হাতে না পেয়ে ভারতের ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ দাউদ ইব্রাহিমকে ভাতে মারতে চাইছে দেশটির সরকার। তার জন্য প্রথম ধাপে কাজও শুরু করে দিয়েছে দেশটির কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গোয়েন্দারা। সরকারের ধারণা, সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে দাউদ নিজে যেমন আর আত্মসমর্পণ করবে না, ঠিক তেমনই তাকে পাকিস্তান থেকে বের করে ধরে আনাও কার্যত অসম্ভব। অথচ পাকিস্তানে বসে ভারতবর্ষের বিরুদ্ধে নানা ষড়যন্ত্রে প্রতিবেশী দেশকে সাহায্য করার প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও এই মাফিয়া ডনের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নিতে পারছে না ভারত সরকার।
এই কারণেই দাউদ এবং তার মাফিয়া চক্রকে মোকাবেলা করার জন্য নতুন কৌশলের কথা ভাবছেন ভারতের সরকারি কর্মকর্তারা। দেশটির কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তার ব্যাখ্যা, ইয়াকুবের ফাঁসির ঘটনার পর দাউদ নিজে নতুন করে প্রত্যাঘাতের চেষ্টা করবে ইতোমধ্যে সেই সতর্কবার্তাও দেওয়া হয়েছে মুম্বাইসহ দেশের বড় শহরগুলিতে।
এরই মধ্যে দাউদের সাগরেদ ছোটা শাকিল ফোন করে পাল্টা আঘাত হানার হুমকিও দিয়েছে। ফলে সব মিলিয়ে মুম্বাই বিস্ফোরণের অভিযুক্ত ইয়াকুব মেমনের ফাঁসির পর দাউদ আবারও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে ভারতের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে। ওই বিস্ফোরণের অন্যতম মূল অভিযুক্তের নামও দাউদ ইব্রাহিম কাসকর।
গোয়েন্দাদের হিসেবে, পাকিস্তানের আতিথেয়তায় দাউদ করাচিতে থাকলেও এখনও ক্রিকেট বেটিং, সিন্ডিকেট এবং হুমকি দিয়ে টাকা আদায়সহ একাধিক খাতে কয়েক হাজার কোটি টাকা তুলে থাকে দাউদের দলবল। সেই টাকা হাওয়ালার মাধ্যমে পৌঁছেও যায় ভিনদেশে। ভারতবর্ষের বড় শহরগুলির মধ্যে এমন কোনও জায়গা নেই যেখান থেকে এই টাকা আদায় হয় না। শুধুমাত্র মুম্বাই থেকেই বছরে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা এখনও আদায় হয় শুধু দাউদের নামেই!
এই মুহূর্তে ভারত সরকারের ‘দাউদ-স্ট্র্যাটেজি’ কী? দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্রের খবর, ভারতে চলা দাউদের মৌরসিপাট্টা ভেঙে দিতে মরিয়া দেশটির সরকার। সেজন্য আইবি-কে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যেখানে যেখানে দাউদের ব্যবসা চলার সামান্য খবরও পাওয়া যাবে সেখানেই খোঁজ নিয়ে বিস্তারিত রিপোর্ট তৈরি করতে হবে। তাতে কারা কারা জড়িত রয়েছে রিপোর্টে তারও উল্লেখ থাকতে হবে। কারণ, এই ব্যবসাগুলি থেকে বিপুল টাকার যোগান বন্ধ করতে চাইছেন গোয়েন্দারা। জানা গিয়েছে, এ জন্য বিভিন্ন হাওয়ালা অপারেটরদের ওপরও নজরদারি বাড়াতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যেই ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে যারা দাউদ মাফিয়া চক্রের সঙ্গে যুক্ত তাদের সম্পর্কে রিপোর্ট তৈরির কাজও শুরু হয়েছে।
ভরতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র দপ্তরের এক কর্মকর্তার কথায়, শুধু এটাই নয়, দ্বিতীয় ভাগে আরও কড়া মনোভাব নেওয়া হবে। তার মধ্যে রয়েছে- দাউদের যে সম্পত্তি এদেশে রয়েছে আইনি জটিলতা কাটিয়ে সেগুলিকে নিলামের তোলার প্রস্তুতি শুরু করা। পারমোডিয়া স্ট্রিটসহ দাউদের অধিকাংশ সম্পত্তি এখন ফেমা আইনে সিল করে রাখা হয়েছে। যার মধ্যে একটি বিল্ডিং প্রায় চার বছর আগে একটি স্বেচ্ছাসেবি সংস্থা কিনতে চেয়ে মুম্বাই পুলিশকে চিঠিও দিয়েছিল। যদিও সম্পত্তি বিক্রির প্রক্রিয়া কতটা সফল হবে তা নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন রয়েছে।
কারণ, ২০০১ সালের জানুয়ারি মাসে আয়কর বিভাগের পক্ষ থেকে দাউদের মোট ১১টি সম্পত্তি নিলাম করার জন্য তোলা হলেও একজনও ক্রেতা তা কেনার জন্য এগিয়ে আসেননি। আবার সে বছরেরই সেপ্টেম্বর মাসে ১৩টি সম্পত্তি বিক্রির জন্য দর ডাকা হলে মাত্র ছ’জন গোপনে দরপত্র জমা দিয়েছিল। যদিও পরে সেই কাজও আর এগোয়নি।
ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে আরো খবর, ভারত থেকে যা টাকা যায় তা দিয়ে পাকিস্তানে মোচ্ছবেই রয়েছেন দাউদ। সুতরাং তার কাছে আর্থিক যোগানটা বন্ধ করতে হবে। আর অর্থ বন্ধ হলে আইএসআই-সহ অন্যান্য সংস্থা শুধুমাত্র অতিথি দাউদকে দেখে রাখতে অনেকটাই উত্সাহ হারাবে।
কিন্তু পুরো বিষয়টি আসলে কতটা সফল হবে? ভারতীয় গোয়েন্দাদের কথায়, বিষয়টি আপাত দৃষ্টিতে সহজ মনে হলেও আসলে তা নয়। কারণ দাউদের অধিকাংশ ব্যবসাই এখানে চলে বেনামে। যা চিহ্নিত করা কার্যত দুঃসাধ্য। এজন্য শুধু আইবি নয়, নামতে হবে সিবিআই ইডিসহ অন্যান্য কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাগুলিকেও।

