একটি ট্রাভেল এজেন্সির কর্মকর্তা আবু তালেব। গত ২১ আগস্ট বসুন্ধরা সিটির একটি দোকান থেকে এইচটিসি ব্র্যান্ডের একটি মোবাইল ফোন সেট কেনেন। সাড়ে ২২ হাজার টাকা দিয়ে কেনা ওই সেটটি আসল না নকল তিনি বুঝতে পারেননি। কিন্তু গত শুক্রবার বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন ও র্যাবের যৌথ অভিযানে বসুন্ধরা সিটির কয়েকটি দোকান থেকে ২ কোটি টাকা মূল্যের এক হাজারেরও বেশি অবৈধ মোবাইল সেট উদ্ধার করা হয়। এর অধিকাংশই এইচটিসি ব্র্যান্ডের। শনিবার এই খবর শুনে আবু তালেব নিজের ফোনটি এক সহকর্মীকে দিয়ে পরীক্ষা করতে দেন র্যাবের কাছে। পরে নিশ্চিত হন আসলে তার ওই মোবাইল ফোন সেটটি নকল। তার হাতে থাকা সেটটির দাম খুব বেশি হলে ৭/৮ হাজার টাকা। অর্থাত্ নিশ্চিতভাবে ১৪/১৫ হাজার টাকা ঠকেছেন তিনি।
গ্রাহকের সঙ্গে এই প্রতারণা ঠেকাতে শুধু উদ্যোগেই ‘সীমাবদ্ধ’ আছে টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি। সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে আইএমইআই নম্বর বিহীন সেটই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও বলছেন। আর এ কারণে মোবাইল নম্বর থাকা সত্ত্বেও অপরাধীদের সনাক্ত করা সম্ভব হয় না। তাছাড়া হারিয়ে গেলে বা ছিনতাই হলেও তা উদ্ধার করা যায় না। এসব অপকর্ম রোধে মোবাইল ফোন অপারেটরদের ন্যাশনাল ইক্যুইপমেন্ট আইডেন্টিফিকেশন রেজিষ্ট্রার (এনইআইআর) যন্ত্র স্থাপনের নির্দেশনা দিয়েছিল বিটিআরসি। তবে তারপরে তিন বছর পেরিয়ে গেলেও ওই নির্দেশনা বাস্তবায়ন হয়নি। এই সিস্টেম স্থাপন হলে ব্যবহারকারীরা আইএমইআই নম্বর বিহীন হ্যান্ডসেট দিয়ে সিম ব্যবহার করলে তা বন্ধ করে দেয়া যায়। এছাড়া আইএমইআই নম্বর যুক্ত কোনো হ্যান্ডসেট চুরি হলে তা সহজেই উদ্ধার করা যায়। সিম কার্ড বদলে ফেললেও তাকে সনাক্ত করা সম্ভব হয়। নকল হ্যান্ডসেটে বৈধ আইএমইআই নম্বর ব্যবহার করার বাধ্যবাধকতা নেই। এই সুযোগটা কাজে লাগাচ্ছে নকল সেট আমদানিকারকরা। এনইআইআর ব্যবহার করলে নকল সেটের দৌরাত্ম্য কিছুটা হলেও কমানো সম্ভব হতো বলে বিটিআরসির একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
সম্প্রতি আবার এই যন্ত্র বসানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিটিআরসির সচিব সরওয়ার আলম। ইত্তেফাককে তিনি বলেন, অবৈধ মোবাইল ফোন সেটের বিরুদ্ধে অভিযানের পাশাপাশি এনইআইআর যন্ত্র বসাতেও তাগাদা দেয়া হচ্ছে।
অবৈধ মোবাইল ফোন আমদানি বন্ধের বিষয়ে জানতে চাইলে ডাক ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম ইত্তেফাককে বলেন, অবৈধ ফোন আমদানিতে যে একটি চক্র কাজ করে এটা আমরা বুঝতে পারছি। তবে এতে সরকারের কেউ জড়িত থাকলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। পাশাপাশি অবৈধ সেট আমদানি বন্ধে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, শুল্ক কর্তৃপক্ষ, বিটিআরসিকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করা হবে। পাশাপাশি অনিবন্ধিত সিম কার্ড ও অবৈধ সেটের বিরুদ্ধে যে অভিযান শুরু হয়েছে তাও অব্যাহত থাকবে।মোবাইল ফোন আমদানিকারকদের সংগঠন বাংলাদেশ মোবাইল ফোন ইম্পোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক রেজওয়ানুল হক সাংবাদিকদের বলেছেন, বছরের পর বছর ধরে মোবাইল হ্যান্ডসেটের বাজারে এই কারসাজি চলে আসছে। তারপরেও মূল চক্র সব সময় ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকে। আর তল্লাশির নামে হয়রানি পোহাতে হয় সাধারণ ব্যবসায়ীদের। আমরাই চাই অবৈধ ব্যবসা বন্ধ হোক।
কিভাবে আসছে নকল সেট ঃ মোবাইল ফোন ব্যবসায়ীরা জানান, নামি কোম্পানির দামি হ্যান্ডসেট আমদানির জন্য এলসি খুলে সেই কাগজ দেখিয়ে চিন বা অন্য কোন দেশ থেকে নিম্নমানের সেট আনা হয়। এর সঙ্গেই চলে আসে কয়েক হাজার নকল সেট। নিয়ম অনুযায়ী হ্যান্ডসেট আমদানির আগে বিটিআরসির কাছ থেকে অনুমতি নিতে হয়। এজন্য মোবাইল হ্যান্ডসেটের ইন্টারন্যাশনাল মোবাইল ইক্যুপমেন্ট আইডেনটিটি (আইএমইআই) নম্বর এবং যে হ্যান্ডসেট আমদানি করা হবে তার নমুনা বিটিআরসিতে জমা দিতে হয়। এসব যাচাই করে বিটিআরসির স্পেকট্রাম বিভাগ আমদানির অনুমতি দিয়ে থাকে।
কিভাবে নকল হচ্ছে ঃ আইএমইআই নম্বর হলো ১৫ ডিজিটের একটি স্বতন্ত্র সংখ্যা যা বৈধ মোবাইল ফোনে থাকে। একটি মোবাইল ফোনের কি-প্যাডে *#০৬# পরপর চাপলে ওই মোবাইল ফোনের বিশেষ এই শনাক্তকরণ নম্বরটি পর্দায় ভেসে উঠে, যা নকল হ্যান্ডসেটে থাকে না। কম দামি হ্যান্ডসেটে লাগানোর জন্য বিদেশ থেকে বিভিন্ন নামি-দামি ব্র্যান্ডের স্টিকার ও ট্যাগ আমদানি করা হয় বলে জানান কয়েকজন ব্যবসায়ী। বিশেষ ধরনের নেগেটিভ পেপারে লাগানো এই স্টিকারে হাত বুলিয়ে বা খালি চোখে দেখে বোঝা যায় না এগুলো নকল। আধুনিক প্রযুক্তিতে তৈরি হওয়ায় ছয়-সাত মাস ব্যবহারেও এসব নকল স্টিকারের উজ্জ্বলতা নষ্ট হয় না। তবে মূল সেট নিম্নমানের হওয়ায় শেষ পর্যন্ত ঠকতে হয় ক্রেতাদের। ব্যবসায়ীরা জানান, নকল ফোনসেটের আমদানি মূল্য এক থেকে আড়াই হাজার টাকার মধ্যে হলেও ভালো ব্র্যান্ডের স্টিকার লাগিয়ে তা বিক্রি করা হয় ৫ থেকে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত। রাজধানীর ইস্টার্ণ প্লাজার একজন ব্যবসায়ী বলেন, বেশি লাভের আশায় নকল হ্যান্ডসেট বিক্রি করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে কম দাম দেখে ক্রেতারা এসব কিনে থাকেন। বৈধভাবে আসা যে হ্যান্ডসেটের দাম ৪০ থেকে ৪৫ হাজার টাকা, সেই হ্যান্ডসেটের নকল পাওয়া যাচ্ছে মাত্র সাত থেকে আট হাজার টাকায়। আর নকল এসব সেট আনতে খরচ হয় মাত্র দুই/আড়াই হাজার টাকা।
সস্তায় আইএমইআই নম্বরঃ রাজধানীর মোতালিব প্লাজাসহ কয়েকটি মার্কেটে বাজারে ৫০ থেকে ২০০ টাকায় আইএমইআই নম্বর বিক্রি হতে দেখা গেছে। একই আইএমইআই নম্বর বিক্রি করা হয় একাধিক গ্রাহককে। কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, মোবাইল সেট আমদানির আগে আইএমইআই নম্বর দিয়ে বিটিআরসি থেকে ছাড়পত্র নেয়া হয়। সেই আইএমইআই নম্বরও পরে বিক্রি করে দেয়া হয়। কারো হ্যান্ডসেট চুরি হলে বা হারিয়ে যাওয়ার পর সেই সেটের আইএমইআই নম্বর পরিবর্তন করা হলে তা আসল পরিচয় হারায়। ফলে ওই হ্যান্ডসেটটি উদ্ধারে আর কোন কূল-কিনারা করতে পারে না আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার ছানোয়ার হোসেন ইত্তেফাককে বলেন, কোন মোবাইল ফোনের আইএমইআই নম্বর পরিবর্তন করা হলে ওই সেটটিকে আর শনাক্ত করা যায় না। এভাবে অপরাধীরা একটি অপরাধ করার পর ফোনটির আইএমইআই বদলে নিয়ে আবারও একইভাবে অপরাধ করে যাচ্ছে।
প্রকাশিত সংবাদ প্রসঙ্গে
এয়ারটেলের বক্তব্য
এদিকে, গতকাল রবিবার ইত্তেফাকে প্রকাশিত ‘অনিবন্ধিত সিমে অপরাধ বাড়ছে’ শীর্ষক সংবাদের একাংশের ব্যাখ্যা দিয়েছেন এয়ারটেলের হেড অব পিআর অ্যান্ড ইন্টারনাল কমিউনিকেশন শমিত মাহবুব শাহাবুদ্দিন। তিনি বলেন, ২০১২ সালে ৬ হাজার ১৮৮টি অনিবন্ধিত সিম পাওয়ার কারণে বিটিআরসি এয়ারটেলের কাছে ২ কোটি ৫৫ লাখ ২৫ হাজার ৫০০ টাকা জরিমানা দাবি করে একটি ব্যাখা দিতে বলেছিল। এয়ারটেল কর্তৃপক্ষ বিটিআরসির কাছে নিজেদের অবস্থান ব্যাখা করে উত্তর দিয়েছিল। বিটিআরসি ওই ব্যাখায় সন্তুষ্ট হয়, যার কারণে এয়ারটেলকে কখনো জরিমানা দিতে হয়নি।

