আধুনিক বাংলা কবিতার অন্যতম প্রধান কবি শামসুর রাহমানের নবম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। ২০০৬ সালের এই দিনে তিনি ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন। অনুজপ্রতিম এক কবিকে শামসুর রাহমান বলেছিলেন, ‘একজন কবির সবচেয়ে উপভোগের বিষয় কাব্য রচনা। কবিতা রচনার মধ্য দিয়েই আমি জীবনকে উপভোগ করি।’ কবি শামসুর রাহমান তাই আজীবন কবিতায় সমর্পিত ছিলেন।
২০০৬ সালের ১৭ আগস্ট ৭৬ বছর বয়সে আমাদের ছেড়ে চলে গেলেও আজীবন কবিতায় সমর্পিত এ কবি বেঁচে আছেন বাঙালির সত্তায়— প্রধানতম কবি হয়েই। ‘তোমাকে পাওয়ার জন্য হে স্বাধীনতা আর কতকাল ভাসতে হবে রক্তগঙ্গায়’ — মুক্তিযুদ্ধে কবির উদ্দীপ্ত উচ্চারণে স্বাধীনতাকামী মানুষের মনে সাহস সঞ্চারিত হয়েছিল। কবিতার বরপুত্র, কালের কণ্ঠস্বর এ কবি ছিলেন মৃদুভাষী। মুক্তিযুদ্ধে, মৌলবাদ ও স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তার কবিতা মানুষকে উজ্জীবিত করেছে, জুগিয়েছে প্রেরণা। সকল বিপর্যয়ে, দুঃশাসনে, মানবতার লাঞ্ছনায় বাঙালিকে বার বার ফিরে যেতে হবে কবি শামসুর রাহমানের কাছে।
মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে জাতীয় কবিতা পরিষদ ও শামসুর রাহমান স্মৃতি পরিষদের পক্ষ থেকে আজ সকাল ১১টায় বনানী কবরস্থানে কবির কবরে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হবে। এছাড়া সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠন এতে অংশ নেবে। কবির স্মরণে ‘তিনবাংলা লেখক ফাউন্ডেশন’ আগামীকাল জাতীয় জাদুঘরের কবি সুফিয়া কামাল মিলনায়তনে বিশেষ অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করেছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রদর্শনী, কর্মশালা, স্মৃতিচারণ, সম্মাননা প্রদান ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
কবি শামসুর রাহমান ১৯২৯ সালের ২৩ অক্টোবর ঢাকার মাহুতটুলিতে নানা বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তার পৈত্রিক বাড়ি নরসিংদী জেলার রায়পুরায় পাড়াতলী গ্রামে। ১৯৪৯ সালে সোনার বাংলা পত্রিকায় তার প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয়। তিনি বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় ছদ্মনামে সম্পাদকীয় ও উপ-সম্পাদকীয় লিখতেন। ১৯৫৭ সালে দৈনিক মর্নিং নিউজ পত্রিকায় সাংবাদিক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। স্বাধীনতার পরে ১৯৭৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে দৈনিক বাংলা ও সাপ্তাহিক বিচিত্রার সম্পাদক নিযুক্ত হন। ১৯৮৭ সালে সামরিক সরকারের শাসনামলে তিনি দৈনিক বাংলা থেকে পদত্যাগ করেন। এরপর তিনি সাহিত্য পত্রিকা অধুনা’র সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
কবির লেখা ‘বর্ণমালা, আমার দুখিনী বর্ণমালা’, ‘আসাদের শার্ট’, ‘স্বাধীনতা তুমি’, ‘তোমাকে পাওয়ার জন্য হে স্বাধীনতা’ এসব কবিতার মধ্যে তার বিদ্রোহী চেতনার বহিঃপ্রকাশ ঘটে। তার প্রকাশিত প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘প্রথম গান, দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে’ ১৯৬০ সালে প্রকাশিত হয়। কাব্য, উপন্যাস, প্রবন্ধ, শিশুতোষ গ্রন্থসহ তার রচিত শতাধিক বই রয়েছে।
সাহিত্যে অনন্য অবদানের জন্য তিনি আদমজী সাহিত্য পুরস্কার, বাংলা একাডেমি পুরস্কার, একুশে পদক, নাসির উদ্দন স্বর্ণপদক, জীবনানন্দ পুরস্কার, আবুল মনসুর আহমেদ স্মৃতি পুরস্কার, সাংবাদিকতার জন্য মিতসুবিশি পুরস্কার, স্বাধীনতা পদক ও আনন্দ পুরস্কার লাভ করেন। এছাড়া ভারতের যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় এবং রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে কবিকে সম্মান সূচক ডি লিট উপাধি দেয়া হয়।

