অপরাধীদের ব্যবহৃত ৯৫ ভাগ সিমের রেজিস্ট্রেশন নেই

S M Ashraful Azom
মোবাইল ফোন অপারেটর এয়ারটেলের একটি নম্বর দিয়ে মিরপুরের একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীর কাছে ২৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয় একজন শীর্ষ সন্ত্রাসীর নামে। ওই নম্বরটিসহ গত মাসে পল্লবী থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী। পুলিশ ওই মোবাইল ফোনের বিস্তারিত জানতে সংশ্লিষ্ট অপারেটরকে নম্বরটি পাঠিয়ে দেয়। কয়েকদিন পর এয়ারটেল থেকে যে তথ্য পাওয়া যায় তাতে দেখা যায় ওই নম্বরের রেজিস্ট্রেশন ঠিক আছে। কিন্তু তার সবকিছুই ভুয়া। নম্বরটির অনুসন্ধান করতে গিয়ে পুলিশ দেখে, শুধু চাঁদাবাজির কাজেই ব্যবহার করা হয়েছে নম্বরটি। শুধু ওই ব্যবসায়ী নয়, আরো কয়েকজনের কাছে চাঁদা চাওয়া হয়েছে।
 
শুধু এই একটি ঘটনা নয়, হরহামেশাই মোবাইল ফোন দিয়ে চাঁদা দাবি করা হচ্ছে। আর এসব চাঁদা দাবির অভিযোগ তদন্তে নেমে পুলিশকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। কারণ ওই সব নম্বরের অধিকাংশের কোন রেজিস্ট্রেশনই নেই। আর দু’একটি রেজিস্ট্রেশন পাওয়া গেলেও ঠিকানা ও ছবি সবই ভুয়া। গত মাসে এই ধরনের ১৩০টি সিম বন্ধ করে দিয়েছে পুলিশ। অনিবন্ধিত এই সব সিমের ওই হুমকিদাতা বা চাঁদাবাজকে অনেক সময় শনাক্ত করতে পারে না পুলিশ বা র্যাব। এ নিয়ে র্যাব ও পুলিশের পক্ষ থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে বারবার অনুরোধ করা হয়েছে। কিন্তু কখনই সিমের রেজিস্ট্রেশন নিশ্চিত করতে শক্ত পদক্ষেপ নেয়নি বিটিআরসি।
 
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার ছানোয়ার হোসেন ইত্তেফাককে বলেন, ‘গত দুই মাসে অপরাধীদের অন্তত ৩০০ নম্বর নিয়ে আমি কাজ করছি। এর মধ্যে ৯৫ ভাগ নম্বরের রেজিস্ট্রেশন নেই। অপরাধীদের হাতে অনিবন্ধিত সিম থাকার কারণে অপরাধ করে কিছুদিন গা ঢাকা দিয়ে থাকতে পারছে তারা।’ পুলিশের এই কর্মকর্তার মতে, সিমের রেজিস্ট্রেশন শতভাগ করা গেলে অপরাধ অর্ধেকের বেশি এমনি কমে যাবে।
 
গ্রামীণফোনের কর্পোরেট এফেয়ার্সের প্রধান মাহমুদ হোসাইন ইত্তেফাককে বলেন, ‘জাতীয় পরিচয়পত্রের সার্ভারে প্রবেশের সুযোগ না দিলে আমাদের পক্ষে আসল-ভুয়া খুঁজে বের করা সম্ভব নয়। বারবার আশ্বাস দেয়া হলেও আমাদের সেই সুযোগ দেয়া হয়নি।’ এয়ারটেলের হেড অব পিআর অ্যান্ড ইন্টারনাল কমিউনিকেশন শমিত মাহবুব শাহাবুদ্দিন ইত্তেফাককে বলেন, ‘বাজারে এয়ারটেলের কোন অনিবন্ধিত সিম নেই। প্রতিটি সিমই বিটিআরসির নির্দেশনা অনুযায়ী চালু করা হয়। কেউ যদি ভুয়া পরিচয় দেন তাহলে আমাদের পক্ষে শনাক্ত করা কঠিন। তবে আমরা বিটিআরসির নির্দেশনার বাইরে কিছুই করি না। বাজারে এয়ারটেলের সিমের চাহিদা বেশি। এই কারণে কোন চক্র ভুল তথ্য দিয়ে থাকতে পারেন। আমরা সেগুলো ধরতে পারলে বন্ধ করে দেই।’
 
বছর তিনেক আগে ২০১২ সালে মোবাইল ফোনের সিমের রেজিস্ট্রেশন নিয়ে বেশ কঠোর অবস্থান নেন তত্কালীন বিটিআরসির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) জিয়া আহমেদ। ওই সময় তিনি অনিবন্ধিত সিমের জন্য সংশ্লিষ্ট অপারেটরদের জরিমানাও করেন। সবচেয়ে বেশি টাকা জরিমানা করা হয় এয়ারটেলকে ২ কোটি ৫৫ লাখ ২৫ হাজার ৫০০ টাকা। তাদের ৬ হাজার ১৮৮টি নিবন্ধনহীন সিম পাওয়া গেছে। গ্রাহক সংখ্যার দিক দিয়ে দ্বিতীয় সেরা মোবাইল ফোন অপারেটর বাংলালিংকের ৩ হাজার ৮৫৭টি অনিবন্ধিত সিম র্যাবের মাধ্যমে পায় বিটিআরসি। ৫০ ডলার হিসেবে তাদের জরিমানার পরিমাণ ১ কোটি ৫৯ লাখ ১০ হাজার ১২৫ টাকা। শীর্ষ অপারেটর গ্রামীণফোনের জরিমানা ১ কোটি ৭ লাখ ৯৫ হাজার ১২৫ টাকা। তাদের অনিবন্ধিত সিম তখন পাওয়া যায় ২ হাজার ৬১৭টি। রবি’র ১ হাজার ৩০৯টি অনিবন্ধিত সিমের বিপরীতে জরিমানা ৫৩ লাখ ৯৯ হাজার ৬২৫ টাকা। টেলিটকের সিম ১ হাজার ১২৪টি সিমের জরিমানা ৪৬ লাখ ৩৬ হাজার ৫০০ টাকা। আর সিটিসেলের রিম রয়েছে ১৫৯টি। তাদের জরিমানা ৬ লাখ ৫৫ হাজার ৮৭৫ টাকা। এসব টাকা পরিশোধও করে তারা।
 
জিয়া আহমেদের মৃত্যুর পর বিটিআরসির চেয়ারম্যান হন সুনীল কান্তি বোস। প্রথম দিকে তিনিও শক্ত থাকলেও সবকিছুর পর আবার আগের জায়গায় ফিরে যায়। এরপর আর অনিবন্ধিত সিমের জন্য কাউকে জরিমানা করা হয়নি। সর্বশেষ তারানা হালিম টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর নতুন করে তত্পরতা শুরু হয়েছে।
 
তারানা হালিম ইত্তেফাককে বলেন, ‘মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর আমার প্রথম পদক্ষেপ-প্রতিটি সিমের রেজিস্ট্রেশন নিশ্চিত করতে হবে। এখানে কোন ছাড় দেয়া হবে না। এ কারণে আমি নিজেই মাঠে নেমে অভিযান চালাচ্ছি।’ উত্স মুখ বন্ধ না করে মাঠে অভিযান চালালে কতটা সফলতা আসবে- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সমস্যা কোথায় তা জানতে হলেও মাঠ পর্যায়ে যেতে হবে। কারণ অপারেটররা দায় এড়িয়ে সব অভিযোগ দেন রিটেলার বা দোকানিদের উপর। তাই দোকানিদের ধরে অনুসন্ধান করে উেস যাওয়ার চেষ্টা করছি। যেখান থেকেই অনিবন্ধিত সিম বাজারে দেয়া হচ্ছে তাদের কোন ছাড় নেই।’ বিটিআরসির কাজে অসন্তোষ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘আমি ঘোড়ার স্পিডে দৌড়ালে তাদেরও ওই স্পিডে দৌড়াতে হবে। কচ্ছপের গতিতে দৌড়ালে হবে না।’ এই কাজে তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতা চান।
 
সম্প্রতি পুলিশ সদর দফতর থেকে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এক চিঠিতে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে মোবাইল ফোনে চাঁদা দাবি, হুমকি প্রদান, ভয়-ভীতি প্রদর্শন ও উত্ত্যক্ত করার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া ফোন ব্যবহার করে নানা ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে। নিবন্ধন ছাড়া সিম বিক্রি করায় এসব ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট গ্রাহককে শনাক্ত করা সম্ভব হয় না। তাই অনিবন্ধিত সিমের ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে ব্যবস্থা নেয়ার অনুরোধ করে তারা।
 
শেষ পর্যন্ত অনিবন্ধিত সিম ধরতে মোবাইল কোর্ট চালাতে চান টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম। কয়েকদিন আগে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়ে মোবাইল কোর্ট চেয়েছেন তিনি। গত বছরের পহেলা এপ্রিল মোবাইল ফোন অপারেটরগুলোর অনিবন্ধিত সব সিম বন্ধ করতে নির্দেশ দিয়েছিল হাইকোর্ট। বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার ও মুহাম্মদ খুরশীদ আলম সরকারের বেঞ্চ এই আদেশ দেয়। বিটিআরসি, বিটিআরসির চেয়ারম্যান, স্বরাষ্ট্র সচিব, ডাক ও টেলিযোগাযোগ সচিবসহ গ্রামীণফোন, বাংলালিংক, টেলিটক, রবি, এয়ারটেলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে অবিলম্বে এই আদেশ বাস্তবায়ন করতে বলা হয়েছিল। হাইকোর্টের এই আদেশের তোয়াক্কা না করে অলিগলি থেকে শুরু করে সর্বত্র এখনো বিক্রি হচ্ছে নিবন্ধনহীন সিম।
 
একটি মোবাইল ফোন অপারেটরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ইত্তেফাককে বলেন, ‘অনেকদিন ধরেই বলা হচ্ছে জাতীয় পরিচয়পত্রের সার্ভারে প্রবেশের সুযোগ পাবে মোবাইল ফোন অপারেটররা। তাহলেই অপারেটরদের পক্ষে গ্রাহকের পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব। কারণ একটি পরিচয়পত্র নিয়ে কেউ সিম কিনতে এলে কোনভাবেই বোঝার সুযোগ নেই, সেটি আসল না নকল। ফলে তার কাগজপত্র দেখেই সেটি বিশ্বাস করে তার কাছে সিম বিক্রি করা হচ্ছে। এরপর যদি দেখা যায় ওই কাগজটি সঠিক নয়, তাহলে অনেক নম্বরই বন্ধ করে দেয়া হয়।’
 
তাদের এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত নন টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম। তিনি বলেন, যাদের দিয়ে অপারেটররা সিম বিক্রি করছেন, তাদের তো অন্তত সংশ্লিষ্ট অপারেটরের অনুমোদন থাকতে হবে। কিন্তু তাও নেই। আর অনেক রেজিস্ট্র্রেশনে দেখা যাচ্ছে উদ্ভট নাম ও বাবা-মায়ের নাম ব্যবহার করা হচ্ছে। যা দেখেই বোঝা যায় এটা ঠিক নয়। আসলে এখানে আন্তরিকতাটা গুরুত্বপূর্ণ। সবাই আন্তরিক হলেই এই প্রবণতা থেকে বের হওয়া যাবে।
 
র্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক কর্নেল জিয়াউল আহসান ইত্তেফাককে বলেন, ‘বাংলাদেশ ছাড়া বিশ্বে আর কোথাও এভাবে অনিবন্ধিত সিম বাজারে পাওয়া যায় না। মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলোর এই অসুস্থ প্রতিযোগিতা বা মানসিকতার কারণে অপরাধ দমনে বেগ পেতে হচ্ছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে। সরকার কঠোর হলেই এসব নিয়ন্ত্রণ সম্ভব।’
ট্যাগস

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Know about Cookies
Ok, Go it!
To Top