম্প ‘পিছু হটেছেন’ বলে তেহরান মনে করছে। কাবুলে অবস্থিত ইরানি দূতাবাসও জানিয়েছে যে, কঠোর সতর্কবার্তার পর ট্রাম্প আক্রমণ থেকে বিরত থাকতে বাধ্য হয়েছেন।
তেলের বাজারে ধস: ১৩ শতাংশ কমলো দাম
ট্রাম্পের পক্ষ থেকে পাঁচ দিনের জন্য হামলা স্থগিতের ঘোষণার পরপরই বিশ্ব তেলের বাজারে এর ইতিবাচক প্রভাব দেখা গেছে। গত কয়েক দিন ধরে হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ থাকায় তেলের দাম প্রতি ব্যারেলে ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গিয়েছিল। কিন্তু হামলা স্থগিতের নির্দেশে তেলের দাম মুহূর্তেই ১৩ শতাংশের বেশি কমে গেছে। ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচারসের দাম ব্যারেলে প্রায় ১৭ ডলার কমে ৯৬ ডলারে নেমে এসেছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট ১৩.৫ শতাংশ কমে ৮৫.২৮ ডলারে অবস্থান করছে। তেলের দামের এই পতন বিশ্ব অর্থনীতির জন্য কিছুটা স্বস্তিদায়ক হলেও হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি সচল না হওয়া পর্যন্ত এই শঙ্কা কাটছে না।
যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আস্থা হারিয়ে ইরানের কাছে দক্ষিণ কোরিয়া
মার্কিন-ইসরায়েলি আগ্রাসনের কারণে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল অনিশ্চিত হয়ে পড়ায় মার্কিন মিত্র দেশগুলোর মধ্যে অনাস্থা বাড়ছে। বিশেষ করে দক্ষিণ কোরিয়া তাদের দীর্ঘদিনের বন্ধু যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ভরসা করতে না পেরে সরাসরি তেহরানের দ্বারস্থ হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী চো হিউন ইরানকে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিশেষ অনুরোধ জানিয়েছেন।
দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধ এবং গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে ক্রমাগত বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কায় এশীয় শেয়ার বাজারে বড় ধরনের ধস নেমেছে। দক্ষিণ কোরিয়ার মুদ্রা 'ওন'-এর মান গত ১৭ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসায় দেশটি চরম অর্থনৈতিক সংকটের মুখে পড়েছে। ট্রাম্প বিভিন্ন মিত্র দেশের কাছে যুদ্ধজাহাজ চেয়েও যখন সাড়া পাচ্ছেন না, তখন দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলো নিজেদের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরাসরি ইরানের সঙ্গে আলোচনায় বসাকেই শ্রেয় মনে করছে।
মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি এক জটিল সমীকরণের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ট্রাম্পের বিশাল অংকের অর্থ দাবি আরব দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের ফাটল ধরাতে পারে। অন্যদিকে, ইরানের অনড় অবস্থান এবং জ্বালানি করিডোর বন্ধ করার হুমকি ওয়াশিংটনকে পিছু হটতে বাধ্য করেছে। পাঁচ দিনের এই যুদ্ধবিরতি বা স্থগিতাদেশ স্থায়ী কোনো সমাধানের দিকে যায় নাকি সংঘাত আরও চরম রূপ নেয়, তা দেখার জন্য বিশ্ববাসী এখন উৎকণ্ঠার সঙ্গে অপেক্ষা করছে।







খবর/তথ্যের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, সেবা হট নিউজ এর দায়ভার কখনই নেবে না।