যারা পরবর্তী বাচ্চা নেবার কথা ভাবছেন

S M Ashraful Azom
নতুন অতিথিটিকে যখন প্রথমবারের মতো কোলে নেন, তখন এটা চিন্তা করা নিতান্তই অসম্ভব যে আবারো এই একই কষ্ট সহ্য করে আপনি আরেকটি সন্তানের জন্ম দেবেন। কিন্তু কিছু সময় পর হয়তো আপনিই আবার বাচ্চা নেয়ার কথা ভাবতে শুরু করবেন।  
 
যদি আপনার প্রথম সন্তানটি জন্মের সময় কম ওজনের হয়, কিংবা তার যদি কোনো শারীরিক বা মানসিক সমস্যা থেকে থাকে, অথবা যদি আপনার গর্ভপাত কিংবা মৃত সন্তান প্রসব হয়ে থাকে, তাহলে আপনি অবশ্যই চাইবেন যেন আপনার পরের সন্তানটি সুস্থ ও সবলভাবে জন্মাতে পারে। আপনি এবং আপনার সঙ্গী কীভাবে পরবর্তী সন্তান নেয়ার জন্য প্রস্তুত হতে পারেন সে সংক্রান্ত কিছু প্রয়োজনীয় তথ্য এখানে দেয়া হলো
 
চিন্তাটা দুজনেরই
 
আপনার গর্ভধারণের সম্ভাবনা তখনি বেশি থাকবে যখন আপনি এবং আপনার সঙ্গী দুজনের স্বাস্থ্যই ভালো থাকবে। খাদ্যাভ্যাসের অনিয়ম, ধূমপান, মদ্যপান এবং কাজের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ শুক্রাণুর (sperm) উৎপাদনকে ক্ষতিগ্রস্থ করতে পারে এবং গর্ভধারণের প্রক্রিয়াকে কঠিন করে দিতে পারে। সুতরাং গর্ভধারণের জন্য প্রস্তুত হবার প্রথম পদক্ষেপই হতে হবে দুজনের দৈনন্দিন জীবন যতটা সম্ভব স্বাস্থ্যকর করা।
 
যারা গর্ভধারণ করতে চাচ্ছেন তাদের জন্য এই গর্ভধারণ সংক্রান্ত নির্দেশিকায় আরো তথ্য আছে। এর মধ্যে আছে খাদ্যাভ্যাস, ধূমপান, মদ্যপান ও ব্যায়াম সংক্রান্ত পরামর্শ। সত্যিকার অর্থে সুষম খাদ্যাভ্যাস ও ফিটনেস অংশে কেবল যেসকল দম্পতি গর্ভধারণ-এর কথা ভাবছেন শুধুমাত্র তাদের জন্য নয়, সবার জন্যই উপকারী পরামর্শ রয়েছে।এর মধ্যে আছে প্রতিদিন পাঁচ পদ সবজি ও ফল খাওয়া, ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা, নিজেকে ফিট করা এবং নিরামিষাশীদের জন্য সুষম খাদ্যাভ্যাস।  
 
ফলিক অ্যাসিড (folic acid)
 
যখন থেকেই গর্ভধারণের চেষ্টা করবেন, তখন থেকে শুরু করে গর্ভাবস্থার ১২ সপ্তাহ পর্যন্ত একজন নারীর প্রতিদিনের খাবারে অন্তত ৪০০ গ্রাম করে ফলিক অ্যাসিড থাকতে হবে । যে কোনো ফার্মেসিতেই আপনি ফলিক অ্যাসিডের ট্যাবলেট কিনতে পারবেন। সেই সাথে ফলিক অ্যাসিড আছে এমন খাবার তো খেতে হবেই। সবুজ শাকসবজি ও শস্যদানা থেকে তৈরি খাবারে ফলিক অ্যাসিড থাকে।  
 
নিচের যেকোনো পরিস্থিতিতে আপনাকে বেশি বেশি ফলিক অ্যাসিড খেতে হবে -
* যদি আপনার কোন সন্তানের স্পাইনা বাইফাডা (spina bifada) হয়ে থাকে
* আপনার যদি কোলিয়্যাক ডিজিজ (coeliac disease) থাকে
* আপনার যদি ডায়াবেটিস থাকে
* যদি মৃগী রোগের (epilepsy) জন্য ওষুধ খান
 
আপনার ডাক্তারের সাথে এ ব্যাপারে কথা বলুন।
পরবর্তী গর্ভধারণের আগে যা যা করতে পারেন, সে ব্যাপারে এখানে কিছু তথ্য দেয়া হলো ।
রুবেলা / জার্মান মিজেলস (rubella, german measles)
 
গর্ভাবস্থার প্রথম দিকে গর্ভবতী মা রুবেলায় আক্রান্ত হলে গর্ভে শিশুর ক্ষতি হবার সম্ভাবনা থাকে। পূর্ববর্তী গর্ভধারণের সময় যদি আপনাকে রুবেলার টিকা দেয়া না হয়ে থাকে, তাহলে বাচ্চার জন্মের পরপরই আপনাকে MMR ( measles, mumps, rubella) টিকা দেয়ার জন্য বলা হবে। পরবর্তীবার গর্ভধারণের  আগে অবশ্যই রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে দেখা নেয়া উচিৎ আপনি রুবেলা হবার ঝুঁকি থেকে মুক্ত কিনা। 
 
রক্তপরীক্ষার মাধ্যমে বোঝা যাবে আপনি রুবেলায় আক্রান্ত হবার ঝুকি থেকে কতটা বিপদমুক্ত। যদি দেখা যায় কারো সম্ভাব্যতার মাত্রা বেশি বা অনিশ্চিত, তাহলে তাকে আরেকবার রুবেলা প্রতিরোধক টিকা দেয়া হতে পারে।  
 
আপনার ওজন
 
ওজন নিয়ন্ত্রণে থাকলে গর্ভধারণের সম্ভাবনাও বেড়ে যাবে। প্রথম গর্ভধারণের সময় আপনার ওজন বেড়ে যেতে পারে, এবং আপনি হয়তো আবারো আগের অবস্থায় ফিরে যেতে চাইবেন। যদি আপনার ওজন ১০০ কেজি'র ( ২০০ পাউন্ড) উপরে হয় তাহলে ওজন কমানো আবশ্যক। ওজন কমানোর সবচেয়ে ভালো উপায় হচ্ছে একটি সুষম ও কম চর্বিযুক্ত খাদ্যাভ্যাস এবং উপযুক্ত ব্যায়াম।  
 
গর্ভধারণের আগে আপনার শরীরের ভরের সূচক বা বিএমআই, হেলদি ওয়েট ক্যালকুলেটরের সাহায্যে আপনি নিজেই বের করে নিতে পারবেন। বুঝতে পারবেন আপনার ওজন ঠিক আছে নাকি ওজন কমাতে হবে। যদি আপনি ইতিমধ্যেই গর্ভবতী হয়ে থাকেন তাহলে এই ক্যালকুলেটর কাজে আসবে না। যদি ওজন কমানোর দরকার হয় তাহলে কোনো বন্ধু বা আপনার সঙ্গীকে সাথে নিয়ে ব্যায়ামের ক্লাসে যোগ দিতে পারেন। যদি কোনো সাহায্য বা পরামর্শের দরকার হয় তাহলে ডাক্তারের সাথে কথা বলুন। আপনি এবং আপনার সঙ্গী দুজন মিলেই ওজন কমানোর একটা সুবিধাজনক পদ্ধতি বের করতে পারেন, কিন্তু সেটা অবশ্যই ইতিমধ্যেই গর্ভধারণ করে ফেলা দম্পতিদের জন্য নয়।
 
ওষুধ
 
কিছু ওষুধ গর্ভাবস্থায় শিশুর জন্য ক্ষতিকারক হতে পারে। আবার কিছু ওষুধ খেতে কোনো সমস্যা নেই। যদি আপনার বা আপনার সঙ্গীর দীর্ঘমেয়াদী কোনো অসুস্থতা থাকে এবং নিয়মিত কোনো ওষুধ খেতে হয়, তাহলে গর্ভধারণের আগে ডাক্তারের সাথে কথা বলে জেনে নিন, এই ওষুধ গর্ভধারণ বা সন্তান জন্মদানের ক্ষমতার (fertility) ওপর কোনো প্রভাব ফেলতে পারে কি না।  
 
প্রেসক্রিপশন ছাড়া কোনো ওষুধ কিনতে হলে ডাক্তার বা ফার্মাসিস্টের সাথে কথা বলে নিন।
নিষিদ্ধ ড্রাগ (illegal drugs) আপনার গর্ভধারণের ক্ষমতাকে প্রভাবিত করতে পারে কিংবা আপনার গর্ভস্থ শিশুর জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
 
 
ডায়াবেটিস এবং মৃগী রোগ 
যদি আপনার ডায়াবেটিস বা মৃগী রোগ থাকে তাহলে গর্ভধারণের প্রক্রিয়া শুরু করার আগেই ডাক্তারের সাথে কথা বলে নিন।
গর্ভাবস্থা পরবর্তী বিষণ্ণতা এবং সন্তান জন্মদান পরবর্তী মানসিক অসুস্থতা (puerperal psychosis)
যদি প্রথম সন্তানের জন্মের পর আপনি দীর্ঘ সময়ের জন্য বিষণ্ণতা কিংবা জটিল মানসিক অসুস্থতায় ভুগে থাকেন, তাহলে দ্বিতীয়বার গর্ভধারণের আগে ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করে নিন।
 
যৌন বাহিত সংক্রমণ
যৌন বাহিত সংক্রমণ আপনার স্বাস্থ্য কিংবা গর্ভধারণের ক্ষমতাকে প্রভাবিত করতে পারে। যদি আপনাদের কোনো একজনেরও যৌন বাহিত রোগের সংক্রমণের সম্ভাবনা থাকে তাহলে গর্ভধারণের আগেই তা পরীক্ষা করে চিকিৎসা করিয়ে নেয়া উচিৎ। এইচআইভি (HIV), হেপাটাইটিস বি (Hepatitis B) এবং হেপাটাইটিস সি (Hepatitis C) এর মতো সংক্রমণগুলো যৌন মিলনের মাধ্যমে সংক্রমিত ব্যক্তি থেকে আরেকজনের শরীরে যায়, বিশেষ করে যদি কনডম ছাড়া যৌন মিলন করা হয়।
 
আবার যৌন মিলন ছাড়াও কিছু কিছু সংক্রমণ একজনের দেহ থেকে আরেকজনের দেহে ছড়াতে পারে। যেমন, এইচআইভি, হেপাটাইটিস বি কিংবা হেপাটাইটিস সি যৌন মিলন ছাড়াও, ইনজেকশন সিরিঞ্জ-এর মাধ্যমেও এক দেহ থেকে আরেক দেহে সংক্রামিত হতে পারে। যদি আপনি এইচআইভি পজিটিভ হয়ে থাকেন তাহলে আপনি গর্ভবতী থাকা অবস্থায়, কিংবা প্রসবের সময়, এমনকি বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়ানোর সময়ও তার দেহে এইচআইভি সংক্রমণ হতে পারে। এইচআইভি নিয়ে বেঁচে থাকা সংক্রান্ত লিঙ্কটি দেখুন এবং গর্ভাবস্থার সাথে এইচআইভি সংক্রমণের সম্পর্ক নিয়ে আরও জানুন।
 
কর্মস্থলের ঝুঁকি
 
আপনি যদি গর্ভবতী হন বা নতুন মা হন, তাহলে আপনার উর্ধ্বতন কর্মকর্তা অবশ্যই আপনাকে এমন কাজ দেবেন না যাতে আপনার বা গর্ভের শিশুর ক্ষতির কোনো ঝুঁকি থাকে। কর্মস্থলে এসময় কীভাবে ঝুকিমুক্ত থাকবেন সে ব্যাপারে আরও জানুন।  যখনই আপনি আপনার কর্মস্থলে জানাবেন যে আপনি গর্ভবতী, তখন থেকেই আপনার সহকর্মী এবং উর্ধ্বতন কর্মকর্তা আপনার জন্য একটি ঝুকিমুক্ত কাজের ব্যবস্থা করবেন। কিছু কিছু ঝুঁকি আপনা থেকেই নিয়ন্ত্রণ করা যায়, যেমন আপনি কোথায় বসে কাজ করবেন, কিংবা কতক্ষণ কাজ করবেন। যদি কোনো ঝুঁকির সম্ভবনা একেবারেই নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, সেক্ষেত্রে আপনার জন্য অন্য কোনো ঝুকিমুক্ত কাজের ব্যবস্থা করা হবে, তবে বর্তমান কাজের সাপেক্ষে আপনার বেতন ও অন্যায্য শর্তাবলী আগের মতোই প্রযোজ্য থাকবে।
 
কর্মজীবী সব মেয়েদের জন্যই মাতৃত্বকালীন ছুটির ব্যবস্থা থাকে। আপনার সুবিধামত সে ছুটি আপনি নিতে পারেন। 
 
সিজারিয়ান সেকশনের পর যোনিপথে প্রসব বেশীরভাগ নারীই প্রথম সন্তান সিজারিয়ান (Cesearian Section) হলেও দ্বিতীয় সন্তানের সময় স্বাভাবিকভাবেই যোনিপথে প্রসব করতে পারেন। তবে, প্রথমবার আপনার কেন সিজারিয়ান সেকশন করা হয়েছিলো তার ওপরও সেটা নির্ভর করে। যেসব নারীর শ্রোণীচক্র সরু তাদের ক্ষেত্রে আগে থেকেই সিজারিয়ান সেকশন করার সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয়া হয়। আপনার ডাক্তারই আপনাকে সবচেয়ে ভালো পরামর্শ দিতে পারবে। যেসব নারীদের পরবর্তী গর্ভাবস্থায় যোনিপথে প্রসবের জন্য পরামর্শ দেয়া হয়, তাদের প্রসব প্রক্রিয়া স্বাভাবিকই হয়।
 
গর্ভধারণ করতে এখনো সমস্যা হচ্ছে?
 
প্রথমবার যদি অনেক দ্রুত আপনি গর্ভধারণ করেও থাকেন, দ্বিতীয়বার গর্ভধারণ করতে কয়েকমাস সময় লেগে যেতে পারে। জেনে নিন মাসিক চক্রের কোন সময় যৌন মিলন করলে আপনার গর্ভবতী হবার সম্ভাবনা বেশি থাকবে। যদি বেশ কয়েকমাস কেটে যাবার পরও আপনি গর্ভধারণ না করেন, তাহলে আপনার ডাক্তার বা নিকটস্থ পরিবার পরিকল্পনা চিকিৎসা কেন্দ্রে যোগাযোগ করুন।      
ট্যাগস

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Know about Cookies
Ok, Go it!
To Top