‘অরে জাম গাছে ঝুলা, আইজ মাইরা ফেলাইয়্যাম’

Seba Hot News
ময়মনসিংহ: ছাগল চুরির অপবাদ দিয়্যা মোস্তফা তার দলবল লইয়্যা আমারে ধইরা নিয়া যায়। তার লোকজনরে অর্ডার দিয়া বলে অরে জাম গাছে ঝুলা। লাডি আন, অরে আইজ মাইরা ফেলাইয়্যাম।

গলাধরা কন্ঠে বাংলানিউজকে কথাগুলো বলছিলেন ময়মনসিংহের ভালুকায় স্থানীয় গ্রাম্য মাতাব্বর এক যুবলীগ নেতা তার সাঙ্গপাঙ্গদের নিষ্ঠুর নির্যাতনের শিকার শামীম আহমেদ (১৬) নামে এক কিশোর। তার বাড়ি উপজেলার মল্লিকবাড়ি গ্রামে।

ছাগল চুরির নাটক সাজিয়ে গত জুলাই কিশোরকে প্রকাশ্যে গাছে ঝুলিয়ে বেধড়ক লাঠিপেটা করেন স্থানীয় নং মল্লিকবাড়ি ইউনিয়নের নং ওয়ার্ড যুবলীগ সভাপতি গোলাম মোস্তফা তার লোকজন। ঘটনার পর থানায় মামলা দায়ের করা হলেও রহস্যজনক কারণে পুলিশ গ্রেফতার করছে না মোস্তফাকে।

উল্টো ক্ষমতাসীন দলের বিতর্কিত নেতার দফায় দফায় হুমকি-ধামকিতে ভীতসন্ত্রস্ত শামীমকে হতে হয়েছে নিজের বাড়ি ছাড়া। বাড়ি ওই বাড়ি ঘুরে পালিয়ে বেড়াতে হচ্ছে তাকে। নিজের মানবিক বিপর্যয় দুর্দশার চিত্র তুলে ধরে শনিবার (০৮ আগষ্ট) সকালে বাংলানিউজের সঙ্গে কথা বলেন শামীম। 

জানা যায়, গত জুলাই স্থানীয় মল্লিকবাড়ি গ্রামের আব্দুল কুদ্দুসের একটি ছাগল হারিয়ে যায়। আর ছাগল ওই গ্রামের শহীদ মিয়ার ছেলে শামীম চুরি করেছেন বলে অপবাদ দেয় স্থানীয় যুবলীগ নেতা গোলাম মোস্তফা। তার নেতৃত্বে পরদিন সুজন, সোহাগ, নাজমুল, রফিকুল, সুলতানসহ থেকে ১০ জন শামীমকে মল্লিকবাড়ি গ্রামের নম্বর মোড় থেকে উঠিয়ে নিয়ে যায়।

শামীম জানায়, ‘মোস্তফা তার দলবল নিয়্যা আমারে ধইরা নিয়া যায়। বলে, আমার লগে চল, দরকার আছে। আমি বলি দাদীর অসুখ। কিন্তু ওরা আমারে ছাড়ে না, জোরজবরদস্তি কইরা ধইরা নিয়া যায়।

নির্মম অমানবিক নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরে কিশোর বলেন, ‘স্থানীয় পাগলার মোড়ে নিয়া মোস্তফা তার লোকদের অর্ডার দিয়া প্রথমে আমার মাথা নিচে, ঠ্যাং উপরে দিয়া উকতা কইরা ঝুলায়। তখন আমার নাক দিয়া রক্ত আসতাছে দেইখ্যা আমারে গাছ থেইক্যা নামাইয়্যা আনে।

গা শিউরে উঠা নির্যাতনের এখানেই শেষ নয়। পশুর চেয়েও অধম মোস্তফা তার সাঙ্গপাঙ্গরা এবার মাটি থেকে ফুট উপরে জাম গাছে হাত উপরে আর পা নিচের দিকে দিয়ে বেঁধে জাম গাছে আবারো ঝুলায় শামীমকে। কাঁপা কাঁপা কন্ঠে শামীম বলে, ‘বাঁশঝাড় থেইক্যা ১০টা মোডা জিংলা (মোটা বাঁশের কঞ্চি) কাইট্যা আনবার কয় মোস্তফা।

পরে মোস্তফা আর তার লোকজন বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বাইড়ায়্যা আমারে রক্তাক্ত জখম করে। আমার ডাইন পাউয়ের (পা) অবস্থা বেশি খারাপ হইয়া যায়। আমি ঝুলন্ত অবস্থায় বার অজ্ঞান হইয়্যা পড়লেও অগর মন গলে নাই।’ 

কয়েক দফা নির্যাতনের পর বাড়ি থেকে শামীমের মাকে ডেকে এনে সাদা কাগজে স্বাক্ষর নিতেও চাপ প্রয়োগ করে মোস্তফা। কিন্তু বাঁধা দেন পৈশাচিক নির্যাতনে কাহিল শামীম। পরে সেইদিন সন্ধ্যার পর নির্যাতনকারীরা তাকে বাড়িতে পৌছে দেন। 
কিন্তু রাত গড়াতেই শামীম অসুস্থ হয়ে পড়লে মারা যাবার শঙ্কায় মোস্তফা হাজার টাকা দিয়ে তাকে স্থানীয় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঠায়। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে শামীম চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থাতেই সিলেটের রাজন হত্যা ঘটনার পরিণতিতে মাতাব্বর মোস্তফা মাঝে ভয় চেপে বসে।

স্থানীয় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিতে গিয়েও শামীমের উপরে নেমে আসে মোস্তফার নতুন শাস্তির খড়গ। শামীম বলেন, ‘হাসপাতালে দিন থাহার পর মোস্তফা আইস্যা বড় ডাক্তারের সঙ্গে কতা বলে সিটটা কাইট্ট্যা দেয়। পরে পিন্টু ভাই ডাক্তারকে বলে আমারে থাকার ব্যবস্থা করে। দিন হাসপাতালে থাহি। ডান ঠ্যাঙের অবস্থা তহনও ভালা হয় নাই।

ভয়ানক নির্যাতনের ঘটনা ফাঁস হয়ে যাবার পর ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেন মোস্তফা। শামীম মামলা দায়ের করাতে আরও চটে যান। মামলার এক নম্বর স্বাক্ষী স্থানীয় তাজউদ্দিনকেও ম্যানেজ করে ফেলেন বলেও অভিযোগ উঠে। মামলা তুলে না নেয়ায় মোস্তফা অব্যাহত হুমকিতে বাড়ি ছাড়তে হয় কিশোরকে।

নিজের কষ্টের দিনলিপির কথা তুলে ধরে বাংলানিউজকে উৎকন্ঠিত শামীম বলেন, ‘ঈদের পরদিন স্থানীয় ভান্ডাবর এক আত্মীয় বাড়িত যাই। মোস্তফা খোঁজ পাইয়া সেখানেও যায়। আমি অসুস্থ। খুড়াইয়্যা খুড়াইয়্যা হাঁডি। নিজের বাড়ি ছাইড়া পালাইয়্যা থাকি। মোস্তফা হুমকি দিতাছে আপোস না করলে জানে মাইরা ফেলবো।

মোস্তফার সঙ্গে কোনো পূর্ব বিরোধ নেই বলেও শামীম দাবি করেন। তবে কেন বর্বর নির্যাতন এর কারণও ব্যাখ্যা করেন কিশোরমোস্তফার ঘনিষ্ঠ রফিকুল ছাগল চুরি করছিল। গত / বছরে এলাকায় থেকে চুরির ঘটনা ঘটাইছে এই লোক। মোস্তফা জানে তারই লোক ছাগল চুরি করছে। অহন ফাইস্যা যাইবো। আর এইড্যা ঢাকতেই আমার উপর দোষ চাপায়।

অমানবিক নির্যাতনের ঘটনায় মামলা দায়েরের পরেও মোস্তফা তার সাঙ্গপাঙ্গরা এখনও প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে বলে অভিযোগ করে শামীম জানায়, পর্যন্ত সুলতান নামে এক আসামিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বাদ বাকী আসামিদের ধরতে লোক দেখানো অভিযান চালাচ্ছে পুলিশ।

মোস্তফা তার লোকজনের অপকীর্তি বর্ণনা করে নির্যাতনের শিকার শামীম আরও বলেন, ‘মোস্তফা আমগর এলাকার মসজিদের জমি নিজের দখলে নিবার চাইতাছে। কয়দিন আগে এলাকাবাসী আন্দোলনও করছে। এলাকাত সালিশ-দরবার কইরা দুপক্ষের কাছ থেইক্যাই হে টাকা খায়। ক্ষমতার জোরে অনেকদিন ধইরা হে যা খুশি তাই করতাছে।

আমারে মাইরা ফেলবার চাইছিল, ওর বিচার চাই। ওর লগে আমি আপোস করমু নাক্ষেদ ঝেরে বলেন অসহায় শামীম।

এসব বিষয়ে ভালুকা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গোলাম সরোয়ার জানান, নির্যাতনের ঘটনায় স্থানীয় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে সাধারণ জখমের সার্টিফিকেট দেওয়া হয়েছে শামীমকে। ইতোমধ্যে একজন আসামি গ্রেফতার করা হয়েছে। মোস্তফাসহ বাদ বাকীদের ধরতে পুলিশের অভিযান চলছে।

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Know about Cookies
Ok, Go it!
To Top