![]() |
| দোকান বিক্রি করে সাইকেলে বিশ্ব জয়: ‘যাযাবর বাংলাদেশ’ মোহাম্মদ মাসুদের অবিশ্বাস্য যাত্রা |
Nomadic Bangladesh এর গল্প: মোহাম্মদ মাসুদের বিশ্ব ভ্রমণের অদম্য যাত্রা
নরসিংদীর এক অদম্য তরুণ মোহাম্মদ মাসুদ, যিনি ভ্রমণপিপাসুদের কাছে এখন 'Nomadic Bangladesh' নামেই সমধিক পরিচিত। সাইকেলে চড়ে বিশ্ব ভ্রমণের এক অদম্য নেশায় মগ্ন তিনি। গৎবাঁধা জীবনের চেনা ছক আর নিশ্চিত ব্যবসা ছেড়ে বেছে নিয়েছেন এক যাযাবর জীবন, যেখানে পথই তার ঠিকানা আর পুরো পৃথিবীই তার ঘর। তার এই যাত্রা শুধু দেশ ভ্রমণ নয়; বরং বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের নামকে এক অনন্য উচ্চতায় তুলে ধরার এক সাহসী প্রয়াস।
ভ্রমণের শুরু: দেশ থেকে বিদেশ
২০১৩ সালে এসএসসি পাস করার পর মাসুদের পড়াশোনার চেয়ে ব্যবসার দিকেই মনোযোগ ছিল বেশি। নরসিংদীর মনোহরদী শহরে মুঠোফোনের যন্ত্রাংশের দোকান দিয়ে বেশ ভালোই চলছিল তার দিনকাল। কিন্তু ইন্টারনেটে ভ্রমণ বিষয়ক বিভিন্ন ভ্লগ দেখতে দেখতে তার মনেও ডানা মেলে ঘুরে বেড়ানোর তীব্র ইচ্ছা। প্রথমে বাস, ট্রেন ও লঞ্চে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরলেও প্রকৃতির একদম কাছাকাছি যেতে তিনি বেছে নেন বাইসাইকেল। একটি সেকেন্ড হ্যান্ড সাইকেল কিনে ঢাকা থেকে তেঁতুলিয়া এবং সেখান থেকে টেকনাফ পর্যন্ত প্যাডেল চাপেন তিনি। এমনকি থানচির দুর্গম পাহাড়ি পথেও দমে যায়নি তার সাইকেলের চাকা।
দেশের সীমানা পেরিয়ে মাসুদের মন পাড়ি জমায় বিদেশে। অধিকাংশ বাংলাদেশির মতো তারও বিদেশ যাত্রা শুরু হয় প্রতিবেশী দেশ ভারত দিয়ে। ভারতে গিয়ে একটি নতুন সাইকেল কিনে সেটি নিয়েই ঘুরে বেড়ান বিভিন্ন রাজ্যে। এই যাত্রাপথেই মহারাষ্ট্রে তার দেখা হয় কানাডার দুই সাইক্লিস্টের সাথে, যা তার আত্মবিশ্বাস আরও বাড়িয়ে দেয়।
আফ্রিকার পথে: নতুন দিগন্তের উন্মোচন
ভারত ভ্রমণের পর মাসুদ উড়াল দেন পূর্ব আফ্রিকার দেশ কেনিয়ায়। সেখানে প্রায় ১০ দিন কাটানোর পর একে একে উগান্ডা, রুয়ান্ডা, বুরুন্ডি ও তানজানিয়া ভ্রমণ করেন। এই দীর্ঘ আফ্রিকান ট্রেইলে তার একমাত্র সঙ্গী ছিল প্রিয় বাইসাইকেলটি। কেনিয়ার নাইরোবি শহর পেরিয়ে এলমা রাভাইন এলাকার একটি সরকারি প্রাইমারি স্কুলে তাঁবু পেতেছিলেন তিনি। স্কুল থেকে বিদায় নেওয়ার সময় প্রধান শিক্ষকের অনুরোধে তিনি সেখানে একটি গাছের চারা রোপণ করেন এবং তার নাম দেন 'Bangladesh'। এই চারাটি আফ্রিকার মাটিতে চিরকাল বাংলাদেশের স্মৃতি বহন করবে।
![]() |
| যাযাবর জীবনের পথে: নিজের ব্যবসা ছেড়ে অজানাকে জানতে দেশ থেকে দেশান্তরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন 'Nomadic Bangladesh' খ্যাত মাসুদ। - ছবি: মাসুদ মোহাম্মদের ফেসবুক প্রোফাইল থেকে নেওয়া |
পথের বিপদ ও অপ্রত্যাশিত বন্ধুত্ব
মাসুদের এই দীর্ঘ যাত্রাপথ সবসময় মসৃণ ছিল না। উগান্ডার নাকাপিরিপিরিত থেকে মরোতোর পথে জনমানবহীন পাহাড়ি এলাকায় তাকে একাকী চলতে হয়েছে, যা ছিল তার জীবনের অন্যতম ভয়ংকর অভিজ্ঞতা। উগান্ডাতেই এক সড়ক দুর্ঘটনায় তার সাইকেলটি মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং তিনি নিজেও আহত হয়ে বেশ কিছুদিন শয্যাশায়ী ছিলেন।
তবে পথের যেমন বিপদ ছিল, তেমনি ছিল মানুষের ভালোবাসার উষ্ণতা। তানজানিয়ার ট্যুর অপারেটর রেবেকা পোকারের সাথে ফেসবুকে পরিচয় ছিল মাসুদের। তানজানিয়ায় প্রবেশ করার সময় রেফারেন্সের প্রয়োজন হলে রেবেকা তাকে নিজের বাসার ঠিকানা ও মোবাইল নম্বর দিয়ে সাহায্য করেন। ঈদের আগের দিন মাসুদ রেবেকার পরিবারের সাথে দেখা করেন এবং তাদের আতিথেয়তায় মুগ্ধ হন। এই ধরনের অপ্রত্যাশিত বন্ধুত্বই মাসুদকে বারবার পথ চলার সাহস জুগিয়েছে।
সীমিত খরচে বিশ্ব দর্শনের দর্শন
মোহাম্মদ মাসুদ তার এই যাযাবর জীবনে খরচ কমানোর জন্য কঠোর মিতব্যয়িতা অবলম্বন করেন। সাইকেলে যাতায়াত করায় জ্বালানি খরচ নেই বললেই চলে। সাধ্যের মধ্যে সাধারণ খাওয়া-দাওয়া করেন, অনেক সময় নিজেই রান্না করে নেন। খুব বেশি বাধ্য না হলে কোনো গেস্টহাউস বা হোটেলে থাকেন না, আশ্রয় নেন তাঁবুতে। তার এই জীবনযাপন প্রমাণ করে যে, অদম্য ইচ্ছা আর সাহস থাকলে সীমিত সম্পদ নিয়েও বিশ্ব ভ্রমণ সম্ভব।
মাসুদের বাবা একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং বিজিবি থেকে অবসরপ্রাপ্ত নায়েব সুবেদার। শুরুতে মা শিরিন সুলতানা ছেলের এই ভ্রমণ নেশা নিয়ে চিন্তিত থাকলেও, এখন পরিবার তার স্বপ্নের সবচেয়ে বড় সমর্থক। মাসুদ তার দোকানটি বিক্রি করে দিয়েছেন এবং এখন সম্পূর্ণভাবে তার বিশ্ব ভ্রমণের স্বপ্ন পূরণে মনোযোগী। মোহাম্মদ মাসুদের এই 'যাযাবর বাংলাদেশ' হয়ে ওঠার গল্প দেশের লাখো তরুণের জন্য এক দারুণ অনুপ্রেরণা।








খবর/তথ্যের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, সেবা হট নিউজ এর দায়ভার কখনই নেবে না।