বিশ্ব বাজারকে আবারো অস্থিরতা গ্রাস করিয়াছে। একদিকে তেলের মূল্য পতন, অন্যদিকে শেয়ার বাজারে ধস— এই দুই নিয়ামক গোটা বিশ্বকে মন্দার শঙ্কা ধরাইয়া দিয়াছে। তেল লইয়া ক্ষমতাধর দেশগুলির রাজনীতি গোটা বিশ্বকে নাড়া দিয়াছে। ইহার প্রভাব যদিও কাহারো জন্যই সুখকর হইবে না, তথাপি এই খেলা চলিতেছে এবং সহসা বন্ধ হইবার কোন লক্ষণ দেখা যাইতেছে না। খোলা চোখে দেখিলে ইহা স্পষ্ট যে, ছয় বছরের মধ্যে সর্বনিম্নে তেলের দাম দাঁড়াইয়াছে। মাত্র ৪০ ডলারে ব্যারেল প্রতি তেল কিনিতে পাওয়া যাইতেছে। ইহার পরও তেল উত্তোলন কমিতেছে না। বরঞ্চ তেল উত্তোলনকারী দেশগুলির সংগঠন ওপেকের সদস্যরা তেল উত্তোলন বাড়াইয়া দিয়াছে। বিশেষত সৌদি আরব এবং ইরাক তাদের প্রয়োজনের অতিরিক্ত তেল উত্পাদন করিতেছে। একই ভাবে যুক্তরাষ্ট্রের তেলের মজুদও পর্যাপ্ত পরিমাণে রহিয়াছে এবং উত্তোলনও শুরু করিয়াছে। ইহার ফলে, অতিরিক্ত সরবরাহ নিশ্চিত হওয়ায় তেলের মূল্য ক্রমেই কমিতেছে।
বিশ্লেষকরা বলিয়াছেন, ইহা মূলত নানান ইস্যুতে রাশিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধের ফল। যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক অবরোধে পড়া রাশিয়া অন্যতম তেল রফতানিকারক দেশ এবং ইহার জাতীয় আয়ের বড় অংশই আসে তেল রফতানি করিয়া। দাম কমিয়া যাইবার ফলে রাশিয়ার আয়ও কমিয়া যাইবে এবং অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হইবে তাহাতে ‘বিশ্ব রাজনীতিতে রাশিয়ার হুঙ্কার’ও ক্ষীণ হইবে— এই কৌশলেই আগাইয়াছে যুক্তরাষ্ট্র। এই যখন বাজারের অবস্থা, তখন আরো দাম কমিবার পূর্বাভাস দিয়াছে বিশ্বব্যাংকসহ আরো কিছু সংস্থা। ইহার পিছনে যুক্তিও আছে। ইরানের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের প্রভাবে তেলের বাজারে সরবরাহ বৃদ্ধি এবং দরপতন অব্যাহত থাকিবে বলিয়া ধারণা করা হইতেছে। কারণ, ইরানের পরমাণু কর্মসূচি সীমিত রাখিবার বিনিময়ে সেই দেশের উপর হইতে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা তুলিয়া নেওয়ার প্রভাবেই এমনটি হইবে।
তেল লইয়া যখন এই রাজনীতি, তখন শীর্ষ দেশগুলির অর্থনৈতিক শ্লথ গতিও দেখা দিয়াছে। যাহা নতুন করিয়া উদ্বেগের কারণ হইয়া দাঁড়াইয়াছে। আশংকা করা হইতেছে আরেকটি মন্দাও কি আসন্ন? গত ত্রিশ বত্সর ধরিয়া ক্রমঅগ্রসরমান অর্থনীতি চীনকে লইয়া পশ্চিমা বিশ্বের ভীতিও কম ছিল না। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্ অর্থনীতির এই দেশটি পণ্য ও বাণিজ্যিক সেবা আমদানিতেও দ্বিতীয় শীর্ষে রহিয়াছে। সেই চীনের প্রবৃদ্ধি কমিয়া যাওয়ায় বিশ্বজোড়া বিনিয়োগকারীরা উদ্বিগ্ন হইয়া পড়িয়াছে। ইহার আগে তেলের দাম যখন আকাশচুম্বী ছিল, তখন চীনের অগ্রসরমান অর্থনীতিকেই দায়ী করা হইয়াছিল। এইবারে চীন নিজেই যদি সমস্যায় থাকে, তাহা হইলে জ্বালানি তেলের মূল্য আরো একধাপ কমিয়া যাওয়াই স্বাভাবিক। তখন তেল বিক্রেতা দেশগুলি যেমন প্রত্যাশিত আয় করিবে না, তেমনি চাহিদা না থাকায় বিকাশমান অর্থনীতির দেশগুলিও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়িবে। সেই ক্ষেত্রে আরেকটি মন্দা গ্রাস করিবার শঙ্কা উড়াইয়া দেওয়া যায় না। ইতোমধ্যে তেল কোম্পানিগুলির শেয়ারের দামও কমিয়াছে। কোন কোন কোম্পানি হাজার হাজার কর্মীও ছাঁটাই করিয়াছে। দরপতন অব্যাহত থাকা মানে আরো কর্মসংস্থানের সুযোগ বন্ধ হওয়া এবং আয় কমিয়া যাওয়া। ইহার প্রভাব সরাসরি পড়িবে বাংলাদেশের মত দরিদ্র দেশগুলিতেও। তেল রফতানিকারক দেশগুলিতে শ্রম চাহিদাও কমিয়া যাইবে, তাহাতে রেমিটেন্স প্রবাহ ক্ষতিগ্রস্ত হইবে। বিশ্ববাজারে উত্পাদিত পণ্যের চাহিদা কমিয়া গেলে রফতানি আয় ও বাজার দুইটিই সংকুচিত হইবে। এই মুহূর্তে যদিও কম দামে তেল আমদানি করিতে পারায় সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে ভর্তুকি দিতে হইতেছে না। কিন্তু সামগ্রিক চাহিদা কমিয়া গেলে ইহার প্রতিঘাত মোকাবেলার সক্ষমতার বিষয়টি স্বল্পোন্নত দেশগুলিকে এখুনি ভাবিতে হইবে।
